দশ দিগন্তে

গুলশান শোলাকিয়া থেকে ডালাস : অন্তরালের সত্য

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Terror

বাংলাদেশের গুলশান থেকে শোলাকিয়া, শোলাকিয়া থেকে আমেরিকার ডালাস। পৃথিবীর দুই প্রান্তের দুইটি দেশের সাম্প্রতিক এই তিনটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী কাণ্ডের উত্স এক নয়। বাংলাদেশের সন্তাসের পেছনে রয়েছে ধর্মান্ধ জঙ্গিদের হাত। ডাল্লাসের সন্ত্রাসের পেছনে রয়েছে সাদা পুলিশের সঙ্গে কালো মানুষের বিবাদ। (তবে আগের অরল্যান্ডোর সমকামী ক্লাবের হত্যাকাণ্ড একই ধর্মান্ধ উন্মাদের কাণ্ড)। গুলশান ও শোলাকিয়া এবং ডালাসের সন্ত্রাসের কারণ আলাদা হলেও এই সন্ত্রাস একটি বাস্তব সত্য তুলে ধরেছে যে, সন্ত্রাস মোকাবিলায় পৃথিবীর ছোট-বড় সকল দেশ কতোটা অসহায়।

বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল ছোট দেশ। তথাপি প্রতিবেশী ভারত এবং পাকিস্তানের সন্ত্রাস দমনের চেয়েও বাংলাদেশ পেট্রোল বোমা সন্ত্রাস থেকে শুরু করে নানা ধরনের সন্ত্রাস মোকাবিলা করার ব্যাপারে সক্ষমতা দেখিয়েছে। তাকে স্বীকৃতি না দিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও অনবরত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছিল, বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনে সক্ষম হচ্ছে না। মানবাধিকার রক্ষা ও নাগরিকদের নিরাপত্তা দানে ব্যর্থ হচ্ছে। ফ্রান্স এবং আমেরিকায় সাম্প্রতিক বড় এবং ভয়াবহ সন্ত্রাসগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এই সন্ত্রাস দমনে আমেরিকার মতো সুপার পাওয়ার এবং ফ্রান্সের মতো শক্তিশালী ইউরোপিয়ান দেশও কতোটা ব্যর্থ।

বাংলাদেশে আইএসের অস্তিত্ব আছে কিনা সেটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হওয়ার আগেই ওয়াশিংটন বাংলাদেশে আইএস আছে বলে উদ্দেশ্যমূলকভাবে চিত্কার শুরু করেছিলো। ভাগ্যের পরিহাস, এখন অরল্যান্ডো ও ডালাসের ঘটনায় প্রমাণিত হলো- আমেরিকায় এখনো জঙ্গিবাদ এবং বর্ণবাদ- দুই ধরনের সন্ত্রাসই বিদ্যমান। অরল্যান্ডোর ঘটনার দায়িত্বতো আইএস স্বীকার করেছিলো। বাংলাদেশে আইএস আছে বলে চিত্কার জুড়ে আমেরিকাসহ কয়েকটি দেশ বরং বাংলাদেশের জামায়াতি, জেএমবি ইত্যাদি জঙ্গি গোষ্ঠিগুলোকে টার্গেট কিলিংয়ের পর আইএসের কভারে গুলশানের মতো অনেক বড় ধরনের হামলা চালাতে উত্সাহ জুগিয়েছে বলা চলে।

জঙ্গিবাদ এবং বর্ণবাদ দুই-ই আমেরিকায় বিরাজমান এবং আমেরিকানদের মতো সুপার নেশনকে তা দ্বিধাবিভক্ত করে রেখেছে। এই সত্যটা ডাল্লাসের ঘটনার পর মার্কিন মিডিয়া ও নেতারা এখন স্বীকার করছেন। সম্ভবত এই বোধোদয় থেকেই প্রেসিডেন্ট ওবামা ঘোষণা দিয়েছেন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে আছে আমেরিকা। এই ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাজ্য এবং জাপানও। ভারতের রাষ্ট্রপতিও এই ঘোষণা দিয়েছেন। বাংলাদেশের বর্বর জঙ্গিরা বেছে বেছে হিন্দু পুরোহিত, মন্দিরের সেবাইত হত্যা করা শুরু করেছিল। উদ্দেশ্য ছিলো- ভারতে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করা, হাসিনা সরকারের প্রতি মোদী সরকারকে বিরূপ করে তোলা। এই চেষ্টাটা বিএনপি এবং জামায়াতও তাদের রাজনৈতিক প্রচারণায় চালাচ্ছিল; কিন্তু  ভারত সরকার বা জনগণ তাদের এই ট্রাপে পা দেননি। বরং বিশ্বের অধিকাংশ দেশই এখন বাংলাদেশের সঙ্গে সলিডারিটি বা একাত্মতা ঘোষণা করছে।

গুলশান ও শোলাকিয়ার সন্ত্রাস দুইটি ব্যাপার স্পষ্ট করে তুলেছে, যা সরকারকে সন্ত্রাস উচ্ছেদের অভিযানে বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি ব্যাপার হলো- এই সন্ত্রাসীরা বাংলাদেশি এবং তাদের ঘাঁটি বাংলাদেশেই রয়েছে। তারা আইএসের বহিরাগত জঙ্গি নয়। তুরস্কের ইস্তাম্বুল এয়ারপোর্টের হামলা আইএস চালিয়েছে বলে বলা হয়েছে। এই হামলাকারীরা অধিকাংশই চেচনিয়া, কাজাকিস্তান প্রভৃতি দেশের সন্ত্রাসী। বাংলাদেশে ব্লগার হত্যা থেকে শুরু করে গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনা পর্যন্ত সবগুলো ঘটনাতেই ধৃত সন্ত্রাসীরা সকলেই বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে একজনও সিরিয়ান অথবা ইরাকি সন্ত্রাসী পাওয়া যায়নি, যাদের আইএস পাঠিয়েছে বলে সন্দেহ করা যেতো।

এখন প্রশ্ন, তাহলে আইএস কেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সন্ত্রাসগুলোর দায়িত্ব স্বীকার করছে? এ সম্পর্কে আমেরিকার অরল্যান্ডোর ঘটনা সম্পর্কে এক মার্কিন পর্যবেক্ষকের অভিমত উদ্ধৃত করা চলে। তিনি বলেছেন “অরল্যান্ডোর ঘটনা একটি একক হত্যাকাণ্ড। ঘাতক ওমর মতিন আইএসের সমর্থক হতে পারে; কিন্তু সমকামুকতার প্রতি বিদ্বেষ থেকে তার এই সন্ত্রাস। (সে নিজেও এই সমকামী ক্লাবে যাতায়াত করতো)। আইএস এই সন্ত্রাসেরও কৃতিত্বটা নিতে চায়। দেখাতে চায় তারা একটি অপ্রতিরোধ্য বিশ্বশক্তি। সর্বত্রই তারা আঘাত হানতে সক্ষম।”

এই অভিমতটি একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। বাংলাদেশে জামায়াত, জেএমবি বা আনসারুল্লা প্রভৃতি জঙ্গি সংগঠন যে সন্ত্রাস চালায় তার কৃতিত্ব দাবি করে আইএস প্রমাণ করতে চায়, শুধু মধ্যপ্রাচ্যে নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও তারা ঘাঁটি গাড়তে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশের জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে তাদের একটা যোগাযোগ গড়ে উঠে থাকতে পারে। তা দূরের আত্মীয়তা, নিকট কুটুম্বের সম্পর্ক নয়।

অন্যদিকে আইএসের কভারে সন্ত্রাস চালালে জামায়াতি গোষ্ঠীর জঙ্গিদেরও সুবিধা। তারা সরকারের সন্ত্রাস দমন অভিযানের লক্ষ্য অন্য দিকে সরিয়ে দিতে পারবে। তাদের আসল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ঢাকা দিয়ে রাখতে পারবে। আরো লক্ষ্য, বিদেশি এবং ভিন্নধর্মী – বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক হত্যা করে ভারতে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করা, হাসিনা সরকারের প্রতি মোদী সরকারের সমর্থন নষ্ট করা এবং আইএস দমনের নামে বাংলাদেশে মার্কিন হস্তক্ষেপ ডেকে আনা। তাতে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের মতো বধ্যভূমিতে পরিণত হবে; কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে- অর্থাৎ ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের দণ্ডদানের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা যাবে এবং হাসিনা সরকারের পতন ঘটিয়ে একটি আধা তালেবানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে।

গুলশানের রেস্তোরাঁয় জাপানি, ইতালিয়ান ও ভারতীয় নাগরিকদের নির্বিচার হত্যার একটাই উদ্দেশ্য, বিদেশিদের মনে ভয় ঢুকিয়ে এদেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটাতে বাধ্য করা। হাসিনা সরকারের আমলে বাংলাদেশের যে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, তার জোয়ার বন্ধ করে দিয়ে দেশে অর্থনৈতিক অস্থিরতার সঙ্গে রাজনৈতিক অরাজকতার সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক, সেকুলার ব্যবস্থাসহ হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো।

সুতরাং কান কথা শুনে আইএসের কল্পিত বাঘের পেছনে না ছুটে হাসিনা সরকারকে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে হবে জামায়াতকে তার শাখা-উপ-শাখাসহ সমমনা সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো দমনের কাজে। তাদের মূল ঘাঁটিগুলো খুঁজে বের করার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অর্থ ও অস্ত্রের উত্স সন্ধান করতে হবে। তারা বাইরের আইএস বা তালেবানদের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ গড়ে তুলে থাকলে তা ছিন্ন করার ব্যবস্থা করতে হবে। এই ব্যাপারে ভারতসহ আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিতে হলে সরকারকে তা বিবেচনা করতে হবে সতর্কতার সঙ্গে। সহযোগিতা যেন সহযোগিতাই হয়, তা যেন বাংলাদেশের মাটিতে কৌশলে অনুপ্রবেশ হয়ে না দাঁড়ায়।

বলেছি, গুলশান ও শোলাকিয়ার ঘটনা দুইটি ব্যাপার স্পষ্ট করে তুলেছে। একটি ব্যাপারের কথা উপরে লিখেছি। দ্বিতীয় ব্যাপারটি হলো- এই জঙ্গিরা আর যা-ই হোক ইসলাম-প্রেমিক বা ইসলামের পবিত্রতা রক্ষায় বিশ্বাসী নয়। বিশ্বাসী হলে তারা শুধু শিয়া মসজিদে নয়, মদীনায় মসজিদে নববীর সামনে হামলা চালাতে পারতো না। পবিত্র রমজান মাসে গুলশানে এবং  শোলাকিয়ার ঈদের জামাতে হামলা চালাতে পারতো না। যেকোনো ভাবেই হোক এদের কট্টর ওয়াহাবী মতবাদে দীক্ষা দেওয়া হয়েছে এবং শিরকাটা, গলাকাটাসহ বর্বর হত্যাকাণ্ডে ট্রেনিং দেওয়া হয়েছে।

এরা যে কেবল মাদ্রাসার ছাত্র তা নয়, উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবার এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত তরুণদের মধ্য থেকেও সন্ত্রাসীরা ক্যাডেট সংগ্রহ করেছে এবং তাদের ট্রেনিং দিয়েছে। এই রিক্রুটিং ও ট্রেনিংদানে যে বিপুল অর্থের প্রয়োজন তা কেবল মধ্যপ্রাচ্যের কোনো কোনো দেশ থেকে আসছে তা নয়, দেশে ব্যাংক, ইনসিওরেন্স কোম্পানি, হাসপাতাল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের আগে ইসলামযুক্ত করে বিপুল অর্থ ভাণ্ডার গড়ে তোলা হয়েছে। এই অর্থে অস্ত্রের চালান আসছে বিদেশ থেকে। এই অস্ত্র ও অর্থের উত্সমুখ বন্ধ করতে না পারলে সরকারের সন্ত্রাস দমন অভিযান সফল হবে না।

দেশে যখন সন্ত্রাসের আগুন জ্বলছে, বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তখন সেই আগুনে আলু পুড়িয়ে খেতে চাচ্ছেন। বলেছেন, “হাসিনা সরকার সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থ। তাদের উচিত নির্বাচন দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়া”। এই সন্ত্রাসের শুরু বেগম জিয়ার সরকারের আমলে। বাংলা ভাই এবং জেএমবির উত্থান তখন। শেখ হাসিনার সভায় গ্রেনেড হামলাসহ একটার পর একটা রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড চলেছে। তিনি হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা দূরে থাক, একজন হত্যাকারীকেও ধরে দণ্ড দিতে পারেননি। এই সেদিন তার দল জামায়াতের সহযোগিতায় দেশে চালিয়েছে মানুষ পুড়িয়ে মারার সন্ত্রাস। আবার ক্ষমতায় এলে বর্তমানের সন্ত্রাসীদেরই ক্ষমতার অংশীদার করে তার সরকার কী করবে তা বুঝতে দেশের মানুষের কষ্ট হওয়ার কথা কি? যারা ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধী ও ঘাতকদের ক্ষমতার অংশীদার করতে পারেন, তারা বর্তমানের সন্ত্রাসীদেরও ক্ষমতার অংশীদার করতে বিবেকপীড়া বোধ করবেন কি?

দেশে সন্ত্রাস দমনে জাতীয় ঐক্য দরকার এটা সত্য; কিন্তু এই ঐক্য কি সন্ত্রাসীদের সহযোগীদের সঙ্গেও গড়ে তুলতে হবে? বিএনপি এখনো সন্ত্রাসী জামায়াতের সঙ্গে প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়ে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি, তারেক রহমান লন্ডনে বসে এখনো জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন। বর্তমান সন্ত্রাসের পেছনে তারও ইন্ধন আছে কি না তা কে বলবে? বিএনপি একদিকে সন্ত্রাসী জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করে চলবে অন্য দিকে সন্ত্রাস দমনে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসতে চাইবে, তাতো হয় না। সন্ত্রাসীদের পক্ষপুটে রেখে সন্ত্রাস দমন অভিযানে তো সামিল হওয়া যায় না।

জঙ্গি সমস্যা নানা চেহারায় এখন একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। রাতারাতি এই সমস্যা দূর হবে তা আশা করা যায় না। এ সমস্যা মোকাবিলায় হাসিনা সরকারের রেকর্ড বরং তুলনামূলকভাবে ভালো। রাজনৈতিক বা অন্য কোনো স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা না করে সকলের উচিত সন্ত্রাস দমনে সরকারকে সহযোগিতা করা। এই সহযোগিতা পেলে হাসিনা সরকারই বাংলাদেশে সন্ত্রাস নির্মূল করতে পারবেন, অন্য কেউ নয়। – ইত্তেফাক

লন্ডন, ৯ জুলাই শনিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment