কালের আয়নায়

জঙ্গিবাদের আড়ালে সাম্রাজ্যবাদের থাবা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

France

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর যখন এশিয়া ও আফ্রিকার অধিকাংশ দেশ স্বাধীন হতে থাকে, তখন বার্ট্রান্ড রাসেল পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদকে মৃত সাপের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। বলেছিলেন, ‘এই সাপের আর দংশন করার শক্তি নেই।’ কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি তার মন্তব্য প্রত্যাহার করেন এবং বলেন, ‘মৃত সাপের দেহে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার হয়েছে।’ মার্কিন শাসকদের যুদ্ধাপরাধী ঘোষণা করে তাদের বিচারের জন্য তিনি গণআদালতও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

গত শতকের শেষদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ের পর অনেক কমিউনিস্ট তাত্ত্বিক ও পণ্ডিতের (আমাদের দেশেও) মনেও এই ইল্যুশন তৈরি হয়েছিল যে, সমাজতন্ত্রী সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ায় পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের নয়, পশ্চিমা গণতন্ত্রের জয় হয়েছে। এখন বিশ্বে আর কোনো যুদ্ধ-বিগ্রহ থাকবে না। বাংলাদেশের এক কমিউনিস্ট লেখক তো আনন্দে বগল বাজাতে বাজাতে পত্রিকায় কলাম লিখে তার হেডিং দিয়েছিলেন, ‘অমল-ধবল পালে গণতন্ত্রের মন্দমধুর হাওয়া লেগেছে।’ গর্বাচেভের পেরেস্ত্রইকার প্রশংসায় তখন কমিউনিস্ট শিবিরের অনেকেই পঞ্চমুখ।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে নাপাম বোমা নিয়ে আমেরিকার হস্তক্ষেপের পর যেমন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে বার্ট্রান্ড রাসেলের ইল্যুশন দূর হয়েছিল, তেমনি মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা কর্তৃক একদল ধর্মান্ধ হিংস্র জিহাদিস্ট তৈরি করা, তাদের মাধ্যমে আফগানিস্তান, ইরাক, লেবানন, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ বাধানো, ইরাকে অবৈধ যুদ্ধে সেক্যুলার সরকারের পতন ঘটানো, অতঃপর এই জিহাদিস্ট বা টেরোরিস্ট দমনের নামে এই দেশগুলোতে সামরিক অভিযান চালিয়ে রক্তাক্ত বধ্যভূমি তৈরি করার পর এখন কমিউনিস্ট ও অকমিউনিস্ট অনেক পণ্ডিতেরই চৈতন্যোদয় ঘটেছে যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপর্যয়ে পশ্চিমা গণতন্ত্রের জয় হয়নি, জয় হয়েছে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ সাপের মতো মাঝে মধ্যে খোলস পাল্টায়, মরে না।

গত শতকের মাঝামাঝি থেকে স্নায়ুযুদ্ধ বা কোল্ড ওয়ারের সময়ে এই সাম্রাজ্যবাদ তথাকথিত স্বাধীন বিশ্বের ত্রাণকর্তা (savior of free world) সেজেছিল। তখন কমিউনিস্টদের নাম দেওয়া হয়েছিল টেরোরিস্ট। এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে কমিউনিস্ট সন্ত্রাসবাদের উত্থান দমনের নামে কখনও পরোক্ষ, কখনও প্রত্যক্ষ সামরিক হস্তক্ষেপ দ্বারা গণতন্ত্রকামী মানুষের ওপর চালানো হয় চরম নির্যাতন। সামরিক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বহু গণতান্ত্রিক সরকারের পতন ঘটানো হয়। বহু দেশের স্বাধীনচেতা নেতাদের হত্যা করা হয়। সিআইএর এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন চিলির আলেন্দে থেকে বাংলাদেশের শেখ মুজিব পর্যন্ত বহু নেতা।

পাল্টা বিশ্ব শক্তি হিসেবে সমাজতন্ত্রী শিবিরের পতনের পর আমেরিকায় নিউ কনজারভেটিভ (নিউকন) পরিচয়ে নব্য আধিপত্যবাদী শাসকগোষ্ঠীর অভ্যুদয় হয়। হিটলারের ‘মেইনক্যাম্পের’ মতো এদের মেনিফেস্টো ছিল নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার বা নতুন বিশ্ববিধান। এই বিধানের লক্ষ্য সারাবিশ্বে আমেরিকার নিরঙ্কুশ আধিপত্য বিস্তার করা। সেই লক্ষ্যে চরম সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণও তাদের কাছে অন্যায় বিবেচিত হবে না। ক্ষমতার দর্পে বুশ প্রশাসন জাতিসংঘকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে এবং একক সিদ্ধান্তে ইরাকে হামলা চালায়।

ইরাকে ও লিবিয়ায় সেক্যুলার সরকারের পতন জিহাদিস্ট ইসলামিক স্টেট বা আইএসের অভ্যুদয়ে সাহায্য জুগিয়েছে। আমেরিকা এক হাতে এদের সাহায্য জুগিয়ে ইরান ও সিরিয়ার প্রতিষ্ঠিত সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে এই আইএসকে দমনের নামে সীমিত বোমাবর্ষণের নীতি অনুসরণ দ্বারা গোটা এলাকায় যুদ্ধ প্রলম্বিত করছে এবং লাখ লাখ শরণার্থী সমস্যার সৃষ্টি করেছে। এই শরণার্থী সমস্যায় গোটা ইউরোপ এখন টালমাটাল এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেন বেরিয়ে এসেছে।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন গ্গ্নোবাল ক্যাপিটালিজম এখন সংকটের মুখে। একটার পর একটা অর্থনৈতিক মন্দা তাকে পার হতে হচ্ছে। এই সময় মার্কিন অর্থনীতির একমাত্র নির্ভর যুদ্ধাস্ত্র বিক্রি। যতই যুদ্ধের বিস্তার ঘটবে, ততই মার্কিন ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মালিক বা করপোরেট ব্যবসায়ীদের বিরাট মুনাফা। মধ্যপ্রাচ্যের তেল এখন তাদের হাতের মুঠোয়। হোয়াইট হাউস এখন তাদের নির্দেশে চলে। আমেরিকার প্রকৃত শাসক এখন তারাই। বহুকাল আগে এই সত্যটা উন্মোচিত করেছিলেন ভারতের মানবতাবাদী নেতা মানবেন্দ্র রায় (M.N. Roy) তার ‘হু রুলস ইন আমেরিকা’ নামক পুস্তিকায়।

এই যুদ্ধবাদী এবং পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের নেতা আমেরিকা তার আধিপত্য এবং ওয়ার ইন্ডাস্ট্রির মুনাফার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধকে নিকট প্রাচ্যেও বিস্তার ঘটাতে চায়। তার আশু লক্ষ্য উপমহাদেশের আরেকটি মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ। অপর মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ পাকিস্তানে তারা সামরিক ঘাঁটি গেড়েছে। সামরিক চুক্তি বলে সরকারের অনুমতি ছাড়াই সেদেশে জঙ্গি ঘাঁটির ওপর হামলা চালিয়ে তারা নিরীহ মানুষ মারতে পারে। তাতে পাকিস্তানে জঙ্গি দমন হয়নি। রোজই চলছে জঙ্গিদের বর্বর হত্যাকাণ্ড। পাশাপাশি মার্কিন সামরিক তৎপরতা।

এ পর্যন্ত আমেরিকা যে ক’টি দেশে সাহাযদানের নামে ঢুকেছে, তার প্রত্যেকটি দেশ এখন রক্তাক্ত এবং সন্ত্রাসকবলিত। মিসর এবং তুরস্ক তার সাম্প্রতিক প্রমাণ। বাংলাদেশেও সাম্প্রতিক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিয়ে আমেরিকা দাবি তুলেছে, দেশটিতে আইএস আছে। এই দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য তার চেষ্টার অন্ত নেই। ভাবখানা এই, বাংলাদেশ যদি স্বীকার করে আইএস আছে, তাহলেই যেন সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আসলে সমস্যার সমাধান হবে না, সেটি স্থায়ী হবে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতকে উপমহাদেশে ডেকে আনা হবে। একদিকে জঙ্গি হামলা এবং অন্যদিকে এই জঙ্গি দমনের নামে মার্কিন ড্রোন হামলা বাংলাদেশে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে।

বাংলাদেশে সন্ত্রাসী ঘটনা অবশ্যই ঘটছে। তার পেছনে জামায়াত, আনসারুল্লাহ, হিযবুত, জেএমবি প্রভৃতি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা অস্পষ্ট নয়। এই সন্ত্রাস দমনে হাসিনা সরকার যথেষ্ট কঠোরতা ও দক্ষতার প্রমাণ দিচ্ছে। তথাপি আমেরিকার কণ্ঠে আইএস আইএস বোল এবং আমেরিকায় যখন সন্ত্রাসের আগুন জ্বলছে, তখন বাংলাদেশে সেই সন্ত্রাসের আগুন নেভানোর কাজে সাহায্যের প্রস্তাব নিয়ে ঢাকায় ছুটে এসেছিলেন মার্কিন বিদেশ দপ্তরের নিশা দেশাই। বাংলাদেশ সন্ত্রাস দমনে আমেরিকার কাছ থেকে কারিগরি সাহায্য নিতে পারে, তথ্যবিনিময় করতে পারে। কিন্তু কোনো সামরিক সাহায্য দেশটির প্রয়োজন আছে কি? এই অযাচিত সাহায্যদানে আমেরিকার এত আগ্রহ কেন?

বাংলাদেশের সন্ত্রাসের চেয়ে বহুগুণ বড় সন্ত্রাস ঘটছে ফ্রান্সে। গত বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের নিস শহরে বাস্তিল দিবসের উৎসবে সন্ত্রাসী হামলায় একই দিনে মারা গেছে ৮৪ জন নরনারী। এ পর্যন্ত পাওয়া খবরে জানা যায়, একজন মাত্র আত্মঘাতী সন্ত্রাসী এই ভয়াবহ ঘটনা ঘটিয়েছে। তার তিউনিসীয় পরিচয় থেকে মনে হয়, সে আইএসের সঙ্গে যুক্ত। ফ্রান্সের এই পৌনঃপুনিক সন্ত্রাস দমনের জন্য আমেরিকা সসৈন্যে ছুটে যাচ্ছে না কেন? ফ্রান্স তো পশ্চিমা সামরিক সংস্থা ন্যাটোরও সদস্য। এই সদস্য রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসমুক্ত করার জন্য ওয়াশিংটনের মাথাব্যথা নেই কেন? মাথাব্যথা কেবল বাংলাদেশের জন্য?

বাংলাদেশের ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের জন্য পাকিস্তানের যত মমতা, তা দেখে বুঝতে কষ্ট হয় না, বাংলাদেশের বর্তমান জঙ্গি কর্মকাণ্ডের পেছনেও ইসলামাবাদের মদদ আছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইর প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য তৎপরতা এখন কারও জানতে বাকি নেই। কিন্তু এই তৎপরতার সঙ্গে মার্কিন সিআইএর কোনো যোগাযোগ আছে কি-না কে বলবে? ঘোলা পানিতে মৎস্য শিকারে সিআইএর দক্ষতা কারও অজানা নয়। বাংলাদেশের সন্ত্রাস বিরোধী তৎপরতাকে কল্পিত বাঘের (আইএস) পেছনে ধাবিত করে আসল বাঘকে (জামায়াত-শিবিরকে) উদ্দেশ্য সাধনে সাহায্য জোগানো হচ্ছে কি-না তা আজ ভালোভাবে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে এ ব্যাপারে সজাগ ও সক্রিয় করা জরুরি।

বিশ্বের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি প্রত্যক্ষ করে এ রকম সন্দেহ করা অমূলক হবে কি? এই তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিবাদের পেছনে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের গোপন থাবা লুকিয়ে আছে? এই জঙ্গিবাদকে রুখতে হলে তার পেছনের সাম্রাজ্যবাদী দানবকেও যে রুখতে হবে, এই সচেতনতা এখন আমাদের মধ্যে কোথায়? সাপের মতো খোলস পাল্টে সাম্রাজ্যবাদ নতুন চেহারা ধারণ করেছে। জঙ্গিবাদ অপচ্ছায়া, তার পেছনের আসল কায়া সাম্রাজ্যবাদ। এই সাম্রাজ্যবাদ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের (war against terrorism) যত ভনিতা করুক, জঙ্গিবাদকে রুখতে হলে এই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধেই সতর্ক হওয়ার প্রয়োজন আছে।

আমাদের দেশে বামপন্থিরা ছিলেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে অগ্রপথিক। এখন এই সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার কথা তারা ভুলে গেছেন কি-না তা আমি জানি না। বাংলাদেশের বামপন্থিদের একটা বড় অংশ সিপিবির এখন স্লোগান- ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে লুটেরা শ্রেণির বিরুদ্ধে লড়াই চাই’। লুটেরা শ্রেণি মানে দেশের নব্য ধনী শ্রেণি। কিন্তু এদের পেছনের আসল শক্তি বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে আসল লড়াইটির কথা এই বামপন্থিরা আজকাল ভুলে গেলেন কেন? এই ভুল কি ইচ্ছাকৃত?

অন্যদিকে আমাদের সুশীল সমাজের ভূমিকাও অস্বচ্ছ। সংবাদপত্রের কলামে এবং টেলিভিশনের টক শোতে সন্ত্রাস দমনে সরকারের ভুলত্রুটি আবিষ্কারে তারা খুবই ব্যস্ত। কিন্তু এই সন্ত্রাসের পেছনে যে ভয়ানক সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি লুকিয়ে আছে, সে সম্পর্কে তাদের কারও কণ্ঠে টুঁ শব্দটি নেই কেন, তা আজ এক প্রশ্ন। তারা কি এ সম্পর্কে সজাগ নন? নাকি সজাগ থেকেও কোনো বিশেষ কারণে নিশ্চুপ? তারা কি জানেন না, এই সন্ত্রাস সরকার আজ হোক কাল হোক দমন করতে পারবে। কিন্তু এই সন্ত্রাসের পেছনে যে ভয়ানক সাম্রাজ্যবাদী অভিসন্ধি লুকিয়ে আছে, তাকে প্রতিহত করা না গেলে শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, গোটা উপমহাদেশের জন্যই এক ঘোর অভিশাপ নেমে আসবে?

আমার ধারণা, শেখ হাসিনা সাহসের সঙ্গে সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করছেন। কিন্তু তার ওপর চারদিক থেকে প্রচণ্ড চাপ বাড়ছে, যাতে তিনি সন্ত্রাস দমনের জন্য বাইরের সাহায্য গ্রহণ করেন। তাতে একদিকে প্রমাণ করা যাবে, এই সরকার সন্ত্রাস দমনে ব্যর্থ। অন্যদিকে এই সন্ত্রাস দমনের নামে বাইরের শক্তিকে ঘরে ডেকে আনা যাবে। তাতে বাংলাদেশের রেজিম চেঞ্জের জন্য ওত পেতে বসে থাকা মহলগুলোর উদ্দেশ্য সাধন সহজ হবে- এটাই তারা হয়তো মনে করেন। কিন্তু তাদের উদ্দেশ্য সাধন হলে গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অশান্তির আগুন জ্বলবে। – সমকাল

লন্ডন, ১৫ জুলাই ২০১৬, শুক্রবার

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment