কালান্তরের কড়চা

ভাগের মা গঙ্গা পায় না

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

 

AG

ব্রিটেনের ২৩ জুনের গণভোটে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ত্যাগের পক্ষে রায় সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া নিয়ে ঢাকার অন্য দুটি কাগজে আমি নিবন্ধ লিখেছি। আজকের লেখাটিও ব্রিটেনের গণভোট সম্পর্কেই। তবে এটা আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। হিন্দু শাস্ত্রে বলে, মানুষকে তার কর্মফল ভোগ করতে হয়। কথাটা একটা দেশ ও রাষ্ট্র সম্পর্কেও প্রযোজ্য। যারা অন্য দেশকে ভাগ ও বিভাজনের রাজনীতি করে, শেষ পর্যন্ত সেই বিভাজনের অভিশাপ তাদের মাথাতেই নেমে আসে।

ব্রিটিশ জনগণকে দোষ দিই না। এ রূপ একটি সহিষ্ণু পরিশ্রমী ও উদার জাতি পৃথিবীতে কমই আছে। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠী, তারা কনজারভেটিভ, লেবার কিংবা লিবারেল যা-ই হোক, তাদের অতীত ও বর্তমান হচ্ছে কেবল বিভাজনের চাতুর্য ও ধূর্ততায় ভরা। অন্য দেশকে ভাগ করা, তাদের ছোট ছোট রাষ্ট্রে ভাগ করে পরস্পরের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে রাখা এবং এভাবে রক্তাক্ত বিবাদ লাগিয়ে রেখে ওই অঞ্চলে নিজেদের সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ ও প্রভুত্ব বহাল রাখা – এটাই ছিল এক সময়ের ব্রিটিশ কূটনীতি ও রাজনীতি; যার উত্তরাধিকার এখন আমেরিকা গ্রহণ করেছে।

এই অভিশপ্ত কর্মফলই এখন ব্রিটিশদের স্পর্শ করেছে। তাদের সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়েছে। তাদের গড়া অতি সাধের কমনওয়েলথ এখন চ্যাটারিং ক্লাব। সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ঐক্যের বদলে অনৈক্য বিরাজ করছে। খোদ ব্রিটেনের গ্রেটনেসেই এখন ভাঙন ধরেছে। নিজেদের হিতাহিত ভুলে ব্রিটিশ জনগণের একটা বড় অংশ ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ভাগ হয়ে যাওয়ার পক্ষে রায় দিয়েছে। এই রায়ের প্রতিক্রিয়ায় স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড- এই দুটি দেশও ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাইছে। যদি যায় এবং ওয়েলস রাজ্যটিও তাদের পদাঙ্ক অনুসরণ  করতে চায় (এখন পর্যন্ত চাচ্ছে না), তাহলে গ্রেট ব্রিটেন আর গ্রেট থাকবে না। আবার অতীতের ছোট্ট দ্বীপ ইংল্যান্ড হয়ে যাবে।

আমার মতে, এটা অতীত ও বর্তমানের ব্রিটিশ শাসকদের কর্মফল। প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নিয়ে তুরস্কের ওসমানিয়া সাম্রাজ্য (Ottoman Empire) পরাজিত হয়েছে। ইতিহাসবিদরা বলেন, ব্রিটিশ নেতা উইনস্টন চার্চিল এই সাম্রাজ্যকে ছোট ছোট রাষ্ট্রে (ইরাক, সিরিয়া, সৌদি আরব, জর্দান, কুয়েত, কাতার ইত্যাদি) ভাগ করে ব্রিটেনের করদরাজ্যে পরিণত করেন। আয়ারল্যান্ডে ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট অধিবাসীদের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে দেশটিকে দুই ভাগ করা হয়। আইরিশ বিপ্লবীরা ২০০ বছর সন্ত্রাস চালিয়েও ব্রিটিশ শাসনের নিগড় ভাঙতে পারেনি। তবে নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড স্বশাসিত অঙ্গরাজ্য হয়েছে। এখন সেই নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডও ব্রিটেন থেকে ভাগ হতে চায়।

চার্চিল ছিলেন প্রথম লিবারেল এবং পরে টোরি দলের নেতা। কট্টর রক্ষণশীল সাম্রাজ্যবাদী নেতা। তাঁর পক্ষে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে খণ্ড খণ্ড রাষ্ট্র তৈরি এবং তাদের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে রাখা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার ছিল না। কিন্তু লেবার পার্টি একটি সমাজবাদী প্রগতিশীল দল হলেও কী করে ভারতকে স্বাধীনতা দানের সময় একই ভাগ-বিভাজনের নীতি অনুসরণ করল? ভারতবর্ষকে ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা দানের সময় লেবার পার্টি ছিল ব্রিটেনে ক্ষমতায়। ক্লেমেন্ট এটলি ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এই লেবার গভর্নমেন্ট শুধু ধর্মের ভিত্তিতে ভারতকে ভাগই করল না, সাবেক অখণ্ড ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলোর ভাগ্য নির্ধারণের সময় কাশ্মীর রাজ্যটিরও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ না করে তাকে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল সদ্য স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বিবাদ লাগিয়ে রেখে এ অঞ্চলে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থ অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্যে।

ব্রিটিশ শাসকদের এই উদ্দেশ্য সফল হয়নি তা নয়। এই কাশ্মীর নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের বিবাদ চলছে ৬০ বছরের ওপর। ছোট-বড় যুদ্ধ হয়েছে কয়েকটি। কাশ্মীর ভাগ হয়ে এক অংশ ভারতের এবং অন্য অংশ পাকিস্তানের দখলে। কাশ্মীরে এখন সন্ত্রাসী তৈরি হচ্ছে। এই সন্ত্রাস ভারতকে হিন্দুত্ববাদ এবং পাকিস্তানকে তালেবানি ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জঙ্গিবাদ মাথা তুলছে সারা উপমহাদেশে। বাংলাদেশ পর্যন্ত তা ছড়িয়েছে। নিত্য নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হচ্ছে উপমহাদেশের তিনটি দেশেই। ব্রিটিশ শাসকদের ভাগ করো ও শাসন করো (Divide and rule) নীতির দগদগে ঘা এখন সারা উপমহাদেশের অঙ্গে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্য এখন নেই। কিন্তু ব্রিটিশ শাসকদের অতীতের সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ও নীতির বড় রকমের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধে আমেরিকার শরিক না হয়ে ব্রিটেনের লেবার গভর্নমেন্ট একসময় যে গৌরব অর্জন করেছিল, তা একালে সম্পূর্ণ ধ্বংস করে টনি ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন লেবার গভর্নমেন্ট। ইরাকে শিয়া-সুন্নি বিবাদ বাধানো এবং দেশটিকে বিভক্ত করার মার্কিন পরিকল্পনায়ও ব্রিটিশ সরকারের সায় ছিল। সিরিয়ায় আসাদ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে উসকানি দান এবং আইএস বা তথাকথিত ইসলামিক স্টেট নামের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সৃষ্টি করার পেছনে ছিল আসাদ সরকারের পতন ঘটানো এবং সিরিয়াকেও ভাগ করে ফেলা।

সিরিয়া সমস্যা সৃষ্টি করে লাখ লাখ শরণার্থী সমস্যা তৈরি দ্বারা সারা বিশ্বে অবস্থার ভারসাম্য ধ্বংস করেছে ইঙ্গ-মার্কিন পরিকল্পনাই। ক্যামেরন সরকার যখন কৃচ্ছ্রতার নীতি অনুসরণের নামে ব্রিটিশ জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ রাষ্ট্রের সার্ভিসগুলো নির্মমভাবে ছাঁটাই করছে, তখন মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে নিত্যনতুন হামলার (যেমন সিরিয়ায় বিমান হামলা) ঘোষণা দিয়ে অনাবশ্যক যুদ্ধে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ বরাদ্দে কার্পণ্য করেনি।

ব্রিটিশ শাসকদের অতীত ও বর্তমানের এই কর্মফলই আজ তাদের জন্য বুমেরাং হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা না-থাকার প্রশ্নে ব্রিটিশ জাতি আজ এতটা দ্বিধাবিভক্ত, যা অতীতে কখনো দেখা যায়নি। টোরি ও লেবার দুটি বড় দলেই রয়েছে এই বিভক্তি। এই সেদিন ডেভিড ক্যামেরন সাধারণ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। দুদিন না যেতেই নিজ দলের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার বিরোধী অংশের কাছে পরাজিত হয়ে তাঁকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

এবারের গণভোটের একটা বিস্ময়কর ব্যাপার হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে যাতে ব্রিটেন বেরিয়ে না আসে সে জন্য দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রীসহ সাবেক দুজন প্রধানমন্ত্রী জন মেজর ও টনি ব্লেয়ারও ক্যাম্পেইনে নেমেছিলেন। প্রভাবশালী অনেক মিডিয়াই ছিল ইউরোপে থাকার পক্ষে। লন্ডনের মেয়র এখন লেবার দলের পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সাদেক খান। তিনি বিপুলভাবে জনপ্রিয় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে জোর প্রচারণা চালিয়েছেন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনের সঙ্গে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইউনিয়নে থাকার পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। ব্রিটিশ কমনস সভায় পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত সদস্য মিসেস ওয়ার্সি, টিউলিপ সিদ্দীক, রুশনারা আলীসহ তিনজন বাংলাদেশি সদস্যও ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে জোর প্রচারকার্যে অংশ নিয়েছেন।

আমেরিকার জোর চাপ ছিল ব্রিটেন যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকে। প্রেসিডেন্ট ওবামা স্বয়ং এ জন্য আবেদন জানিয়েছিলেন। ব্রিটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের স্বার্থও নানাভাবে সম্পৃক্ত। কারণ এ দেশে কয়েক লাখ বাংলাদেশির বাস। ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থায় এখন তারা অনেকটা অঙ্গীভূত। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাই প্রকাশ্যেই অভিমত প্রকাশ করেছেন, ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকা উচিত। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত দূত হয়ে ব্রিটেনে এসেছিলেন তাঁর মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফ। তিনি বাংলাদেশি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনের এক সভায় বক্তৃতা দিয়ে তাঁর স্বদেশিরা যাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে ভোট দেয় সে জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।

কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার পক্ষে রায় দিয়েছে; যদিও এই রায়ের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা কম। কিন্তু এই রায় ক্যামেরন সরকারের পতন ঘটিয়েছে। ব্রিটিশ জাতিকে দ্বিধাবিভক্ত করেছে। এমনকি অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির সঙ্গে বিলাতের বাংলাদেশি কমিউনিটিও দ্বিধাবিভক্ত হয়েছে। এই গণভোটে উগ্র জাতীয়তা কতটা কাজ করেছে তা বোঝা যায় জো কক্সের মতো একজন জনপ্রিয় মহিলা এমপির নির্মম হত্যাকাণ্ডে। তিনি লেবার দলের এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার একজন প্রভাবশালী সমর্থক ছিলেন।

ব্রিটেনের ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পক্ষে দেশে-বিদেশে এত সমর্থন থাকা সত্ত্বেও দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে তা কেন প্রভাবিত করতে পারল না, তার চুলচেরা বিশ্লেষণ এখন চলছে। কিন্তু কেউ কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছেন না। ‘ভাগের মা গঙ্গা পায় না’ – এই প্রবাদটি এখন ব্রিটেনের বেলায় সত্য হতে চলেছে। গণভোটের রায় প্রকাশিত হতেই স্টার্লিংয়ের বাজারদর কমছে। শেয়ার মার্কেট ও স্টক এক্সচেঞ্জে ধস নেমেছে। এই অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রাজনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা। স্কটল্যান্ড ও নর্দার্ন আয়ারল্যান্ড ব্রিটেন থেকে আলাদা হয়ে যেতে চাইছে।

ব্রিটিশ রাজনীতিতেও পরিবর্তনের ঝোড়ো হাওয়া বইছে। ক্যামেরনের মধ্যপন্থী সরকারের বদলে বরিস জনসন অথবা অন্য কোনো কট্টর ডানপন্থী নেতার নেতৃত্বে পুরো ডানপন্থী একটি টোরি সরকার ক্ষমতায় বসতে পারে। লেবার পার্টিতেও বামপন্থী করবিন-নেতৃত্বকে হটানোর ষড়যন্ত্র আঁটছে ব্লেয়ার অনুসারী ডানপন্থীরা। এভাবে টোরি ও লেবার দুই দলেই যদি ডানপন্থী নেতৃত্ব ক্ষমতা দখল করে, তাহলে কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ কী তা ভেবে অনেকে শঙ্কিত।

ব্রিটেনের রাজনীতি কোন দিকে গড়ায় এবং সার্বিকভাবে ইউরোপীয় রাজনীতিতে তা কী প্রভাব বিস্তার করে তা দেখার জন্যই অনেকে এখন অপেক্ষা করছেন। তবে কিছু ব্রিটিশ রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, বৃহত্তর ইউরোপীয় ঐক্যকে এড়িয়ে ক্ষুদ্র দ্বীপ ইংল্যান্ড বিপর্যয় এড়াতে পারবে না। এই বিপর্যয় এড়ানোর জন্যই তাকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে সম্পর্ক রক্ষার জন্য আবার আলোচনার টেবিলে বসতে হবে। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ২৭ জুন ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment