কালের আয়নায়

আত্মসন্তোষ সম্মেলনের সাফল্যকে ব্যর্থ করে দিতে পারে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

al

১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে নিখিল ভারত কংগ্রেসের একটি উদ্দীপনাময় সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে ব্রিটিশ রাজকে বলা হয় কুইট ইন্ডিয়া- ভারত ছাড়ো। নইলে আন্দোলন ও সংগ্রাম। এই সম্মেলন শেষে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরুকে এক মার্কিন সাংবাদিক বলেছিলেন, ‘আপনাদের সম্মেলন খুবই সফল হয়েছে। মনে হয় কংগ্রেস দলের এটা একটা ঐতিহাসিক সম্মেলন।’ নেহরু জবাবে বলেছিলেন, ‘সম্মেলন সফল হয়েছে সেটা বলা যাবে, সম্মেলনে আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি তা বাস্তবায়ন করা যাবে কি-না তার ওপর।’

আমার পাঠকদের অনেকেরই স্মরণ থাকতে পারে, এই সম্মেলন থেকে কংগ্রেস ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু করার পরই গান্ধী-নেহরু-আজাদ-প্যাটেলসহ কংগ্রেসের অধিকাংশ নেতাকর্মীকে জেলে ঢোকানো হয়। তবু সাধারণ নেতাকর্মীদের দ্বারাই ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন শুরু হয়। পাঁচ বছরের মাথায় ভারত উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। কংগ্রেসের এই আগস্ট (১৯৪২) সম্মেলন তাই একটি ঐতিহাসিক সম্মেলনের আখ্যা পেয়েছে।

গত সপ্তাহে ঢাকায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনটিকে একটি ঐতিহাসিক সম্মেলন আখ্যা দেওয়া যাবে কি-না তা নির্ভর করে এই সম্মেলন পরবর্তী দলটির কার্যক্রমের ওপর, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষমতার ওপর। এ কথা সত্য, আওয়ামী লীগের এবারের সম্মেলন জাতীয় রাজনীতির গণ্ডি ভেঙে আন্তর্জাতিক পরিধি লাভ করেছিল। আমেরিকা, রাশিয়া, ভারত, চীনসহ ছোট-বড় ১০টি দেশের নেতারা এসেছিলেন এ দেশে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশের প্রতিনিধিরা তো ছিলেনই; তারা সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশের উন্নয়ন এবং দক্ষিণ এশিয়ার নেতা হিসেবে শেখ হাসিনার প্রশংসা করেন।

এটা আওয়ামী লীগের জন্য একটা বড় পাওয়া। সম্মেলনে আগত বিদেশি অতিথিরা একবাক্যে বলেছেন, শেখ হাসিনা একজন ‘rare leader’- দুর্লভ নেতা। আওয়ামী লীগ যদি এই নেতার হাতে রাজনৈতিক শক্তি জোগানোর জন্য নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা, অনৈক্য ও কোন্দল দূর করতে পারে; সন্ত্রাস ও দুর্নীতির গডফাদারদের কবল থেকে দলকে মুক্ত করে জনগণের আস্থা ও সমর্থন লাভের অবস্থানটিতে ফিরে যেতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবারের অক্টোবর সম্মেলন অবিভক্ত ভারতে কংগ্রেসের বিয়াল্লিশের আগস্ট সম্মেলনের মতো ঐতিহাসিক গুরুত্ব পাবে।

১৯৪২ সালের কংগ্রেসের চেয়ে ২০১৬ সালের আওয়ামী লীগের সামনে দায়িত্ব অনেক বড় এবং কঠিন। কংগ্রেসের সামনে তখন সংগ্রাম ছিল একটি বিদেশি শক্তির বিরুদ্ধে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের সামনে যে সংগ্রাম অপেক্ষা করছে তা দেশি-বিদেশি দুই অপশক্তির বিরুদ্ধে। দলের অভ্যন্তরেও অপশক্তির অবস্থান রয়েছে। তারা একশ্রেণির নব্য ধনী। জনসাধারণের কাছে নব্য শোষক হিসেবে পরিচিত। বাইরের শত্রুদের আগে এই ‘enemy within’ বা ভেতরের শত্রু দমন করা হবে আওয়ামী লীগের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। এই কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করে জনগণের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর জন্য দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিয়েছেন শেখ হাসিনা এবারের সম্মেলনে। একমাত্র এই নির্দেশ পালন দ্বারাই দেশের এই বৃহত্তম রাজনৈতিক দলটি আবার তার পূর্বশক্তি লাভ করতে পারে।

আওয়ামী লীগ এখন যতই অসংগঠিত দল হোক, তার একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব রয়েছে। এবারের সম্মেলনে দলটি জাতীয় রাজনীতির পরিধি পেরিয়ে একটা আন্তর্জাতিকতার, বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় ভূরাজনীতিতে একটা বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবস্থানে গিয়ে পৌঁছেছে। দলে এসেছেন একজন কর্মদক্ষ, তরুণ নেতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে। তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে যার ভালো সংযোগ রয়েছে। এই অবস্থায় নেতৃত্ব এবং নীতির জোরেই জাতীয় রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আবার ঘুরে দাঁড়ানোর কথা। যদি দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারে, তাহলে ধর্মীয় সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও চক্রান্তের রাজনীতির ব্যূহ ভেদ করে গণতন্ত্র শক্ত মাটিতে দাঁড়াবে বাংলাদেশে। আওয়ামী লীগ সরকার উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় দেশে সুশাসনও প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

আওয়ামী লীগের ২০তম জাতীয় সম্মেলনটি সবেমাত্র শেষ হয়েছে। সুতরাং এখনই বলা চলবে না, হাসিনা-কাদের নেতৃত্ব দলটিকে দেশের জাতীয় রাজনীতিতে সর্বশ্রেষ্ঠ দলের অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে পারবে কি-না! তবে এই সম্মেলন সেই প্রত্যাশা জনমনে সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে। আমার শুধু একটাই ভয়, সবল নেতৃত্ব ও সুষ্ঠু নীতি থাকা সত্ত্বেও ভারতের কংগ্রেসের মতো বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ না আবার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার সুবাদে আত্মসন্তোষের কারণে এই সম্মেলনের সাফল্য ধরে রাখার ব্যাপারে ব্যর্থ হয়।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে জওহরলাল নেহেরু বলেছিলেন, ‘একটি বড় রাজনৈতিক দলে আত্মসন্তোষ একটি বড় রোগ। এই রোগে বিশ্বের বহু বড় রাজনৈতিক দলে বিপর্যয় ঘটেছে। এই রোগে যদি কংগ্রেস আক্রান্ত হয়, তাহলে সেদিন তার পতন ঘটবে।’ নেহরুর এই সতর্কবাণীটি বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের বেলাতেও সত্য। এই দলটি বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির সবচেয়ে বড় দল। এই দলের তখনই পতন ঘটেছে, যখন দলটির মধ্যে অনৈক্য ও আত্মসন্তোষ দানা বেঁধেছে। বর্তমানে দলটির মধ্যে এই দুটি রোগই বিরাজিত। এই রোগ দূর করার কাজে নবনির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের যদি গোড়াতেই সর্বশক্তি প্রয়োগ না করেন, তাহলে তিনি দায়িত্ব পালনে সফল হতে পারবেন না।

অধুনা আওয়ামী লীগের অনেক ছোট-বড় নেতার (এমনকি মন্ত্রীরও) মুখেই শুনি, তাদের প্রতিপক্ষ দল বিএনপি, এমনকি স্বাধীনতার শত্রু জামায়াতও শেষ হয়ে গেছে। কথাটা আমরাও অনেকে লিখে থাকি এবং বলে থাকি। আমাদের কথার অর্থ, বিএনপি এখন একটি অচল, স্থবির দল। তার নীতি ও নেতৃত্ব ব্যর্থ হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, বিএনপি, এমনকি জামায়াতেরও সংগঠন হিসেবে মৃত্যু হয়েছে। দল দুটির বর্তমান নিষ্ক্রিয়তা তাদের বিলুপ্ত হওয়ার আভাস দেয় না। বলা চলে, জনসমর্থনের অভাবে বিএনপি বর্তমানে নিষ্ক্রিয় থাকতে বাধ্য হলেও এটা তাদের এক ধরনের কৌশল। নতুনভাবে শক্তি সঞ্চয় করতে না পারলেও পুরনো শক্তিকে তারা ধরে রাখতে পেরেছে ভবিষ্যতে সুযোগমতো কাজে লাগানোর জন্য।

বিএনপির বর্তমান নিষ্ক্রিয়তায় আওয়ামী লীগের উল্লসিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। বরং সতর্ক হওয়ার কারণ আছে। শত্রুর শক্তিকে কখনোই ছোট করে দেখতে নেই। এটা চাণক্য বাক্য। ১৯৪৬ সালে অবিভক্ত বাংলায় সাধারণ নির্বাচনে শেরেবাংলা ফজলুল হকের দলকে সম্পূর্ণ হারিয়ে দিয়ে মুসলিম লীগ নেতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সদম্ভে ঘোষণা করেছিলেন- ‘ছেচল্লিশের নির্বাচন ফজলুল হকের জন্য ওয়াটারলুর যুদ্ধে নেপোলিয়নের পরাজয়ের মতো।’ অর্থাৎ ওয়াটারলুর যুদ্ধে হেরে গিয়ে নেপোলিয়ন যেমন আর মাথা তুলতে পারেননি, তেমনি ছেচল্লিশের নির্বাচনে হেরে গিয়ে ফজলুল হক আর কোনো দিন রাজনীতিতে মাথা তুলতে পারবেন না।

জিন্নাহর এই দম্ভোক্তি সত্য প্রমাণিত হয়নি। ‘৪৬ সালের নির্বাচনের মাত্র আট বছরের মাথায় ফজলুল হক তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিতে জনপ্রিয় নেতা হিসেবে আবার উঠে আসেন এবং ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে মুসলিম লীগকে বাংলার মাটি থেকে উৎখাত করেন। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যা করে যে ঘাতক শক্তি ভেবেছিল, বাংলাদেশের মাটি থেকে বঙ্গবন্ধুর পরিবার এবং তার দলকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হলো; তারা কি ভাবতে পেরেছিল, সেই বঙ্গবন্ধু পরিবারের এক নারী সদস্য (শেখ হাসিনা) গৃহবধূর ভূমিকা ছেড়ে রাজনীতিতে আসবেন এবং ঘাতকদের ফাঁসিকাষ্ঠে চড়াবেন? জামায়াতের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের সব আস্ফালন ধুলায় মিশিয়ে দেবেন?

বাংলাদেশে বিএনপি তো এখনও একটি রাজনৈতিক দল। দলটি নিষ্ক্রিয় হয়েছে। বিলুপ্ত হয়নি। মরা গাছে যদি আবার ফুল ধরে, মরা গাঙে যদি বান ডাকে, তাহলে বিএনপিও সুযোগ পেলে আবার খাড়া হতে পারে এবং আবার আঘাত হানতে পারে- এ কথাটি আওয়ামী লীগের নেতাদের, বিশেষ করে যারা বিএনপিকে কথায় কথায় তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করেন তাদের মনে রাখা উচিত। ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ অবশ্যই চেয়েছে বিএনপি ভেঙে যাক; প্রবীণ নেতারা তারেক রহমানের দৌরাত্ম্যে জোট বেঁধে দল ছাড়ূন। খালেদা-তারেকের নেতৃত্বের প্রতি ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট নেতারা পাল্টা দল গড়ূন। এর কোনোটাই হয়নি। প্রবীণ নেতারা জোট বেঁধে দল ছাড়েননি। দু’একজন দল ছেড়ে বেরিয়ে গিয়ে নতুন দল গঠন করেছিলেন। তারাই বরং দেশের রাজনীতিতে ‘হারাধনের একটি ছেলে’ হয়ে গেছেন। বিএনপি এখনও বড় সভা-সমাবেশ করে। প্রবীণ নেতারা নিষ্ক্রিয় রয়েছেন; দল ছাড়েননি।

এই বাস্তব পরিস্থিতি সামনে রেখেই বিএনপি ও জামায়াতকে রাজনীতির মাঠে সম্পূর্ণ পরাজিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগকে প্রস্তুত ও পুনর্গঠিত হতে হবে। প্রতিপক্ষ বিএনপিকে ছোট করে দেখার এবং নিজেদের অপরাজেয় ভাবার আত্মসন্তোষ ত্যাগ করতে হবে। নইলে খরগোশ ও কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতায় খরগোশের মতো আওয়ামী লীগেরও বিপর্যয় ঘটতে পারে। বর্তমানে বিএনপির নেতৃত্ব শুধু দুর্বল নয়, দলটি নীতিহীন দল হিসেবেও জনগণের কাছে পরিচিত। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে প্রমাণ করতে হবে- তাদের দলটির নেতৃত্বই শুধু শক্তিশালী নয়; দুর্নীতি, সন্ত্রাস, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক অবস্থানে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা ও আন্তরিকতাও তার আছে। এই ২০তম জাতীয় সম্মেলনের পর দেখা যাক, ফিনিক্স পাখির মতো আবার জেগে ওঠার শক্তি আওয়ামী লীগের আছে কি-না! – সমকাল

লন্ডন, ২৮ অক্টোবর শুক্রবার, ২০১৬

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment