কালের আয়নায়

ব্রেক্সিট ও ট্রাম্প :বিশ্ব কোন পথে মোড় নেবে?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

পশ্চিমা জগৎ এখন তোলপাড় ব্রেক্সিট আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্টগিরি নিয়ে। এই দুটি ঘটনা ইউরোপ-আমেরিকায় স্থিতাবস্থা ভেঙে দিয়ে এক গভীর অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে। মনে হয়েছিল, ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে ঢোকার পর হয়তো এই অনিশ্চয়তা একটু কাটবে, তিনি আগের স্থিতাবস্থা রক্ষার দিকে একটু ঝুঁকবেন। তা হয়নি। গতকালই (বৃহস্পতিবার) খবর বেরিয়েছে, তিনি নির্বাচনী প্রচারের সময় যেসব অঙ্গীকার ঘোষণা করেছিলেন, এতদিন অনেকেই যাকে মনে করেছেন আপ্তবাক্য, সেসব অঙ্গীকার তিনি সত্য সত্যই পূরণ করতে এগিয়েছেন। ফলে ভয় আরও বেড়েছে।

নতুন প্রেসিডেন্ট মেক্সিকান বর্ডারে দেয়াল তোলার অর্ডার দিয়েছেন। সেই সঙ্গে ইরাক ও সিরিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশের শরণার্থীদের আমেরিকায় ঢুকতে না দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে অনেকেই ভাবছেন, ট্রাম্প হয়তো ন্যাটোর গুরুত্ব হ্রাস করার এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তেও অটল থাকবেন। ইরানের সঙ্গে আণবিক চুক্তি রাখতে চাইবেন না এবং চীনকেও আমেরিকার মোস্ট ফেভারিট ট্রেড পার্টনার হিসেবে গণ্য না করে চীন থেকে আমদানিকৃত পণ্যের ওপর বাণিজ্য শুল্ক বাড়াবেন।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যদি সত্যই এ পথ নেন (যা তিনি নিয়েছেন বলে অনুমিত হয়) এবং প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের পূর্ববর্তী আমেরিকার আইসোগনিস্ট যুগে ফিরে যেতে চান (আমেরিকা ফার্স্ট স্লোগান তুলে), তাহলে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ বাজার চাঙ্গা হবে এবং অর্থনীতি বর্তমান বিপর্যয় সাময়িকভাবে কাটিয়ে উঠবে এ কথা সত্য; কিন্তু আমেরিকা বিশ্বে তার আধিপত্য, বাজার এবং বিশ্ব মুদ্রা হিসেবে ডলারের আধিপত্য রক্ষা করতে না-ও পারে।

আমেরিকার ইউরোপীয় মিত্ররা যেমন এ কথা ভেবে শঙ্কিত (কারণ, আমেরিকার অর্থনৈতিক ও সামরিক পাহারায় তারা এতকাল নিরাপদ বোধ করেছে), তেমনি আমেরিকার এস্টাবলিশমেন্টের একটা বড় অংশ এবং ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান দুটি প্রধান দলেরই একটা বড় অংশ বিচলিত। কিন্তু এই মুহূর্তে ট্রাম্পকে ঠেকানোর কোনো উপায় নেই। ‘আমেরিকা আমেরিকানদের জন্য’- এই স্লোগান তুলে ট্রাম্প আমেরিকার এলিট ক্লাসের মধ্যে না হলেও সাধারণ শ্বেতাঙ্গ অধিবাসীদের এক বৃহৎ অংশের মধ্যে জোরালো সমর্থন সৃষ্টি করেছেন। এতদিনের অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত অন্যান্য বর্ণ এবং গোত্রের মানুষের মধ্যেও ট্রাম্পের সমর্থন রয়েছে। তারা ভাবছে, ডোনাল্ড মানুষ হিসেবে যা-ই হোন, তার নীতি দেশটির অর্থনৈতিক সমস্যা দূর করবে। সাধারণ মানুষের ক্লেশ দূর করবে।

আমেরিকায় সাধারণ মানুষের বড় অংশের এই মোহ দূর না হওয়া পর্যন্ত ট্রাম্পকে হটানো মুশকিল। তবে সাধারণ শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এই মোহ দূর হলে এবং মার্কিন এস্টাবলিশমেন্টের মধ্যে তার বিরোধিতা শক্তিশালী হলে ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি নিয়ে কতদূর এগোতে পারবেন, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অনেক মার্কিন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প হয় তার একগুঁয়ে নীতি নিয়ে আমেরিকাকে ১৯১৪ সালের আগের বিচ্ছিন্নতার যুগে ফিরিয়ে নিতে পারেন অথবা তিনি প্রেসিডেন্ট নিক্সনের পরিণতি বরণ করতে পারেন। যে কোনো বড় একটা কেলেঙ্কারিতে তিনি অভিযুক্ত হয়ে ইমপিচমেন্টের মুখে পড়তে পারেন। তবে এসবই আগাম অনুমান মাত্র।

লন্ডনের সানডে টাইমস পত্রিকার এক কলামিস্ট ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, ট্রাম্প নয়া চীনের সঙ্গে প্রত্যক্ষ সংঘাতে জড়িয়ে পড়বেন। একটি আমেরিকান কাগজের পর্যালোচনায় বলা হয়, ইরানের বা কিউবার সঙ্গে ওবামার আপস চুক্তিগুলো ট্রাম্প মানতে না চাইলে এবং সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মৈত্রীকে উৎসাহিত করে তাদের আরও অস্ত্রসজ্জিত করার নীতি গ্রহণ করলে মধ্যপ্রাচ্যে আইএসের উৎপাত কমতে পারে। কিন্তু নতুন করে এবং আরও বৃহত্তরভাবে আঞ্চলিক সংঘর্ষের আগুন জ্বলে উঠতে পারে। তা যদি হয় তাহলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে পুতিনের রাশিয়াকে ট্রাম্প পাশে পেতে না-ও পারেন। ইরান ও সিরিয়ার মিত্র হিসেবে রাশিয়া মধ্যপ্রাচ্যে এমন নিজস্ব খেলা খেলতে চাইবে, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আশাভঙ্গের কারণ হতে পারে। তিনি হয়তো না বুঝে আগুন নিয়ে খেলতে চান, যে আগুন সকলের আগে আমেরিকার স্বার্থ ও আধিপত্যকেই স্পর্শ করতে পারে।

ব্রিটেনের বর্তমান টরি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মের ব্রেক্সিট নীতিও ভালো হোক, মন্দ হোক বিচ্ছিন্নতাবাদী। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনকে সরিয়ে আনার পক্ষে যে গণভোট হয়েছে, তা তিনি দ্রুত বাস্তবায়ন করতে চান। আমেরিকার আগের প্রেসিডেন্ট ওবামা চেয়েছিলেন ব্রিটেন যেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন না ছাড়ে। এ জন্য তিনি প্রকাশ্যে ওকালতিও করেছেন। কিন্তু বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ব্রেক্সিট নীতির সমর্থক এবং ব্রিটেনের সঙ্গে বিশেষ অর্থনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় আগ্রহী।

ট্রাম্প এবং তেরেসার নীতি দু’জনের রাজনৈতিক লক্ষ্যের পরিপূরক। কিন্তু অর্থনৈতিক স্বার্থের ক্ষেত্রে পরস্পরের পরিপূরক নয়। আমেরিকা বিদেশে সস্তা শ্রমিকের বাজারে সুবিধা ভোগের লোভ সংবরণ করে নিজ দেশে পণ্য উৎপাদন শুরু করলে তার বেকার মজুরের সংখ্যা কমবে। অর্থনীতি কিছুটা চাঙ্গা হবে। কিন্তু ব্রিটেন ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ছাড়ার ফলে তার ওপর অভিবাসনের চাপ অনেকটা কমবে বটে; কিন্তু ইইউর একক বাজারের সুবিধা ব্রিটেনকে হারাতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে বন্যার ঢলের মতো মানুষের ব্রিটেনে আসা ঠেকাতে ইইউর একক বাজারের সুবিধা ছাড়তে রাজি। এ ছাড়া ইউরোপিয়ান কাস্টমস ইউনিয়ন এবং ইউরোপিয়ান কোর্ট অব জাস্টিসের আনুগত্য বর্জন করে ব্রিটেনের সার্বভৌমত্ব ফিরিয়ে আনার তিনি পক্ষপাতী। তার মতে, ব্রিটেনকে যদি ইউরোপিয়ান একক বাজার ছাড়তে হয়, তাহলে বিশ্বের বাজারে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে ব্রিটেন তার উন্নয়নমুখী অর্থনীতি শক্তিশালী করতে পারবে।

ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ এবং ব্রিটিশ রাজনীতিকদের একাংশের ব্রিটিশ সভরিনিটি ফিরিয়ে আনার স্লোগানের মধ্যে পার্থক্য কম। দুটিই বিচ্ছিন্নতার স্লোগান। এই স্লোগান মার্কিন জাতিকে যেমন দ্বিধাবিভক্ত করেছে, তেমনি করেছে ব্রিটেনের মানুষকেও। ব্রেক্সিটের প্রশ্নে কনজারভেটিভ পার্টি দ্বিধাবিভক্ত, দ্বিধাবিভক্ত লেবার পার্টিও। ব্রেক্সিটের বিরোধিতা করতে গিয়ে কনজারভেটিভ গভর্নমেন্টের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে ব্রেক্সিট সমর্থক।

একই অবস্থা লেবার পার্টি নেতা করবিনের। তিনি ব্রেক্সিটের বিপক্ষে জনমত গড়ে তোলায় শক্তিশালী ভূমিকা নেননি- এই অভিযোগে তার দলের ডানপন্থি এমপিরা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়েছিলেন। তারা করবিনকে নেতৃত্ব থেকে হটাতে পারেননি। কিন্তু লেবার পার্টিতে ব্রেক্সিট প্রশ্নে বিভক্তি রয়ে গেছে। গণভোটের সময় ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোটের জয়ও মার্জিনাল। এ কথা জেনে ব্রেক্সিট-বিরোধীরা ইইউ ছাড়ার প্রশ্নে আবারও গণভোট অনুষ্ঠান চান; কিন্তু সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

তেরেসা মে ব্রেক্সিট বাস্তবায়নের যে সহজ পথ ধরতে চেয়েছিলেন, তা সম্ভব হয়নি। গণভোটে জয় হলেও ইইউ ত্যাগের সময় ও শর্তাবলি সম্পর্কে পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়া ব্রেক্সিট কার্যকর করা যাবে না – এই দাবি প্রধানমন্ত্রী মে এড়াতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছেন, সে সম্পর্কে পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতেই হবে। তেরেসা মে আদালতের সঙ্গে বিবাদে জড়াতে চান না। তিনি সুপ্রিম কোর্টের রায় মেনে পার্লামেন্টে ব্রেক্সিটের ব্যাপারে তার নীতি রূপায়ণে এমন একটি প্রস্তাব আনতে চেয়েছেন, যা সহজেই পার্লামেন্টে পাস হয়ে যাবে।

লেবার পার্টির নেতা করবিন এই বিলের সমর্থক। কিন্তু তার এমপিদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতানৈক্য আছে। নেতার নির্দেশ মানতে না পারায় লেবার দলের বাংলাদেশি এমপি শেখ রেহানার কন্যা টিউলিপ সিদ্দিক দলের ছায়া মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন।

আমেরিকা না হয় মহাদেশ। তাই বিশ্ব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে নিজের সম্পদ ও বিশাল আয়তনের জোরে কিছুকাল টিকে থাকতে পারবে। কিন্তু ছোট দ্বীপ ব্রিটেন কি তা পারবে? সাম্রাজ্য হারানোর পর তার সাবেক উপনিবেশগুলো নিয়ে গড়া কমনওয়েলথ ছিল। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগ দিয়ে ইউরোপে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের লোভে ব্রিটেন কমনওয়েলথকে অকার্যকর করে দিয়ে ইইউতে যোগ দেয়। কিন্তু মুদ্রা ব্যবস্থায় এক হয়নি। ইউরোর বদলে পাউন্ডের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রেখেছে। অভিবাসন আইন এবং শ্রম আইন ও মানবাধিকারসহ বহু ব্যাপারে ব্রিটেন ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের মধ্যে মনোমালিন্য হয়েছে। ব্রিটেনের এক শ্রেণির মানুষ সব সময়ই মনে করেছে, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ব্রিটেনের সার্বভৌমত্ব গ্রাস করছে। ইউনিয়ন ছাড়ার প্রশ্নে তাদেরই জয় হয়েছে।

কিন্তু এই জয়লাভের পর সম্বিত ফিরেছে ব্রিটেনের বহু মানুষের। ইউরোপের সঙ্গে জোট না বেঁধে ব্রিটেন তাহলে কি করে একটি ইউরোপীয় শক্তি হিসেবে বাঁচবে? দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যহারা ব্রিটেন আমেরিকার গলগ্রহ দেশ হিসেবে টিকতে চেয়েছে। এমনকি লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে বলা হতো ল্যাপডগ অব বুশ। মনে হয়, ইইউ ত্যাগের পর বর্তমানে টরি প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে আমেরিকার ওপর নির্ভরতা বাড়াতে চান।

তিনি ইতিমধ্যেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ‘স্পেশাল রিলেশনশিপ’ গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন এবং বলেছেন, Opposites attract’ অর্থাৎ ট্রাম্প এবং তার বিপরীত চরিত্র হলেও পরস্পরকে তারা আকর্ষণ করেছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সমালোচকরা বলেছেন, ‘ট্রাম্প নির্যাতনের সমর্থক।’ বলেছেন ‘torture works’ (অত্যাচার কাজ দেয়)। এ ধরনের ব্যক্তির সঙ্গে কি করে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সখ্য গড়ে তুলবেন? জবাবে মে বলেছেন, ট্রাম্প ও তার ভিন্ন মত থাকতে পারে। কিন্তু তাদের একজন নির্বাচনে এবং অন্যজন ব্রেক্সিট ভোটে জেতার পর দু’জনে মিলে বিশ্বকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন।

এ সম্পর্কে এক ব্রিটিশ কলামিস্ট লিখেছেন, ‘তেরেসা মের এই স্বপ্ন টনি ব্লেয়ারও জর্জ বুশের সঙ্গে মিতালি করে দেখতে শুরু করেছিলেন। তাতে দুনিয়ার যে অবস্থা হয়েছে তার ধাক্কা এখনও সামলানো যাচ্ছে না। তেরেসা মে ব্লেয়ারের পথে চলতে চাইলে অদূর ভবিষ্যতে বিশ্ব কী চেহারা ধারণ করবে, তা ভাবনার বিষয়।’ – সমকাল

লন্ডন, ২৭ জানুয়ারি শুক্রবার, ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment