দশ দিগন্তে

শেখ হাসিনা আরেকটি ‘পুলসেরাত’ পার হলেন

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Terrorism

শেখ হাসিনা আরেকটি পুলসেরাত পার হলেন। ভয়াবহ বিডিআর বিদ্রোহের পর এই টেরোরিস্ট বা জিহাদিস্ট হামলা। ইস্পাত কঠিন মনোবল না থাকলে এ ধরনের ভয়ঙ্কর বিপদ মোকাবিলা করা কঠিন। এটা স্তুতির মতো শোনায়, নইলে একথা লিখতে আমার দ্বিধা নেই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে শেখ হাসিনা একজন লৌহ মানবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। শুক্রবার (১ জুলাই বিকালে লন্ডন সময়) খবর পাই যে, ঢাকার একটি রেস্টুরেন্টে টেরোরিস্ট হামলা হয়েছে। তারা দুইজন পুলিশ অফিসারকে হত্যা করেছে। ৪০ জন পুলিশকে আহত করেছে; হোটেলে খেতে আসা কয়েকজন নিরীহ মানুষকে জিম্মি করেছে এবং রেস্টুরেন্টটি টেরোরিস্টদের দখলে; তখন শঙ্কিত হয়ে ভেবেছি, ইস্তাম্বুলের পর ঢাকায় আরেকটি কারবালা-কাণ্ড ঘটতে যাচ্ছে। সরকার কি পারবেন এই পরিস্থিতি সহজে সামাল দিতে?

প্রায় সারারাত টেলিভিশনের সামনে বসে রয়েছি। সিএনএন অবিরাম প্রচার করছিলো ঢাকার খবর। সেই সঙ্গে ঘটনাস্থলের ছবি। পশ্চিমা মিডিয়াগুলোর স্বভাবদোষ এই যে, তারা সঠিক খবর প্রচার করেন বটে; কিন্তু সেই সঙ্গে তাদের ভাষ্য থাকে একতরফা। কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলক। সিএনএনের মার্কিন সংবাদ ভাষ্যকার এবং কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা বারবার এটা প্রমাণ করার চেষ্টা করছিলেন যে, এটা হয় আইএস অথবা আল-কায়েদার হামলা। একথা বলার ফাঁকে ফাঁকে এমন কথাও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশ। সন্ত্রাস মোকাবিলায় তাদের তেমন দক্ষতা ও উন্নত ব্যবস্থা নেই। অর্থাৎ এই সন্ত্রাস মোকাবিলা করা তাদের পক্ষে সহজ হবে না।

একথাটা তারা রানা প্লাজা দুর্ঘটনার সময়েও রটিয়েছিলেন। বাংলাদেশের উদ্ধার কার্য ও ত্রাণ ব্যবস্থা উন্নত নয়- এই ধুয়া তুলে কোনো কোনো পশ্চিমা দেশ তাদের উদ্ধারকারী সেনা ইউনিটকে বাংলাদেশে পাঠাতে চেয়েছিল। বাংলাদেশ সেই সাহায্য নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। আমাদের সেনাবাহিনীর উদ্ধারকারী ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিট অত্যন্ত দক্ষতা ও দ্রুততার সঙ্গে যেভাবে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আটকেপড়া নর-নারীকে উদ্ধার করেছে; ধ্বংসস্তূপ সরিয়েছে তা পরে বহির্বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

শুক্রবারের টেরোরিস্ট হামলার ঘটনাতেও বাংলাদেশের পুলিশ ও র‍্যাব দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দেখিয়েছে। ঢাকার রেস্টুরেন্টটি সশস্ত্র জঙ্গিরা দখল করে নেওয়ার পর মনে হয়েছিল তা দখলমুক্ত করতে বেশ কিছুুদিন লাগবে। হোস্টেসদের জীবিত উদ্ধার করা যাবে কিনা সন্দেহ। সরকারকেও হয়তো নার্ভ হারিয়ে এই সন্ত্রাস মোকাবিলায় বিদেশি সাহায্য চাইতে হতে পারে। মার্কিন পেন্টাগনতো সেই আশায় গোঁফে তা দিয়ে বসে আছেন। তাহলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক ও সিরিয়ার মতো উপ-মহাদেশের পাকিস্তানের পর বাংলাদেশেও একটা কিলিং ফিল্ড তৈরি করতে পারেন। সন্ত্রাসী এবং সন্ত্রাস দমনকারী দুই পক্ষের কাছেই দেদার অস্ত্র বিক্রি করে বিরাট মুনাফা লুটতে পারেন; যেটা তারা মধ্যপ্রাচ্যে করছেন।

শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ। তার সরকার এই কাজটা করেননি। বিডিআর বিদ্রোহ মোকাবিলা করার সময় প্রধানমন্ত্রী যে সাহস ও মনোবলের পরিচয় দেখিয়েছেন, এবার টেরোরিস্ট হামলার সময়েও তা দেখিয়েছেন। এক রাতেই পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে বাংলাদেশের র‍্যাব ও পুলিশ। অথচ কোনো কোনো পশ্চিমা দেশে দেখা গেছে, এই ধরনের হামলায় পুলিশ দিনের পর দিন অবরোধ তৈরি করে টেরোরিস্টদের সাথে হোস্টেস উদ্ধারের জন্য নেগোসিয়েসন চালায়। তাতে কখনো সফল হয় কখনো সফল হয় না। এই ধরনের হামলা প্রতিরোধে তারা সেনাবাহিনী পর্যন্ত ব্যবহার করে।

এই লেখাটি লিখতে বসে প্রাথমিক খবরে জানতে পেরেছি, সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযানে ছয়জন টেরোরিস্ট নিহত হয়েছে। একজন ধরা পড়েছে। আটক ব্যক্তিদের মধ্যে ২০ জনকে টেরোরিস্টরা গলা কেটে হত্যা করেছে। তেরোজনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এক ভারতীয় সাংবাদিক কলকাতা থেকে আমাকে জানিয়েছেন- এই টেরোরিস্ট-দমন অভিযানে ভারত সমর্থন ও সাহায্য জুগিয়েছে। বাংলাদেশ সরকার এ সম্পর্কে এখন পর্যন্ত কিছু বলেননি। তবে উপ-মহাদেশে টেরোরিজমের বিস্তার দমনে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন; কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর একটা বড় অংশ জিহাদিস্টদের প্রতি সহানুভূতিশীল। ওসামা বিন লাদেনকে পাকিস্তানই দীর্ঘকাল লুকিয়ে রেখেছিলো।

বাংলাদেশের এই টেরোরিস্ট হামলাটি আইএস না আল-কায়েদা ঘটিয়েছে, সে বিতর্কে গিয়ে লাভ নেই। এই ব্যাপারে বাংলাদেশের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে কারা সন্ত্রাস ঘটাচ্ছে সেই বিতর্কে জড়ানো নিরর্থক। বড় কথা, বাংলাদেশে সন্ত্রাসী আছে এবং তারা সন্ত্রাস ঘটাচ্ছে। সর্বশক্তি প্রয়োগে এদের দমন করা প্রয়োজন। গত শুক্রবারে ঢাকার গুলশানের রেস্টুরেন্টের ট্রাজেডির মধ্যে একটা আশার দিক এই যে, একজন সন্ত্রাসী জীবিত ধরা পড়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে এদের আসল পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের সঙ্গে এদের যোগাযোগ কতোটুকু তা হয়তো জানা যেতে পারে। সেই সূত্র ধরে পুলিশ সন্ত্রাসীদের ঘাঁটি আবিষ্কার এবং তাদের দমনে অগ্রসর হতে পারে।

নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে জঙ্গিরা তাদের টেকনিক বদল করেছে। এতোদিন ছিল টার্গেট কিলিং। দুই-তিনজন সন্ত্রাসী বাইকে চেপে এসে একজন বা দুইজন নিরীহ লোককে হত্যা করেছে এবং পালিয়ে গেছে। এবার তারা সঙ্ঘবদ্ধ হয়ে একটি রেস্টুরেন্টে প্রকাশ্যে হামলা চালিয়েছে এবং পুলিশের সঙ্গে যুদ্ধে রত হয়েছে। এটা যদি একই গ্রুপের কাজ হয়ে থাকে তাহলে বুঝতে হবে, টার্গেট কিলিং দ্বারা যে কাজ হচ্ছে না এটা তারা বুঝতে পেরে অন্য পন্থার আশ্রয় নিয়েছে। অর্থাৎ প্রকাশ্য তত্পরতায় নেমেছে।

এই ব্যাপারে আরো একটি কথা ভেবে দেখার মতো। সাম্প্রতিক সন্ত্রাস-দমন অভিযানে পুলিশ হাজার হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। এই গ্রেফতার অভিযানে সন্ত্রাসীদের একটা বড় দল হয়তো ধরা পড়েছে। বাকি অংশও ধরা পড়বে এই আশঙ্কা থেকে ডেসপারেট হয়ে তারা এই হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। সম্প্রতি তুরস্কের ইস্তাম্বুল বিমান বন্দরে বড় ধরনের বোমা হামলার পর পরই ঢাকায় এই সন্ত্রাসী হামলা ঘটায় দুইটি ঘটনার মধ্যে কেউ কেউ যোগাযোগ খুঁজতে পারেন; কিন্তু দুইটি ঘটনার মধ্যেই অমিলটি স্পষ্ট। ইস্তাম্বুলে আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়েছে। যেটা আইএসের হামলার ট্রেডমার্ক। ঢাকায় আত্মঘাতী বোমা হামলা চালানো হয়নি। রেস্টুরেন্ট দখল করে, গেস্টদের জিম্মি করে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে নেমে জঙ্গিদের ছয়জন নিহত হয়েছে।

আগেই লিখেছি, রেস্টুরেন্টে খেতে আসা বেশ কিছু সংখ্যক গেস্টকে জঙ্গিরা গলা গেটে হত্যা করেছে। এটা জামায়াত-শিবিরের গলাকাটা, শিরাকাটা সন্ত্রাসের সঙ্গে দৃশ্যত অভিন্ন। আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির ধারণা, এই সন্ত্রাস দমনে সরকার আইএস, আল-কায়দা ইত্যাদি সংগঠনের পিছনে না দৌড়ে দেশের ভেতরেই জামায়াত-শিবির এবং তাদের অভিন্ন উপদল যেমন জেএমবি, আনসারুল্লা, হিজবুত ইত্যাদি সংগঠনগুলোর গোপন ঘাঁটিতে হানা দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে পারেন। তাহলে সন্ত্রাস দমন অনেকটা সহজ হবে। আইএস, আল-কায়দার সঙ্গে জামায়াতিদের সংযোগ থাকতে পারে; কিন্তু এই সন্ত্রাসের মূল নায়ক জামায়াত-শিবির।

জামায়াতিদের দুইটি মূল লক্ষ্য, একটি বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও অসাম্প্রদায়িক সরকারের পতন ঘটিয়ে কট্টর ওয়াহাবি মতবাদ ভিত্তিক মধ্যযুগীয় সরকার প্রতিষ্ঠা। দ্বিতীয়ত ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় তার প্রতিশোধ গ্রহণ। তাদের সঙ্গে বাইরের কিছু চক্রেরও যোগসাজশ আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে তারা ঈর্ষান্বিত। স্বনির্ভর, গণতান্ত্রিক  বাংলাদেশের অস্তিত্ব তারা মানতে রাজি নয়।

আমি লিখেছি বটে, শেখ হাসিনা আরেকটি পুলসেরাত পার হলেন। বাস্তবে গুলশানের এই রেস্টুরেন্টের ঘটনা আভাস দিচ্ছে, ভবিষ্যতে এই ধরনের ঘটনা আরো ঘটবে। সন্ত্রাসীরা সম্পূর্ণ নির্মূল হয়নি। তাছাড়া বাংলাদেশেও তাদের রিক্রুটমেন্ট ও ট্রেনিং অব্যাহত রয়েছে। তাদের হাতে অস্ত্র ও অর্থ তুলে দেওয়ার সোর্সেরও অভাব নেই। এই ভয়াবহ চ্যালেঞ্জের মুখে হাসিনা সরকার কি করবেন? অসম্ভব সাহস ও মনোবলের জোরে শেখ হাসিনা নিজের জীবন বাজি রেখে একটার পর একটা দুর্যোগ সামাল দিচ্ছেন; কিন্তু একা তিনি কতো লড়বেন?

এই সন্ত্রাস দমনে একটা জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা এবং সরকারের পেছনে তার জোরালো সমর্থন দরকার। আমাদের বুদ্ধিজীবী এবং সকল পেশার মানুষেরই একটা গোলটেবিল বৈঠকে বসে পঞ্চাশের দশকের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বিরোধী আন্দোলনের মতো একটি সন্ত্রাস-বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করা প্রয়োজন। সন্ত্রাস দমনের জন্য ভারতের সঙ্গেও বাংলাদেশের একটা যুক্ত কার্যক্রম দরকার; যাতে বাংলাদেশে তাড়া খেয়ে সন্ত্রাসীরা ভারতে পালাতে না পারে এবং আবার ভারত থেকে বাংলাদেশে ঢুকতে না পারে।

কলকাতার একটি দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে, বাংলাদেশে সন্ত্রাস বিরোধী গ্রেফতার অভিযান চলাকালে বহু জঙ্গি সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিম বঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা রাজ্যে ঢুকেছে এবং সেখানকার সন্ত্রাসীদের সঙ্গে ঘোঁট পাকাচ্ছে। এদের ধরার জন্য দুই দেশের যুক্ত কার্যক্রম গ্রহণ করা দরকার। ঢাকায় গুলশানের রেস্টুরেন্টের ট্রাজেডি একটি বড় ধরনের অশনি সংকেত। রমজান মাস এবং ঈদউল ফিতরের পবিত্রতাকেও লঙ্ঘন করতে এই সন্ত্রাসীদের কোনো বিবেক পীড়া নেই। তারা ইসলামের নাম তুলেই এই ধর্মের অবমাননা করছে। শুধু গ্রেফতার নয়, সরকার এদের সম্পর্কে একটা সর্বাত্মক কর্মপন্থা গ্রহণ করুন। নইলে গুলশান-ট্রাজেডির পুনরাবৃত্তি আরো ঘটবে। বাংলার মাটিতে এই বর্বর সন্ত্রসীদের সম্পূর্ণ পরাজিত করতে হবে। – ইত্তেফাক

লণ্ডন, ২ জুলাই শনিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment