দশ দিগন্তে

নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের অন্তত কোনো মুখোশ নেই

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

যাত্রা শুরুতেই বিপত্তি। আমেরিকার ৪৫তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে দুশ’র বেশি বিক্ষোভকারীকে গ্রেফতার করতে হয়েছে। দু’পক্ষের মধ্যে বিবাদ ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে আহত হয়েছে বহু লোক। পরের দিনের বিশাল নারী মিছিল সারা ইউরোপ কাঁপাচ্ছে বলে জানা গেছে। মেক্সিকোতেও ট্রাম্প বিরোধী বিক্ষোভ হয়েছে। একমাত্র মস্কোতে মদের বোতলের ছিপি খুলে নাগরিকেরা উল্লাস প্রকাশ করেছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন শপথ নিচ্ছিলেন তখন ওয়াশিংটনে আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, অঝোর ধারায় বৃষ্টি ঝরছিল। লন্ডনের গার্ডিয়ানের (২১ জানুয়ারি) মতে, “Even the heavens wept”- অর্থাৎ প্রকৃতিও কাঁদছিল। শনিবারের গার্ডিয়ানের সম্পাদকীয়ের শিরোনাম হচ্ছে, “Americans and the world should be very afraid” (আমেরিকা এবং বিশ্বের মানুষের ভীত হওয়া উচিত)। লন্ডনের এক কলামিস্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, “ট্রাম্পের অধীনে আমরা এক গ্লোবাল কনফ্রন্টেশনের যুগে প্রবেশ করব।’ এই কলামিস্ট টিমোথি গারটন য়্যাশ মনে করেন, যদিও তৃতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হবে না, কিন্তু গত শতকের কিউবান মিসাইল-সঙ্কটের মতো ভয়াবহ কোনো সঙ্কট দেখা দিতে পারে। চীনের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘর্ষও দেখা দিতে পারে।”

গার্ডিয়ান ও গারটন য়্যাশের মতো কলামিস্টদের লেখায় ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্পর্কে ইউরোপের এলিট ক্লাস বা সুশীল সমাজের মতামত প্রকাশিত হয়েছে। এই এলিট ক্লাস তাদের বর্তমান সুযোগ-সুবিধা ও বিশ্বের বর্তমান স্থিতাবস্থা নষ্ট হওয়ার ভয়ে ভীত। ট্রাম্প এই সুশীল সমাজকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছেন। তাদের সম্পর্কে বলেছেন, “a political elite that had forgotten ordinary people” (এই রাজনৈতিক সুশীল সমাজ সাধারণ মানুষকে ভুলে গেছে)। ওয়াশিংটনে দুই দলের এলিট ক্লাস সম্পর্কেই তিনি অভিযোগ করেছেন, তারা শুধু সাধারণ মানুষকে ভুলে যায়নি; তারা ইনার সিটিগুলোকে ড্রাগস, মাফিয়া এবং অপরাধের কেন্দ্রস্থল করে তুলতে সাহায্য জুগিয়েছে।

বাংলাদেশে যারা সুশীল সমাজের এক বৃহৎ অংশের ভূমিকা দেখছেন, তারা সম্ভবত ডোনাল্ড ট্রাম্পের এ সম্পর্কিত বক্তব্য শুনে মর্মাহত হবেন না। কিন্তু তাদের শঙ্কিত হওয়ার কারণ আছে তার অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণ শুনে। এই ভাষণ জিঙ্গোইস্টিক এবং আইসোনালিস্ট দুই ধরনের অতিশয়োক্তিতে ভর্তি। তিনি জোর গলায় বলেছেন, “From this moment on it’s going to be only America first” অর্থাৎ এখন থেকে সর্বকাজে আমেরিকার স্বার্থই তার কাছে প্রাধান্য পাবে বাইরের বিশ্ব সম্পর্কে তার দায়িত্ব নেই।

তিনি তার নির্বাচনী বক্তৃতাতেও বলেছেন, ‘এতোদিন বহির্বিশ্বকে পাহারা দিতে গিয়ে আমেরিকা অর্থ খুইয়েছে। এখন সে নিজেকে পাহারা দেবে।’ তার এই বক্তব্য শুনে মনে হয়েছে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হলে তিনি দেশটিকে উড্রো উইলসনের আইসোনালিস্ট যুগে ফিরিয়ে নেবেন। তাতে আমেরিকার অর্থনীতি চাপ মুক্ত হবে; কিন্তু ইউরোপের নিরাপত্তা এবং আমেরিকার বিশ্ব আধিপত্যও বিপন্ন হবে বলে ইউরোপীয় এলিটরা মনে করেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ শ্লোগানে অতি জাতীয়তাবাদের গন্ধ রয়েছে। অনেকে মনে করেন এই অতি জাতীয়তাবাদের মধ্যে ফ্যাসিবাদের বীজ লুকিয়ে আছে। ট্রাম্প অবশ্য তার অভিষেক অনুষ্ঠানের ভাষণে বলেছেন, ‘তার ক্ষমতা গ্রহণ এক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে আরেক প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গ্রহণ নয়। এটা এক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পিপল বা জনগণের ক্ষমতা গ্রহণ।’ এই কথাগুলো তিনি যখন বলছিলেন, তখন হোয়াইট হাউসের সামনে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ তার ক্ষমতা গ্রহণের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিল।

তাতে মনে হয় মার্কিন জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার বদলে তিনি বিভক্ত করেছেন। মার্কিন এস্টাব্লিসমেন্টও তার ব্যাপারে দ্বিধাবিভক্ত। এই দ্বিধাবিভক্ত জনগণ ও এস্টাব্লিসমেন্ট নিয়ে তিনি শুধু অতি জাতীয়তাবাদী ও বিচ্ছিন্নতাবাদী শ্লোগান তুলে কী করে আমেরিকাকে আরো শক্তিশালী করবেন এবং আমেরিকার বিশ্ব নেতৃত্ব অব্যাহত রাখবেন তা এখন দেখার রইল। তার কাছে যদি আমেরিকাই ফার্স্ট হয়, তাহলে এই বিশ্বায়নের যুগে উনিশ শতকের আইসোনালিস্ট যুগে ফিরে গিয়ে কী করে আমেরিকার স্বার্থ ও প্রাধান্য অক্ষুণ্ন রাখবেন তাও দেখার রইল।

অভিষেক ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারো মুসলিম বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন। আমেরিকা বহিরাগতদের দেশ বলে পরিচিত। সে দেশে নারী-বিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ ও ধর্মবিদ্বেষ প্রচার করে তিনি এই দেশটিকে কিভাবে ঐক্যবদ্ধ রাখবেন? তার আমলে যদি মার্কিন গণতন্ত্র আরো দুর্বল হয়, তাহলে আজকের ইউনাইটেড স্টেটস গত শতকের সোভিয়েট ইউনিয়নের পরিণতি বরণের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। অভিষেক অনুষ্ঠানের দিন প্রবল বৃষ্টিতে অতিথিদের মাথা ভিজেছে। তাকে প্রকৃতির কান্না আখ্যা দিয়ে লন্ডনের এক কলামিস্ট লিখেছেন, ‘‘The heavens wept and so should we for broken democracy” (প্রকৃতি কেঁদেছে, সুতরাং ভগ্নদশা গণতন্ত্রের জন্য আমাদেরও কান্না উচিত)।

মার্কিন গণতন্ত্রের এখন ভগ্নদশাই। গণতান্ত্রিক বিশ্বের নেতা আমেরিকায় গণতন্ত্রের পতন শুরু হয় পঞ্চাশের দশকে প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের আমলে। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের উপর অত্যাচার তখন চরমে পৌঁছে (পড়ুন এ সম্পর্কিত স্টেইনব্যাকের উপন্যাস ‘ট্রাবল ইন জুলাই’)। জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে অনাবশ্যকভাবে এটম বোমা ফেলা হয় এবং জাতিসঙ্ঘের অনুমোদন না নিয়েই জাতিসঙ্ঘের পতাকা ব্যবহার করে উত্তর কোরিয়ায় হামলা চালানো হয়। জর্জ বুশ জুনিয়র প্রেসিডেন্ট হন বিতর্কমূলক নির্বাচনে এবং তার আমলে আমেরিকা একটি যুদ্ধবাজ হামলাকারী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসনের আমলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় মার্কিন ভূমিকা ছিল তার নিজের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোর বিরোধী।

সুতরাং ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির আমলে মার্কিন গণতন্ত্রের ভগ্নদশা ঘটবে এই শঙ্কা প্রকাশ করা সঙ্গত কি? প্রশ্ন তোলা উচিত তার অতি জাতীয়তাবাদী রেটোরিক এই ভগ্নদশা গণতন্ত্রের আরো ক্ষতি করবে কিনা? এক্ষেত্রে একটি বড় আশার কথা, আমেরিকার জনগণ, যারা ট্রাম্পের অতি জাতীয়তাবাদী শ্লোগান দ্বারা প্রভাবিত হননি, তারা এখন সতর্ক ও সঙ্ঘবদ্ধ। ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশাল গণ-বিক্ষোভ, সারা ইউরোপ জুড়ে নারী মিছিল। অশ্বেতাঙ্গ ও বহিরাগত আমেরিকানদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশন সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে খুব বেশিদূর এগুতে পারবেন, তা অনেকে মনে করেন না।

চীনে মার্কিন পণ্যের উত্পাদন বন্ধ করে এবং চীনের পণ্যের উপর শুল্ক বাড়িয়ে দিয়ে ট্রাম্প কতটুকু সফল হবেন তাও প্রশ্নের বিষয়। মার্কিন ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা কি চীনের সস্তা শ্রমিকের বাজার ত্যাগে সহসা রাজি হবেন? যদি না হন, তাহলে দেশের ভেতরেই ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সংঘাত দেখা দেবে। ট্রাম্প একসঙ্গে কতো ফ্রন্টে লড়বেন? তার আমলে চীনের সঙ্গে আমেরিকা প্রত্যক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়বে, এ আশঙ্কাও অমূলক। তার একটি বড় কারণ, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি।

গত শতকে চীন ও সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে দারুণ বিবাদ চলছিল। তারই সুযোগ নিয়ে চীনকে নিজ দলে টেনে সোভিয়েট ইউনিয়নের ত্বরিত পতন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল আমেরিকা। বর্তমানে চীন ও রাশিয়ার মধ্যে বড় কোনো বিরোধ নেই। বরং সখ্যতা রয়েছে। চীন তার সামরিক ও অর্থনৈতিক প্রভাবও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিরাট ভাবে বাড়িয়েছে। এ অবস্থায় ট্রাম্প যেখানে নাটো সম্পর্কে বিরূপ মনোভাব পোষণ করেন এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি প্রত্যাহার করতে চান, সেখানে তিনি চীনের বিরুদ্ধে যত কঠোর অবস্থান নিন, প্রত্যক্ষ যুদ্ধে জড়াতে যাবেন তা মনে হয় না। পশ্চিমা সুশীল সমাজের মুখপাত্রেরা হয়তো রজ্জুতে সর্পভ্রম করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প যতোই বিতর্কমূলক চরিত্রের মানুষ হন, তার একটা যুদ্ধ-বিরোধী, এমনকি স্নায়ুযুদ্ধ বিরোধী মনোভাব আছে বলে অনেকে মনে করেন। এই ধারণা সত্য হলে এটা তার চরিত্রের ভালো দিক। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “ইরাকে যুদ্ধ বাধানো ছিল আমেরিকার চরম ভ্রান্তি। এই যুদ্ধ দ্বারা আমেরিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।” অন্যদিকে ওবামা প্রশাসনের আমলে রাশিয়ার সঙ্গে যে নতুন স্নায়ুযুদ্ধ শুরু করা হয়, তিনি তার অবসান ঘটিয়ে পুতিন সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে চান। মার্কিন সুশীল সমাজ ও এস্টাবলিসমেন্টের চরম বিরোধিতার মুখেও তিনি রুশ-নেতা পুতিনের প্রশংসা করেছেন এবং বলেছেন, রাশিয়া তার পরমাণু অস্ত্রের সংখ্যা কমালে তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবেন।

এটা এখন মনে হয়, ডোনাল্ড ট্রাম্প তার আগের প্রেসিডেন্টদের প্রথাগত পথে চলবেন না। তার নেতৃত্ব আমেরিকাকে এবং গোটা বিশ্বকেও ভালো না মন্দ কোন্ পথে টেনে নেবে তা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনো আসেনি। তিনি তার অতি জাতীয়তাবাদী রেটোরিক বাস্তবায়ন করতে চাইলে আমেরিকা এবং বিশ্ব দুইয়েরই ক্ষতি করবেন। আর এই রেটোরিক থেকে সরে এসে রুশ-মার্কিন সমঝোতার ভিত্তিতে যদি মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের অশান্তি ও যুদ্ধগুলো থামাতে পারেন তাহলে নিন্দিত প্রেসিডেন্ট থেকে নন্দিত প্রেসিডেন্টও তিনি হয়ে উঠতে পারেন।

আমার বলতে দ্বিধা নেই, হিলারি ক্লিনটন যতই উদার রাজনীতিকের ভান করুন, তার মুখোশের আড়ালে একটি সম্প্রসারণবাদী ও যুদ্ধবাদী মুখ লুকানো আছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে আইএস-কে পৃষ্ঠপোষকতা দানে তার ওই পরিচয় পাওয়া গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্তত এই ধরনের কোনো মুখোশ নেই। তার যে চেহারাটা এখন মানুষ দেখছে, এটাই তার আসল চেহারা। কথায় তিনি খুবই উগ্র। কিন্তু তার কাজেও এই উগ্রতার প্রতিফলন ঘটে কিনা সেটাই এখন দেখার রইল। তিনি যদি ভুল পথ আঁকড়ে থাকেন, তাহলে বিশ্বের ক্ষতি হবে, কিন্তু সবচাইতে ক্ষতি হবে আমেরিকার। – ইত্তেফাক

 [ লন্ডন ২১ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৭ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment