কালান্তরের কড়চা

এই কৌতুকনাট্যের পরিণতি কি কমেডি, না ট্র্যাজেডি?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

আমেরিকার রিপাবলিকান দলীয় আরেক সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান সম্পর্কে বাজারে একটি গল্প প্রচলিত আছে। কতটা সত্য তা জানি না।

রিগ্যান ছিলেন বি-মুভির অভিনেতা, তেমন খ্যাতিমান কেউ নন। ভাগ্যগুণে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে যাওয়ার পর একদিন হোয়াইট হাউসে ঘুম থেকে জেগে স্ত্রী ন্যান্সিকে জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘ন্যান্সি, আমি কি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়েছি, না প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় অভিনয় করছি?’ ন্যান্সি তাঁকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিনি প্রেসিডেন্ট হয়েছেন।

রিগ্যান জমানা গত হয়েছে বহুকাল হয়। এখন হোয়াইট হাউসে ঢুকেছেন রিপাবলিকান দলীয় আরেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি রাজনীতিকও নন। বিলিয়নেয়ার বিজেনসম্যান এবং রিয়ালিটি শোর অভিনেতা। এখন কেউ কেউ কৌতুক করে বলছেন, রোনাল্ডের মতো ডোনাল্ডও অপ্রত্যাশিতভাবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হয়ে যাওয়ার পর হয়তো ভাবছেন, তিনি এখন তাঁর টেলিভিশনের রিয়ালিটি শোতে প্রেসিডেন্টের ভূমিকায় অভিনয় করছেন।

ডোনাল্ড ট্রাম্প একজন নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট। কিন্তু তাঁর হাবভাব, হুমকি-ধমকি মধ্যযুগের সম্রাটদের মতো। একজন মার্কিন সাংবাদিকের মতে, প্রাচীন রোমের সম্রাট নিরোর মতো। তিনি কাউকে পরোয়া করেন না, কিছুই পরোয়া করেন না, এমন কমিক ক্যারেক্টারের ভাব দেখাচ্ছেন। নারীদের সম্পর্কে তাঁর অভব্য ও অসংযত মন্তব্যের পরও বিশ্বের একজন নারী প্রধানমন্ত্রীই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেছেন। তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে। তা নিয়েও বাজারে নানা কৌতুককর মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।

লন্ডনের ‘সানডে টাইমস’ ট্রাম্প-প্রেসিডেন্সি সম্পর্কে সহানুভূতিশীল। এই কাগজও মিসেস মের ওয়াশিংটন সফর সম্পর্কে সম্পাদকীয় নিবন্ধে (২৯ জানুয়ারি) লিখেছে, ‘There are those who think (absurdly) that Britain, and in particular a female Prime Minister, should have maintained a distance from Mr. Trump.’ (এমন ব্যক্তিরাও আছেন, যাঁরা ভাবেন (অবাস্তবভাবে) ব্রিটেন, বিশেষভাবে একজন মহিলা প্রধানমন্ত্রীর মি. ট্রাম্পের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখা উচিত ছিল)। ‘সানডে টাইমস’ তার এই মন্তব্যে absurdly কথাটা লাগিয়ে মি. ট্রাম্পের প্রত্যাঘাত থেকে হয়তো নিজেকে বাঁচাতে চেয়েছে।

কিন্তু কৌতুক আর কূটনীতি এক কথা নয়, আটলান্টিকের দুই পারের জাতীয় দৈনিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মের বৈঠকের সময়ের দু-একটি ঘটনা সম্পর্কে খবর ও মন্তব্য প্রচারে কূটনৈতিক শালীনতা বজায় রাখলেও অনেক ট্যাবলয়েড কাগজ সেই শোভনতা রক্ষা করেনি। ট্রাম্পের সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের মানুষ হয়ে টেরেসা মে কী করে সবার আগে তাঁর কাছে ছুটে গেলেন এই জিজ্ঞাসার জবাব হিসেবে তিনি যেন বলেছেন, ‘opposite attracts’. (বিপরীতই আকর্ষণ করে)। তাঁর এ মন্তব্য নিয়েও দুই দেশের এক শ্রেণির কাগজে টীকা-টিপ্পনী কম কাটা হয়নি।

হোয়াইট হাউসে হাঁটতে গিয়ে ট্রাম্প কী করে টেরেসা মের হাত চেপে ধরলেন, তা নিয়েও অনেক হালকা মন্তব্য হয়েছে। এই ছবি ফলাও করে বিশ্বের বেশির ভাগ বড় কাগজে ছাপা হয়েছে। ওয়াশিংটন থেকে ব্যাপারটি ধামাচাপা দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট সিঁড়ি বাইতে কিংবা উঁচু-নিচু পথে হাঁটতে ভয় পান। হোয়াইট হাউসের যে পথ দিয়ে টেরেসা মেকে নিয়ে তিনি হেঁটে আসছিলেন, সেটি অসমতল ছিল। প্রেসিডেন্ট তাঁর ফোবিয়া থেকে ভয়ে নিজের অগোচরেই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর হাত চেপে ধরেন। এই ব্যাখ্যা অবশ্য মেনে নেওয়ার মতো এবং অনেকেই মেনে নিয়েছেন।

টেরেসা-ট্রাম্প বৈঠক সম্পর্কে অনেকে আবার কূটনৈতিক শালীনতা বজায় রাখেননি। আমেরিকার একটি পলিটিক্যাল ওয়েবসাইটে এই বৈঠককে তুলনা করা হয়েছে, ‘a regional governor returning to Rome to greet the new emperor’। অর্থাৎ টেরেসা মে যেন রোম সাম্রাজ্যের কোনো অঞ্চলের গভর্নর। নতুন সম্রাটকে অভিনন্দন জানানোর জন্য রোমে ছুটে আসছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনে সম্ভাবনাপূর্ণ তরুণ প্রার্থী ইমানুয়েল ম্যাকরন তাঁর মন্তব্যেও কোনো কূটনৈতিক শালীনতা রাখেননি। মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক সম্পর্কে বলেছেন, ‘It confirmed Britain’s position as a vassal state of the US empire’. (এই বৈঠক মার্কিন সাম্রাজ্যের তাঁবেদার রাষ্ট্র হিসেবেই ব্রিটেনের অবস্থান প্রমাণ করেছে)।

এই বৈঠক সম্পর্কে ভালো-মন্দ মন্তব্য এখনো শেষ হয়নি। অনেকে বলছেন, এই বৈঠকে টেরেসা মের সাফল্য, তিনি ডোনাল্ডের কাছ থেকে ন্যাটোকে সমর্থনদানের প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পেরেছেন। সমালোচকরা বলছেন, ট্রাম্প যে ন্যাটোকে ১০০ ভাগ সমর্থন দেবেন সে সম্পর্কে তাঁর মুখ থেকে কিছু জানা যায়নি। যা বলার বলেছেন টেরেসা মে। সুতরাং ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি কতটা সঠিক, তা বলার সময় এখনো আসেনি। অন্যদিকে ট্রাম্পের রাশিয়ানীতিও টেরেসা মে বদলাতে পারেননি। তাঁর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বৈঠক শেষ হতে না হতেই জানা গেছে, পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্প শীর্ষ বৈঠকের উদ্যোগ নিয়েছেন।

আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেনের স্পেশাল রিলেশনস আরো পোক্ত করার জন্য টেরেসা মে ট্রাম্পকে লন্ডন সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু এই আমন্ত্রণ গ্রহণ করার সঙ্গে সঙ্গে ট্রাম্প একটি ব্যাপারে এই উষ্ণ সম্পর্কের ওপর ঠাণ্ডা পানি ঢেলে দিয়েছেন। জানা গেছে, নয়া প্রেসিডেন্ট ব্রিটেন সফরকালে প্রিন্স চার্লসের সঙ্গে দেখা করতে আগ্রহী নন। তাঁর পরিবর্তে চার্লসপুত্র উইলিয়াম ও হ্যারি তাঁকে প্যালেসে অভ্যর্থনা জানাবেন এটা তিনি চান। কারণ ক্লাইমেট চেঞ্জ ও গ্লোবাল ওয়ার্মিং সম্পর্কে প্রিন্স চার্লসের মতামতের তিনি ঘোর বিরোধী।

বিশ্বের আবহাওয়া পরিবর্তন এবং ক্রমাগত উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার বিবাদ সম্পর্কে প্রিন্স চার্লস ৪০ বছর ধরে সতর্কবাণী শোনাচ্ছেন এবং এই বিবাদ মোকাবিলার জন্য ক্যাম্পেইন চালাচ্ছেন। অন্যদিকে ট্রাম্প মনে করেন, ক্লাইমেট চেঞ্জের ব্যাপারটি একটি প্রতারণা (a hoax) এবং ‘মানি মেকিং ইন্ডাস্ট্রি’ হিসেবে চীনাদের জন্যই চীন এই ধুয়া তুলেছে। উদ্দেশ্য আমেরিকার ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রির ক্ষতি করা। ট্রাম্পশিবির থেকে বলা হয়েছে, প্রিন্স চার্লসের কাছ থেকে ক্লাইমেট চেঞ্জ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট কোনো লেকচার শুনতে চান না। ট্রাম্প যদি এই গোঁ ধরে থাকেন, তাহলে ব্রিটেনে তাঁর স্টেট ভিজিট অনিশ্চিত হয়ে উঠতে পারে।

ট্রাম্প যে ব্রিটেনে এই সরকারি সফরের পরোয়া করতে নাও পারেন তার প্রমাণ, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক তিনি এক কথায় বাতিল করে দিয়েছেন। কারণ মেক্সিকো সীমান্তে যে দেয়াল তোলার অর্ডার দিয়েছেন, সেই দেয়াল তৈরির খরচ বহনে মেক্সিকো রাজি নয়। ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন, তিনি মেক্সিকো থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ধার্য করা শুল্ক থেকে এই খরচ কেটে নেবেন।

আমেরিকার সঙ্গে স্পেশাল রিলেশনস জোরালো করার ব্যাপারে টেরেসা মের আন্তরিক চেষ্টা কতটা সফল হবে তা নিয়েও অনেকে সন্দেহ পোষণ করেন। ট্রাম্প ব্রিটেন সফরকালে প্রিন্স চার্লসকে এড়িয়ে চলার যে নীতি গ্রহণ করতে চান, তাতে কি রয়াল ফ্যামিলি তাঁকে আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করতে পারবে? এর আগে প্রিন্সেস ডায়ানা এবং পরে প্রিন্সেস কেট সম্পর্কে তিনি যে অশোভন মন্তব্য করেছেন তাতে ব্রিটিশ রাজপরিবারের তাঁর সম্পর্কে প্রীত থাকার কোনো কারণ নেই।

ট্রাম্প এক প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, তিনি মনে করেন প্রিন্সেস ডায়ানাকে তিনি পেতে পারতেন (‘I think I could have’)। সম্প্রতি প্রিন্স উইলিয়ামের স্ত্রী ডাচেস অব কেমব্রিজের (প্রিন্সেস কেট) সানবাথকালীন অর্ধনগ্ন ছবি গোপনে ক্যামেরায় ধারণ করে প্রকাশ করা হয়। ট্রাম্প সে সম্পর্কে টুইটে লিখেছেন, ‘কেট যদি নগ্ন হয়ে সানবাথ করতে পারেন, তাহলে কে তাঁর ছবি তুলে কিছু টাকা কামাতে চাইবে না?’ এ জন্য ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল থেকেই প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ট্রাম্প লন্ডন সফরে গেলে প্রিন্স চার্লস এবং তাঁকে এক ঘরে বসানো কি ঠিক হবে?’

ট্রাম্পের লন্ডন সফর সম্পর্কে ওয়াশিংটনের মনে আরো শঙ্কা রয়েছে। এই সফরকালে ব্রিটেনের হাজার হাজার মানুষ যে তাঁর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে রাস্তায় নামবে, এটা তারা নিশ্চিত ধরে নিয়েছে। ট্রাম্পের আগে জর্জ বুশ জুনিয়র গালফ ওয়ারের পর লন্ডন সফরে এসে যে গণবিক্ষোভের মুখে বাকিংহাম প্যালেস থেকে বাইরে বেরোতে পারেননি, ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন লন্ডনে এলে তাঁর চেয়েও বড় বিক্ষোভ হবে। বিশেষ করে নারী বিক্ষোভ উত্তাল হয়ে উঠবে। এমনিতেই ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গে ইরানসহ সাতটি মুসলিম দেশের নাগরিকদের আমেরিকায় ঢোকা প্রায় নিষিদ্ধ করে দিয়ে তিনি দেশে-বিদেশে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও বিক্ষোভের সম্মুখীন হয়েছেন। আমেরিকায়ও চলছে বিক্ষোভ এবং তার এয়ারপোর্টগুলোতে ক্ষুব্ধ ও আটকে পড়া নিরীহ মানুষের বিক্ষোভ চলছে।

ট্রাম্পের আচার-আচরণকে অনেকে ডন কুইকজোটের যুদ্ধযাত্রার সঙ্গে তুলনা করছেন। ট্রাম্পও আমেরিকাকে আবার গ্রেট বানানোর স্লোগান তুলে সর্বত্র অদৃশ্য শত্রু দেখছেন। তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এর পরিণতি কী? ডন কুইকজোটের পরিণতি হয়েছিল ট্র্যাজিক। একটি কৌতুক চরিত্রের ট্র্যাজিক পরিণতি! ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেলায়ও তাই ঘটবে কি? একটি বিশাল ও শক্তিশালী রাষ্ট্রের তিনি কর্ণধার হয়েছেন, এ কথা যদি তিনি বুঝতে পারেন, তাহলে হয়তো তিনি বদলাবেন, নইলে রবীন্দ্রনাথ-কথিত দানবের মূঢ় ও ট্র্যাজিক পরিণতিই কি বিশ্ববাসীকে একদিন প্রত্যক্ষ করতে হবে? – কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment