খাগড়াছড়ি সদরসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সমাবেশ

২৮ এপ্রিল, ২০১৭
প্রেস বিজ্ঞপ্তি –

সকল প্রকার নারী নির্যাতন ও খুনের বিচার কর! রমেল খুনীদের বিচর কর। এ স্লোগান নিয়ে ধর্ষণের মেডিকেল টেস্ট রিপোর্ট প্রদানে পার্বত্য চট্টগ্রামে জারিকৃত সরকারি গোপণ নিষেধাজ্ঞা বাতিলের দাবীতে আজ ২৮ এপ্রিল ২০১৭ (শুক্রবার) খাগড়াছড়ি সদরের স্বনির্ভরস্থ ইউপিডিএফ কার্যালয়ের সম্মুখে চৌরাস্তা মোড়ে সকাল সাড়ে ১০টায় সমাবেশ করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামে আন্দোলনরত ৫ নারী সংগঠন (হিল উইমেন্স ফেডারেশন, পার্বত্য চট্টগ্রাম নারী সংঘ, সাজেক নারী সমাজ, ঘিলাছড়ি নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি, নারী আত্মরক্ষা কমিটি)।

হিল উইমেন্স ফেডারেশন জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক চৈতালি চাকমার সঞ্চালনায় কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নিরূপা চাকমা’র সভাপতিত্বে সমাবেশে বক্তব্য রাখেন, ইউপিডিএফ-এর জেলা সংগঠক মিঠুন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক জিকো ত্রিপুরা, পিসিপি কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি বিপুল চাকমা ও  পার্বত্য নারী সংঘের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কাজলী ত্রিপুরা।

সমাবেশে ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমা বলেন, ইউপিডিএফ জনগণের সংগঠন, নিপীড়ন নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ প্রতিরোধের সংগঠন। ইউপিডিএফ ‘প্রতিক্রিয়াশীলতা’ ‘সাম্প্রদায়িকতা’কে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্রয় দেয় না। পাহাড়ে কোনো হত্যা বা নির্যাতনের ইস্যুকে সংগঠনটি ‘সাম্প্রদায়িক’ উস্কানির জন্য ব্যবহার করে না।

কিছুদিন আগে মহালছড়িতে ছাদিকুল নামে একজনকে হত্যা করা হয়েছে। কারা এই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তা এখনো আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী খুঁজে বের করতে পারেনি। (এই হত্যাকান্ডের ঘটনা সেই এলাকার সামাজিক পরিবেশের অবনতিকেই তুলে ধরে। সুতরাং তা পাহাড়ি-অপাহাড়ি নির্বিশেষে সমাজের সকলকেই ভোগাবে)। কিন্তু এই হত্যার ঘটনাকে বিশেষ একটি মহলকে দিয়ে সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হচ্ছে, উস্কানি দেয়া হচ্ছে। এই হত্যা যে-ই করুক তার বা তাদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে নির্বিচারে অন্য জাতিসত্তার বিরুদ্ধে উস্কানি কোনভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি আরো বলেন, খাগড়াছড়িতে কয়েকমাস আগে ইতি চাকমা নামে একজন কলেজ ছাত্রীকে খুন করা হয়েছে। এই হত্যাকান্ড সমাজে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার কথা চোখের সামনে তুলে ধরে। এই হত্যায় যে-ই জড়িত থাকুক, তাকে বা তাদের খুঁজে বেড় করতে হবে এবং শাস্তি দিতে হবে। তবে এজন্য কোনো নিরপরাধী বা হত্যার সাথে জড়িত নয় এমন কাউকে হয়রানি করা চলবে না।

তিনি রাঙ্গামাটিতে পিসিপি নেতা ও কলেজ ছাত্র রমেল চাকমা’র মৃত্যুকে একটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক হত্যাকান্ড আখ্যায়িত করে বলেন, আমরা দেখেছি রমেল চাকমা হত্যার ঘটনা ধামাচাপা দিতে নানা তৎপরতা ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। রমেল চাকমার মৃতদেহ তার পরিবারের কাছ থেকে জোরপূর্বক কেড়ে নেয়া হয়েছে, পুড়ে ফেলা হয়েছে। এ সংক্রান্ত রিপোর্ট প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে, স্থানীয় সাংবাদিকদের হুমকি দেয়া হচ্ছে। সন্ত্রাসের নানা কাল্পনিক কাহিনী তৈরী করা হচ্ছে।

এছাড়াও দৈনিক জনকন্ঠ পত্রিকায় গৌতম বুদ্ধকে ‘সন্ত্রাসী’ বলা হয়েছে। এটা তাদের ইচ্ছাকৃতও হতে পারে অথবা অনিচ্ছাকৃতও হতে পারে। তবে এটা যে জেনেশুনে করা হয়েছে তা নিশ্চিত। বৌদ্ধরা যাদের ভিক্ষু বা শ্রামণ বলে থাকেন, অন্য ধর্মীয় ব্যক্তিগণ তাদের সন্যাসী বলেন, সন্ত্রাসী নয়। জনকণ্ঠের এই ‘ভুল’এর পেছনে ‘জঙ্গীবাদী’ উগ্রবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আছে, এই বিষয়ে প্রশ্রয় রয়েছে।

তিনি ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সাম্প্রদায়িক হামলার আগে এই পত্রিকাটি আগাম বলেছিল ‘সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হবে’ এ ধরনের সংবাদ প্রকাশের অভিযোগ করে বলেন, এই ভুলের পেছনে জনকন্ঠ পত্রিকা নিশ্চয়ই অন্য উদ্দেশ্যকে তুলে ধরেছে। তাই তিনি আগামীতে সকলকে সজাগ ও সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।

সমাবেশে হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সভাপতি নিরূপা চাকমা বলেন, আজকের এই সমাবেশ ভন্ডুল করে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী বহু চেষ্টা চালিয়েছে। সাজেক, দীঘিনালা, গুইমারাতে সেনাবাহিনী বিভিন্ন কায়দা কৌশলে বাধা প্রদান করার চেষ্টা চালিয়েছে। হুমকি দিয়েছে এবং ভয়-ভীতি দেখিয়েছে। পানছড়ি, মহালছড়ি থেকে আসা আমাদের নেতাকর্মীদের গাড়ি আটকে দেয়া হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সকাল থেকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে গ্রেফতারের হুমকি বা ভয় দেখানো হয়েছে। সমাবেশ না করার জন্য চাপ দেয়া হয়েছে।

তিনি সাজেকের বাঘাইহাট জোন কর্তৃপক্ষের কড়া সমালোচনা করে বলেন, গতরাতে সাজেক নারী সমাজের নেত্রী নিরূপা চাকমার বাড়ি বাঘাইহাট জোন থেকে একদল সেনা সদস্য ঘেরাও করে আকস্মিক তল্লাশি চালিয়েছে। বাড়ির দরজা ভেঙ্গে ভেতরে ঢুকেছে। এর ঘটনার তিনি তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং পাড়া-গ্রামে সেনাবাহিনী কতৃক অব্যাহত হয়রানিমূলক বাড়িঘর তল্লাশি এবং সাধারণ জনগণকে বেআইনি গ্রেফতার ও নির্যাতন বন্ধের দাবী জানান।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সমতলে নারী ধর্ষণ ও হত্যার কয়েকটি বিচার ও রায় হতে দেখা গেছে। অপরাধীদের ফাঁসি অথবা বিভিন্ন মেয়াদে কারাদন্ড দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামে এযাবৎকালে যতগুলো অপহরণ, ধর্ষণ ও ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ঘটেছে তার কোন সঠিক ও সুষ্ঠু বিচার হয়নি। সেকারণে পাহাড়ি নারীদের ওপর যৌন সন্ত্রাস অধিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুধু তাই নয়, আর সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো ধর্ষণের শিকার পাহাড়ি নারীদের মেডিকেল রিপোর্ট প্রদানে সরকারের গোপন নির্দেশনা রয়েছে। উক্ত নির্দেশনার ফলে আজ পর্যন্ত কোন পাহাড়ি নারী ভিকটিম-এর ক্ষেত্রে সঠিক মেডিকেল রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। তিনি সমাবেশ থেকে গোপনে জারিকৃত উক্ত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জোর দাবি জানান।

সমাবেশ শেষে শহরে একটি মিছিল বেড় করা হয়। মিছিলটি স্বনির্ভর থেকে শুরু হয়ে জেলা পরিষদ, রেড স্কোয়ার হয়ে চেঙ্গী শহরের চেঙ্গী স্কোয়ার ঘুরে আবার স্বনির্ভর ফিরে এসে এক সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মাধ্যমে শেষ হয়।

এছাড়াও খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, গুইমারা, মানিকছড়ি এবং রাঙ্গামাটির সাজেক ও কাউখালীতে একই দাবীতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।

বার্তা প্রেরক –

নীতিশোভা চাকমা
দপ্তর সম্পাদক,  হিল উইমেন্স ফেডারেশন
কেন্দ্রীয় কমিটি।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment