কালের আয়নায়

সন্ত্রাস ও দুর্ঘটনামুক্ত এবারের ঈদ ও কোরবানি প্রসঙ্গে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

eid

এবারও কোরবানির ঈদের ছুটিতে আমার ঢাকার বন্ধুদের অনেকে (সাংবাদিকসহ) তাদের গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলেন। ছুটি শেষে তাদের অনেকেই ঢাকায় ফিরে এসেছেন। ঢাকার যানজট অনেকটা কমেছিল। রাজধানীর কর্মচাঞ্চল্য কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল। তা আবার ফিরে এসেছে। এবারের ঈদের ছুটির বৈশিষ্ট্য কী- এক সাংবাদিক বন্ধুকে তা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বললেন, ‘আমরা বড় ভয়ে ছিলাম। বর্তমানের জিহাদিস্ট বা সন্ত্রাসীরা তো ধর্মের কোনো পবিত্রতাই মানে না। তারা মসজিদে বোমা ফাটায়। ঈদের জামাতে রক্তবন্যা বহায়। শোলাকিয়ায় তারা কী ঘটাল তা তো দেখেছেন। আমাদের ভয় ছিল, কিছুকাল নিষ্ক্রিয় থাকলেও তারা আবার ঈদের ছোট-বড় জামাতে আবার না কী ট্র্যাজেডি ঘটায়! আমাদের সে আশঙ্কাটা সত্যে পরিণত হয়নি। দু’একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনা ছাড়া ঈদ শান্তিপূর্ণভবে পালিত হয়েছে।

জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ জন্য কাকে ধন্যবাদ দেবেন- সরকারকে, না জিহাদিস্টদের? সাংবাদিক বন্ধু বললেন, জিহাদিস্টদের ধন্যবাদ দেওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। ওদের ধর্ম বর্বরতা, অন্য কোনো ধর্মেরই ওরা অনুসারী নয়। নিরীহ মানুষ হত্যা কোনো ধর্মেরই বিধান হতে পারে না। ওরা পারলে এবার রাজধানীতে তো বটেই, অন্যান্য স্থানেও ঈদের জামাতে হামলা চালাত। সরকারের কঠোরতা এবং সন্ত্রাসী নিধনে পুলিশ ও র‌্যাবের সাফল্যের ফলে তারা মাথা তুলতে পারেনি। তাদের রাজনৈতিক উস্কানিদাতারাও এবার নেপথ্যে বসে সক্রিয় হতে পারেনি। সরকারের দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাবের মোকাবেলায় তারা এখন নিজেদের ঘর সামলাতে ব্যস্ত। সুতরাং এবারের ঈদের শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতির জন্য, যারা বর্তমান সরকারের সমর্থক নন, তাদেরও এ সরকারকে ধন্যবাদ জানানো উচিত।

ঢাকার সাংবাদিক বন্ধুর এই মন্তব্যের সঙ্গে আমি নিজের মন্তব্যটিও যোগ করতে চাই। এবার ঈদের ছুটিতে ট্রেনে, বাসে বা লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই যে হয়নি, তা নয়। কিন্তু সড়ক যোগাযোগ ও নৌ মন্ত্রণালয়ের সতর্ক পর্যবেক্ষণ নীতির দরুন এবার বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটেনি। এক সমাজ বিজ্ঞানী বলেছেন, “নীতিহীন সন্ত্রাসের সঙ্গে যখন অদমনীয় লোভ যুক্ত হয়, তখন তা একটা দেশ ও সমাজের সবচেয়ে বড় শত্রু হয়ে দাঁড়ায়।’ এই বিজ্ঞানীর বাণী বাংলাদেশের জন্য শতভাগ সত্যে পরিণত হয়েছিল।

একশ্রেণির অতিলোভী লঞ্চ মালিকের অতিলোভের জন্য লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী এবং মালবোঝাই করার ফলে লঞ্চ দুর্ঘটনা একটা নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অনুরূপ ঘটনা বাস এবং ট্রেনেও চলছিল। একবার তো সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের তার আকস্মিক সড়ক পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পান, একটি বাসে শুধু অতিরিক্ত যাত্রী ও মালবোঝাই করা হয়নি, বাসের চালকটিরও গাড়ি ড্রাইভিংয়ের কোনো ট্রেনিং নেই। সে কী করে ড্রাইভিং লাইসেন্স জোগাড় করেছে, তাও এক প্রশ্ন। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে ওই চালকের শাস্তির ব্যবস্থা করেছিলেন।

বর্তমানে দেশে যাতায়াত ব্যবস্থা অনেকটা উন্নত। সড়ক দুর্ঘর্টনা, লঞ্চ দুর্ঘটনা বন্ধ হয়েছে, তা নয়। কিন্তু ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সড়ক ও নদীপথে একশ্রেণির মানুষের লোভের কাছে নিরীহ মানুষের দলবদ্ধ মৃত্যু সম্পূর্ণ বন্ধ করতে চাইলে সরকারকে আরও কঠোর হতে হবে। কঠোর ট্রাফিক আইন চালু এবং তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। মন্ত্রীরা যাতে হুইসেল বাজিয়ে দমবন্ধ করা যানজটে দলা পাকানো সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ উপেক্ষা করে নিজেরা হাওয়ার গতিতে ছুটে যেতে না পারেন, তার ব্যবস্থা করতে হবে।

বাংলাদেশে এই মনুষ্যত্ব বোধহীন লোভের সঙ্গে তথাকথিত জিহাদিস্টদের বর্বরতা যুক্ত হয়ে এমন এক ভয়াবহ সামাজিক দানবের জন্ম হয়েছিল, যার কবল থেকে দেশ কোনো দিন মুক্ত হবে, তা ভাবা যায়নি। শেখ হাসিনার সরকার এই অসম্ভব কাজটিতে অনেকটা সফল হয়েছে। কেবল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্বারাই সন্ত্রাসের দাঁত ভেঙে ফেলতে এই সরকার সফল হয়েছে। এটা সাময়িক সাফল্য কি-না জানি না। তবে মেকি মানবতাবাদীদের মায়াকান্নায় না ভুলে সরকার যদি সন্ত্রাসী নিধনে কঠোর থাকে, তাহলে বাংলাদেশ যে পাকিস্তানের পরিণতি বরণ করবে না- এ কথা নিঃসংশয়ে বলা যায়।

গো-হত্যা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই করা হয়। আবার কোনো কোনো মুসলিম দেশেও গো-সম্পদ রক্ষার বৃহত্তর স্বার্থে গো-হত্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। ইসলাম ধর্মেও কোনো কারণে যথেচ্ছভাবে প্রাণী হত্যার বিধান নেই। সবচেয়ে পুষ্টিকর খাদ্য হিসেবে বিবেচিত হয় দুধ। গোবর হচ্ছে কৃষিকাজের সবচেয়ে ভালো সার। এসব কারণে অবিভক্ত ভারতে অবাধে গরু কোরবানির দাবিতে যে মুসলিম লীগ দল দাঙ্গা-হাঙ্গামা পর্যন্ত করেছে, সেই মুসলিম লীগ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশে) গো-সম্পদ রক্ষার স্বার্থে প্রতি শুক্রবার গরু জবাই করা নিষিদ্ধ করে দিয়েছিল।

বর্তমান বাংলাদেশেও যথেচ্ছভাবে গো-সম্পদ নষ্ট নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। ধর্মীয় বিধান মেনে অবশ্যই কোরবানির ঈদে গরু, ছাগল বা ভেড়া কোরবানি দিতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনের বাইরে একটি প্রাণীও হত্যা নয়। আমাদের নব্য ধনীরা এখন আত্মত্যাগের আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়, নিজেদের ধনের দেমাগ দেখানোর জন্য লাখ লাখ টাকায় একাধিক গরু কিনে তা জবাই করেন। জবাই করার আগে আবার গরুগুলোকে রঙ-বেরঙে সাজিয়ে সংবাদপত্রে বা ফেসবুকে তার ছবি প্রদর্শন করা হয়। জবাই করা গরুর ছবিও দেখানো হয়। এটা কি ধর্মীয় বিধানের অবমাননা নয়?

ইসলাম ধর্ম বলে, ‘তুমি ডান হাতে যা দান করো, তা বাম হাত যেন জানতে না পারে।’ পশু কোরবানি হচ্ছে আল্লাহর রাহে শ্রেষ্ঠদান। সেই দানের কথা এত ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করে নিজের ধন-ঐশ্বর্যের গরিমা প্রকাশ করতে হবে- এটা কোন ধর্মে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে? এবার ঢাকায় কোরবানির ঈদের একটা ছবি ফেসবুকে দেখে বিস্মিত হয়েছি। একটা গলিপথ দিয়ে প্রবল বৃষ্টির পানির স্রোত বয়ে চলেছে। কিন্তু সেই পানির রঙ গাঢ় লাল। কোরবানি দেওয়া গরুর রক্তে সেই পানির স্রোত লাল।

এটা এক সময় শুধু ঢাকায় কেন, উপমহাদেশের অনেক শহরেই দেখা যেত। কোরবানির ঈদের পর ছোট-বড় রাস্তায় যত্রতত্র গরুর মাথার খুলি, ফেলে দেওয়া হাড়গোড় পড়ে থাকত। তা বহুদিন পড়ে থাকার পর দুর্গন্ধে পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠত। ফলে জন স্বাস্থ্যঘটিত সমস্যা দেখা দিত। এ ব্যাপারে সরকার অবশ্য এখন অনেক সজাগ। যত্রতত্র গরু জবাই করতে দেওয়া হয় না। হাড়-মাংসও ফেলে রাখতে দেওয়া হয় না। সুতরাং এবার ফেসবুকে শহরের রাস্তায় বৃষ্টির পানির স্রোত লাল রঙ ধারণ করেছে দেখে বিস্মিত এবং ব্যথিত দুই-ই হয়েছি। শুধু শহর কর্তৃপক্ষের নয়, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষেরও এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। এমনিতেই ঢাকার পরিবেশ নানা কারণে দূষিত। পবিত্র কোরবানির ঈদের সময়ে তা যেন আরও দূষিত না হয়। তাতে ঈদের মর্যাদাও নষ্ট করা হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দু’জন নেতৃস্থানীয় ইমামকে আমি অভিনন্দন জানাই। তারা হলেন কলকাতার না-খোদা এবং টিপু সুলতান- এই দুই বিখ্যাত মসজিদের ইমাম। তারা ঈদের দিন পশু জবাই করার ছবি ফেসবুকে বা সামাজিক মাধ্যমে না দেওয়ার জন্য সব মুসলমানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন। তাদের এই আবেদনে সমর্থন জানিয়েছেন আরও অনেক বিশিষ্ট ইমাম। কলকাতার রেড রোডে প্রতি বছর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত হয়। সেই জামাতে ইমামতি করেন মওলানা ফজলুর রহমান। তার বক্তব্য রাজ্যের বহু মসজিদের ইমাম সমর্থন করেছেন।

মওলানা ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘কোরবানি মানুষ নিজের জায়গায় করবে। তার ছবি হোয়াটসআপে বা ফেসবুকে কেন দেবে কেউ? যারা পশু জবাই পছন্দ করে তারা এই ছবি দেখবে আর যারা অপছন্দ করে, তারাও দেখবে। হিন্দু বা যারা নিরামিষাশী, তাদের মনে তো আঘাত লাগবেই জবাইয়ের ছবি দেখে। এমন কিছু করা ইসলামে নিষেধ, যাতে কারও মনে আঘাত লাগে। তাই জবাইয়ের ছবি এভাবে দেওয়াটা উচিত নয়।

তিনি পশু কোরবানির ছবি ফেসবুকে দেওয়ার আরও একটি অকল্যাণকর দিক তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, ‘এই পশু জবাইয়ের দৃশ্য কোমলমতি শিশুদের মনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাদের মনে ভীতি সৃষ্টি করতে পারে। এ ছাড়া পশু কোরবানি একটি ঘেরাও করা জায়গায় দেওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেছেন এবং বলেছেন, পশুর হাড়গোড়-বর্জ্য একটি নির্দিষ্ট স্থানে ফেলতে হবে। নইলে জনস্বাস্থ্যের গুরুতর ক্ষতিকর কারণ ঘটবে।

আমার ধারণা, এ ধরনের আবেদন বাংলাদেশের আলেম, ইমাম ও খতিবদের দেশবাসীর কাছে জানানো উচিত। আত্মত্যাগের আদর্শের জন্য কোরবানি দেওয়া আর আত্মপ্রচারের জন্য দেশে যথেচ্ছ পশুহত্যা এক কথা নয়। কোরবানির পশুকে যথাসম্ভব কম কষ্ট দিয়ে জবাই করার নির্দেশও ধর্মীয় বিধানে বলা হয়েছে। আমরা সেই বিধানও মানি না। আমরা ত্যাগ-উৎসবকে ভোগ-উৎসবে পরিণত করেছি। ধর্ম ও মানবতাকে আমরা পরস্পরের পাল্টা শক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছি। অথচ ধর্মের ভিত্তি হচ্ছে মানবতা। আমরা ধর্মের নামে সেই মানবতাকে প্রতিনিয়ত অগ্রাহ্য করে চলেছি।

ধর্মানুসরণ এবং ধর্মান্ধতা এক জিনিস নয়। ধর্ম বলে, পশু কোরবানির আগে নিজের অন্তরের পশুটিকে হত্যা করো। ধর্মান্ধরা পশুর গলাকাটা আর মানুষের গলাকাটার মধ্যে সমান আনন্দ পায়। এমনকি মানুষের গলা কেটে তার ছবি ফেসবুকে, সামাজিক মিডিয়ায় দেয়। মধ্যপ্রাচ্যে আইএস নামক বর্বর জঙ্গিরা বহুদিন ধরে এই কাজটি করেছে। প্রতিপক্ষের মানুষ ধরে নিয়ে তাকে পশুর মতো নিষ্ঠুরভাবে গলা কেটে হত্যা করে সেই ছবি ফেসবুকে, সামাজিক মিডিয়ায় দিয়েছে। এই নিষ্ঠুরতার অনুকরণে আমরা যদি পশু কোরবানির দৃশ্য ফেসবুকে এবং সামাজিক মিডিয়ায় দিতে থাকি, তা একইভাবে ধর্ম এবং মানবতা দুইয়েরই অবমাননা ঘটাবে।

বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রিয়; কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। তাদের ধর্মান্ধ করে তোলার রাজনৈতিক চক্রান্ত ব্যর্থ হয়েছে। ধর্মান্ধদের ঘৃণ্য সহিংসতাও সরকার কঠোর হাতে দমন করেছে। এখন জনচিত্তকে আরও ধর্মান্ধতামুক্ত করার দায়িত্ব সরকার এবং সুধী সমাজেরও। সামাজিক মিডিয়া এবং ফেসবুকে পশু কোরবানির দৃশ্য দেখানো নিষিদ্ধ করা হোক। কলকাতার আলেমদের মতো বাংলাদেশের আলেমরাও এ ব্যাপারে অগ্রণী হোন। তাতে দেশে সন্ত্রাস পরাজিত হবে। ধর্ম ও মানবতা দুয়ের মর্যাদাই বাড়বে। – সমকাল

লন্ডন, ১৫ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment