কালান্তরের কড়চা

২৫ মার্চের গণহত্যার দিনটি অচিরেই আন্তর্জাতিক দিবস হয়ে উঠবে

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশের পার্লামেন্টে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। দীর্ঘ ৪৬ বছর কেটে যাওয়ার পর এই অভূতপূর্ব বর্বরতার শিকার সাধারণ মানুষ, বুদ্ধিজীবী ও মনীষীদের আত্মত্যাগের প্রতি জাতীয়ভাবে শ্রদ্ধা ও সম্মান জানানো হলো। গত শনিবার ১১ মার্চ দিনটি তাই আমাদের ইতিহাসের আরেকটি মাইলফলক হয়ে গেল। সম্ভবত স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও তা হতো না, যদি স্বাধীনতাযুদ্ধের পক্ষের একটি জোট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এখন ক্ষমতায় না থাকত। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনাই জাতির মনের ক্ষোভ দূর করলেন, তাদের দাবি পূরণ হলো। হাসিনা সরকারের এই কৃতিত্বও জাতির ইতিহাসে গ্রন্থিত থাকবে চিরকাল।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনে ১১ মার্চ তারিখটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য আছে। ১৯৪৮ সালে আমাদের স্বাধীনতার উত্স বাংলা ভাষা আন্দোলন শুরু হয়। তখন থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত ১১ মার্চ ছিল ভাষা দিবস। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত ঘটনার আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের মানুষ ১১ মার্চকে ভাষা আন্দোলনের দিবস হিসেবে পালন করত। ভাষা আন্দোলন থেকেই স্বাধীনতার আন্দোলন। আর কাকতালীয় ব্যাপার হলো, এই ১১ মার্চ তারিখেই স্বাধীনতার পর জাতীয় সংসদ ২৫ মার্চের বর্বর হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে পাকিস্তানি হানাদারদের গণহত্যার দিবস হিসেবে চিহ্নিত করে প্রতিবছর আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের ব্যবস্থা করল। এতকাল অনানুষ্ঠানিকভাবে জনগণ যে দিবসটি (২৫ মার্চ) স্মরণ করেছে, এখন তা আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের একটি জাতীয় দিবসে পরিণত হলো।

কিন্তু এই ২৫ মার্চ দিবসটি সব আনুষ্ঠানিকতার বাইরে একটি সর্বজনীন, শুধু সর্বজনীন নয়, বিশ্বজনীন দিবস হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। যা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের ২১ ফেব্রুয়ারি দিবসটি। ১৯৫২ সালে ভাষার দাবিতে ঢাকার রাজপথে প্রাণ দিয়েছেন একদল দামাল যুবক। এই হত্যাকাণ্ডও ঘটিয়েছিল তত্কালীন পাকিস্তানি শাসকরা। হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে তারা ভেবেছিল মানুষের মুখ থেকে তাদের মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে পারবে। তা তারা পারেনি।

বরং সেই আন্দোলন ছড়িয়ে গেল বিশ্বময়। বিশ্বের যেকোনো স্থানে যত অনাহৃত, উপেক্ষিত ভাষা আছে, যত পীড়িত জনগোষ্ঠী ছিল মৌন ও মূক, তারা আবার সরব হয়ে উঠল। বাংলা ভাষার আন্দোলন তাদের প্রেরণা। ফলে ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করল আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে। এখন সারা বিশ্বে এই দিবসটি পালিত হয়। ভাষা আন্দোলনের গানে মুখরিত হয় বাংলাদেশ থেকে শুরু করে সুদূর আফ্রিকার সিয়েরা লিওন পর্যন্ত।

আমার ধারণা, একুশে ফেব্রুয়ারির মতো বাংলাদেশের ২৫ মার্চের গণহত্যার দিবসটিও একদিন একটি আন্তর্জাতিক দিবসে পরিণত হবে। সম্ভবত সে দিনটি খুব বেশি দূরে নয়, যে দিন মে দিবস ও একুশে দিবসের মতো বাংলাদেশের ২৫ মার্চের গণহত্যা দিবসটিও সারা বিশ্বে গণহত্যার প্রতিবাদ দিবস হিসেবে পালিত হবে। এ প্রতিবাদ হবে শুধু ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের গণহত্যার নয়, সারা বিশ্বের অতীতের ও বর্তমানের সব ধরনের গণহত্যার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দিবস হিসেবে। সে দিন পাকিস্তানও এই দিবস পালনে শরিক হতে পারে। কেন, একুশে ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ডের নায়ক পাকিস্তান প্যারিসে ইউনেসকোর বৈঠকে যখন একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস ঘোষণার প্রস্তাব উঠেছিল, তখন কি সমর্থন জানায়নি? তারা জানিয়েছিল।

পাকিস্তানি শাসকরা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে তাদের হানাদার বাহিনীর নারকীয় অত্যাচারের কথা অস্বীকার করে আসছে। এই চেষ্টা তারা একুশে ফেব্রুয়ারির হত্যাকাণ্ড সম্পর্কেও করেছিল। পরে তাদের শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছিল। পাকিস্তানের বর্তমান প্রজন্মের শাসকরা যখন ক্ষমতার মঞ্চ থেকে বিদায় নেবে; দেশটির নতুন প্রজন্মের নতুন শাসকরা ভবিষ্যতে প্রকৃত গণতন্ত্রের অনুসারী হয়ে তাঁদের পূর্বসূরিদের কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হবেন, তখন এই গণহত্যা দিবস পালনে তাঁরাও দ্বিধা করবেন না বলে আমার ধারণা।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর এটা জার্মানিতেও ঘটেছে। যুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের ৬০ বছর পূর্তি ইউরোপব্যাপী পালনের একবার ব্যবস্থা হয়েছিল। তাতে ব্রিটেন, ফ্রান্স, আমেরিকার সঙ্গে জার্মানিও যোগ দিয়েছিল। কারণ এটাকে জার্মানির পরাজয় দিবস হিসেবে পালন করা হয়নি। করা হয়েছিল ফ্যাসিবাদের পতন দিবস হিসেবে। হিটলারের ফ্যাসিবাদী শাসনে জার্মানির মানুষও নিপীড়িত হয়েছে। তাদের বহু কবি-সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীকে হিটলার হত্যা করেছে। সুতরাং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরাজয়কে জার্মানি নিজের পরাজয় বলে গণ্য করেনি। গণ্য করেছে ফ্যাসিবাদের পরাজয় হিসেবে। জার্মানির নতুন প্রজন্মের শাসকরা তাই ব্রিটিশ, আমেরিকান  ও ফরাসিদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ফ্যাসিবাদ পতনের ৬০ বর্ষ পূর্তি উত্সবে যোগ দিয়েছিল বেশ কয়েক বছর আগেই।

এই ঘটনা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানেও ঘটেছে। পাকিস্তানের ভুট্টো সরকার বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যখন ইসলামী শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোরে যান, তখন লাহোরের একটি উর্দু কাগজে লেখা হয়েছিল, ‘শেখ মুজিব শুধু বাংলাদেশের ত্রাতা নন, তিনি পাকিস্তানের মানুষেরও ত্রাতা। পাকিস্তানের সামরিক জান্তার সঙ্গে যুদ্ধ করে তিনি বাংলাদেশকে স্বাধীন করেছেন এবং পাকিস্তানের মানুষকেও নিষ্ঠুর সামরিক শাসন থেকে মুুক্ত করেছেন। ’ বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে পরাজয়ের পরই পাকিস্তানে সামরিক জান্তার পতন হয়েছিল। জনগণ কিছুকালের জন্য হলেও গণতন্ত্র ফিরে পেয়েছিল।

পাকিস্তানের শাসকরা এখন পর্যন্ত তাদের জনগণকে বাংলাদেশে তাদের গণহত্যা সম্পর্কিত প্রকৃত বিবরণ জানতে দেয়নি। কিন্তু যেসব প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী এই বিবরণ জানেন, তাঁরা লজ্জিত ও অনুতপ্ত। তাঁদের অনেকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনাও করেছেন। ইতিহাসের সত্য কখনো মুছে ফেলা যায় না। পাকিস্তানের মানুষ একদিন সব সত্য জানবে এবং তারাও এই গণহত্যার প্রতিবাদে সরব হবে। পাকিস্তানে প্রকৃত গণতন্ত্র ফিরে এলে ও সেনাবাহিনীর খবরদারিমুক্ত প্রকৃত গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে তারাও বাংলাদেশের সঙ্গে তখন সহমর্মিতা অনুভব করবে ও ২৫ মার্চের গণহত্যা দিবসকে পাকিস্তানবিরোধী দিবস হিসেবে গণ্য না করে বিশ্বের অতীতের ও বর্তমানের সব গণহত্যার আন্তর্জাতিক  প্রতিবাদ দিবস হিসেবে অবশ্যই পালন করবে।

শতাব্দীকালেরও বেশি আগে শিকাগো শহরে শ্রমিক সমাবেশের ওপর গুলি চালিয়েছিল পুলিশ। মারা যান অসংখ্য শ্রমিক। তাতে শুধু শিকাগো শহর বা আমেরিকা নয়, গর্জে উঠেছিল সারা বিশ্বের শ্রমিক শ্রেণি। এই শ্রমিক হত্যার দিবসটি মে দিবস নামে এখন সারা বিশ্বে পালিত হয়। কারণ এই দিবসটি এখন আর শুধু শ্রমিক হত্যা দিবস নয়, বিশ্বের শ্রমিকদের স্বার্থ, অধিকার ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার দিবস। সাম্প্রতিককালে পশ্চিমা ধনবাদী দেশগুলো নানাভাবে এ দিবসটি পালনের গুরুত্ব হ্রাসের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারা তাতে সফল হয়নি।

২৫ মার্চের গণহত্যাটি বাংলাদেশে সংঘটিত হলেও সারা বিশ্বের মানবতাকে তা আঘাত করেছে। এই গণহত্যার প্রতিবাদ উঠেছে সারা বিশ্বে। এই হত্যার প্রতিবাদে নিউ ইয়র্কে বিশাল গণজমায়েত হয়েছে। তাতে দল বেঁধে বিশ্বখ্যাত গায়ক, কবি, শিল্পীরা যোগ দিয়েছেন। ফ্রান্সের দার্শনিক বুদ্ধিজীবী আঁন্দ্রে মার্লো প্রতিবাদ জানিয়েছেন। ভারতের ওস্তাদ রবিশঙ্কর বিক্ষোভ সমাবেশে সেতার বাজিয়েছেন। ভারতের ইন্দিরা গান্ধী শুধু বাংলাদেশের এক কোটি শরণার্থীকে তাঁর দেশে আশ্রয়ই দেননি, তাঁর সেনাবাহিনীর অন্তত ২০ হাজার জওয়ান ও অফিসার এই নৃশংস গণহত্যার প্রতিরোধ যুদ্ধে সাহায্য দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন রক্ষার জন্য আবেদন প্রচার করেছে আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, তখনকার বিশ্বের দুই সুপারপাওয়ার।

এই দিবসটির গুরুত্ব তাই বিশ্বজনীন। বর্বর গণহত্যার বিরুদ্ধে বিশ্বমানবতার প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ দিবস হিসেবেই এই দিনটি সারা পৃথিবীতে পালিত হওয়া উচিত এবং অদূর ভবিষ্যতে যে তা হবে, সে সম্পর্কে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই। একুশের বিশ্বায়নে যেমন সফল ভূমিকা ছিল হাসিনা সরকারের, তেমনি গত ১১ মার্চ বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণার কৃতিত্বও হাসিনা সরকারের। বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের এই সিদ্ধান্ত ২৫ মার্চের গণহত্যা দিবসকে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে পালনের সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। ১৯৭৫ সালের ন্যাশনাল ট্র্যাজেডির পর সামরিক ও স্বৈরাচারী সরকারগুলো আমাদের স্বাধীনতাযুদ্ধের সব অর্জন ও মূল্যবোধ একে একে ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছিল। হাসিনা সরকার ক্ষমতায় না এলে ও টিকে থাকতে না পারলে এই অর্জন ও মূল্যবোধগুলোর পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা কখনোই সম্ভব হতো না। আর কোনো কারণে নয়, এই একটি মাত্র কারণেই শেখ হাসিনার নামটি ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, রবিবার, ১২ মার্চ ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment