দশ দিগন্তে

একটি মৃত্যু, একটি জন্মদিন এবং একটি দলের বিলম্বিত শোক

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

symble

বহুকাল আগে সংবাদপত্রের পাতায় দেখা একটা ছবির কথা এখন বার বার মনে পড়ছে। মৃত্যুশয্যায় শায়িত কবি শামসুর রাহমান। আরেক কবি সৈয়দ শামসুল হক তার হাত ধরে বিষণ্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। আরো একটি ঘটনার কথা (ছবি নয়) মনে পড়ে। আমার আশিতম জন্মদিবসে ঢাকায় ছিলাম। আমাকে সংবর্ধনা দানের একটা আয়োজন করা হয়েছিল। সভাগৃহে ঢুকতে যাব, দেখি প্রবেশপথের মুখেই সৈয়দ হক দাঁড়িয়ে আছেন। আমার হাত জড়িয়ে ধরে বললেন, বান্ধব, চলো। তাকে নিয়ে সভায় ঢুকেছি। মঞ্চে উঠেছি।

এরকম আরো অনেক ঘটনার কথা মনে পড়ে। ছায়াছবির মতো মনে ভেসে উঠছে। লন্ডনে তিনি এলেই টেলিফোন পেতাম, বন্ধু, কেমন আছো, কখন দেখা হবে? আমার বাসার কাছেই হ্যারোতে ছিল তার ছেলের বাসা। সে বাসাতেই উঠতেন। সঙ্গে স্ত্রী আনোয়ারা হক। আমরা কখনো আমার বাসায় অথবা হ্যারো অন দা হিলের একটা কাফেতে বসতাম। গল্প করতে করতে কখনো মাঝরাত হয়ে যেত। আমাকে নাইট বাসে তুলে দেওয়ার জন্য দু’জনেই এসে বাসস্ট্যান্ডে অপেক্ষা করতেন। আমাকে বাসে তুলে না দিয়ে যেতেন না।

লন্ডনে সৈয়দ হকের সঙ্গে আড্ডা দিতে বসে ঢাকায় পঞ্চাশের দশকের সওগাত অফিসের সেই নিত্যকার জমাট আড্ডার কথা মনে পড়তো। সেই আড্ডাও আজ নেই, সেই আড্ডার মানুষেরাও আজ নেই। কোথায় তারা মিলিয়ে গেলেন? আলাউদ্দীন আল আজাদ, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, খালেদ চৌধুরী, ফজলে লোহানী, তাসিকুল আলম খাঁ, আবদুল গনি হাজারী, সরদার জয়েনউদ্দীন—পঞ্চাশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সব উজ্জ্বল নক্ষত্র কোথায় তারা একে একে মিলিয়ে গেলেন? সবশেষে গেলেন সৈয়দ শামসুল হক। আমার ঝগড়া বিবাদ করার মতো একজন মিত্রও আর রইল না। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় তাই বলতে হয়-“দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ।”

সৈয়দ হকের সঙ্গে শেষ বিদায়ের ঘটনাগুলোও মনে পড়ছে। তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সার রোগের চিকিত্সার জন্য লন্ডনে এসেছেন। ক্যামোথেরাপি গ্রহণের জন্য নিয়মিত হাসপাতালে যান। থাকেন হ্যারোতে তার শ্যালিকার বাসায়। সঙ্গে লেখিকা স্ত্রী আনোয়ারা সৈয়দ হক। আনোয়ারা প্রায়ই টেলিফোন করতেন। বলতেন, হক আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। কখনো বলতেন, দেখা করতে চায়। আপনি আমাদের বাসায় চলে আসুন।

একদিন জানলাম, সৈয়দ হক সস্ত্রীক আমার বাসায় সারাটি দিন কাটাতে চান। আমি বিব্রত হলাম। রান্নাবান্না কে করবে? আমার স্ত্রী প্রয়াত। আমাকে বিপদমুক্ত করলেন লোকমান হোসেন এবং মোহাম্মদ আজিজ। দু’জনেই সৈয়দ হকের ভক্ত। শেষ সময়ে লন্ডনে তার সেবাযত্ন করেছেন। তারা হকের পছন্দ অনুযায়ী ডাল, ভাত, ইলিশ ভাজা, মুরগি, নানারকম ভর্তা ইত্যাদি ডেকচি বোঝাই করে নিয়ে এলেন। রোগক্লিস্ট সৈয়দ হকের মুখে কিছুই রোচে না। তবু দেখলাম, আয়েশ করে খাচ্ছেন।

সেদিন মৃত্যু নিয়ে কথা হলো। দুজনেই আশি পেরিয়েছি। মৃত্যু যেকোনো মুহূর্তে নোটিস দিতে পারে। সৈয়দ হককে তো দিয়েই বসেছে। তবু বললেন, “এখন মৃত্যু হলে আমার দুঃখ নেই। কেবল ইচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর জন্মশত বার্ষিকী পালনের উত্সবটা যেন দেখে যেতে পারি।” বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার যৌবনকাল থেকে নিষ্ঠার কথা আমি জানি। একটাই কারণ, সৈয়দ হক মনে করতেন, বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা; যিনি বাঙালিকে বাঙালিত্ব ফিরিয়ে দিয়েছেন। একই কারণে তিনি শেখ হাসিনারও অনুরাগী। তার মতে, বাঙালির বাঙালিত্ব রক্ষায় এখন একমাত্র সাহসী সৈনিক শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের মানুষ যদি বাঙালিত্ব হারায়, তাহলে নিজের সাহিত্য সংস্কৃতিসহ বাঙালি তার জাতিসত্তা হারাবে।

সম্ভবত এই কারণেই তিনি মৃত্যুশয্যায় শুয়েও শেখ হাসিনার এবারের জন্মদিন উপলক্ষে গান রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে কোনো দলগত আনুগত্য ছিল না, ছিল অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতিসত্তা ও তার প্রতিনিধিদের প্রতি আনুগত্য। এখানে নিজের একটি বক্তব্যের বিশ্লেষণ করছি। ঢাকায় অন্য একটি দৈনিকে সৈয়দ হক সম্পর্কে লিখতে গিয়ে আমি লিখেছি, তার মৃত্যুতে বিএনপি শোক প্রকাশ করেনি এবং তার জানাজাতেও তাদের কোনো নেতা-নেত্রী অংশ গ্রহণ করেননি। এখন জেনেছি, কবিকে কুড়িগ্রামে সমাহিত করার পর বিএনপি একটি দায়সারা গোছের বিবৃতিতে শোক প্রকাশ করেছে। সন্দেহ নেই এই দায়সারা গোছের বিবৃতি দেওয়ার কারণ, দলের এক প্রবীণ উপদেষ্টা দলকে ভর্ত্সনা করে বলেছেন, সৈয়দ হকের মতো দেশের একজন প্রধান কবির মৃত্যুতে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন না করা বিএনপির উচিত হয়নি। এই ভর্ত্সনা শুনেই বিএনপির এই বিলম্বিত বোধোদয়।

তবে সৈয়দ হক সম্পর্কে আমার আরেকটি লেখায় একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল আছে। নাট্য ও চিত্র পরিচালক নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুসহ লন্ডনে চিকিত্সাধীন সৈয়দ হককে দেখার জন্য আমরা কয়েকজন তার হ্যারোর বাসায় গিয়েছিলাম। সেখানে নাসিরউদ্দিন বাচ্চুকে সৈয়দ হক বলেছিলেন, আমার শেষ নাটকটি মঞ্চস্থ করার ভার তোমাকে দিয়ে যাব। হ্যামলেটের বাংলা রূপান্তরটি আমি অন্য আরেকজনকে দিয়েছি। আমার শোনার ভুলে কথাটা হয়ে গেছে, তোমাকে হ্যামলেট নাটকটি দিয়ে যাব। এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য পাঠকদের কাছে ক্ষমা চাই।

আগের কথায় ফিরে যাই। বঙ্গবন্ধুর জীবনের উপর সৈয়দ হক একটা ডকুমেন্টারি তৈরি করে গেছেন। তার ইচ্ছে ছিল, বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তিনি একটি কাব্য-নাটিকা লিখবেন। ক্যান্সার রোগে মৃত্যু নিশ্চিত জানার পর আশা প্রকাশ করেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকীর উত্সব তিনি দেখে যাবেন। তার সেই আশা পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার ৬৯তম জন্মদিন উপলক্ষে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে তিনি একটি গান লিখে গেছেন। এটি গত ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্মদিনের উত্সবে গীত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগের দিন সৈয়দ হকের মৃত্যু হওয়ায় শেখ হাসিনার নির্দেশে তার জন্মোত্সবের বিশাল আয়োজন বাতিল করা হয়।

এটা কাকতালীয় ব্যাপার কিনা জানি না। শেখ হাসিনার জন্মদিন ২৮ সেপ্টেম্বর। আগের দিন ২৭ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বিকালে সৈয়দ হক শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন শুধু দেশে নয়, বিদেশেও বিশালভাবে শেখ হাসিনার জন্মোত্সব পালনের আয়োজন করা হয়েছিল। তা শেখ হাসিনার নির্দেশেই বাতিল করা হয়। এই প্রজ্ঞা ও মহানুভবতার কোনো তুলনা হয় না। এই জন্মদিন পালিত হলে শেখ হাসিনা যে মহত্ত্ব অর্জন করতেন, তার চেয়ে অনেক বেশি মহত্ত্ব অর্জন করেছেন এই উত্সব বাতিল করে। দেশের মানুষের কাছে তার ভাবমূর্তি আরো বেড়েছে।

এখানেই মানসিকতা ও হৃদয়বৃত্তির পার্থক্য। শেখ হাসিনা দেশের একজন প্রধান কবির মৃত্যুতে সার্বজনীনভাবে আয়োজিত বিশাল জন্মদিনের উত্সব বাতিল করেছেন। আর বিএনপি-নেত্রী খালেদা জিয়া জাতির পিতার মৃত্যুদিবসকে তার বানানো জন্মতারিখ ঘোষণা করে বিশাল কেক কেটে এতোদিন জন্মদিন পালন করেছেন। এই নকল জন্মদিন পালন করে তিনি নিজেকেই ছোট করেছেন।

এবার যদি শেখ হাসিনার জন্মদিনের উত্সবটি পালিত হতো, তাহলে তার বৈশিষ্ট্য সকলের চোখেই ধরা পড়তো। এবার ঢাকায় তার জন্মদিন পালনের বড় আয়োজনটি করা হয়েছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের বাইরের বহু বড় বড় সাংস্কৃতিক ও সামাজিক সংগঠনের দ্বারা। আওয়ামী লীগের আয়োজনতো ছিলই। এক কথায় দলীয় নেত্রীর পর্যায় থেকে শেখ হাসিনা যে জাতীয় নেত্রীর পর্যায়ে উঠে গেছেন এই আয়োজন তারই প্রমাণ। একমাত্র জামায়াত ও বিএনপি’র ঘরানার লোকজন ছাড়া দেশের প্রগতিশীল অধিকাংশ দলমতের বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী সাহিত্যিকেরা সম্মিলিত হয়েছিলেন এই জন্মদিনের উত্সব পালনের আয়োজনে। অনুষ্ঠান হয়নি। কিন্তু এই আয়োজনের সার্বজনীন বৈশিষ্ট্য দেশের মানুষের মনে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত।

এই বৈশিষ্ট্য হলো শেখ হাসিনার নেতৃত্ব এখন কেবল দলীয়ভাবে নয়, জাতীয় ভাবে স্বীকৃত। শেখ হাসিনা এখন বাংলাদেশের জাতীয় নেত্রী, একথাটা বলা হলে অত্যুক্তি করা হয় না। নিজের যোগ্যতা ও ব্যক্তিত্বের গুণেই শেখ হাসিনা এই নেতৃত্ব বাংলাদেশে অর্জন করেছেন; যেমন ভারতে অর্জন করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী এবং ইসরায়েলে অর্জন করেছিলেন গোল্ডা মেয়ার। বাংলাদেশের শেখ হাসিনার চাইতেও বড় নেতা এবং জ্ঞানী গুণী মানুষ আছেন। কিন্তু জাতীয় নেতা হওয়ার যে সাহস ও ক্যারিশমা কোনোটাই তারা জাতির সামনে তুলে ধরতে পারেননি।

জাতিকে জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ করার জন্য সৈয়দ হক একটা মন্ত্র উচ্চারণ করেছিলেন—“জাগো বাহে কুনঠে সবাই।” শেখ হাসিনার পেছনে এই ঐক্যবদ্ধ জাতির সমর্থন দরকার। তার সরকারের অনেক ভুল আছে, স্খলন পতন আছে। কিন্তু একথা সত্য, হাসিনা-নেতৃত্বের অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশ হয়তো এতোদিনে আধা তালেবান রাষ্ট্র হয়ে যেত। গণতন্ত্র ও মানবতা ধূলায় লুণ্ঠিত হতো। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতির অস্তিত্ব বিপন্ন হতো। এক কথায় বাঙালির বাঙালিত্ব আবার সর্বনাশের থাবায় পড়ে যেত।

বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ক্রান্তিকাল। এই ক্রান্তিকাল সাফল্যের সঙ্গে অতিক্রমের জন্য চাই সাহসী রাজনৈতিক আন্দোলনের পাশাপাশি সাহসী সাংস্কৃতিক আন্দোলন। পঞ্চাশের দশকের বাংলাদেশে যে সাহসী সাংস্কৃতিক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তার একজন পথিকৃত্ ছিলেন সৈয়দ শামসুল হকও। শেখ হাসিনা তার জন্মদিনের উত্সব বাতিল করে সেই পথিকৃতের প্রতিই আসলে সম্মান দেখালেন। একজন কালোত্তীর্ণ লেখকের মৃত্যুর শোক ও বেদনা তাই জাতীয় নেত্রীর উত্সববিহীন জন্মদিনকে আরো মহত্ত্ব ও গরিমা দিয়েছে; তাকে ক্ষুণ্ন করেনি। – ইত্তেফাক

লন্ডন, ১ অক্টোবর, শনিবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment