নিজের যোগ্যতায় যিনি আজ জননেত্রী

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

agc-3

জওয়াহেরলাল নেহেরুর মৃত্যুর পর লালবাহাদুর শাস্ত্রী যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন, ইন্দিরা গান্ধী তখন তার মন্ত্রিসভায় তথ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন। তখন কংগ্রেস দলের ভেতর থেকেই কেউ কেউ বলেছিলেন, “নেহেরু কন্যা হিসেবেই তিনি মন্ত্রীপদ পেলেন।” লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর পর যখন কংগ্রেস সংসদীয় দলের নেতার পদে প্রবীণ নেতা মোরারজী দেশাইয়ের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ইন্দিরা গান্ধী জয়লাভ করলেন এবং প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করলেন, তখনো তার কোনো কোনো ক্রিটিক প্রকাশ্যেই বলেছেন, “নেহেরু কন্যা হিসেবেই তার এই জয়। বেশিদিন তিনি এই পদ ধরে রাখতে পারবেন না। যারা তাকে সামনে খাড়া করে নিজেরা ক্ষমতায় আসার জন্য অপেক্ষা করেছে, তাদের নেতা কামরাজই তাকে একদিন হটিয়ে নিজে প্রধানমন্ত্রীর পদে বসবেন।”

সমালোচকদের এই ভবিষ্যদ্বাণী সত্য প্রমাণিত হয়নি। ইন্দিরা গান্ধী অল্পদিনের মধ্যে প্রমাণ করেন, তিনি কেবল তার পিতার ক্যারিশমার জোরে নয়, নিজের যোগ্যতার বলে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং দীর্ঘকাল তিনি ক্ষমতায় থাকবেন। দলের ভেতরে বসে যারা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছিলো, এমনকি তার এক সময়ের ‘পেট্রন’ কামরাজও অল্প সময়ের মধ্যে দল ছেড়ে যেতে বাধ্য হন। তখন তার এককালের ক্রিটিকরাই বলতে শুরু করেন “ঝযব রং ধ ষবধফবৎ নু যবৎ ড়হি ৎরমযঃ” (নিজের যোগ্যতার বলেই তিনি আজ একজন নেত্রী)।

আজ ২৮ সেপ্টেম্বর। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ৭০তম জন্মদিন। তিন দশকের বেশি বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটির নেত্রীপদে তিনি আছে এবং তিন তিনবার নির্বাচিত হয়েছেন দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে। এখনো প্রধানমন্ত্রী পদে আছেন। দল এবং সরকার দুই-ই শক্তহাতে পরিচালনা করছেন। ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে এখানেই তার মিল। আশির দশকে যখন তিনি হালভাঙা আওয়ামী লীগের হাল ধরেছিলেন, তখন সকলেই ভেবেছিলেন, তিনি দলের নেতা হয়েছেন বঙ্গবন্ধু কন্যা হওয়ার সুবাদে। দলটা সংগঠিত হলেই তাকে সরে যেতে হবে। কোনো প্রবীণ নেতা দলের হাল ধরবেন।

যখন সামরিক শাসনের শেষে বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচনের হাওয়া বইলো, তখনো অনেকে প্রকাশ্যেই বলেছেন, শেখ হাসিনাকে নেতার পদে রেখে আওয়ামী লীগ কখনো নির্বাচনে জয়ী হতে পারবে না। আন-ইলেক্ট্রেবল পার্টি হিসেবে থেকে যাবে। আওয়ামী লীগ এখন সংগঠিত হয়েছে। শেখ হাসিনার উচিত ড. কামাল হোসেন বা অনুরূপ কোনো যোগ্য নেতার হাতে নেতৃত্ব ছেড়ে দিয়ে সরে যাওয়া। তিনি স্বেচ্ছায় সরে না গেলে ড. কামাল হোসেনকেই হয় তো ভারতের কামরাজের ভূমিকা নিয়ে হাসিনাকে সরিয়ে দলকে নির্বাচনে জেতানোর এবং নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার চেষ্টা করতে হবে।

ড. কামাল এই চেষ্টা চালানোর আগেই শেখ হাসিনা তাকে দেশের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সুযোগ দেন। ড. কামাল বিএনপির প্রার্থী বিচারপতি সাত্তারের কাছে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হন। তারপর ১৯৮৬ সালের নির্বাচনের পর দলের পরাজয়ের দায়িত্ব হাসিনার কাঁধে চাপিয়ে তাকে নেতৃত্বের পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। কামরাজের মতোই তিনি ব্যর্থ হন এবং দল ছেড়ে দেন। তারপরও হাসিনা-নেতৃত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র কম হয়নি। দলের ভেতরে একশ্রেণীর প্রবীণ নেতা কখনো জোট বেঁধে কখনো সেনাশাসকদের পৃষ্ঠপোষকতায় ‘সংস্কারপন্থী’ সেজে তাকে দলের নেত্রীর পদ থেকে সরানোর চেষ্টা করেছেন। আবার বাইরে থেকেও বহুবার চেষ্টা হয়েছে তার প্রাণনাশের। তাকে বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোরও চেষ্টা হয়েছে। ইন্দিরা গান্ধীকেও এতো বাধা ও চক্রান্ত অতিক্রম করতে হয়নি।

এখন শেখ হাসিনার অনেক চরম সমালোচকও স্বীকার করেন, ঝযব রং ধ ষবধফবৎ নু যবৎ ড়হি ৎরমযঃ (নিজের যোগ্যতার বলেই তিনি আজ নেত্রী)। বঙ্গবন্ধুর কন্যা হওয়ার ক্যারিশমা বহন করে তিনি হয় তো রাজনীতিতে এসেছিলেন; কিন্তু গত তিন দশকেরও বেশি সময় দেশের রাজনীতিতে নিজের অধিষ্ঠান অক্ষুন্ন রেখে তিনি প্রমাণ করেছেন, পিতার ক্যারিশমা অতিক্রম করে তিনি আজ নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতার বলেই জননেত্রী। বাংলাদেশে তিনি এখন তার চাইতে বয়সে বড়, বিদ্যাবুদ্ধিতে বড় অনেক নেতার মাথা ছাপিয়ে উঠেছেন। তার সমকক্ষ কোনো নেতা এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আর কেউ নেই এ কথা লিখতে দ্বিধাবোধ করি না।

শেখ হাসিনাকে আমি তার কৈশোরকাল থেকে দেখছি। বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির উত্তরাধিকার তার কাঁধে বর্তাবে এটা কোনোদিন ভাবিনি। আমার চোখের সামনে ধ ষবধফবৎ রহ সধশরহম একজন নেত্রীর জন্ম হচ্ছে এও কোনোদিন ভাবিনি। ভেবেছি, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার হয়তো তার কোন ছেলের কাঁধে বর্তাবে, নয়তো তার ভাগ্নে শেখ ফজলুল হক মনিতো আছেনই। কিন্তু মাঝে মাঝে শেখ হাসিনার মধ্যে পিতার দুর্জয় সাহস, ত্যাগ ও প্রতিজ্ঞার ভাব দেখে মনে হতো হাসিনা বঙ্গবন্ধুর পুত্রসন্তান হয়ে জন্মালেই সম্ভবত ভালো হতো। আজ সে কথা ভেবে লজ্জা পাচ্ছি। কারণ, আমার চোখের সামনে গোল্ডা মেয়ার, ইন্দিরা গান্ধী, ইভা পেরনের দৃষ্টান্ত থাকতে আমি কেন ভাবতে পারিনি, শেখ হাসিনা নারী হয়ে জন্মালেও ভবিষ্যতে পুরুষ রাজনৈতিক নেতার চাইতেও অধিক যোগ্যতা ও দক্ষতা দেখাতে পারবেন? বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের পর যখন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বহীন; দলটি প্রায় বিলুপ্ত হওয়ার মুখে, স্বদেশে অধিকাংশ নেতা হয় জেলে অথবা আত্মগোপন করেছেন, ড. কামাল হোসেন বিদেশে নিষ্ক্রিয়, তখন বাংলাদেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছিলেন লন্ডনের বাংলাদেশীরা। এ সময় বঙ্গবন্ধু-পরিবারের সদস্য মমিতুল হক (খোকা মিয়া) আমাকে বলেন, শেখ হাসিনা শীঘ্রই দেশে যাবেন এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করবেন।

আমি তাকে বলেছি, শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতা হবেন, তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু দলটি কখনো ক্ষমতায় গেলে প্রধানমন্ত্রী হবেন কে? প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো নেতা কই আর দলে? খোকা মিয়া সহজকণ্ঠে বলেছেন, কেন, শেখ হাসিনা হবেন? আমি অবিশ্বাসভরা চোখে তার দিকে তাকিয়েছি, শেখ হাসিনা দেশের প্রধানমন্ত্রী হবেন? এটা কি সম্ভব?

কয়েক বছরের মধ্যে শেখ হাসিনা আমার মনের এই অবিশ্বাসটি ভেঙ্গে দিয়েছেন। মনের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব দূর করেছেন। দলের নেতৃত্ব গ্রহণের অল্পদিনের মধ্যে ভাঙা দলকে খাড়া করেছেন। ইন্দিরা গান্ধী কংগ্রেসের ঐক্য রক্ষা করতে পারেননি। তার দল আদি কংগ্রেস ও ইন্দিরা কংগ্রেস; এই দুই নামে ভাগ হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকেও ভাগ করার চেষ্টা হয়েছিল। প্রথমে একজন প্রবীণ নেতা হাসিনা-নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক কর্মী ও নেতাসহ দল থেকে বেরিয়ে গিয়ে বাকশাল পুনর্গঠন করেছিলেন। অল্পদিনের মধ্যে সেই নেতা দলে ফিরে এসে শেখ হাসিনার সরকারে মন্ত্রিত্ব গ্রহণ করেছিলেন। ড. কামাল হোসেন, কাদের সিদ্দিকীও বিদ্রোহী হয়ে নতুন দল গঠন করে আওয়ামী লীগ ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন, পারেননি। আওয়ামী লীগ এখনো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে অখণ্ড ও অবিভাজ্য।

তার সবচাইতে বড় কৃতিত্ব, ড. কামাল হোসেন, আবদুর রাজ্জাকের মতো নেতারা আওয়ামী লীগ ত্যাগ করার পর যারা বলেছিলেন, দলটি নির্বাচন-অযোগ্য (ঁহবষবপঃধনষব) হয়ে গেছে, আর কোনোদিন নির্বাচনে জয়ী হবে না, তাদের কথা তিনি মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। তার নেতৃত্বেই দলটি তিন তিনবার ক্ষমতায় এসেছে এবং এখনো তিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী। তার আমলে দেশের মঙ্গা দূর হয়েছে, খাদ্যভাব দূর হয়েছে। দারিদ্র্য দূর হওয়ার পথে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি সারা বিশ্বের প্রশংসা কুড়িয়েছে। তিনি বিশ্বব্যাংকের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে পদ্মা সেতু পরিকল্পনা বাস্তবায়নে হাত দিয়েছেন। প্রাথমিক স্তরে তিন কোটি শিশুর হাতে বিনামূলে পাঠ্যপুস্তক পৌঁছে দেয়ার ব্যবস্থা করেছেন। মাধ্যমিক স্তরেও নারীশিক্ষা অবৈতনিক করেছেন। মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর ঘাতক ও একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান করেছেন।

যে সন্ত্রাসের আজ বিশ্বব্যাপী বিস্তার ঘটেছে, বাংলাদেশে তিনি তাকে একাকী মোকাবেলা করছেন। যে সন্ত্রাস আফগানিস্তান ও পাকিস্তানকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে, বাংলাদেশে তিনি তাকে মাথা তুলতে দেননি। বাংলাদেশে এতোকাল যারা গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে শোরগোল করেছেন, তাদের অনেকে এখন স্বীকার করছেন, শেখ হাসিনা ছাড়া বাংলাদেশে বিএনপি-জামায়াতের থাবা থেকে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার টেকাতে পারতো না। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ড হতো না। বাংলাদেশকে সন্ত্রাস জর্জড়িত আধা তালেবান রাষ্ট্র হওয়া থেকে কেউ রক্ষা করতে পারতো না।

বাংলাদেশের এখনো অনেক সমস্যা আছে। ব্যাপক দুর্নীতি আছে। নব্যধনীদের অনাচার ও লুণ্ঠন আছে। তবু চারদিকে ওঁৎ পাতা শত্রুদের ভয়াবহ ষড়যন্ত্র একটার পর একটা ব্যর্থ করে শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে আজ যেখানে এনে দাঁড় করিয়েছেন, সেটা কি আর কোনো নেতা বা দলের নেতৃত্বে গঠিত সরকারের দ্বারা সম্ভব হতো? দেশের অধিকাংশ মানুষের মতে তা সম্ভব হতো না। এই অসম্ভবটিই সম্ভব করেছেন শেখ হাসিনা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। তাই তিনি আজ শুধু একজন লিডার নন, একজন স্টেটসম্যান হিসেবে বিশ্বময় স্বীকৃত। ভারত যেমন তার বন্ধু, তেমনি বন্ধু চীনও। আমেরিকা এবং সৌদি আরবও আর আগের মতো বৈরী নয়। দেশের ভেতরে যে কুইসলিংয়ের দল বিদেশী সাহায্যে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে হটাবেন ভেবে অপেক্ষা করছিলেন তারাও আজ হতাশ। তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ।

জাতীয় রাজনীতির সাফল্যের মতো আন্তর্জাতীয় রাজনীতিতেও শেখ হাসিনার সাফল্য চোখে পড়ার মতো। কেউ কেউ তাকে বঙ্গকন্যা বলে অভিহিত করেন। আমি বলি বঙ্গোপসাগর-কন্যা। তিনি এখন সারা দক্ষিণ এশিয়ারই একজন নেতা। ৭০তম জন্মদিনে আমি তার দীর্ঘ জীবন কামনা করি এবং বাংলাদেশে তার নেতৃত্বের একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠা দেখে যেতে চাই। জয়তু হাসিনা।

লন্ডন ২৭ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার ২০১৬।

প্রকাশিত : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment