কালের আয়নায়

ব্রিটেন ও ব্রেক্সিটের ভবিষ্যৎ কী?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

এ সময়টা মনে হয় অসম্ভব সম্ভব হওয়ার সময়। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত ব্রিটিশ নির্বাচনেও এটাই সত্য প্রমাণিত হলো। যে টোরি দল ভূমিধস বিজয় অর্জন করবে বলে মিডিয়া এতদিন জোরেশোরে ঢাক পিটিয়েছে, তারা সরকার গঠনের জন্য পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় ৩২৬টি আসন পায়নি। পেয়েছে এ পর্যন্ত ৩১৮ আসন। অন্যদিকে জেরেমি করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টির নির্বাচনে ভরাডুবি হবে বলে বিগ মিডিয়া এবং ব্রিটিশ সুশীল সমাজের মাথাওয়ালা পণ্ডিতেরা প্রচার চালচ্ছিলেন। অসম্ভবকে সম্ভব করে তারা পেয়েছেন ২৬১ আসন। পণ্ডিতেরা বলেছিলেন, নতুন পার্লামেন্টে লেবার পার্টি প্রধান বিরোধী দলে থাকার মতো আসনও পাবে না। সেই ভবিষ্যদ্বাণীকে ব্যর্থ প্রমাণিত করে করবিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। এই সাফল্য ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় রাজনীতির বর্তমান ধারা বদলে দিতে পারে।

৮ জুনের নির্বাচনে যা ঘটল, তাতে বলা যায়, ব্রিটেনে একটি হ্যাঙ পার্লামেন্ট গঠিত হতে চলেছে। কোয়ালিশন গঠন করা ছাড়া কোনো বড় দলের পক্ষে সরকার গঠন সম্ভব নয়। এ নির্বাচনে লিবারেল ডেমোক্র্যাট দল পেয়েছে ১২ আসন। স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট দল পেয়েছে ৩৫ আসন। অন্য একটি দল পেয়েছে ১০ আসন। এ অবস্থা অতীতে একবার দেখা দিয়েছিল সাবেক টোরি নেতা ক্যামেরুনের প্রথম মন্ত্রিসভা গঠনের সময়। সেবারও নির্বাচনে হ্যাঙ পার্লামেন্ট গঠিত হওয়ায় ক্যামেরুন লিবারেল পার্টির তৎকালীন নেতা নিক ক্লিগের সঙ্গে কোয়ালিশন করে সরকার গঠন করেছিলেন। এটা ছিল ব্রিটিশ রাজনীতিতে এক অসম্ভব ঘটনা। কারণ, নীতিগত প্রশ্নে লিবারেল দল কখনও টোরিদের সঙ্গে কোয়ালিশন করে না, করে লেবার দলের সঙ্গে। কিন্তু সেবার তারা করেছিল। গঠিত হয়েছিল কন-লিব মন্ত্রিসভা। এবার সেই লিবারেল নেতা নিক ক্লিগও নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।

লেবার পার্টিকে যদি সরকার গঠন করতে হয় তাহলে লিবারেল ও স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করতে হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেটি সম্ভব নয়। তিন দলের কোয়ালিশন সরকার গঠন ব্রিটিশ রাজনীতিতে সম্ভব কি? সে ক্ষেত্রে টোরিদের সঙ্গে লিবারেল দলের কোয়ালিশন গঠন সম্ভব হলে সরকার গঠনের মতো আসন নিয়ে টোরি দল সরকার গঠন করতে পারে।

কিন্তু নির্বাচনের সময় লিব ডেম বলেছে, তারা আর কোয়ালিশনে যাবে না। যাওয়ার পথে বিস্তর বাধা। অতীতে টোরি প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরুনের সঙ্গে জোট বাধার সময় ব্রেক্সিট সমস্যাটি ছিল না। এখন এটি বিরাট সমস্যা। ব্রেক্সিট প্রশ্নে কনজারভেটিভ এবং লেবার দুই দলই বিভক্ত। বলতে গেলে গোটা ব্রিটিশ ন্যাশনই বিভক্ত। এই বিভক্তির মধ্যে একটি হ্যাঙ পার্লামেন্ট ব্রিটেনকে যে গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলে দেবে এবং ইউরোপের রাজনীতিতেও আরও অশ্চিয়তা সৃষ্টি করবে সেটাই এই নির্বাচনের রায়ের খারাপ দিক।

টোরি নেত্রী তেরেসা মে তার নেতৃত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবেন কি-না সেটাও এখন এক প্রশ্ন। ব্রেক্সিট গণভোটে ব্রেক্সিট সমর্থকদের জয়লাভের পর ক্যামেরুন প্রধানমন্ত্রীর পদে ইস্তফা দেন এবং ব্রেক্সিটপন্থি তেরেসা মে নতুন টোরি সরকার গঠন করেন। বিগ মিডিয়া প্রচার করা শুরু করেছিল, তেরেসা মে মার্গারেট থ্যাচারের চেয়েও অনেক বেশি জনপ্রিয়। লেবার নেতা করবিনকে তারা চরমপন্থি আখ্যা দিয়ে একজন ‘নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য নেতা’ হিসেবে তুলে ধরেছিল এবং প্রচার করেছিল করবিনকে নেতৃত্বে রেখে এখন নির্বাচনে গেলে লেবার পার্টি প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে তেরেসা মে যে আকস্মিকভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ‘গ্যাম্বলে’ গেলেন তার প্রধান কারণ সম্ভবত দুটি। তিনি সাধারণ নির্বাচনে জয়ী একজন প্রধানমন্ত্রী না হওয়ায় (পার্লামেন্টারি দলের সদস্যদের ভোটে জয়ী) ব্রেক্সিট প্রশ্নে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে শক্তভাবে দর কষাকষি করতে পারছেন না বলে যুক্তি দেখিয়েছিলেন। এই শক্ত দরকষাকষির ব্যাপারে তিনি ব্রিটিশ জনগণের কাছ থেকে আরও জোরালো ম্যান্ডেট চান। দ্বিতীয়ত, তিনি বিগ মিডিয়ার প্রচারে বিশ্বাসী হয়ে ভেবেছিলেন, লেবার দলে করবিন-নেতৃত্বের যে অনিশ্চিত অবস্থা, তাতে এ মুহূর্তে নির্বাচন হলে তিনি ভূমিধস বিজয়ের অধিকারী হবেন।

তার এই বিশ্বাসে চিড় ধরে লেবার পার্টির নির্বাচন-ইশতেহার প্রকাশের পর। এ ইশতেহারে শিক্ষা, স্বাস্থ্য খাত থেকে শুরু করে সন্ত্রাস দমন পর্যন্ত সব বিষয়ে ব্রিটিশ জনগণ- বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে করবিন এমন এক আশার আলো তুলে ধরেন যে, আকস্মিকভাবে নির্বাচনী রাজনীতির দৃশ্যপট বদলে যায়। জনমত পরীক্ষায় দেখা যায়, নির্বাচকদের সমর্থনের ক্ষেত্রে টোরি ও লেবার দলের মধ্যে যে বিরাট গ্যাপ ছিল তা যেন জাদুমন্ত্রে কমে গেছে এবং জনসমর্থনের ক্ষেত্রে টোরি ও লেবার দলের অবস্থা প্রায় নেক টু নেক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিটেনে সম্প্রতি দুটি বড় বড় সন্ত্রাসী হামলা হওয়ার পর জেরেমি করবিন সাহসের সঙ্গে বলেন, ‘এই সন্ত্রাসের কারণ ব্রিটিশ পররাষ্ট্র নীতিতেই নিহিত। অপর দেশে হামলা চালালে নিজের দেশেও পাল্টা হামলা ডেকে আনা হয়।’ ব্রিটেনের সাম্প্রতিক দুটি সন্ত্রাসী হামলাও তেরেসা মের নির্বাচন-সাফল্যে বড় রকমের বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। টোরি দলে এখনও যে ক্যামেরুনপন্থিরা রয়েছেন, তারা প্রচার করেছেন, তেরেসা মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকাকালে পুলিশের সংখ্যাশক্তি কর্তনের যে নীতি অনুসরণ করেছেন তার ফলে ম্যানচেস্টার ও লন্ডন ব্রিজে আত্মঘাতী সন্ত্রাসীরা এই বিপর্যয় ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

নির্বাচনী যুদ্ধে নেমে তেরেসা মে প্রতিদ্বন্দ্বী করবিনের সঙ্গে বিতর্কে মুখোমুখি হতে চাননি, এটা ছিল তার বড় রকমের দুর্বলতা। করবিনের নির্বাচনী ইশতেহারে ছাত্রদের টিউশন ফি বাতিল, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় সংকোচের নীতি পরিহার, রেলওয়ে, ডাকঘর জাতীয়করণ, বেকারদের জন্য বড় ধরনের চাকরির বাজার সৃষ্টি, সন্ত্রাস দমনের জন্য পররাষ্ট্র নীতির পরিবর্তন সংক্রান্ত যে বড় ধরনের প্রতিশ্রুতি ছিল, তার বিকল্প কোনো প্রতিশ্রুতি টোরি দলের ভাণ্ডারে ছিল না।

আর্থিক স্বচ্ছতার নামে একদিকে যুদ্ধব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্যদিকে ওয়েলফেয়ার স্টেটের সব জনকল্যাণমূলক খাতে ধনীদের স্বার্থে বিরাট আর্থিক ছাঁটাই নীতি সাধারণ মানুষের জীবনে যে দুর্বিষহ অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তার প্রতিবাদই এবার নির্বাচনে প্রভাব ফেলেছে। বিগ মিডিয়া, বিগ বিজনেস এবং এস্টাবলিশমেন্টের সম্মিলিত করবিনবিরোধী প্রচারণা সফল হয়নি। নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী না হলেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং ব্রিটিশ রাজনীতিতে করবিনের নেতৃত্বে আবার শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। এই নির্বাচনে হ্যাঙ পার্লামেন্ট ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটা অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করলেও তা অদূর ভবিষ্যতে সারাবিশ্বেই চরম প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থিদের কবল থেকে জনগণকে মুক্ত হওয়ারও পথ দেখাবে বলে আশা করা যায়।

আমার ধারণা, একটা বিরাট অসম্ভবকে সম্ভব করে ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল, ফ্যাসিবাদী চরিত্রের ব্যক্তির আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর বিশ্বব্যাপী যে আশঙ্কা তৈরি হয় সেই আশঙ্কা ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের নির্বাচনেও প্রভাব ফেলেছে। মানুষ সচেতন হয়েছে। তাই ফ্রান্সে এক তরুণ ট্রাম্প-সমর্থিত বর্ণবিদ্বেষী লো পেনের অনিবার্য বিজয়ের সম্ভাবনা নস্যাৎ করে দিয়ে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যদিকে যে তেরেসা মে ইউরোপের দিকে মুখ ফিরিয়ে ট্রাম্পের হাত ধরে আমেরিকার গলগ্রহী দেশ হিসেবে ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ তৈরি করবেন ভেবেছিলেন, তাতেও ব্যর্থতা বরণ করেছেন। নির্বাচনকালে করবিন স্পষ্ট ভাষাতেই বলেছেন, ‘আমি (প্রধানমন্ত্রী হলে) ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত ধরব না (ও রিষষ হড়ঃ যড়ষফ যরং যধহফ), তবে আমেরিকার সঙ্গে সমঝোতা করে চলার চেষ্টা করব।’

ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্মের ভোটাররা তার কথায় সাড়া দিয়ে দলে দলে তার দলকে ভোট দিয়েছে। এখানেই এবারের নির্বাচনে লেবার পার্টি জয়ী না হলেও তার এই অপ্রত্যাশিত সাফল্যের কারণ। লন্ডনের করবিনবিরোধী সান্ধ্য দৈনিক ইভনিং স্ট্যান্ডার্ড এখন স্বীকার করছে, ‘১৮ থেকে ৩৪ বছরের ভোটাররা দলে দলে লেবার পার্টিকে ভোট দিয়েছে। আর টোরি দল পেয়েছে ৬৫ বছর ও তদূর্ধ্ব বয়সের ভোটারদের সলিড ভোট।’ বিগ বিজনেস, বিগ মিডিয়া এবং এস্টাবলিশমেন্ট মিলে যতই চক্রান্ত করুক, ব্রিটেনের দ্রুত বর্ধিষ্ণু তরুণ ভোটাররা ব্রিটিশ রাজনীতির ধারা অদূর ভবিষ্যতে আমূল বদলে দিতে পারে।

অনেকে মনে করছেন, ব্রিটেনের হ্যাঙ পার্লামেন্টের অনিশ্চয়তা থেকে মুক্ত করার জন্য শিগগিরই আরেকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। যদি হয়, আমার ধারণা, করমিনের নেতৃত্বে লেবার পার্টি জয়ী হবে। কারণ টোরি-দুঃশাসন থেকে মুক্ত থাকার জন্য তরুণ ভোটাররা আরও বেশি সংখ্যায় লেবার পার্টিকে ভোট দেবে। তবে একটি কথা বলা চলে, শত বিরুদ্ধ এবং অসত্য প্রচারণা সত্ত্বেও লেবার পার্টিতে করবিন নেতৃত্ব স্থিতিশীলতা লাভ করেছে। অন্যদিকে টোরি দলে তেরেসা মের অবস্থান অনিশ্চিত। টোরি দলের অভ্যন্তরে ইতিমধ্যেই কানাঘুষা শুরু হয়েছে, অদূর ভবিষ্যতে বরিস জনসন অথবা আর কেউ তেরেসা মের স্থলাভিষিক্ত হতে পারেন।

ব্রিটেনের এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বড় চমক সৃষ্টি করেছেন বাংলাদেশি তিন কন্যা। টিউলিপ সিদ্দিক, রুশনারা আলী ও রুপা হক। তিনজনই লেবার দলের। টিউলিপ (বঙ্গবন্ধুর নাতনি) আগের নির্বাচনে মাত্র ১১শ’ ভোটের ব্যবধানে জিতেছিলেন। এবার ভোটের ব্যবধান ১৫ হাজারেরও বেশি। রুশনারা আলী ৩৫ হাজারেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে এবং রুপা হক ১৩ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছেন। টিউলিপ সিদ্দিক আবার লেবার পার্টির ছায়া মন্ত্রিসভায় আসন পেতে পারেন।

কী হবে কী হবে না তা এখন বলার সময় নয়। কারণ, এটা মনে হয় অসম্ভব সম্ভব করার সময়। তবে বলা চলে, ব্রিটিশ রাজনীতিতে একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে চলেছে, যার প্রভাব পড়বে ইউরোপের রাজনীতিতেও। নির্বাচনে তেরেসা মের অবস্থান শক্ত না হয়ে দুর্বল হয়ে পড়ায় এর প্রতিক্রিয়া বর্তাবে ব্রেক্সিট সমস্যার ওপরেও। এই সমস্যায় ব্রিটিশ জাতি দ্বিধাবিভক্ত।

এই লেখা যখন লিখছি, তখন শোনা যাচ্ছে তেরেসা মে উত্তর আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নিস্ট পার্টি বা ডিইউপির কাছ থেকে সরকার গঠনের সমর্থন পেয়েছেন। তার মানে, একটি সংখ্যালঘু সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে। এই সরকারের নেতা হিসেবে তেরেসা মের অবস্থান দুর্বলই থাকবে। আমার ধারণা, অদূর ভবিষ্যতে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মতো ব্রেক্সিট নিয়েও আবার কোনো ধরনের গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। – সমকাল

কলামিস্ট ও লেখক
লন্ডন ৯ জুন, শুক্রবার ২০১৭।।

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment