বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

অনলাইন ডেস্ক –

Tiger

বিরূপ প্রকৃতি আর বাণিজ্যের চাপে অতি বিপন্ন প্রাণীটিকে বাঁচানোর আহ্বান জানানোর মধ্য দিয়ে আজ ২৯ জুলাই পালিত হচ্ছে বিশ্ব বাঘ দিবস। বাঘের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে দুনিয়া জুড়েই চলছে নানামুখী উদ্যোগ-আয়োজন। তবু দিন দিন কমছে এর সংখ্যা। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ বাঘের আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত সুন্দরবনও এর আওতামুক্ত নয়।

বাঘ আমাদের জাতীয় পশু। আমাদের গর্ব ও অহংকারের প্রতীকও বটে। তবে বিরূপ প্রকৃতি এবং বাণিজ্যের চাপে বাঘের অস্তিত্ব ব্যাপকভাবে হুমকির মুখে। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবনে এখন বাঘের সংখ্যা মাত্র ১৮২। এর মধ্যে বনের বাংলাদেশ অংশে ১০৬টি ও ভারতীয় অংশে ৭৬টি বাঘ রয়েছে। এই ম্যানগ্রোভ বনে সরকারিভাবে পরিচালিত জরিপে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

খণ্ড খণ্ডভাবে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে বাঘের আবাস। শঙ্কাজাগানিয়া তথ্য হলো, গত শতকেই প্রাণীটির ৯৭ শতাংশ মারা পড়েছে। এ অবস্থায় বাঘ রক্ষায় ২০১০ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বলা হয়, বিশ্ব জুড়ে মাত্র তিন হাজার বাঘ রয়েছে। সেখান থেকেই বিপন্নপ্রায় প্রাণীটিকে রক্ষায় বিশ্বে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২৯ জুলাইকে বাঘ দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে প্রতিবছর সারা বিশ্বে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা জানার লক্ষ্যে ২০১৩ সালে বাঘ শুমারি শুরু হয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ প্রকল্প বিষয়ক আঞ্চলিক সহযোগিতা ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে এই শুমারি চলে। গত বছরের মার্চ মাসে ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিং’ পদ্ধতিতে বাঘের ছবি সংগ্রহের কাজ শেষ হয়। ওই বছরেরই শেষের দিকে শুমারির ফল ঘোষণা করা হয়। ওই শুমারির ভিত্তিতে দাবি করা হচ্ছে, সব মিলিয়ে গোটা সুন্দরবনে ১৮০টি বাঘ থাকতে পারে। তবে গণনার পদ্ধতিগত ত্রুটির কথাও বলা হচ্ছে।

এদিকে সুন্দরবনে চোরা শিকারিদের কবলে পড়ে বাঘ মারা পড়ছে। মাঝে মাঝে বাঘের চামড়া উদ্ধারের ঘটনা এ আশঙ্কাকে আরো জোরালো ভিত্তি দেয়। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত পূর্ব সুন্দরবন (শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ) এলাকায় চোরা শিকারিদের হত্যা করা ৯টি বাঘের চামড়া উদ্ধার হয়েছে। তবে বনজীবীদের ধারণা, যে পরিমাণ হত্যার ঘটনা ঘটছে তার তুলনায় উদ্ধারের ঘটনা খুবই কম।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবনে বাঘ হত্যায় তৎপর বড় ছয়টি শিকারি দল। তারা সুযোগ পেলেই বাঘ হত্যা করে এর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিভিন্ন দেশে পাচার করে। এর মধ্যে পশ্চিম সুন্দরবন (খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জ) বিভাগে শিকারিরা বেশি তৎপর। বন বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, ১৯৮০ থেকে এ পর্যন্ত চোরা শিকারি ও বনদস্যুদের হামলা, গ্রামবাসীর পিটুনি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে সুন্দরবনের ৭০টি বাঘ মারা গেছে।

আরো একটি কারণে সুন্দরবনে বাঘের অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। তা হলো দ্রুততার সঙ্গে এর বাস্তুতন্ত্রের (ইকোলজি) পরিবর্তন হওয়া। মাটি ও পানিতে বিপুল পরিমাণ লবণ জমা হওয়ায় সুন্দরবনে বাঘের খাদ্য-শৃঙ্খল ভেঙে পড়েছে। ভারতের সুন্দরবন বায়োস্ফিয়ার রিজার্ভ বা সংরক্ষিত জীবমণ্ডলের কর্মকর্তা প্রদীপ ব্যাস কলকাতায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, যেভাবে সুন্দরবনের মাটিতে নুনের পরিমাণ বাডছে তা রীতিমতো ভয়ের। বিশেষ করে মধ্য সুন্দরবনের পরিস্থিতি সংকটজনক হয়ে উঠেছে। সুন্দরী ও কেওড়ার মতো ম্যানগ্রোভ গাছগুলো বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। এর ফলে সেগুলো হয় আকারে ছোট হয়ে যাচ্ছে অথবা মরে যাচ্ছে। বিপাকে পড়ছে এ-জাতীয় বেশ কিছু গাছ ও তৃণজাতীয় উদ্ভিদ, যেগুলো হরিণের খাদ্য। আর খাবারের অভাবে দ্রুত কমছে হরিণের সংখ্যা। চোরা শিকারিদের দাপট তো আছেই। বাঘের খাদ্যের অন্যতম প্রধান উৎস হরিণ কমে গেলে সে কি খাবে?

বাণিজ্যিক দৃষ্টিভঙ্গিও বাঘের অস্তিত্ব রক্ষায় বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ-ভারত নৌ প্রটোকলের আওতায় নৌরুট এই সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে। মংলা বন্দরের প্রধান চ্যানেল পশুর নদ। এই পশুর-শ্যালা নদীপথেই নৌ প্রটোকলসহ দেশের অভ্যন্তরের পণ্য আনা-নেওয়া করা হয়। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শ্যালা নদীতে তেলবাহী ট্যাংকার ফেটে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় তেল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া একই পথে একাধিকবার সিমেন্টবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে।

মংলার জয়মণিতে সুন্দরবনের কোলে গড়ে উঠছে দেশের অন্যতম বৃহৎ সাইলো (খাদ্য গুদাম), পশুর নদের পাড়েই গড়ে উঠেছে বড় বড় শিল্প প্রতিষ্ঠান; বিশেষ করে কয়লা ভিত্তিক একটি তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে জোরেশোরে। এসবই বাঘের অস্তিত্ব রক্ষায় বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment