প্ল্যাটফরম থেকে পার্টি এবং পার্টি থেকে প্ল্যাটফরম

 

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

agc-0

বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের মতো এককালে ছিল একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম, কেবল রাজনৈতিক পার্টি নয়। এখন অবশ্য তা নয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার আগে কংগ্রেসে শুধু ডান বাম মধ্য বামদেরই সমাবেশ ঘটেনি, চরম প্রগতিশীল ও চরম প্রতিক্রিয়াশীলদেরও সম্মিলন তাতে ঘটেছিল। ভারতের সোস্যালিস্ট পার্টি, এমনকি অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টিও অল ইন্ডিয়া ন্যাশনাল কংগ্রেসের এফিলিয়েটেড পার্টি ছিল। তখন একটি মাত্র লক্ষ্যে ভারতের সকল দল (একমাত্র হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগসহ কিছু ছোট দল ছাড়া) কংগ্রেসের প্ল্যাটফরমে ঐক্যবদ্ধ ছিল, লক্ষ্য ছিল ভারতের স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার পর বিভিন্ন দল তাদের ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচী নিয়ে কংগ্রেস থেকে আলাদা হয়ে যায়। কম্যুনিস্ট পার্টি আলদা হতে চায়নি। কিন্তু ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলনের সময়ে কম্যুনিস্ট পার্টির ভূমিকার জন্য নেহরু কমিশন (জওয়াহের লাল নেহরুর নেতৃত্বে গঠিত) কম্যুনিস্ট পার্টিকে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেন। কম্যুনিস্ট পার্টির পক্ষ থেকে ড. গোবিন্দ অধিকারী এই সুপারিশ পুনর্বিবেচনার জন্য কংগ্রেসের কাছে আবেদন জানিয়েছিলেন। কংগ্রেস তা অগ্রাহ্য করে। প-িত নেহরু ঘোষণা করেন, ‘কংগ্রেস এখন থেকে একটি রাজনৈতিক পার্টি, আর রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম নয়। কংগ্রেস তার নিজস্ব কর্মসূচী নিয়ে এখন থেকে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়াবে।’

পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ ভারতের কংগ্রেসের মতো একটি ঘোষিত রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম হয়নি; কিন্তু এই দলে ডান বাম, প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল সকল মতের (জামায়াত ও মুসলিম লীগপন্থীরা ছাড়া) মানুষ এসে ভিড় জমিয়েছিল। পাকিস্তানে অবিভক্ত কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এই দলের নেতা-কর্মীদের এক বিরাট অংশ আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। আওয়ামী লীগ বাস্তবে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়। এই প্ল্যাটফরমের লক্ষ্য ছিল মূলত: স্বাধীন ও ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা।

এই লক্ষ্যটি অর্জিত হওয়ার পর অবশ্য আওয়ামী লীগের এই রাজনৈতিক প্ল্যাটফরমের চরিত্রটি আর বজায় থাকেনি। বাম রাজনীতির একটা অংশ স্বাধীনতার আগেই আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা অবশ্য জনবিচ্ছিন্নই হয়ে গিয়েছিলেন। দেশের রাজনীতিতে তাদের অস্তিত্ব এখন দূরবীণ দিয়ে খুঁজতে হয়। নেহরুর মতো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঘোষণা করেননি যে, আওয়ামী লীগ আর রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম নয়, বরং একটি রাজনৈতিক পার্টি। কিন্তু দেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় তিনি আওয়ামী লীগকে নিয়ে এককভাবে নির্বাচন করেন। এবং এককভাবে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে।

নিজের দল নিয়ে সরকার গঠন করলেও বঙ্গবন্ধু সদ্য অর্জিত স্বাধীনতা এবং ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রীয় কাঠামো রক্ষা করার লক্ষ্যে একা পথ চলতে চাননি। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী অন্য দুটি প্রধান দল কম্যুনিস্ট পার্টি ও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (মোজাফফর)সহ একটি রাজনৈতিক মোর্চা গঠন করেছিলেন। তার নাম ছিল গণঐক্য জোট। এই ঐক্যজোটেরই সম্প্রসারিত রূপ বাকশাল। এটি একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা নয়। তিনি নিজের দলেরও স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী প্রধান দলগুলো নিয়ে এই মোর্চা গঠন করেছিলেন। লক্ষ্য ছিল প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বাধীনতাবিরোধীদের সম্মিলিত চক্রান্ত থেকে স্বাধীনতা এবং তার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র রক্ষা করা।

বঙ্গবন্ধুর পর তার কন্যা শেখ হাসিনা দীর্ঘ একুশ বছর পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে একক সরকার গঠনের চেষ্টা করেননি। দেশের স্বাধীনতার শত্রুরা যে কতটা পরাক্রান্ত এবং তাদের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চক্রের যোগসাজশ কতটা শক্তিশালী তা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন। তাই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠন করেছিলেন ঐকমত্যের সরকার। তার বর্তমান সরকারও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত মহাজোট সরকার। তার এই সরকারে ডানপন্থী এবং বামপন্থী দু’ধরনের দলই আছে। আছেন মধ্যপন্থীরাও। ফলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বিএনপির বর্জন করায় যারা এই মহাজোট সরকারের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা জেগে ঘুমানোর ভান করেন। বাস্তবতাকে মেনে নিতে চান না। এই বাস্তবতা হলো, গত সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বা মহাজোট ক্ষমতায় না এলে বাংলাদেশের গণসমাজকে তালেবানি দাপট থেকে রক্ষা করা যেত না।

এই রাজনৈতিক পটভূমিতে আওয়ামী লীগের এবারের কুড়িতম জাতীয় সম্মেলন একটি অভূতপূর্ব ঘটনা। বলা চলে এমনটি আগে কখনও ঘটেনি। শুধু সকল দলমতের মানুষ এই সম্মেলনে ভিড় জমায়নি; পৃথিবীর ছোট-বড় অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিরা এই সম্মেলনে এসেছেন। এসেছেন দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল দেশের গণ্যমান্য প্রতিনিধিরা। তাদের অধিকাংশই হাসিনা-নেতৃত্ব সম্পর্কে একবাক্যে বলেছেন, “আপনি শুধু বাংলাদেশের নেতা নন, সারা দক্ষিণ এশিয়ারই একজন নেতা।”

এটা সত্য, শেখ হাসিনা এখন শুধু একজন পলিটিশিয়ান নন, তিনি একজন স্টেটসম্যানও। দেশের রাজনীতিতে বহু আকাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আনয়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিশ্ব স্বীকৃত সাফল্য অর্জন করে তার নেতৃত্ব আজ একটি ইনস্টিটিউশনে পরিণত হয়েছে। এখন দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে তার নেতৃত্বের প্রভাব স্পষ্ট। তিনিই এই প্রতিষ্ঠা নিজের যোগ্যতায় অর্জন করেন। এখন তিনি নিজের আলোকেই আলোকিত। এখানে একটি ভয়ের কথা এই যে, আওয়ামী লীগ একটি ৬৭ বছরের প্রাচীন এবং ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক সংগঠন এবং এককালের জাতীয় রাজনীতির প্ল্যাটফরম হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে একমাত্র-হাসিনা নেতৃত্ব ছাড়া তার আর কোন বড় মূলধন নেই।

দলটিতে সুযোগ সন্ধানী, সুবিধাবাদীদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবং দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। এই অবস্থা দল এবং হাসিনা-নেতৃত্ব দুয়ের জন্যই কল্যাণকর নয়। ভরসার কথা, শেখ হাসিনা এই অবস্থা সম্পর্কে সচেতন এবং এবারের সম্মেলনে দলের নেতা ও কর্মীদের কাছে তিনি অত্যন্ত জোর দিয়ে বলেছেন, ‘আত্মসংশোধন করুন, জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ান। আগামী নির্বাচনেও জয়ী হওয়ার জন্য দলকে প্রস্তুত করুন।’ এই প্রস্তুতির লক্ষ্যে তিনি দলের মহাসচিব পদে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন, প্রেসিডিয়ামে কিছু নতুন মুখ এনেছেন এবং দলের সব কমিটি ও উপ-কমিটির সদস্যদের নাম ঘোষিত হলে দলকে কতটা ঢেলে সাজানোর প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে তাও বোঝা যাবে।

এটা আমার অত্যুক্তি নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় হাসিনা-নেতৃত্ব আজ যেমন স্বীকৃত সত্য, তেমনি আওয়ামী লীগকেও কেবল বাংলাদেশে নয়, গোটা দক্ষিণ এশিয়াতেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির একটি মোর্চা অথবা প্ল্যাটফরম হিসেবে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। এককালে যে চরিত্রটি ছিল ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের, আওয়ামী লীগ পুরোপুরি সেই চরিত্রে পৌঁছতে না পারুক, তাকে তার কাছাকাছি পৌঁছতে হবে। যদি দলটি তা পারে, তা হলে শুধু বাংলাদেশেই নয়, প্রতিবেশী দেশগুলোতেও গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান শক্তিশালী করার ব্যাপারে আওয়ামী লীগ সাহায্য যোগাতে পারবে।

একটি প্রাচীন জীর্ণ বটগাছের মতো এখন আওয়ামী লীগের অবস্থা। একে আবার তাজা করে তুলতে হলে গাছটির মরা ডালপাতা, যাতে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের ঘুণ ধরেছে, তা নির্মম হাতে ছেঁটে ফেলতে হবে। নতুন পাতা গজাবার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বর্তমানে দলটির অবস্থা যাই হোক, তার পুরনো প্লুরাল চরিত্রটি ফিরিয়ে আনতে হবে। এজন্য দলের ভেতরে যে সার্জিক্যাল অপারেশন দরকার, এ বারের সম্মেলনের পরিবেশ দেখে মনে হলো, শেখ হাসিনা সেই সার্জিক্যাল অপারেশনের জন্য প্রস্তুত। তবে তিনি রাতারাতি কিছু ঘটাবেন না। একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মতো তার চিকিৎসা হবে ধীর, কিন্তু সাফল্য নিশ্চিত।

এখন বাংলাদেশে শেখ হাসিনার মতো একজন অভিজ্ঞ ও দেশহিতৈষী নেত্রীর আরও কিছুকাল ক্ষমতায় থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন পুনর্গঠিত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের মতো একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক মোর্চার তার পেছনে শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ। কোন শক্তিশালী রাজনৈতিক মোর্চার সমর্থন ছাড়া কোন রাজনৈতিক সরকারের সাফল্য স্থায়ী হতে পারে না। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমার রাজনীতির অস্ত্র জনতার ঐক্য।’ শেখ হাসিনাও জনতার এই ঐক্যের জোরে দেশে সামরিক ও স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়েছেন। শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক চরিত্র ফিরিয়ে এনেছেন। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দ-দান করেছেন। সবচাইতে বড় কথা, যে জঙ্গীবাদ বিশ্বসন্ত্রাসের চেহারা ধারণ করে বাংলাদেশেও তার থাবা বিস্তারের চেষ্টা করেছিল তার নখর তিনি ভোঁতা করে দিয়েছেন।

নেতার এই সাফল্যকে ধরে রাখা, দেশের উন্নয়নের ফসল জনগণের দুয়ারে পৌঁছে দেয়া, সর্বোপরি স্বাধীনতার অপহৃত অর্জনগুলো পুনরুদ্ধার করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে আত্মশোধনপূর্বক পুনর্গঠিত ও শক্তিশালী হতে হবে। জনবিচ্ছিন্নতা দূর করতে হবে। স্বাধীনতা-পূর্বকালের মতো একটি রাজনৈতিক পার্টি থেকে জাতীয় প্ল্যাটফরমের অবস্থান আবার গ্রহণ করতে হবে। বর্তমান সম্মেলন থেকে আওয়ামী লীগের এই পুনর্জাগরণের এবং পার্টি থেকে প্ল্যাটফরমে রূপান্তরিত হওয়ার কাজটি যদি শুরু হয়, তাহলে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এবং আমাদের জাতীয় রাজনীতিতেও দলের এই কুড়িতম সম্মেলন একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ২৫ অক্টোবর, মঙ্গলবার, ২০১৬]

প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment