ট্রুডোর সম্মান এবং খুনি নূর চৌধুরীর ভবিষ্যত্

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

pm

বহু বছর আগের কথা। একবার নায়াগ্রা প্রপাত দেখার লোভে আরও দু’জন বন্ধুর সঙ্গে কানাডায় গিয়েছিলাম। নায়াগ্রা প্রপাত সংলগ্ন বাসেলো শহরে একরাত অবস্থান করেছি, তারপর চলে গেছি রাজধানী অটোয়াতে। তখন কানাডায় আমাদের হাইকমিশনার ছিলেন সম্ভবত একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল আলম। (এখন সঠিকভাবে স্মরণ করতে পারছি না বলে লজ্জাবোধ করছি)। এই হাইকমিশনার এবং তার স্ত্রী দু’জনেই অত্যন্ত অমায়িক চরিত্রের মানুষ। আমি যেদিন অটোয়া শহরে হাজির হই, সে দিনটি ছিল বাংলা নববর্ষের দিন। হাইকমিশনারের বাড়িতে সে রাতে নববর্ষ উত্সব হলো। অটোয়ার বহু বাংলাদেশি এসেছিলেন। প্রায় সারা রাত গান বাজনা হলো। একটা চমত্কার রাত তার বাসায় কাটিয়েছি।

পরদিন সকালে অটোয়া শহর দেখতে বেরুলাম। সঙ্গে হাইকমিশনারও ছিলেন। নানা জায়গায় ঘুরে পার্লামেন্ট হাউস দেখতে এসে চোখে পড়ল, এক প্রৌঢ় ব্যক্তি পার্লামেন্ট হাউসের সামনে একটা পাথরের বেদিতে বসে আছেন। তার পরনে হাফ প্যান্ট, গায়ে একটা বুশ শার্ট। তখন শীত নেই। চমত্কার রৌদ্র মাখা প্রকৃতি। মনে হলো, ওই প্রৌঢ় মানুষটি রোদ পোহাচ্ছেন। তাকে দেখে আমার চেনা মানুষ মনে হলো। সামনে এগিয়ে যেতেই বুঝলাম, তাকে কখনো সামনাসামনি দেখিনি। কিন্তু টেলিভিশনে দেখেছি এবং খবরের কাগজেও তার ছবি বহুবার দেখেছি।

আমাদের হাইকমিশনারও এ সময় আমার কানের কাছে মুখ এনে বললেন, ইনি কানাডার সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডো। বুঝলাম, তাকে চিনতে ভুল করিনি। এখন তিনি বেঁচে নেই। কিন্তু তখন বেঁচে ছিলেন, তবে আর প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। ছিলেন কানাডার এক কিংবদন্তির নেতা। অটোয়ায় কানাডার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীদের স্ট্যাচু আছে। পিয়েরে ট্রুডোর তখন ছিল না। তিনি একটা স্ট্যাচুর কাছেই বসা ছিলেন।

এই মানুষটির কথা এত জানা ছিল যে, তার সঙ্গে আলাপ করার ইচ্ছে হলো। কানাডা (ব্রিটিশ) কমনওয়েলথভুক্ত দেশ। ব্রিটেনের রাণী কানাডারও হেড অব স্টেট। এটা ট্রুডোর পছন্দ ছিল না। তিনি কানাডাকে প্রজাতন্ত্রী করার পক্ষপাতী ছিলেন। একবার ব্রিটেনের বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ কানাডায় সরকারি সফরে গেলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাকে সংবর্ধনা জানাতে এসেছিলেন গায়ে হাফশার্ট চড়িয়ে, পায়ে স্যান্ডেল। এটা রাণীর প্রতি চরম অসৌজন্য প্রদর্শন বলে সমালোচনা হয়েছিল। তিনি কেয়ার করেননি।

তার স্ত্রী মার্গারিটার সঙ্গে তার সম্পর্ক এবং মার্গারিটার আচার-আচরণ সম্পর্কেও তখন কানাডায় বিতর্কের ঝড় উঠেছিল। তাদের বিয়ে ভেঙে যায়। মার্গারিটা এ সম্পর্কে একটি বই লেখেন। তাতেও তিনি বিব্রত হননি। এই অনমনীয় মানুষটি ছিলেন অসম্ভব স্বাধীন চেতা। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ক’জন বিশ্বনেতা এই যুদ্ধকে সমর্থন জানিয়েছেন, পিয়েরে ট্রুডো ছিলেন তাদের অন্যতম। তখন বাংলাদেশের পক্ষে দ্বিধাহীনভাবে কথা বলেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে বাংলাদেশি শরণার্থীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট কানাডিয়ান পার্লামেন্টারি ডেলিগেশন পাঠিয়েছিলেন। তা ছাড়া স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম যে কটি দেশ বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় কানাডা তাদের অন্যতম। কমনওয়েলথ এবং জাতিসঙ্ঘে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের জন্যও সমর্থন জানিয়েছিলেন পিয়ের ট্রুডোর সরকার। এমন একজন মানুষকে সেদিন সামনে পেয়ে আলাপ করার আগ্রহ চেপে রাখতে পারিনি।

আমরা তার সামনে গিয়ে ‘গুড মর্নিং স্যার’ বলতেই তিনি হেসে গুড মর্নিং বলে উঠে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা কি ইন্ডিয়ান? আমি নিজেদের বাংলাদেশি বলে পরিচয় দিতেই তিনি মাথাটা একটু নিচু করে অভিবাদন জানানোর ভঙ্গি করে বললেন, “স্যালুট টু দ্য মেমোরি অব ইওর গ্রেট লিডার শেখ মুজিবুর রহমান।” তিনি আমাদের হাইকমিশনারের সঙ্গেও পরিচিত হলেন, তারপর আর পাথরের বেদিটাতে না বসে আমাদের সঙ্গে আলাপ শুরু করলেন।

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, এখানে কানাডার অনেক সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ট্যাচু আছে, আপনার নেই কেন? তিনি হেসে বললেন, সকল সাবেক প্রধানমন্ত্রীর স্ট্যাচু এখানে নেই। যারা মারা গেছেন, তাদের স্ট্যাচু আছে। জীবিত অবস্থায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীদের স্ট্যাচু এখানে বসানো হয় না। আমি মারা গেলে আমার স্ট্যাচু এখানে রাখা হবে।

সেদিন কানাডার পার্লামেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডোর সঙ্গে আমাদের বেশ কিছুক্ষণ আলাপ হয়েছিল। আলাপের সবটা এতো দীর্ঘকাল পর মনে নেই। এটুকু মনে আছে, তিনি বার বার বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার কথা বলেছিলেন। দীর্ঘকাল পরে হলেও সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে পিয়েরে ট্রুডো তার এই ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার যথার্থ স্বীকৃতি পেয়েছেন। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার এবারের কানাডা সফরের সময় কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর (পিয়েরে ট্রুডোর ছেলে) হাতে তুলে দিয়েছেন তার পিতার মরণোত্তর মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা—ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার অনার পদক।

এই সম্মান প্রদর্শন করে শুধু পিয়েরে ট্রুডোকেই কৃতজ্ঞতা জানানো হলো না। বাংলাদেশ ও কানাডার সম্পর্ককে আরো দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করানো হলো। জাস্টিন ট্রুডো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে পিতার মরণোত্তর সম্মাননা গ্রহণ করেছেন এবং শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকের সময় বারো বছর বয়সে যে পিতার সঙ্গে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন, সে কথাও গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন। শেখ হাসিনাকে উদ্দেশ করে আরো বলেছেন, “আমরা দু’জনেই দ্বিতীয় প্রজন্ম। আপনার বাবা এবং আমার বাবা দুজনেই প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।”

এই উক্তি দ্বারা তিনি হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন, দু’দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের দু’জন প্রধানমন্ত্রী হয়তো নতুন দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে দু’দেশের সম্পর্ক আরো নতুনভাবে গড়ে তুলবেন এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরো বাড়বে। কানাডা এমনিতেই বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য সাহায্যদাতা দেশ। শেখ হাসিনার এই সফরে এই সাহায্য ও সহযোগিতা আরো বাড়বে। এই বৈঠকে দুই প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ ও গার্মেন্টস পণ্যের রফতানি সম্পর্কেও আলোচনা করেছেন। তাছাড়া জাস্টিন ট্রুডো বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণও গ্রহণ করেছেন।

এটা শেখ হাসিনার একটা বড় কূটনৈতিক সাফল্য। বঙ্গবন্ধুর ঘাতক এবং বর্তমানে কানাডায় পালিয়ে থাকা নূর চৌধুরীকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো অথবা কানাডা থেকে বহিষ্কারে যে ট্রুডো সরকার এখনো সম্মত হননি তা থেকে বাংলাদেশের প্রতি তাদের অসহযোগী মনোভাবের প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং এই ব্যাপারে যে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে তারা একটা উপায় বের করতে রাজি হয়েছেন এখানেই শেখ হাসিনার বর্তমান সফরের বড় সাফল্য।

কানাডায় মৃত্যুদণ্ড প্রথা বাতিল করা হয়েছে বহুকাল আগে। কোনো মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বিদেশিকে তারা তাদের দেশ থেকে তাড়ায় না। কানাডার এই আইনেরই সুযোগ গ্রহণ করেছে নূর চৌধুরী। এজন্য কানাডা সরকার দায়ী নয়। দায়ী বাংলাদেশের সাবেক বিএনপি-জামায়াত সরকার। ২০০৬ সালে খুনি নূর চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করে। কানাডা সরকার তা মঞ্জুর করেননি। তারা বাংলাদেশের তদানীন্তন বিএনপি সরকারকে জানান, তারা যেন এই অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত নেয়। বিএনপি সরকার বঙ্গবন্ধুর খুনিদের প্রতি তাদের সমর্থন ও সহানুভূতির জন্য নূর চৌধুরীকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা করেননি। তাকে দেশের বিচার এড়ানোর জন্য বিদেশে পালিয়ে থাকার সুযোগ দেয়। ২০১০ সালে ঢাকার যুদ্ধাপরাধের বিচারের ট্রাইবুনালের রায়ে নূর চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হলে দেশের আইন অনুযায়ী কানাডা সরকার তার রাজনৈতিক আশ্রয় লাভের আবেদন মঞ্জুর করে।

এখন এই আইনের সুযোগ নিয়ে বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি নূর চৌধুরী কানাডায় পালিয়ে আছে। কানাডা সরকার তার প্রতি সহানুভূতিশীল নয়। কিন্তু আইন ভেঙে তাকে ফেরত পাঠাতে পারছে না। কিন্তু হাসিনা সরকারের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজের উদ্যোগ মিলে এবার অন্তত নূর চৌধুরীকে দেশে ফিরিয়ে আনার একটা সম্ভাবনার সূচনা হয়েছে। এই সম্ভাবনা কতোদিনে কিভাবে বাস্তবায়িত হবে তা বলা মুশকিল। তবে এই ব্যাপারে একেবারেই রুদ্ধ দুয়ারটি যে একটু খুলতে শুরু করেছে তাতে সন্দেহ নেই। দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সখ্য ও আন্তরিকতা এই রুদ্ধদ্বার খোলার একটা উপায় বের করবে সে সম্পর্কে আশা পোষণ করা যায়।

বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের অধিকাংশের বিচার এবং দণ্ড হয়েছে। জিয়াউর রহমান বিচার এড়াতে পেরেছেন, দণ্ড এড়াতে পারেননি। যে কর্ণেল ফারুক ধৃষ্টতার সঙ্গে বলেছিল, “সাহস এবং সাধ্য থাকলে আমাকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করে দেখতে পারো”, তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে প্রাণ দিতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যা ষড়যন্ত্রের আরেক নায়ক খোন্দকার মোশতাক আহমদ যে ঘাতকদের “সূর্যসন্তান” আখ্যা দিয়েছিলেন, সেই “সূর্যসন্তানদের” অধিকাংশকেই আদালতের বিচারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হতে হয়েছে। এতদিন পর্যন্ত বিদেশে পালিয়ে থেকে যে মেজর ডালিম এবং নূর চৌধুরী পলাতক দুঃসহ জীবন যাপন করছে, এরাও চরম দণ্ড এড়াতে পারবে না। সে দণ্ড মানুষের আদালতে না হলেও হবে প্রকৃতির আদালতে। – ইত্তেফাক

লন্ডন ২৪ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment