বড় বেশি বিলম্বিত বোধোদয় (!)

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC

কোন কোন মানুষের আক্কেল দাঁত (রিংফড়স ঃববঃয) নাকি বুড়ো বয়সে গজায়। সেই দাঁত গজানোর ব্যথা ভয়ানক। রকম-সকম দেখে মনে হয় বাংলাদেশের একটি রাজনৈতিক সংগঠন বিএনপিরও শেষ বয়সে আক্কেল দাঁত গজাতে শুরু করেছে। ফলে তার যাতনায় দলের নেতা-নেত্রীরা ক্লিষ্ট। মাত্র সেদিন ১৫ আগস্ট দলনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে তার বানানো জন্মদিনের কেক কাটা উৎসব বাতিল করতে হয়েছে। দু’দিন না যেতেই ২১ আগস্ট তারিখে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলামকে স্বীকার করতে হয়েছে, ২১ আগস্টের (২০০৪) ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি কলঙ্কময় ঘটনা। শুধু একথা স্বীকার করা নয়, শেখ হাসিনার জনসভায় এই বর্বর গ্রেনেড হামলায় আওয়ামী লীগের যে ২২ জন নেতা ও কর্মী নিহত হন তাদের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

ঢাকার সেগুন বাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে অনুষ্ঠিত সভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “আজকে সেই একুশে আগস্ট। এ দিনটিকে আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে স্মরণ করতে চাই। এই একুশে আগস্টে একটি বর্বরতম হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল এবং একটি রাজনৈতিক দলের ২২ জন নেতাকর্মী সেদিন নিহত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটা কলঙ্কময় ঘটনা ঘটেছিল। আমি নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। নিহতদের মধ্যে আমাদের সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সাহেবের স্ত্রী বেগম আইভী রহমানও ছিলেন। আমি তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি এবং তাদের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি।”

মির্জা ফখরুল ইসলামের এই বহু বিলম্বিত বোধোদয়কে অভিনন্দন জানাতে পারতাম এবং এখনও লিখতে পারতাম যে, তার এই বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনীতিতে গতি পরিবর্তনের একটি শুভ উদ্যোগ, যদি তিনি এই বর্বরতার নিন্দা জ্ঞাপনের সঙ্গে সঙ্গে এই বর্বরতা অনুষ্ঠানের নেপথ্য ঘাতকদেরও নিন্দা করে তাদের শাস্তিদানের দাবি জানাতেন। এই ঘাতকেরা অনেকেই এখনও বিচার ও দণ্ডের আওতার বাইরে রয়েছে এবং রয়েছে বিএনপিরই আশ্রয়-প্রশ্রয়ে। এটা অনেকটা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ওবামার জাপান সফরে গিয়ে আণবিক বোমায় ১৯৪৫ সালে বিধ্বস্ত হিরোশিমা ও নাগাসাকির মানুষের জন্য ক্যামেরার সামনে অশ্রু বিসর্জনের মতো। এই দু’টি শহরে আমেরিকা যে বর্বর আণবিক হামলা চালিয়ে লাখ লাখ নিরীহ নর-নারী ও শিশু হত্যা করেছিল, সেজন্যে ওবামা দুঃখ প্রকাশ করেননি, কিংবা এই দু’টি শহরের মানুষের কাছে ক্ষমা প্রার্থনাও করেননি। ওবামা আমেরিকার পাপ স্খলনের কোন চেষ্টাই করেননি, কেবল নাটক করে এসেছেন।

বাংলাদেশে ২০০৪ সালের একুশে আগস্ট তারিখে দেশটির ইতিহাসের আরেকটি বর্বরতম ঘটনা কারা ঘটিয়েছে সেকথা বিএনপি’র মহাসচিব জানেন। এই হামলার উদ্দেশ্য ছিল শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সকল শীর্ষ নেতা হত্যা এবং আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা। এই হত্যা ষড়যন্ত্রের মামলায় আসামির তালিকায় আছেন বেগম খালেদা জিয়ার ছেলে তারেক রহমানসহ ওই দলের ৩০ জন নেতা। দেশের সকল মানুষই জানে, এই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয় বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে। সেই সরকার এই হত্যা চেষ্টার সুষ্ঠু তদন্ত করেনি, বরং মামলাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালায়। অতঃপর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে অভিযোগপত্র গঠন ও মামলা শুরু হয়। কিন্তু তারেক রহমানসহ অনেক আসামিই এখন পলাতক এবং ধরাছোঁয়ার বাইরে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের সম্মুখীন করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। বিএনপির তাতে কোন সহযোগিতা নেই। বরং তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় জড়িত করা হয়েছে বলে এখনও রাজপথে প্রতিবাদ-মিছিল করা হচ্ছে।

আমার কথাটি রূঢ় শোনাতে পারে, তবু বলছি। একুশে আগস্টের বর্বর ঘটনা নিয়ে মির্জা ফখরুলের দুঃখ ও শোক প্রকাশ কি বিলম্বিত বোধোদয়, না কি দলকে দায়মুক্ত করার জন্য সাজানো নাটক? যদি এটি বিএনপি নেতার মনে বিলম্বিত বোধোদয় হয়ে থাকে, তাহলে এই ঘটনার জন্য যারা অভিযুক্ত হয়েছে, তারা অনেকে তার নিজের দলের লোক হলেও তাদের বিচার ও উপযুক্ত দণ্ডদানের দাবি জানানো তার উচিত ছিল। জাতির পিতার মর্মান্তিক মৃত্যু দিবসে বানোয়াট জন্মদিনের উৎসব পালনের জন্য বেগম জিয়ার যেমন উচিত জাতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা, তেমনি ২১ আগস্টের (২০০৪) বর্বর হামলার পেছনে বিএনপির যেসব শীর্ষ নেতার জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে, যাদের বিরুদ্ধে মামলা চলছে, তাদেরও রাজনৈতিক আশ্রয়ে না রেখে বিচারের সম্মুখীন হতে বাধ্য করা উচিত। নইলে ২১ আগস্টের নিহতদের জন্য মির্জা ফখরুলের এই অশ্রু বিসর্জন কুম্ভিরাশ্রু বিসর্জন মনে হতে পারে।

তারেক রহমান সম্পর্কে বাজারে একটি কথা প্রচলিত। কথাটি হলো “লাইক ফাদার লাইক সান,” অর্থাৎ যেমন পিতা তেমন পুত্র। নিষ্ঠুরতা ও ষড়যন্ত্রে তারেক রহমান তার পিতা জিয়াউর রহমানের চাইতেও এক কাঠি দড়। পিতা জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধু হত্যা থেকে জেল হত্যা, বিচার প্রহসনে কয়েক শ’ মুক্তিযোদ্ধা সেনা ও অফিসার হত্যা থেকে কর্নেল তাহের হত্যা পর্যন্ত বহু হত্যাকাণ্ডের ছিলেন নেপথ্য নায়ক। তারেক রহমান “বাপকা ব্যাটা, কুছ না হোক তো থোড়া থোড়া।” দশ ট্রাক অবৈধ অস্ত্রের চালান, হাওয়া ভবনের সন্ত্রাস ও দুর্নীতি এবং ২১ আগস্টের ভয়াবহ গ্রেনেড হামলাসহ অসংখ্য ঘটনার পেছনের নায়ক হিসেবে তিনি অভিযুক্ত। এই অভিযোগগুলোর মোকাবিলা না করে তিনি অসুস্থতার অজুহাত দেখিয়ে লন্ডনে পালিয়ে আছেন। এটা থেকেই কি তার অপরাধ অনেকটা প্রমাণিত হয় না?

তারেক রহমান বিদেশে বলে বেড়াচ্ছেন, তিনি দেশে ফিরলে সুবিচার পাবেন না। তাকে জেলে ঢোকানো হবে। তিনি তো আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগেই বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগে জেলে ছিলেন। চিকিৎসার নামে মুচলেকা দিয়ে জামিনে মুক্ত হন এবং লন্ডনে চলে যান। আট বছর হলো বিচারে দণ্ডিত হওয়ার ভয়ে দেশে ফিরছেন না। রাজনীতি করবেন আবার জেলে যাবার ভয়ে বিদেশে পালিয়ে থাকবেন এটা তো হয় না। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে পাকিস্তান আমলে উনিশটি সাজানো দুর্নীতির মামলা দেয়া হয়েছিল। তিনি প্রত্যেকটি মামলার মোকাবিলা করেছেন। বিদেশে পালিয়ে থাকেননি। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ফখর-মইন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে শুধু দুর্র্নীতির মামলা দেয়া নয়, তাকে বিদেশ থেকে দেশে ফিরতে না দিয়ে হুলিয়া জারিও করা হয়েছিল। তিনি গ্রেফতারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে দেশে ফেরেন এবং সরকারি রোষের মোকাবিলা করেন।

আর আমাদের বীরপুঙ্গব তারেক রহমান জেলে যাওয়ার ভয়ে দেশে ফিরছেন না। বিদেশে বসে ষড়যন্ত্রের জাল বুুনছেন এবং আশা করছেন এই ষড়যন্ত্রের দ্বারা, সন্ত্রাসের দ্বারা হাসিনা সরকারকে উৎখাত করে একদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন। মির্জা ফখরুলের মতো বিএনপির নেতারা একদিকে এই নেতার পাদবন্দনা করছেন এবং অন্যদিকে এখন একুশে আগস্টের বর্বর গ্রেনেড হামলায় নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করছেন; যে গ্রেনেড হামলায় তারেক রহমানের জড়িত থাকার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ২১ আগস্টের নিহতদের জন্য শোক প্রকাশের সঙ্গে এই হামলার নেপথ্য নায়কদের বিচার ও দণ্ডদানের দাবিতে মির্জা ফখরুল সরব হলে এই শোক প্রকাশে তার আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যেত।

গত শতকের ত্রিশের দশকে জার্মানির নাৎসি পার্টির একটা কৌশল ছিল; প্রতিপক্ষের কোন রাজনৈতিক নেতাকে গুপ্তহত্যার পর ঘটা করে তার জন্য শোক প্রকাশ করা এবং হত্যার দায় প্রতিপক্ষের উপর চাপিয়ে তাদের উপর অমানুষিক নির্যাতন চালানো। জার্মানির রাইখস্ট্যাগ (পার্লামেন্ট) ভবনে আগুন দেয় হিটলারের এক ভাড়াটে গুণ্ডা। কিন্তু নাৎসি দল এই অপরাধের দায় জার্মানির কম্যুনিস্ট পার্টির উপর চাপিয়ে তাদের চরম নির্যাতনের শিকার করেছিল। মজার ব্যাপার এই যে, হিটলারের নাৎসি পার্টি যে দুর্বৃত্তকে ভাড়া করে পার্লামেন্ট ভবনে আগুন ধরানোর কাজে লাগিয়েছিল সে ছিল একজন সাবেক কম্যুনিস্ট। বাংলাদেশেও সাবেক বামপন্থী ও বিভ্রান্ত বামপন্থীদের সামরিক ও স্বৈরাচারী চক্রগুলো মাঝে মাঝে কিভাবে তাদের কাজে ব্যবহার করেছে তা লক্ষণীয়।

আমার বিশ্বাস বাংলাদেশে বিএনপি জার্মানির নাৎসিদের এই কৌশল অনুসরণ করতে চায় না। অতীতে আওয়ামী লীগের যত নেতাকে (শাহ কিবরিয়া, আহসানউল্লা মাস্টার প্রমুখ) হত্যা করা হয়েছে, তার প্রত্যেকটির দায় বিএনপির নেতানেত্রীরা আওয়ামী লীগের উপরেই চাপাতে চেয়েছেন। এমনকি শেখ হাসিনার উপর ভয়াবহ গ্রেনেড হামলার সময়ও বেগম খালেদা জিয়ার সাংবাদিক উপদেষ্টা শফিক রেহমান লিখেছিলেন, শেখ হাসিনা তার হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়া এবং দেশবাসীর মনে তার জন্য সমবেদনা ও সমর্থন সৃষ্টির জন্য নিজেই এই হামলাটি চালানোর কৌশলী ব্যবস্থা করেছিলেন।

এই ধরনের নির্দয় নিষ্ঠুর অসত্য প্রচারও একুশে আগস্টের বর্বর হামলার সময় বিএনপির কোন কোন মহল থেকে করা হয়েছিল। দেশের মানুষ তা বিশ্বাস করেনি, তারা বিএনপির প্রত্যেকটি মিথ্যাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই কয়েক বছর ঘটা করে ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসকে বেগম জিয়া তার বানোয়াট জন্মদিনের উৎসব হিসেবে পালন করে এ বছর তা বর্জন করতে বাধ্য হয়েছেন। তার মহাসচিব মির্জা ফখরুলকে প্রকাশ্য সভায় দাঁড়িয়ে একুশে আগস্টের নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করতে হচ্ছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে হচ্ছে।

এটা যদি নতুন রাজনৈতিক কৌশল না হয়ে বিএনপি নেতাদের ভেতর বিলম্বিত বোধোদয়েরও প্রমাণ হয়, তাহলে তাকে অভিনন্দন জানাবো। এটা এখন প্রমাণিত, বিদ্বেষ প্রচার ও ইতিহাসের সত্যের বিকৃতি দ্বারা কোন রাজনৈতিক দল টিকতে পারে না। বিএনপিকে ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের রাজনীতি ছেড়ে গণতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ফিরতে হবে। একুশে আগস্টের সভায় মির্জা ফখরুল বলেছেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিপন্ন করার, বাংলাদেশকে জঙ্গীবাদী রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র চলছে।” এই বিলম্বিত বোধোদয় যদি তাদের মধ্যে সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে বিএনপিরই উচিত এই ষড়যন্ত্রের জাল থেকে নিজেকে সর্বাগ্রে মুক্ত করা। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ২৩ আগস্ট, মঙ্গলবার, ২০১৬]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment