কালের আয়নায়

‘হুঁশিয়ার ইসলাম, ডুবে তব সূর্য’

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

AGC 3

ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে বেশি অবমাননা কে করেছে? এর একটি মাত্র জবাব- ওয়াহাবি মতবাদ এবং এই মতবাদ থেকে জাত জামায়াতে ইসলামী। সৌদি বাদশাহরা যে ধর্ম অনুসরণ করেন তা দ্বীনে ওয়াহাবি; দ্বীনে মোহাম্মদী নয়। শান্তি ও সাম্যের ধর্মের বিস্তৃতি ঘটিয়ে যে পলিটিক্যাল ইসলামের জন্ম দেওয়া হয়েছে এবং যে পলিটিক্যাল ইসলামকে কমিউনিজম ঠেকানোর জন্য পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীরা লুফে নিয়েছিল, তারই আরও বিকৃত ও সন্ত্রাসী রূপ আমরা এখন বিশ্বময় দেখছি- জিহাদিস্ট, ইসলামিক স্টেট, আল কায়দা ইত্যাদি নানা নামে, নানা রূপে। আমাদের উপমহাদেশে জামায়াতে ইসলামী এই জঙ্গিবাদ ও বিকৃত ইসলামের ধারক ও বাহক।

পবিত্র ইসলাম ধর্মে যেসব কথা ও কাজ বর্জনীয়, জামায়াতে ইসলামী ও তথাকথিত জিহাদিস্টদের কাছে তা গ্রহণীয়। যেমন অকারণে হত্যা, নারী ধর্ষণ, শিশু-নারী হত্যা, অন্য ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক হত্যা, তাদের মন্দির ও গির্জায় হামলা চালানো। ইসলামের প্রাথমিক যুগে হজরত ওমর (রা.) খলিফা থাকাকালে খ্রিস্টানদের কবল থেকে জেরুজালেম শহর মুক্ত করেন। শহরে সসৈন্যে প্রবেশের পর পরাজিত খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের নেতারা এসে খলিফাকে বলেন, ‘আপনি সৈন্যদের নিয়ে কোথায় রাত্রিবাস করবেন? আমাদের গির্জাটি বেশ বড়। আপনারা এই গির্জাতেই রাত্রিবাস করুন।’ হজরত ওমর (রা.) সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিয়েছিলেন, না, তা হয় না। আমার সৈন্যরা একবার যদি গির্জায় ঢুকে সেখানে নামাজ পড়ে, তাহলে গির্জাটিকে মসজিদ বানিয়ে ফেলবে। আমি তা হতে দিতে চাই না।’ তিনি মাঠে তাঁবু খাটিয়ে সসৈন্যে রাত্রি যাপন করেছেন।

এটা তো গেল ইসলামের প্রাথমিক যুগের কথা। মধ্যযুগেও দিল্লির গোঁড়া মুসলিম (মোগল) সম্রাট আওরঙ্গজেব দিল্লির অদূরে মসজিদ নির্মাণ করতে গিয়ে যখন জানলেন, এটি শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থান এবং তা একটি মন্দির হয়েছে; সেখানে পূজা-অর্চনা হয়, তিনি তখনই মন্দিরের অংশ বাদ দিয়ে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দেন। এখন শ্রীকৃষ্ণের জন্মস্থানে পাশাপাশি মসজিদ ও মন্দিরের অবস্থান এক অভূতপূর্ব ব্যাপার। আমিও এই ঐতিহাসিক স্থানটি দেখতে গিয়েছিলাম। এই মসজিদ ও মন্দিরে ঢোকার একটি মাত্র দ্বার। সেই দ্বাররক্ষী কখনও একজন মুসলমান, কখনও একজন হিন্দু। এখানে কখনও সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার কথা জানা যায় না।

আরও একটি উদাহরণ দিই ইউরোপের ইতিহাস থেকে। প্রথম ক্রুসেড অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইংল্যান্ডের রাজা রিচার্ড এবং মিসরের সুলতান সালাউদ্দিনের মধ্যে। যুদ্ধে অবশ্য খ্রিস্টান শক্তি পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ চলার সময় কিং রিচার্ড গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। সুলতান সালাউদ্দিন যুদ্ধবিরতি ঘটিয়ে হাকিমের (চিকিৎসক) ছদ্মবেশে খ্রিস্টান শিবিরে যান এবং রিচার্ডকে ওষুধপত্র দিয়ে সারিয়ে তোলেন। স্যার ওয়াল্টার স্কটের উপন্যাস ‘টালিসম্যান’-এ তার বিবরণ আছে।

দিল্লির দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ুন হঠাৎ আক্রান্ত হয়েছিলেন পাঠান সেনাপতি শের শাহের দ্বারা। তিনি সেই হামলা উপেক্ষা করে প্রতিবেশী এক হিন্দু রানীর (সম্রাটকে ভাই ডেকেছিলেন) রাজ্য শত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য সসৈন্যে ছুটে গিয়েছিলেন। সেই সুযোগে শের শাহ দিল্লি দখল করে নেন। এ কারণে তিন বছর সম্রাট হুমায়ুনকে বনে-জঙ্গলে স্ত্রী ও শিশুপুত্র আকবরকে নিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হয়েছে।

পবিত্র ঈদুল আজহা সামনে নিয়ে দূর অতীতের এই জানা কাহিনী পাঠকদের কাছে তুলে ধরছি এই একটি মাত্র কারণে যে, আজ জামায়াতে ইসলামী, তালেবান, আল কায়দা, আইএস ইত্যাদি নামে যে সন্ত্রাসী দল ও জঙ্গি গ্রুপগুলো ইসলামের নাম ভাঙিয়ে দেশে দেশে সন্ত্রাস ছড়াচ্ছে এবং মানবতাবিরোধী জঘন্য অপরাধ করছে, তারা ইসলামের প্রকৃত প্রতিনিধি নয়। এরা নিত্য ইসলামের অবমাননা করে চলেছে; ইসলামকে একটি সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে তার ভাবমূর্তি বিনষ্ট করছে। এর বিরুদ্ধে সারাবিশ্বের শান্তিকামী মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে জামায়াত ও তার পোষ্য দলগুলো ইসলামের শুধু অবমাননা নয়, তার পবিত্র নামগুলো পর্যন্ত অপব্যবহার দ্বারা সাধারণ মানুষের (মুসলমানদেরও) কাছে নিন্দনীয় ও ঘৃণ্য করে তুলছে। ইসলামের প্রাথমিক যুগে আলবদর, আলশামস ইত্যাদি ছিল ইসলামের পতাকাবাহী মুসলমান যোদ্ধাদের এক এক অংশের গৌরবোজ্জ্বল পরিচয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে এই পবিত্র নামগুলো জামায়াত তাদের ঘাতক, দালাল, শিশু হত্যাকারী ও নারী ধর্ষণকারী বিভিন্ন ক্যাডার বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে নামগুলোকে বাংলার মানুষের কাছে ঘৃণ্য পরিচয়ে রূপান্তরিত করেছে। এখন বাংলাদেশে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি নাম মানুষের কাছে নিন্দনীয় পরিচয় এবং গালি। একটা প্রচলিত গালি হচ্ছে ‘তুই রাজাকার’ অথবা ‘তুই রাজাকারের পুত্র’। ইসলামের এত বড় অবমাননা আর কী হতে পারে?

‘শহীদ’ ও ‘জিহাদ’- এই দুটি পবিত্র শব্দের অবমাননা চলছে আরও ব্যাপকভাবে। অতীতে শহীদ বলতেই আমাদের মনে একটা সম্ভ্রম জেগে উঠত এমন মানুষদের জন্য, যারা ধর্ম, দেশ বা জাতির কল্যাণে আত্মদান করেছেন। আর জিহাদ বলতেই একটা বিরাট আদর্শ ও লক্ষ্যের কথা মনে হতো। ধর্ম, দেশ, জাতি এবং মানবতার কল্যাণে কোনো যুদ্ধে যোগ দেওয়া ছিল জিহাদ। এখন বাংলাদেশে শহীদ এবং জিহাদ দুটি কথারই অতিব্যবহার এবং অপব্যবহারে তার পবিত্রতা ও মর্যাদা নষ্ট হতে চলেছে।

সম্প্রতি একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং মানবতার শত্রু মীর কাসেম আলীকে ফাঁসি দেওয়ার পর জামায়াতিরা তাকে শহীদ আখ্যা দিয়ে এই পবিত্র নামের অবমাননা করছে। শহীদ বলা হচ্ছে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত অন্যান্য যুদ্ধাপরাধীকেও। কাদের মোল্লা, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, মতিউর রহমান নিজামী- এরা সবাই জামায়াতিদের প্রচারণায় শহীদ। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর স্বাধীনতা বিরোধী চক্র যখন ক্ষমতায়, তখন মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে নিহত মোনায়েম খানকে পর্যন্ত মুসলিম লীগ, জামায়াত প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক দল শহীদ আখ্যা দিয়ে তার মৃত্যুবার্ষিকী পালন করতে শুরু করেছিল। দেশবাসীর অসহযোগিতায় পরে তা আর করতে পারেনি।

জামায়াতসহ স্বাধীনতা বিরোধী দলগুলো এভাবে অতীতে রাজাকার, আলবদর, আলশামস ইত্যাদি ইসলামের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল নামগুলো কলঙ্কিত করেছে। এখন শহীদ, জিহাদ কথাগুলো কলঙ্কিত করছে। যে জিহাদ কথাটি ছিল এককালে শুধু মুসলমানের কাছে নয়; বিশ্বের সব মানুষের কাছেই একটি মহান লক্ষ্যের যুদ্ধ হিসেবে পরিচিত; তা আজ টেররিজমের সমার্থবোধক। জিহাদিস্ট মানেই একজন সন্ত্রাসী। পশ্চিমা শক্তিগুলো এর সুযোগ নিয়ে ইসলাম ও জিহাদকে একার্থবোধক করে টেররিস্ট বা জিহাদিস্টদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে ইসলাম ও মুসলমানদের সম্পর্কে বিশ্ব-জনমতকে বিরূপ করে তুলতে সক্ষম হচ্ছে। এর জন্য বাংলাদেশে জামায়াতিরা এবং মধ্যপ্রাচ্যে তথাকথিত ইসলামিক স্টেটের বর্বর সন্ত্রাসীরা দায়ী।

বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালত একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলীর প্রাণদণ্ডাদেশ বহাল রাখার পর লন্ডনের আলতাফ আলী পার্কে বাংলাদেশি জামায়াতিরা একটি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করেছিল। অবশ্য এই বিক্ষোভ সমাবেশের সামনের কাতারে ছিল বিএনপির নেতাকর্মীরাই বেশি। তারা তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের নামের আগেও শহীদ কথাটি লাগায়। জিয়াউর রহমান কোনো ভালো কাজের জন্য মারা যাননি। বন্দুকের জোরে রক্তপাত ঘটিয়ে ক্ষমতা দখল করার পর তিনি অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈন্যকে বিচার প্রহসনে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সেনা অফিসারদের মধ্যেই অসন্তোষ ও ক্রোধ ছিল। সেনাবাহিনীর একাংশের বিদ্রোহের ফলেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে তিনি নিহত হন। এখন প্রশ্ন- তিনি শহীদ হলেন কীভাবে? নিজের কৃতকর্মের ফলে কেউ যদি অসন্তুষ্ট সহকর্মীদের হাতে নিহত হন, তাহলে তাকে কি শহীদ হওয়া বলা চলে? শহীদের মর্যাদা লাভ কি এতই সহজ এবং ঠুনকো ব্যাপার?

সদ্য প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত মীর কাসেম আলীকেও শহীদ আখ্যা দিয়ে তার জন্য জামায়াত হা-মাতম করেছে। মুক্তিযোদ্ধাকে অপহরণ করে হত্যা করা, হোটেল রুমে টর্চার সেল তৈরি করে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের ধরে এনে নির্যাতন ও হত্যা, নারী নির্যাতন, নিরীহ মানুষের ঘরে অগি্নসংযোগ যদি শহীদের কাজ হয় তাহলে বাংলাদেশের এ জাতীয় অপরাধ করে যারা বিচারে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছে তারা সবাই শহীদ। শহীদ কথাটির এত বড় অবমাননা জামায়াত ছাড়া আর কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়।

‘লা তাক্রাহা ফি দ্বীন’- ধর্মে কোনো জোর-জুলুম নেই, এটা পবিত্র কোরআনের বাণী। কিন্তু জামায়াতিরা গলা কেটে, নর-নারী নির্বিশেষে মানুষ হত্যা করে ধর্মরাষ্ট্র (আসলে ওয়াহাবি রাষ্ট্র) প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ইসলামের মহানবী (সা.) ধর্ম প্রচার ও রক্ষা করার জন্য মক্কাবাসীদের সঙ্গে একটি নয়, একাধিক যুদ্ধ করেছেন; নিজে আহত হয়েছেন। কিন্তু কখনও সন্ত্রাসের আশ্রয় নেননি। মদিনা থেকে গোপনে নবদীক্ষিত তরুণ মুসলমানদের মক্কায় পাঠিয়ে শত্রুপক্ষের কারও গলা কাটাননি। তাদের ঘরে অগ্নি সংযোগ করাননি। তাদের নারীদের নিগ্রহ ও নির্যাতন করাননি।

আর আজ দেড় হাজার বছর পর সেই মহানবী (সা.) এবং তার ধর্মের নামে বাংলাদেশে জামায়াতিরা এবং মধ্যপ্রাচ্যে আইএস যা ঘটাচ্ছে, তা শুধু ইসলামের কলঙ্ক নয়; গোটা মানবতা ও মানব সভ্যতার কলঙ্ক। সামনে ঈদুল আজহা। এই ঈদের মর্মবাণী ত্যাগ ও আত্মোৎসর্গ। এই আত্মোৎসর্গের আদর্শে আজ সারাবিশ্বের মুসলমানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুসলমানদেরও নতুন করে সংগঠিত হওয়া দরকার। ইসলামের অবমাননাকারী সন্ত্রাসী ও ঘাতক শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো আবশ্যক। ইসলামকে কলঙ্কমুক্ত করা আরও বেশি আবশ্যক।

বহুকাল আগে কবি নজরুল ইসলাম সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছিলেন-

‘বাজিছে দামামা হাঁকে নকীবের তূর্য্য

হুঁশিয়ার ইসলাম, ডুবে তব সূর্য।’

এই সাবধানবাণী ইসলাম ও মুসলমানদের জন্য এখন আরও বেশি সত্য। এবারের ঈদুল আজহায় প্রার্থনা করি- এ যুগের খান্নাস, জামায়াতিদের ‘ওয়াছওয়াছা’ (কুমন্ত্রণা) থেকে বাংলার মানুষ মুক্ত হোক। – সমকাল

লন্ডন ৯ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment