বিএনপির ‘আনলাকি থারটিন’ প্রস্তাব

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

gaffar

বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া নতুন নির্বাচন কমিশন কিভাবে গঠিত হবে এবং সেই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কিভাবে আগামী নির্বাচন হবে সে সম্পর্কে সংবাদ সম্মেলনে তার দলের ১৩ দফা প্রস্তাব জানিয়েছেন। এই প্রস্তাবগুলো পাঠ করতে গিয়ে দেখি, একটি সুষ্ঠু নির্বাচন কমিশন গঠন এবং সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহ প্রকাশের আড়ালে বেগম জিয়া একাত্তরের যুদ্ধাপরাধী এবং অনিবন্ধিত রাজনৈতিক দল জামায়াতকে কিভাবে পেছনের দরোজা দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টাই বিশেষভাবে করেছেন।

এ সম্পর্কে ঢাকার আরেকটি দৈনিকে আমার কলামে গতকাল (মঙ্গলবার) বিশদভাবে আলোচনা করেছি। এখানে সে প্রসঙ্গ আর টানছি না। তার অন্য প্রস্তাবগুলোও দেশে গণতান্ত্রিক শাসনের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সাহায্য না করে তা নষ্ট করার কাজেই যে সহায়তা দিতে পারে, সেদিকেই আজ সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী বলে দাবি করব এবং সেইসঙ্গে গণতান্ত্রিক বিধি বিধান ও সংগঠনগুলো আপাতত যতই দুর্বল হোক, তাকে শক্তিশালী ও কার্যকর হতে দেব না, বরং সেগুলোর উপর সন্দেহ পোষণ করব তা কোন নেতা বা দলের গণতন্ত্রপ্রীতির পরিচায়ক নয়।

বেগম জিয়ার তেরো দফা ফর্মুলায় প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্রের উপর রীতিমতো অনাস্থা প্রকাশ করা হয়েছে এবং এমন ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়েছে, অতীতে একাধিকবার যে ব্যবস্থায় সুষ্ঠু নির্বাচন হয়নি বলে বেগম জিয়াও চেচামেচি করেছেন। তিনি কি স্মরণ করতে পারেন, প্রয়াত বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলীর নেতৃত্বে গঠিত নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে (দেশ-বিদেশের সকল মহলই বলেছেন, এটা ছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন) তার দল হেরে যাওয়ার পর তিনি সেই নির্বাচনের ফলও মেনে নিতে চাননি। বলেছেন, বিএনপির জয় ছিনতাই হয়ে গেছে।

আমেরিকার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বিএনপি-নেত্রীর একটা মিল দেখা যায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তিনি জয়ী না হলে নির্বাচনের ফল মেনে নেবেন না।

এমনকি নির্বাচনে হিলারি ভোট রিগিং করবেন বলেও অভিযোগ তুলেছিলেন। বাংলাদেশেও খালেদা জিয়ার কথাবার্তা শুনে মনে হয়েছে, তার দল নির্বাচনে জয়ী না হলে, তার মত অনুসারে নির্বাচন কমিশন গঠিত না হলে, তার পছন্দমতো নির্বাচন না হলে সেই নির্বাচন বৈধ নয় এবং তিনি তার ফল মেনে নিতে চান না। ১৯৯৬ সালের নির্বাচন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের ফলও তিনি মেনে নিতে চাননি। গত সাধারণ নির্বাচন নানা অজুহাতে বর্জন করে তিনি প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন এই নির্বাচন বৈধ ছিল না।

বর্তমান সরকারের আমলে বিভিন্ন মিউনিসিপ্যালিটি, সিটি কর্পোরেশন ও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করেছে এবং বহু এলাকায় জয়ীও হয়েছে। এই নির্বাচনগুলো মোটামুটি নিরপেক্ষ ও অবাধ হয়েছে। তবু বিএনপি নেত্রী অভিযোগ তুলেছেন- এসব নির্বাচনও অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। এবং এই অভিযোগের ভিত্তিতে বর্তমান সরকারের অধীনে আগামী সাধারণ নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হবে না বলে দাবি তুলে নিজের পছন্দমতো নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি তুলেছেন।

এমন দাবি সাধারণত কোন গণতান্ত্রিক দেশে তোলা হয় না। ধর্তব্যের মধ্যে নয় এমন কিছু কারচুপিও কোনো কোনো দেশের নির্বাচনে হয়। তা নিয়ে সাময়িক হৈচৈ হলেও গণতান্ত্রিক বিধি অনুযায়ী ক্ষমতাসীন দলের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠানে কেউ আপত্তি তোলে না। পশ্চিমবঙ্গে পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে জেলা পরিষদ পর্যন্ত নির্বাচন ক্ষমতাসীন তৃণমূল সরকারের অধীনে হয়েছে। বিরোধী সিপিএম ও অন্যান্য বাম দল বড় ধরনের মার খেয়েছে। তারা কোথাও কোথাও তৃণমূলের গুণ্ডামি ও ভোট কারসাজির অভিযোগ করেছেন, কিন্তু নির্বাচন থেকে সরে যাননি বা ভবিষ্যতে নির্বাচন বর্জনের হুমকি দেননি। বাংলাদেশে যে হুমকি বিএনপি অনবরত দিচ্ছে।

অতীতে বিএনপি ক্ষমতায় থাকাকালে ভোট কারচুপির চূড়ান্ত করেছে। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একটি ভোট কারচুপির নির্বাচন দিয়ে দেশব্যাপী গণবিক্ষোভের মূখে দলটিকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। এই দলের নেত্রীর মুখে যখন অনবরত প্রতিপক্ষের ভোট কারচুপির অভিযোগ শোনা যায়, তখন সেই প্রবাদটি মনে পড়ে “ভূতের মুখে রাম নাম।” বেগম জিয়ার নির্বাচন কমিশন ও নির্বাচন অনুষ্ঠান সংক্রান্ত প্রস্তাবগুলোতে যদি জামায়াতকে নির্বাচনে অংশগ্রহণে সুযোগ দানের ও নির্বাচনকে বিলম্বিত করা অথবা প্রভাবিত করার কূটকৌশল জড়ানো না থাকতো তাহলে অবশ্যই এটা ভেবে আনন্দিত হওয়া যেতো যে, বিএনপি নির্বাচন বর্জনের অপরাজনীতি ত্যাগ করে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের রাজনীতিতে ফিরে আসছে।

কিন্তু ১৩ দফার একটি দফাতেও এই গণতান্ত্রিক উদ্দেশ্যের প্রতিফলন ঘটেনি। ঘুরেফিরে বিএনপি নাম পাল্টে আবার নির্বাচনকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার ফর্মুলা দিয়েছে। এই সরকারের নাম সম্ভবত “নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সহায়ক সরকার।”এবং এই সরকারের রূপরেখাও ভবিষ্যতে বিএনপি একাই ঘোষণা করবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে সহায়ক সরকারের পার্থক্যটা কি? একমাত্র নামটি বদল করা ছাড়া!

নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতিকে দলীয় রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীনের আমলে বিএনপিই বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট করে তোলে। পরবর্তীকালে এর কফিনে শেষ পেরেক মারে মইন-ফখরুদ্দীনের আধা সামরিক সরকার। জনগণ ব্যবস্থাটিকে প্রত্যাখ্যান এবং সংবিধানেও ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়। এই বাতিল ও জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত ব্যবস্থাটিকেই বেগম জিয়া নাম পাল্টে আবার ফিরিয়ে আনতে চান। তার সম্ভবত আশা, আগের দু’জন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান লতিফুর রহমান ও ইয়াজউদ্দীন আহমদকে নিজেদের কব্জায় এনে যেভাবে নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে চেয়েছিলেন, এই ব্যবস্থায় সেটা সম্ভবত আবার পারবেন।

এ ধরনের চক্রান্ত সফল করার দুরাশা পোষণ না করে গণতান্ত্রিক দুনিয়ার সর্বত্র যে রীতিতে নির্বাচন হয় অর্থাৎ ক্ষমতাসীন দলই তাদের অধীনে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করেন এবং নির্বাচনে পরাজিত হলে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন, এটাই তো অনুসরণ করা উচিত। ২০০১ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আওয়ামী লীগ কি শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের নজির দেখায়নি? তাহলে ২০১৯ সালের নির্বাচনও ক্ষমতাসীন দলের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে দিতে আপত্তিটা কোথায়? আওয়ামী লীগ সরকার যদি এই নির্বাচনে বড় ধরনের কোনো কারসাজি করে তাহলে দেশবাসীর তা অজানা থাকবে না। তখন দেশের মানুষকেই সঙ্গে নিয়ে বিএনপি ‘সরকার হটানো’র আন্দোলনে নামতে পারবেন এবং সফলও হবেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপির বিরুদ্ধে এই ধরনের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ কি সফল হয়নি।

বেগম জিয়া তার আনলাকি থারটিন প্রস্তাবে দাবি করেছেন, “নির্বাচনের সময়সূচী ঘোষণার পর থেকে নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ পর্যন্ত সরকারের স্বরাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য, জনপ্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, প্রাথমিক শিক্ষা, পররাষ্ট্র, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় নির্বাচন কমিশনের অধীনে রাখতে হবে।” অর্থাৎ নির্বাচনের সময়সূচী ঘোষণার পর নতুন সরকার (সহায়ক সরকার কি?) দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত বেগম জিয়ার পছন্দমতো গঠিত নির্বাচন কমিশনই হবে প্রশাসনিক সরকার। যার অর্থ নির্বাচনের সময়সূচী ঘোষণার পরই বর্তমান আওয়ামী সরকারকে সব ক্ষমতা ছেড়ে দিতে হবে। কার্যতঃ ক্ষমতায় থাকবে অনির্বাচিত নির্বাচন কমিশন। তারপর নির্বাচন পরিচালনা করবে কি বেগম জিয়ার প্রস্তাবিত অনির্বাচিত সহায়ক সরকার? অর্থাৎ অগণতান্ত্রিক ও অরাজনৈতিক ব্যবস্থার উপর বিএনপি নেত্রীর যতোটা আস্থা, ততোটা রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর নেই। তারপরও তিনি গণতন্ত্র গণতন্ত্র বলে সকল সময় চিৎকার জুড়েন।

বেগম জিয়ার ফর্মুলা মেনে নির্বাচন কমিশন গঠন ও নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে গেলে দেশে রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টির আশঙ্কাই বেশি। সেই ব্যবস্থাটিও বেগম জিয়া তার প্রস্তাবেই রেখে দিয়েছেন। তার একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, “প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনারের যোগ্যতা-অযোগ্যতা ও মনোনয়নের প্রশ্নে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনায় সকল দলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই আলোচনা অব্যাহত রাখতে হবে।” এই প্রস্তাবের উদ্দেশ্যটা স্পষ্ট। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে প্রস্তাবিত বৈঠকে সংখ্যা গরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বিএনপি মানবে না। আলোচনা শেষ করতে না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখবে এবং নির্বাচন পরিস্থিতি অনুকূল মনে না হলে নির্বাচন ঝুলিয়ে রাখবে এবং দেশে অনিশ্চয়তাও সৃষ্টি করতে পারবে। তেরো দফার উদ্দেশ্য যে “মহৎ” তাতে সন্দেহ নেই। তেরো দফায় প্রতিরক্ষা বাহিনীকে নির্বাচনে যুক্ত করে তাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দানের প্রস্তাব করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলেও উপমহাদেশে বহু ছোট-বড় নির্বাচন হয়েছে। জরুরী প্রয়োজন হলে কোনো কোনো নির্বাচনী এলাকায় পুলিশ কিংবা সামরিক বাহিনীও মোতায়েন রাখা হয়েছে। কিন্তু তাদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেসির ক্ষমতা দানের কোনো উদাহরণ বিএনপি নেত্রী দেখাতে পারবেন কি? বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী এখন অতীতের সব দুর্বলতা কাটিয়ে উঠেছে এবং একটি আধুনিক শক্তিশালী দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে বার বার টেনে আনার এই প্রস্তাবে তারাও আগ্রহী হবেন কি? খালেদা জিয়া এখনো কেন ক্যান্টনমেন্ট-নির্ভর রাজনীতি করতে চান সেটাই রহস্য।

আমার একটি ধারণা, নানা রকম শর্ত, প্রস্তাব ও ফর্মুলা তুলে ধরে বেগম জিয়া রাজনীতির অঙ্গনে নিজেদের চাঙ্গা রাখতে চান। আর কোনো উপায় নিজেদের চাঙ্গা রাখার ব্যবস্থা তারা করতে পারছেন না। বিএনপি মুখে এখন যা-ই বলুক ২০১৯ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যবস্থাধীনে তারা নিজেরাই আসবে এবং আসবে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই।

[লন্ডন, ২২ নবেম্বর মঙ্গলবার ২০১৬]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment