আদিবাসী দিবস উপলক্ষে

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তি

সংবাদ বিজ্ঞপ্তি –

CHT Commissionসংগৃহীত ছবি

পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন পার্বত্য চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ভূমি অধিকার নিশ্চিতকরণের জন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছে –

৮ আগস্ট ২০১৬, ঢাকা: বিশ্ব আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ ও সারাবিশ্বের আদিবাসীদের সাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন সংহতি প্রকাশ করছে। একইসাথে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সমতলের আদিবাসীদের ওপর মানবাধিকার লংঘন বিশেষত নিজ ভূমি থেকে আদিবাসীদের উচ্ছেদের ক্রমাগত ঘটনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

এ বছর বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হল- আদিবাসীদের শিক্ষার অধিকার। ২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার কথা বলা হলেও ২০১৬ সালে এসেও তারা নিজেদের ভাষায় শিক্ষার সুযোগ পায়নি। তবে আনন্দের বিষয় যে, ২০১৭ সাল থেকে পাঁচটি আদিবাসী গোষ্ঠীর শিশুরা (চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো ও ওঁরাও) নিজেদের ভাষায় শিক্ষার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের সব আদিবাসী শিশুদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন দাবি জানাচ্ছে। তাই কমিশন আশা করছে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ বাস্তবায়ন করে অচিরেই দেশের অপরাপর সব আদিবাসী গোষ্ঠীর শিশুদের নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে।

২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এদেশের বাঙালি ভিন্ন অন্য জাতিসত্তাদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকৃতি না দিয়ে ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী’ ‘উপজাতি’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। উপরন্তু জাতি হিসেবে ‘বাঙালি’ পরিচিতি চাপিয়ে দিয়ে এদেশের আদিবাসীদের আত্মপরিচয়ের অধিকারকে কেড়ে নেয়া হয়েছে। সংবিধানের ২৩ক ধারায় ‘আদিবাসী’ শব্দের পরিবর্তে ‘উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়’ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু আদিবাসীদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার মৌলিক অধিকার যেমন- রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, ভূমি সংক্রান্ত অধিকারের বিষয়গুলিকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। ২৩ক ধারার মধ্যদিয়ে বৃহত্তর বাঙালি গোষ্ঠী থেকে আদিবাসীদের পৃথক করে তাদেরকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত করা হয়, যা ২ ডিসেম্বর ২০১৪ তারিখের সর্বোচ্চ আদালতের আপীল বিভাগের “ওয়াগাছড়া টি এস্টেট বনাম আবু তাহের ও অন্যান্য [দেওয়ানী মামলা নং-১৪৭, ২০০৭]” শীর্ষক রায়ের সাথে সাংঘর্ষিক। উল্লেখ্য যে, ২০১৪ সালে মাননীয় সুপ্রীম কোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত উক্ত রায়ের মধ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি, ১৯০০’ আইনটি যে একটি বৈধ আইন সেটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২২ জানুয়ারি ২০১৫ তারিখে (স্মাারক- ৪৪.০০.০০০০.০৯.১১.০০১…১৩-১৫, তারিখঃ ২২/০১/২০১৫ খ্রি:) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের প্রতি বৈষম্যমূলক এক সরকারি নির্দেশনা জারী করা হয় যেখানে বলা হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিদেশী নাগরিকদের ভ্রমণের ওপর কড়াকড়ি, সকল দেশী-বিদেশী ব্যক্তি ও সংস্থাসমূহ সেখানকার পাহাড়িদের সাথে কথা বলা বা সভা করতে গেলে স্থানীয় প্রশাসন বা নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিশ্চিত করে কথা বলতে হবে। এধরনের নির্দেশনা স্পষ্টতই মানবাধিকারের চরম লংঘন ও বৈষম্যমূলক।

১৯৯৭ সালে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরের পর ১৯ বছর অতিক্রান্ত হচ্ছে, কিন্তু চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তবে আশার বিষয় হল, সরকার চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধনী) আইন, ২০১৬’ এর খসড়া মন্ত্রিপরিষদ সভায় নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ কৃর্তক প্রস্তাবিত সংশোধনী গ্রহণ ও কমিশনের বৈঠকে কোরাম পূরণ ও সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় সংশোধনী আনায় পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশন এও আশা করছে, এই সংশোধনী খসড়ায় দীর্ঘদিনের দাবি মোতাবেক প্রস্তাবিত ধারাগুলো অক্ষুন্ন রেখে আগামী সংসদ অধিবেশনে পাশ করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন’কে দ্রুত একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হবে।

উপরোক্ত পর্যালোচনা থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন নিম্নোক্ত সুপারিশসমূহ করছে –

১.       অবিলম্বে পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হোক;
২.      দ্রুত পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন (সংশোধনী) আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে পাশ করা হোক এবং কার্যকর প্রয়োগ করা হোক;
৩.      পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জারীকৃত বৈষম্যমূলক সরকারি নির্দেশনা সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাহার করা হোক;
৪.      দেশের সকল আদিবাসী শিশুদের মাতৃভাষায় শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা হোক, এবং
৫.      আদিবাসীদের ভূমি বে-দখল ও তাদের ওপর মানবাধিকার লংঘনের ঘটনা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হোক।

ধন্যবাদসহ,

সুলতানা কামাল এবং এলসা স্টামাতোপৌলো,

কো-চেয়ার, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক আন্তর্জাতিক কমিশন

সদস্য: ড. স্বপন আদনান, লারস এন্ডারস বেয়ার, টোনা ব্লাই, হার্স্ট হেনাম, ড. ইয়াসমিন হক, ড. জাফর ইকবাল, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মির্না কানিংহাম কেইন, খুশী কবির, মাইকেল সি ভন ওয়াল্ট প্রাগ, ড. ইফতেখারুজ্জামান, ড. বীণা ডি’কস্টা।

উপদেষ্টা: ইয়েনেকি এরেঞ্জ, টম এস্কিলসন, ড. মেঘনা গুহঠাকুরতা।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment