২০১৬ সালে আমরা কী হারালাম আর কী পেলাম?

তৃতীয় মত

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

২০১৭ সালের প্রথম ভোরে ঘুম থেকে উঠে ভাবছিলাম, গতরাতে যে ইংরেজি বছরটি (২০১৬) বিদায় নিল তা আমাদের কী দিয়ে গেল? আমরা কী পেলাম, আর কী হারালাম? পশ্চিমা মিডিয়ার মতে, ২০১৬ সালটি পাশ্চাত্যের মানুষ মনে রাখবে দুটি বড় কারণে। এক ব্রেক্সিট বা ব্রিটেনের ইউরোপ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তের কারণে। অন্য কারণটি হল আমেরিকা তথা বিশ্ব রাজনীতিতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এমন এক ব্যক্তির উত্থান, যে উত্থান মানুষকে গত শতকের ত্রিশের দশকে ইউরোপের হিটলারের উত্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

অতীতের অনেক ইংরেজি ও বাংলা সাল ভালো ও মন্দ দুই কারণেই মানুষের স্মরণ থেকে মুছে যায়নি। বাংলা তেরোশ’ পঞ্চাশ সালের কথা কে ভুলবে, যে বছর অবিভক্ত বাংলায় ৫০ লাখ মানুষকে দুর্ভিক্ষে প্রাণ দিতে হয়েছিল? ইংরেজি ১৯৪৬ সালের কথা কে ভুলবে, যে সালটি ছিল গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং বা বিভীষিকাপূর্ণ কলকাতা-দাঙ্গার বছর। তেমনি রক্তে রাঙা ১৯৫২ বাংলাদেশের মানুষের মনে অম্লান ভাষা শহীদদের আত্মদানের বছর হিসেবে। ১৯৪৭ সাল স্মরণীয় দেশভাগের জন্য। আর ১৯৭১ সাল বাংলাদেশের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য স্মরণীয়।

ইউরোপ-আমেরিকায়ও এরকম স্মরণে থাকা বছর আছে অনেক। বার্লিন দুর্গ ভাঙার বছর। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের বছর। ধ্বংসাত্মক আফগান যুদ্ধ এবং পরে গালফ যুদ্ধ শুরু হওয়ার বছর। আমেরিকায় প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের হোয়াইট হাউসে প্রবেশের বছর। এরকম অনেক ইংরেজি সালের কথা উল্লেখ করা যায়, যা বিশ্বকে আলোড়িত করা ঘটনা দ্বারা চিহ্নিত ও স্মরণীয়। এখানে তার তালিকা দিলে লেখাটি অনাবশ্যকভাবে বড় হবে।

বিদায়ী ২০১৬ সালের একটি বড় ঘটনা হল কিংবদন্তির বিশ্ব-নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর মৃত্যু। তার যারা সমালোচক, তারাও একবাক্যে স্বীকার করেছেন, এটা একটি যুগের অবসান ঘটাল। স্টালিনের মৃত্যুতে প্রখ্যাত সমাজতন্ত্রী দার্শনিক রজনী পাম দত্ত লিখেছিলেন, There are moments in history when an instant sums up an age (ইতিহাসে এমন মুহূর্তও আছে, যখন একটি ঘটনাই একটি যুগের খতিয়ান তুলে ধরে)। স্টালিনের মৃত্যুর চেয়েও আমার মতে, কাস্ত্রোর মৃত্যু একটা যুগকে আরও ভালোভাবে চিহ্নিত করেছে, যে যুগটি ছিল নির্যাতিত বিশ্ব মানুষের অভ্যুত্থান এবং সমাজতন্ত্রী বিশ্বের বিজয়পর্বের যুগ। গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের আগ্রাসনে সে যুগটির অবসান হয়েছে বটে; কিন্তু কাস্ত্রো তার মৃত্যুর মধ্য দিয়েও সে যুগের অগ্নিকণাকে নির্বাপিত হতে দেননি। ২০১৬ সালে নতুন গণজাগরণের মধ্য দিয়ে বিশ্ব সেই সত্যটিও প্রত্যক্ষ করছে।

২০১৬ সালে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আমরা বহু বরেণ্য ও খ্যাতনামা ব্যক্তিকে হারিয়েছি। হারানো মনীষীর মধ্যে রয়েছেন সৈয়দ শামসুল হকও। একদিন পশ্চিমা পণ্ডিত যতই ২০১৬ সালকে Gloomy and disastrous বলে আখ্যায়িত করুন, এই সালটি শুধু ধ্বংসের নয়, সৃষ্টিরও। কবি নজরুল বলেছিলেন, ‘ধ্বংস দেখে ভয় কেন তোর ধ্বংস নতুন সৃজন বেদন।’ কথাটি ২০১৬ সালের ব্যাপারে অনেকটাই সত্য। ২০১৬ সাল বহু ধ্বংসকে ধারণ করেছে; কিন্তু বপন করে গেছে নতুন সৃষ্টির বীজ।

নিজের দেশকেই প্রথম উদাহরণ হিসেবে টানি। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ ভয়াবহ মৌলবাদী সন্ত্রাসের উত্থান দেখেছে। আবার তার পতনও দেখেছে। যারা আশা করছিলেন, ভারতে বিজেপির এবং আমেরিকায় ট্রাম্পের বিজয়ে ২০১৬ সালেই বাংলাদেশে ক্ষমতার হাতবদল ঘটবে, অসাম্প্রদায়িক হাসিনা-সরকারের পতন ঘটবে, তারা নিরাশ হয়েছেন। জঙ্গিবাদ দমনে হাসিনা সরকারের কৃতিত্বকে অসাধারণ বলা চলে, যার প্রশংসা আমেরিকার বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ওবামাও করেছেন। ২০১৬ সাল বাংলাদেশে সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্রের দাপট যেমন দেখেছে, তেমনি দেখেছে তার শোচনীয় পরাজয়।

অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাংলাদেশের সম্মানিত স্থানটি নিশ্চিত করেছে ২০১৬ সালেই। রোহিঙ্গা সমস্যা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানোর অপচেষ্টা সফল হয়নি। শেখ হাসিনার প্রাণনাশের সূক্ষ্ম ষড়যন্ত্র যদি হয়ে থাকে, তা-ও ব্যর্থ হয়েছে। ২০১৬ সাল বাংলাদেশের জন্য বড় বড় বিপদ ডেকে এনেছে, চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আবার সেই বিপদ ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে শক্তি জুগিয়েছে এবং সাফল্যও এনে দিয়েছে।

এবার বিশ্বের দিকে তাকাই। ২০১৬ সাল বহিরাগত সমস্যা সৃষ্টি করে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের চেয়েও ভয়াবহ সমস্যার দিকে বিশ্বকে ঠেলে দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, গত শতকের ত্রিশের দশকের ভয়াবহ মন্দা এবং ক্যাপিটালিজমের সংকট থেকে যেমন হিটলারের অভ্যুদয়, তেমনি এই শতকে গ্লোবাল ক্যাপিটালিজমের সংকট ও দুই দফা বিশ্বব্যাপী ইকোনমিক ডিপ্রেসন থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আমেরিকায় যে ওয়ার ইন্ডাস্ট্রি চাঙ্গা করা হয়েছে এবং বর্ণবাদী ও যুদ্ধবাদী মনোভাব গড়ে তোলায় উৎসাহ জোগানো হয়েছে, তা থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ব্যক্তির রাজনৈতিক বিজয় অর্জন সম্ভব হয়েছে।

একশ্রেণীর পশ্চিমা পণ্ডিতের এই বিশ্লেষণ যেমন সঠিক হতে পারে, তেমনি এটাও সত্য, ২০১৬ সালের এই ঘটনা এবং শংকাই বিশ্বমানবের সাহস ও প্রতিরোধ চেতনাকে আবার জাগ্রত করেছে। তারা ইউরোপ ও আমেরিকায় যে নব্য ফ্যাসিবাদের অভ্যুত্থান আশংকা করেন, তা প্রতিরোধের জন্য ২০১৬ সালেই তার কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। নতুন বছরের (২০১৭) ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকার নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন। আর ওইদিনই বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ দিবস পালনের ডাক দেয়া হয়েছে। শুধু আমেরিকায় নয়, সারা ইউরোপে এ দিন লাখ লাখ মানুষ প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দেবে।

আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি একদিনের জন্য ইউরোপে বহিরাগত সম্প্রদায় ও তাদের সমর্থকরা কর্মবিরতি ঘটাবে এবং বিশ্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাদের কতটা প্রয়োজন, তার দিকে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে। তারপর ২২ মার্চ জাতিসংঘের এন্টি রেসিজম ডে উপলক্ষ করে পশ্চিমা অধিকাংশ দেশে বিশাল বর্ণবাদবিরোধী শোভাযাত্রা বেরোবে এবং ট্রাম্পের বর্ণবাদী নীতিকে চ্যালেঞ্জ জানাবে। একজন পশ্চিমা সমাজতাত্ত্বিক বলেছেন, তার ধারণা, বিশ্বব্যাপী বর্তমান সমস্যাগুলোর গোড়ায় রয়েছে পোস্টট্রু–থ পলিটিকসের আবির্ভাব এবং জনগণের মধ্যে তাদের যা বলা হয় তা বিশ্বাস করার প্রবণতা।’

এই বিশ্লেষণ অনেকেই সত্য মনে করেন এবং এই পোস্টট্রু–থ পলিটিক্যাল যুগের সুযোগ নিয়েই ট্রাম্প অসত্য, অতিরঞ্জিত এবং বিদ্বেষমূলক প্রচার চালিয়ে নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন বলে বহু রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা। চরম দক্ষিণপন্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের জয় ইউরোপে চরম দক্ষিণপন্থীদের ক্ষমতা দখলে উৎসাহী ও আশাবাদী করে তুলেছে। নেদারল্যান্ডসে সাধারণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ১৫ মার্চ। উগ্র দক্ষিণপন্থী নেতা গিয়ার্ট ওয়াইলডার্স জনমত সমীক্ষায় এগিয়ে আছেন। তিনি জয়ী হতে পারেন, এই আশংকায় হল্যান্ডে জনগণকে সতর্ক করা হচ্ছে। এবং ওয়াইলডার্স জয়ী হলে অন্য সব দল তার সঙ্গে সহযোগিতা করবে না বলে ঘোষণা করেছে।

হল্যান্ডের মতো ফ্রান্সের ফ্যাসিবাদী ফ্রন্ট ন্যাশনালের শক্তিবৃদ্ধি হয়েছে। এই দলের নেতা মেরিন লেপেন আশা করেন, আগামী মে মাসে তিনি ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট হবেন। এই আশংকায় ফ্রান্সের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক মঞ্চ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন। জনগণকে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধকালীন নাৎসি অধিকৃত ফ্রান্সে তাঁবেদার ভিসি সরকারের আমলের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে বলা হচ্ছে। নতুন বছরে- অর্থাৎ ২০১৭ সালে ফ্রান্সে ফ্যাসিবাদবিরোধী গণজাগরণের সূচনা হলে বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই।

জার্মানিতেও চরম দক্ষিণপন্থীরা এখন শক্তিশালী। বার্লিনে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা এবং ইমিগ্রেশন-নীতির (সিরিয়ার বহিরাগতদের আশ্রয়দান) দরুন মার্কেল তার জনপ্রিয়তা অনেকটাই হারিয়েছেন। এই বছরের শেষের দিকে জার্মানিতে সাধারণ নির্বাচন। অনেকেই শংকিত এই ভেবে যে, মার্কেল ক্ষমতা হারাবেন; কিন্তু অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের ধারণা, ব্রেক্সিট এবং ট্রাম্প-ভিক্টরি ইউরোপের ভোটারদের প্রোটেস্ট ভোটদানের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক করে তুলবে এবং জার্মানিতে উগ্র দক্ষিণপন্থীদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলবে।

এ সম্ভাবনার সূচনা দেখা দিয়েছে ২০১৬ সালেই। ইউরোপের বিভিন্ন শহরে যে সভা-সমাবেশ ঘটছে, তার প্লাকার্ডে লেখা রয়েছে, ‘ফাইট এগেইনস্ট রেসিজম অ্যান্ড ইসলামো ফোবিয়া,’ ডিফেন্ড উইমেন্স রাইট টু চুজ।’ হল্ট দ্য অ্যাডভান্স অব ফ্যাসিজম’ ইত্যাদি। তাতে মনে হয়, ২০১৬ সালে আমরা কেবল হারাইনি; কিছু পেয়েছিও। সেই পাওয়া হল নবগণজাগরণের জন্য শুভ ও সুস্থ চেতনার উন্মেষ। আশা করা যায়, ২০১৬ সালের কাছ থেকে ২০১৭ সাল এই শুভ চেতনার উত্তরাধিকারই বহন করবে।

বাংলাদেশেও এখন পোস্টট্রু–থ পলিটিকসের বাড়াবাড়ি আমরা দেখছি। এই অতিকথন ও অসত্য কথনের রাজনীতির পুরোধা বিএনপি ও জামায়াত। সুশীল সমাজের একশ্রেণীর নেতা ও বুদ্ধিজীবীও এই পোস্টট্রু–থ পলিটিকসে জড়িত। ইংরেজি নববর্ষ ২০১৭ সালে আমার আশা, বাংলাদেশে এই অপরাজনীতির অবসান হবে। ধ্বংস ও বিপর্যয় কাটিয়ে উঠতে ২০১৬ সাল যেমন বিশ্বকে সাহায্য জুগিয়েছে, ২০১৭ সাল সেই সাহায্যকে আরও সম্প্রসারিত ও সফল করে তুলবে। ‘দানবের মূঢ় অপব্যয়, গ্রন্থিতে পারে না কভু ইতিহাসে শাশ্বত অধ্যায়।’ কবির এই বাণীতে আমি বিশ্বাস রাখি। – যুগান্তর

লন্ডন ১ জানুয়ারি, রোববার, ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment