দশ দিগন্তে

একুশে আগস্টের নিরিখে বিএনপি’র আমলনামা

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

Attack

আজ একুশে আগস্ট। বারো বছর আগে ২০০৪ সালের এই দিনে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার জনসভায় প্রকাশ্যে দিনে-দুপুরে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনা বেঁচে যান। রক্তের নদী বয়ে গিয়েছিলো শেখ হাসিনার জনসভায়। বোমার স্প্লিন্টার্সের আঘাতে তার একটি কান জখম হয় যার চিকিত্সা চালাতে হয়েছে দীর্ঘকাল। আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের অনেকে এই হামলায় আহত হয়েছেন এবং অনেকে এখনো সেই ক্ষত বহন করছেন। এই হামলায় আহত নিহত হয়েছে অসংখ্য লোক। সারা জীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছে অগুণতি মানুষ। নিহতদের তালিকার শীর্ষে রয়েছেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের পত্নী আইভি রহমান।

তখনকার বিরোধী দলীয় নেত্রীর উপর এই ধরনের বর্বর হামলার নজির সারা বিশ্বে বিরল। বিএনপি তখন ক্ষমতায়। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী। তার সরকারের মদদেই এই হামলার সব আলামত সঙ্গে সঙ্গে ধ্বংস করা হয়েছিল। নির্লজ্জভাবে প্রচার করা হয়েছিল, এই হামলা আওয়ামী লীগের অন্তর্দ্বন্দ্বের ফল। শেখ হাসিনা নিজেই এই হামলার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে নিজেকে হত্যা চক্রান্তের ভিকটিম সাজিয়ে জনগণের সহানুভূতি ও সমর্থন আদায় করতে পারেন। পরে জানা গেল এই হামলার পেছনে রয়েছে বিএনপি’র অনেক শীর্ষ নেতার হাত। বর্তমানে বিদেশে পলাতক তারেক রহমানের নামও অভিযুক্তদের তালিকায় রয়েছে।

বিরোধী দলের নেতার উপর এতো বড় পৈশাচিক হামলা অন্য কোনো দেশে হলে ক্ষমতাসীন সরকারের পতন হতো। অথবা ক্ষমতাসীন সরকার নিজেরাই পদত্যাগ করতেন। ফিলিপিনসে স্বৈরাচারী শাসক মার্কোস বিরোধী দলের নেতা আকিনোকে দেশে প্রত্যাবর্তনের সময় বিমানবন্দরে বিমানের সিঁড়িতেই ঘাতক লাগিয়ে হত্যা করিয়েছিলেন। সারাদেশ তার বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। নির্বাচনে আকিনোর বিধবা স্ত্রীর কাছে হেরে গিয়ে তাকে দেশ ছাড়তে হয়েছিল।

একুশে আগস্টের ঘটনাও বাংলাদেশে বিএনপি’র অপশাসনের অবসান ঘটায়। এই হামলায় দলের অনেক শীর্ষ নেতার নাম যুক্ত থাকা সত্ত্বেও বিএনপি সরকার তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কোনো সুষ্ঠু তদন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতারের কোনো ব্যবস্থা করেনি। দেশময় জনগণের মধ্যে ক্রোধ ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয়েছে। যার পরিণতি পরবর্তী সাধারণ নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের ভরাডুবি এবং বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। তারপর থেকে বিএনপি এ পর্যন্ত আর ক্ষমতায় আসতে পারেনি।

আমার ধারণা, ১৯৭১ সাল যেমন জামায়াতকে বাংলাদেশে চিহ্নিত করেছে ঘাতক, দালাল ও দেশদ্রোহী দল হিসেবে, তেমনি ২০০৪ ও ২০০৫ সালও বিএনপিকে চিহ্নিত করেছে দুর্নীতিবাজ, সন্ত্রাসীদের মিত্র এবং একটি গণ-বিরোধী দল হিসেবে। জনগণের কাছে স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে চিহ্নিত জামায়াত যেমন জনগণের ভোট আর পায় না, বিএনপির পরগাছা দল হিসেবে তাকে রাজনীতিতে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়েছে; তেমনি বিএনপিও এখন জামায়াতের মিত্র হিসেবে এবং অতীত ও বর্তমানের সন্ত্রাস ও দুর্নীতির জন্য ক্রমশ জনগণের সমর্থন হারাচ্ছে। দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের সবচাইতে বড় প্রতীক এখনো তারেক রহমানের হাওয়া ভবন। দলের এই নষ্ট ভাবমূর্তি মুছে ফেলতে না পারলে বিএনপি’র পক্ষে অদূর ভবিষ্যতেও ক্ষমতায় ফেরা সম্ভব হবে কিনা সন্দেহ। ফিলিপিন্সের মার্কোসের দলের পরিণতি বাংলাদেশে বিএনপি বহন করতে পারে।

বেগম খালেদা জিয়া এখন অহরহ আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের অভিযোগ তুলে চিত্কার করছেন। তিনি আয়নায় নিজের চেহারা দেখছেন না। ২০০৪ এবং ২০০৫ সাল দুটি যে তার সাবেক সরকারকে চরম সন্ত্রাসী ও দুর্নীতিবাজ সরকার হিসেবে চিহ্নিত করে রেখেছে এই বাস্তবতাবোধ সম্ভবতঃ তার মধ্যে নেই। বিএনপি সরকারের আমলের দুর্নীতির তালিকা আবার তুলে ধরার দরকার নেই। বেগম জিয়া নিজেই এখন অসংখ্য দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত এবং রোজই একটা না একটা মামলায় তাকে আদালতে হাজিরা দিতে হয় এবং জামিন নিতে হয়। আর বিএনপি সরকারের আমলে বাংলাভাইদের অভ্যুত্থানসহ হত্যা ও সন্ত্রাসের তালিকা তৈরি করতে গেলে একটি মহাভারত তৈরি হয়ে যাবে। এসব রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের একটিরও কোনো সুরাহা হয়নি।

২০০৪ এবং ২০০৫ এই দুটি সালই বিএনপি’র সন্ত্রাসী রাজনীতির সবচাইতে বড় প্রতীক হিসেবে চিহ্নিত। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের হত্যার জন্য চালানো হয় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা। পরবর্তী বছর আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা ও সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ মোহাম্মদ কিবরিয়াকে নিষ্ঠুর বোমা হামলায় হত্যা করা হয়। তারিখ ২০০৫ সালের ১৭ জানুয়ারি। এই বছরেই ১৭ আগস্ট সারাদেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বিএনপির মিত্র জামায়াতের আশ্রিত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএমবি বোমা হামলা চালায়।

বিএনপি’র শাসনামলে বিরোধী দলীয় নেতাদের হত্যার সঙ্গে দেশের শীর্ষ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা প্রচেষ্টাও চলতে থাকে। আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা আহসানউল্লা মাস্টারকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। দেশের প্রধান কবি শামসুর রাহমানের বাড়িতে ঢুকে তাকে ছোরা মেরে হত্যার চেষ্টা হয়। চেষ্টা ব্যর্থ হয়।  দেশের সর্বজননন্দিত কবির উপর জামায়াতের ক্যাডারের এই নৃশংস হামলার নিন্দা করা দূরের কথা বেগম খালেদা জিয়া এটাকে ‘সাজানো নাটক’ আখ্যা দেন। বরেণ্য সাহিত্যিক ও শিক্ষাবিদ হুমায়ুন আজাদের উপর চলে বর্বর চাপাতি হামলা। এটাও জামায়াতি দুর্বৃত্তদের কাজ। এই হামলার আঘাতজনিত কারণেই হুমায়ুন আজাদ পরে বিদেশে গিয়ে মারা যান।

এই হামলার খবর জানার সময় বেগম খালেদা জিয়া ঢাকার অদূরে এক জনসভায় বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। দেশের একজন বরেণ্য সাহিত্যিকের উপর এই হামলার খবর শুনে তিনি দুঃখিত ও ক্ষুব্ধ হওয়া দূরের কথা, সভায় দাঁড়িয়েই বললেন, “এই ঘটনা আওয়ামী লীগ ঘটিয়েছে। তারা সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার ইস্যু তৈরি করতে চায়।” মিত্র জামায়াতিদের এই বর্বরতাকে তিনি ঢাকা দিতে চেয়েছেন; অন্যদিকে চেয়েছেন দোষটা আওয়ামী লীগের ঘাড়ে চাপাতে। পরে প্রমাণিত হয়েছে, দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি দেশবাসীর কাছে সত্য কথা বলেননি। তার সরকারের ভেতরে বসেই সন্ত্রাসীরা এই সন্ত্রাস চালিয়েছে, এই সত্যটা তিনি আড়াল করতে চেয়েছেন। কিন্তু পারেননি।

একটা লক্ষণীয় ব্যাপার এই যে, বিএনপি’র শাসনামলে শেখ হাসিনার প্রাণনাশের চেষ্টা একবার নয়, একাধিকবার হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রাণনাশের চেষ্টা দূরের কথা, তার শরীরে একটি ফুলের টোকাও পড়েনি। বিএনপি’র কোনো শীর্ষ নেতা বা সাবেক মন্ত্রী নিহত হননি। তারপরও বিএনপি নেত্রীর কণ্ঠে এখন একটিই সুর আওয়ামী লীগ দেশকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসে ভরে ফেলেছে। অবশ্যই আওয়ামী লীগ আমলেও সন্ত্রাস ও দুর্নীতি আছে। কিন্তু এই দুর্নীতি কি হাওয়া ভবনের মতো দুর্নীতি, যা দেশের সকল উন্নয়নকে গ্রাস করে ফেলেছিল? বর্তমানের সন্ত্রাসও কি আওয়ামী লীগের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে অনুষ্ঠিত সন্ত্রাস, যা বিএনপি’র আমলে অনুষ্ঠিত হয়েছিল? বেছে বেছে প্রতিপক্ষের শীর্ষ নেতাদের হত্যা? বুদ্ধিজীবীদের হত্যা?

আওয়ামী লীগ আমলের সন্ত্রাস ব্লগার হত্যা, হিন্দু পুরোহিত, বৌদ্ধ ভিক্ষু বা খ্রিস্টান পাদ্রি হত্যা থেকে শুরু  করে গুলশান ও শোলাকিয়ার হামলার পেছনে সরকারের কোনো প্রশ্রয় ছিল না বা সরকারের কোনো মিত্র দলও এসব করেনি। বরং বিএনপির মিত্র জামায়াত-শিবিরের এবং তস্য উপদল জেএমবি’র হাতই এই সন্ত্রাসের পেছনে আবিষ্কৃত হয়েছে। বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে যেমন রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় দিয়েছে, তেমনি বিরোধী দল হিসেবে থাকাকালেও জামায়াতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে পেট্রোল বোমা হামলায় অসংখ্য নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, যাদের মধ্যে অসহায় নারী ও শিশুও আছে।

আজকের একুশে আগস্ট যে শোকার্ত বেদনাময় স্মৃতি বহন করছে, তার নিরিখে বিএনপি’র রাজনৈতিক জীবন বিচার করলে দেখা যাবে, তার সর্বাঙ্গ সন্ত্রাসের কালিমায় পূর্ণ। এই কালিমা থেকে মুক্ত না হতে পারলে বিএনপি’র পক্ষে একটি সুষ্ঠু রাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠা বজায় রাখা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই দলের শক্তির একমাত্র ভিত্তি হচ্ছে ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতায় না থাকলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে দলটির অস্তিত্ব রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। বর্তমানে ক্ষমতাহীন বিএনপিতে সেই অবস্থাই দেখা দিয়েছে। বিদ্রোহ ও অসন্তোষ দলের মধ্যে মাথা তুলছে। বেগম জিয়া বয়সের ভারে না হলেও নানা রোগে-শোকে আক্রান্ত। তিনি আর কতদিন দলের ভাঙন ঠেকিয়ে রাখতে পারবেন?

নেপালে মাওবাদীরা সন্ত্রাসের পথ ত্যাগ করে সংসদীয় রাজনীতির পথে ফিরে এসেছে। মাওবাদী নেতা নেপালের প্রধানমন্ত্রী হতেও পেরেছেন। নেপালে মাওবাদীরা অস্ত্র হাতে সরকারের বিরুদ্ধে গেরিলা যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশের উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসীদের মতো নিরীহ মানুষের উপর চোরা গোপ্তা হামলা চালায়নি। গলা কাটার রাজনীতি করেনি। ভারতের যেসব স্থানে মাওবাদীরা শ্রেণি শত্রু খতমের নামে নিরীহ কনস্টেবল, গ্রামের জোতদার হত্যা করেছে, সেসব স্থানে তারা জনসমর্থন পায়নি, সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বাংলাদেশে সিরাজ শিকদারের সর্বহারা পার্টি বা পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টির সন্ত্রাস শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে।

হালের জামায়াতি সন্ত্রাসও যে বাংলাদেশে সাফল্য লাভ করবে তার কোনো সম্ভাবনা নেই। তারা আইএস বা আল-কায়েদা যে মুখোশই ধারণ করুক, জনগণের ঘৃণা এবং সরকারের কঠোর নীতি এই দুই প্রতিরোধের মুখে তা ব্যর্থ হবে। হাসিনা সরকার তাই বর্তমানের সন্ত্রাস দমনেও সফল হতে চলেছেন। বিএনপির উচিত, ইতিহাসের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে সর্বপ্রকার সন্ত্রাসী তত্পরতা থেকে নিজেকে মুক্ত করা, সন্ত্রাসী দল জামায়াত এবং তার উপদলগুলোর সঙ্গে সর্বপ্রকার সংশ্রব বর্জন করা। গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুপ্রশস্ত পথে ফিরে আসা। বিএনপি’র আরো উচিত ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের ঘৃণ্য সন্ত্রাসের নিরিখে নিজের অতীত বিচার করা এবং এই অতীত বর্জন করে সুস্থ রাজনীতির ভবিষ্যত্ গড়ে তোলা। নইলে দলটির কোনো ভবিষ্যত্ নেই। – ইত্তেফাক

লন্ডন ২০ আগস্ট, শনিবার; ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment