দশ দিগন্তে

এরশাদ সাহেবের বয়ান এবং বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

জেনারেল এরশাদ আবার ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। স্বপ্ন দেখাতে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদেরও স্বপ্ন দেখায় কারো আপত্তি নেই। চীনের কুয়োমিংটাং দলীয় প্রেসিডেন্ট জেনারেল চিয়াং কাই শেকও ক্ষমতাচ্যুত ও মূল ভূখণ্ড থেকে বিতাড়িত ফরমোজায় আশ্রয় গ্রহণের পর প্রতি বছর ঘোষণা করতেন, তিনি আগামী বছরের মধ্যেই চীনের মূল ভূখণ্ডে অভিযান চালাবেন এবং আবার চীনের ক্ষমতা দখল করবেন। বছরের পর বছর তিনি এই হুমকি দিয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন অপূর্ণ রেখেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

দেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের জীবনেও এমনটা ঘটবে তা আমি ভাবি না এবং সে কামনাও করি না, তবে চিয়াং কাই শেকের বয়সে পৌঁছে তার এমন স্বপ্ন দেখা উচিত নয়। আমি তার শুভাকাঙ্ক্ষী বলেই একথা বলছি। স্বপ্নভঙ্গের বেদনা বড় দারুণ। তিনি এই বেদনা এই বয়সে কেন বইতে যাবেন? চিয়াং কাই শেক ভাবতেন, আমেরিকার সহায়তায় তিনি আবার চীনের মূল ভূখণ্ড দখল করবেন, তার কুয়োমিংটাং পার্টি আবার ক্ষমতায় যাবে। চিয়াং কাই শেক অলীক আশার পেছনে ঘুরেছেন। এরশাদ সাহেব কেন ঘুরছেন? তিনি কি জানেন না আমেরিকা ঘোড়া বদলের রাজনীতিতে পারদর্শী। ব্যবহৃত ঘোড়া তারা দু’বার ব্যবহার করেন না?

জেনারেল এরশাদ জনগণের সমর্থনে ক্ষমতায় ছিলেন না। বাস্তবতা হচ্ছে এই যে, তিনি একটি নির্বাচিত সরকারকে বন্দুকের জোরে ক্ষমতা থেকে হটিয়ে নিজে ক্ষমতা দখল করেছিলেন। দেশের এবং বিদেশের পরিস্থিতি তখন তাঁর ক্ষমতায় বসার ও ক্ষমতায় থাকার অনুকূল ছিল। ক্যান্টনমেন্টের সমর্থন ছিল তাঁর পেছনে। দেশের সুবিধাভোগী এলিট শ্রেণি (নাকি সুশীল সমাজ) সহজেই জিয়াউর রহমানের বদলে তাঁকে ত্রাতা হিসেবে মেনে নিয়েছিল।

তিনি জিয়াউর রহমানের চাইতে বুদ্ধিমান একথা অবশ্যই স্বীকার্য, তিনি ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশের তত্কালীন সরকারকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, তিনি তাদের নির্ভরযোগ্য মিত্র। পাকিস্তান তাই তাঁকে ‘নিশানে পাকিস্তান’ খেতাব দিয়েছিল এবং ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী তাঁকে কিছুকালের জন্য তাদের বিশ্বাসযোগ্য মিত্র বলে ধরে নিয়েছিলেন। ফলে বাংলাদেশের উড়িরচরে ভয়াবহ ঝড়ের সময় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী শ্রীলঙ্কার তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জয়াবর্ধানেকে সঙ্গে নিয়ে এবং প্রচুর ত্রাণসামগ্রীসহ সরাসরি উড়িরচরে ছুটে এসেছিলেন। তাঁর দেখাদেখি পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকও তখন বাংলাদেশে চলে এসেছিলেন। পরে সম্ভবত তাঁর সম্পর্কে দু’দেশেরই ভুল ভাঙতে দেরি হয়নি।

প্রেসিডেন্ট এরশাদ সে সময়ের বিশ্ব-রাজনীতির কারণে পাকিস্তান, চীন, সউদি আরবের সমর্থন আদায়ে সক্ষম হয়েছিলেন। বিএনপি’র উদ্যোগে বাংলাদেশে ভারত-বিদ্বেষী নীতির উন্মেষের যুগে তিনি দিল্লির সামনে এই মরীচিকা সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, ইসলামাবাদের নয়, তিনি দিল্লিরই পরম বন্ধু, রাজীব গান্ধী বেঁচে থাকতেই দিল্লি এই বিভ্রান্তি কাটিয়ে ওঠে। তিনি একে একে তার বিদেশি পৃষ্ঠপোষকদের সমর্থন হারান। তার দুর্নীতি, নারীপ্রীতি ও স্বেচ্ছাচারী শাসনে যখন দেশের মানুষ “এরশাদ হটাও আন্দোলন” শুরু করে তখন ক্যান্টনমেন্টও তার উপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে। তাকে গণআন্দোলনের তীব্রতার মুখে পদত্যাগ করতে হয়।

পরবর্তীকালে সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “তিনি স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে দেশে শান্তিপূর্ণ পন্থায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করেছেন।” কথাটা তিনি সঠিক বলেছেন কি? তার সরকারের বিরুদ্ধে উত্তাল গণবিক্ষোভের মুখে তিনি সেনাবাহিনীর সাহায্যে গণআন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন। এটা এখন ওপেন সিক্রেট যে, তখনকার সেনাপ্রধান জেনারেল নূরুদ্দীন ও তার সহযোগীরা তাতে সম্মত হননি। বাধ্য হয়ে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়। ক্ষমতা ছাড়ার পরও গৃহবন্দী হওয়ার আগে তিনি সেনাবাহিনীর মুষ্টিমেয় অনুগত অফিসারের সাহায্যে একটি ক্যু ঘটিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে চেয়েছিলেন, তাতে ব্যর্থ হন।

সম্প্রতি রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এক মতবিনিময় সভায় তিনি দুঃখ করে বলেন, ক্ষমতা হারানোর পর তাকে ৫ কোটি টাকা জরিমানা ও ৬ মাসের জেল দেওয়া হয়েছিল। “বিএনপি আমাকে কারাগারে রেখে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল। কিন্তু দেশের মানুষের ভালোবাসা আমাকে নতুন জীবন দিয়েছে, আমি মরিনি”—সাবেক রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের মধ্যেও কিছু তথ্যবিকৃতি আছে।

স্বৈরাচারী শাসকেরা গণঅভ্যুত্থানের মুখে সাধারণত নিহত হন অথবা দেশ ছেড়ে পালান। জেনারেল এরশাদ পরম সৌভাগ্যবান, এর কোনোটাই তার ভাগ্যে ঘটেনি। দেশের মানুষের ভালোবাসা নয়, তাদের সহিষ্ণুতা তাকে রক্ষা করেছে। আরো রক্ষা পেয়েছেন, শেখ হাসিনা ও বেগম খালেদা জিয়া দুই নেত্রীই তার বিরুদ্ধে চরম প্রতিশোধপরায়ণ হননি। বরং দু’জনেই পরবর্তীকালে তাকে তাদের রাজনৈতিক মোর্চায় স্থান দিয়েছেন। ফলে ছ’বছর জেল খেটেই তিনি ছাড়া পেয়েছেন এবং রাজনীতিতে আবারো পুনর্বাসিত হয়েছেন।

কিন্তু রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হলে কী হবে, তিনি তার রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির ঐক্য ধরে রাখতে পারেননি। তার পার্টি ভেঙেই নতুন দল জেপি গঠিত হয়েছে। বর্তমান হাসিনা সরকারে যেমন তার জাতীয় পার্টির মন্ত্রী আছেন, তেমনি জেপিরও মন্ত্রী রয়েছেন। তার উপর তার অংশের জাতীয় পার্টিতেও ঐক্য নেই। দলের সংসদীয় নেত্রী এবং তার স্ত্রী বেগম রওশন এরশাদের সঙ্গেও তার বিবাদ মাঝে মাঝেই মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তা ছাড়া তার বহুরূপী কাজ ও কথাবার্তায় জনগণের আস্থা তার উপর মোটেও নেই।

তার দল ও সরকারে যারা প্রভাবশালী নেতা ও মন্ত্রী ছিলেন, যেমন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও কাজী জাফর (প্রয়াত) তারা দল ছেড়েছেন বহু আগে। মওদুদ এখন বিএনপির নেতা এবং কাজী জাফর মৃত্যুর আগে পাল্টা জাতীয় পার্টি গঠন করে বিএনপির শিবিরে যুক্ত হয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ঘেঁষা বলে কথিত আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং শেখ শহীদুল ইসলামও বহুদিন আগে তাকে ত্যাগ করে জেপি নামে পাল্টা দল গঠন করেছেন। ফলে এরশাদ সাহেব এখন যাদের নিয়ে তার ভাঙা দল চালাচ্ছেন, তাদের নিয়ে আগামী নির্বাচনে জিতে আবার ক্ষমতায় যাবেন এমন আশা রংপুরের মতবিনিময় সভায় প্রকাশ করেন কিভাবে? এটা কি চীনের চিয়াং কাই শেকের মতো আবার চীনে ক্ষমতা দখলের আশা প্রকাশ নয়?

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা হচ্ছে, জেনারেল এরশাদ এখন জনগণের চোখে একজন ব্যর্থ ও পতিত সামরিক শাসক। বিভিন্ন দলের ও মতের মানুষ জড়ো করে তিনি যে রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন তার একমাত্র ভিত্তি ছিল ক্ষমতা। তার হাত থেকে ক্ষমতা চলে যেতেই দলও বহুধা বিভক্ত ও দুর্বল হয়ে গেছে। তাছাড়া এরশাদ সাহেবেরও বার বার ভোল পাল্টানো জনগণের কাছে তার নিজের ও দলের ক্রেডিবিলিটি অনেকটাই ধ্বংস করেছে। এ অবস্থায় তিনি কী করে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা তলানিতে গেছে,’ কিংবা ‘বিএনপি আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না, ক্ষমতায় আর আসতে পারবে না, তা কোনো সুস্থ মানুষের পক্ষে বোঝা মুশকিল। রংপুরের মতবিনিময় সভায় তিনি জোর গলায় বলেছেন, আওয়ামী লীগ যখন জনপ্রিয়তা হারিয়েছে এবং বিএনপি আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না, তখন তার দলই নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবে। সুতরাং তিনি আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেবেন।

এটা কি আরব্য রজনীর আবু হোসেনি স্বপ্ন নয়? দেশের রাজনীতি এখন দু’ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও সেক্যুলার রাজনীতিতে বিশ্বাসী জোট, যার নেতৃত্বে রয়েছে আওয়ামী লীগ এবং অন্যদিকে রয়েছে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ছদ্মাবরণে সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ ও পাকিস্তানি মডেলের ধর্মাশ্রিত রাজনীতিতে বিশ্বাসী জোট। যার নেতৃত্বে বিএনপি আসীন। ক্ষমতাহারা হয়ে বিএনপি এখন দুর্বল অবস্থায় থাকতে পারে, কিন্তু তার একটি অটুট ভোট বাক্স আছে, যা এরশাদ সাহেব বা জাতীয় পার্টির নেই।

তাহলে সাবেক সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতি হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের বর্তমান অবস্থানটা কোথায়? তিনি নিজেই একবার বলেছেন, আদর্শ ও নীতির ক্ষেত্রে তিনি বিএনপি’র কাছাকাছি। অর্থাত্ তিনি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করেন। অথচ এখন তিনি আছেন বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের শিবিরে। গরজ বড় বালাই। তাকে বিভিন্ন মামলা-মোকদ্দমা থেকে বাঁচতে হবে। তিনি নিজেই বলেছেন, তার পায়ে এখনো শিকল রয়েছে। তাহলে এখন তার নিজের এবং তার দলের অবস্থানটা কোথায়? সংসদে তার দলের অবস্থান Her majesty’s loyal opposition-এর মতো। সংসদের বাইরে তিনি “আওয়ামী লীগের আমলে জীবনের নিরাপত্তা নেই,” “মানুষ শান্তিতে ঘুমাতে পারছে না” বলে চিত্কার জুড়েছেন। অথচ রাজনীতিতে টিকে আছেন বা ঝুলে আছেন আওয়ামী লীগের রাজনীতির ডাল ধরে। এই অবস্থায় তিনি কি ভাবেন, বাংলার মসনদে তিনি আবার বসবেন? তার হাতিশালে হাতি এবং ঘোড়াশালে আবার ঘোড়া ডাকবে?

রংপুরের মতবিনিময় সভায় সাবেক রাষ্ট্রপতি বলেছেন, “তার অনুগ্রহে বা আনুকূল্যে ২১ বছর পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় এসেছে।” এটাও ইতিহাস-বিকৃতি। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার চেষ্টা করেছেন জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদ দুজনেই। তারা ব্যর্থ হয়েছেন। জনগণের সমর্থনপুষ্ট দলটিকে ধ্বংস করা যায়নি। ’৭৫ এর বিপর্যয়ের পর আওয়ামী লীগ যে আবার জেগে ওঠে তার কারণ, দলে নতুন এবং শক্তিশালী নেতৃত্বের (হাসিনা-নেতৃত্ব) প্রতিষ্ঠা। এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে এরশাদ হটাও আন্দোলন করেই আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসেছে। এরশাদ সাহেবের অনুগ্রহে ক্ষমতায় আসেনি।

বরং বলা চলে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনার অনুগ্রহেই জেনারেল এরশাদ ১৯৯০ সালে জনরোষ থেকে বেঁচে গেছেন। তাকে দেশ ছেড়ে পালাতে হয়নি। বিএনপি এবং খালেদা জিয়া যদি সেসময় সুযোগ পেতেন, তাহলে এই সাবেক রাষ্ট্রপতির কপালে কী ঘটতো, তা এখন ভাবাই যায় না। তিনি নিজেই বলেছেন, “বিএনপি আমাকে কারাগারে রেখে ফাঁসি দিতে চেয়েছিল।” তাহলে তিনি বাঁচলেন কী করে? এরশাদ সাহেবকে অনুরোধ জানাই, তিনি সত্য স্বীকারের সৎ সাহস দেখান। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ]

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment