ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে ড.অমিত চাকমাকে ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রি প্রদান

রাঙ্গামাটি রিপোর্ট –

আনন্দঘন উৎসবমুখর পরিবেশে গতকাল অনুষ্ঠিত হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫০তম সমাবর্তন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রপতি ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর মো: আবদুল হামিদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো: এনামউজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অন্টারিও -এর প্রেসিডেন্ট ও ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. অমিত চাকমা। সাইটেশন পাঠ ও ভাষণ প্রদান করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক । এ সময় ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে বক্তব্য দেন প্রো-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. নাসরীন আহমদ। অনুষ্ঠানে  উপস্থিত ছিলেন প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. মো: আখতারুজ্জামান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো: কামাল উদ্দীনসহ মন্ত্রীপরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য, বিভিন্ন কূটনৈতিক কমিশনের প্রধান, বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট-সিন্ডিকেট সদস্য ও একাডেমিক পরিষদের সদস্যগণ।

সমাবর্তন অনুষ্ঠানে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন ওন্টারিও-এর প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. অমিত চাকমাকে ‘ডক্টর অব সায়েন্স’ ডিগ্রি প্রদান করা হয়। অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬১ জন গবেষককে পিএইচডি, ৪৩ জনকে এমফিল, ৮০ জনকে স্বর্ণপদক এবং ১৭ হাজার ৮শ’ ৭৫ জন গ্র্যাজুয়েটকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি প্রদান করা হয়। সংশ্লিষ্ট অনুষদের ডিনগণ অনুষদভুক্ত বিভাগ ও ইনস্টিটিউটের ডিগ্রিপ্রাপ্ত গ্র্যাজুয়েটদের নাম উপস্থাপন করেন।

এবারের সমাবর্তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগে পড়ুয়া ২৫ জনের অধিক পাহাড়ি শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করেন । তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিদ্যা বিভাগ থেকে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করা ড. নিখিল চাকমা।

উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এই লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয় সমূহে জ্ঞান ভিত্তিক কাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সকল শিক্ষার মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানব কল্যাণ। শুধু সার্টিফিকেট অর্জন বা পরীক্ষায় ভাল ফলাফল করে দেশের কল্যাণ সাধন সম্ভব নয়। এ জন্য তাদের ভাল মানুষ হতে হবে। বর্তমান বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে ছাত্র-ছাত্রীদের আন্তর্জাতিক মানের গ্র্যাজুয়েট হতে হবে।

কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন ওন্টারিও-এর প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর অধ্যাপক অমিত চাকমা বলেন, জীবনে সফল হওয়ার জন্য ৩টি বৈশিষ্ট্য যোগ্যতা, কর্মনিষ্ঠা ও চারিত্রিক গুণের দরকার। নিজের দক্ষতা ও মেধাকে কাজে লাগিয়ে এসব গুণ অর্জন করতে হবে। ভাল ও মন্দের বিচার করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নীতির ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। নীতি ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় সকল গ্র্যাজুয়েট নেতৃত্ব দিলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল হবে।

তিনি বলেন, যারা নেতৃত্বের পদ অলঙ্কৃত করেন তাদের সবার মধ্যেই যোগ্যতা এবং কর্মনিষ্ঠা থাকে। লোক বিশেষে এই দুটোর ব্যবধান খুব বেশি হওয়ার ঘটনা কম। ক্যারেক্টার এমন একটি বিশেষ গুণ; ব্যক্তি হিসেবে তার অনেক ব্যবধান থাকে। আর এই ক্যারেক্টারের মাধ্যমে আপনারা আপনাদের স্বক্রিয়তা, গুণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। আপনারা অনেক বিষয়ে পড়াশুনা করেছেন, কিন্তু শিক্ষা শুধু শাস্ত্রের জ্ঞান অর্জন করা নয়। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হল জ্ঞানের মাধ্যমে মনের জানালা খুলে দেওয়া।মনকে বিকশিত করা, আরও উন্মুক্ত করা। শিক্ষার আলো দিয়ে অজ্ঞানতাকে মুছে দিয়ে জ্ঞানের আলোকে উন্মোচিত করা।,

তিনি আরো বলেন, ‘আমার মূল উদ্দেশ্য হলে- ক্যারেক্টারের  বিষয়ে আপনাদের সচেতন করা। আপনারা সকলে মেধাবী বলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি অর্জন করতে পেরেছেন। এই ডিগ্রি আর মেধাকে কিভাবে কাজে লাগাবেন তার উপর নির্ভর করবে আপনাদের সফলতা। আপনাদের মেধাকে ভালো কাজে লাগাতে হবে। আপনাদের মতো মেধাবান যুব সমাজের প্রয়োজন শুধু বাংলাদেশেরই নয় সারাবিশ্বের। যুগ যুগ ধরে মানবজাতি যেমন অনেক অগ্রগতির দিকে যাচ্ছে, তেমনি অনেক সমস্যার  উৎপত্তি হয়েছে। অতীতে যেমন মানবজাতি তাদের মেধা কাজে লাগিয়ে সমস্যার সমাধান করেছে, তেমনি বর্তমানে আপনাদের মেধাকে কাজে লাগিয়ে সমস্যা সমাধানের উপায় বের করতে হবে।এর জন্য জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে হবে। মনে রাখবেন এই ডিগ্রি আপনাদের শিক্ষাযাত্রার সমাপ্তি নয়। এটা এক বিশেষ মাইলফলক মাত্র। লার্নিং ইজ এ লাইফ লং প্রোসেস।’

ড. অমিত চাকমা বনরূপা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেছেন। এর পর  তিনি রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উর্ত্তীর্ণ হন। পরে তিনি উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন ঢাকা কলেজ থেকে। এরপর স্কলারশিপ নিয়ে তিনি পেট্রোলিয়ম বিষয়ে আলিজিরিয়ায় পড়তে যান।

প্রফেসর ড. অমিত চাকমা কানাডার বিখ্যাত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি অব ওয়েষ্টার্ন অন্টারিও’এর প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করায় বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বিশ্বে উজ্জ্বল করেছেন । তিনি বিশ্বে অধিষ্ঠিত হয়েছেন বিরল সম্মানে। তিনি বাংলাদেশের গর্ব ও অহংকার।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত প্রফেসর ড. অমিত চাকমার জন্ম ১৯৫৯ সালের ২৫ এপ্রিল এক চাকমা পরিবারে। জন্মস্থান বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলা শহরের পশ্চিম ট্রাইবেল আদাম এলাকায়। তার পিতা প্রভাত কুমার চাকমা ও মাতার নাম আলোরাণী চাকমা। তিন ভাই দু’বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment