দশ দিগন্তে

উপমহাদেশ আজ কোন্ পথে

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

পঞ্চাশের দশকের কথা।  তখন কচ্ছ নামক একটি স্থানে পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে এক যুদ্ধে বহু মানুষ মারা যায়। পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশই দাবি করে, এই যুদ্ধে তাদের জয় হয়েছে। পরবর্তীকালে তো কাশ্মির নিয়ে যুদ্ধে দুই দেশেরই ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে প্রচুর। অতীতের কথায় ফিরে যাই, কচ্ছ-যুদ্ধের পরপরই ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা-সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া রাওয়ালপিণ্ডি গিয়েছিলেন সরকারি আমন্ত্রণে। আমিও ছিলাম সফরসঙ্গী। সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনায় যুদ্ধের ক্ষয়-ক্ষতির কথা জেনে মানিক ভাই অভিভূত হয়েছিলেন। রাতে খাবার টেবিলে খেতে বসে তিনি আমাকে বললেন— ‘ভারত ভাগ করে আমরা সম্ভবত ভুলই করেছি, তা না হলে গোটা ভারত ছিল আমাদের যৌথ সম্পত্তি। সেই সম্পত্তি ভাগ করে তার অংশ নিয়ে দুই ভাইয়ের ঝগড়ার মতো এই ঝগড়া। বরিশালে জমি-জিরাত নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে দাঙ্গায় মানুষ মরে। এযুদ্ধ যেন সেই বড় দাঙ্গা’। বহুদিন আগের কথা, মানিক ভাইয়ের সেই কথাগুলো উপমহাদেশের বর্তমান অবস্থা দেখে আবার মনে পড়ছে। কাশ্মির নিয়ে সেই জমির-দাঙ্গা এখনো চলছে। এর ভবিষ্যত্ কী কেউ জানে না!

ধর্ম দ্বারা দেশভাগ যে মানুষের কোনো কল্যাণ করে না, উপমহাদেশের বর্তমান অবস্থা তার উত্কৃষ্ট প্রমাণ। শুধু সম্পত্তির ভাগ নিয়ে যুদ্ধ নয়, ধর্মান্ধতার লড়াইয়েও উপমহাদেশ এখন বিপর্যস্ত। জিন্নাহ চেয়েছিলেন মুসলিম সংখ্যা গরিষ্ঠতার ভিত্তিতে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে। কাঁঠাল গাছে আম ফলেনি। সেই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এখন তালেবানিদের রাজত্ব। গান্ধী ও নেহেরু চেয়েছিলেন ভারতকে একটি আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে। সেই ভারতে আজ উগ্র হিন্দুত্ববাদের জয়-জয়কার। এই দুই বিপরীতমুখী ধর্মান্ধতার লড়াই থেকে বাঙালিদের মুক্ত করার জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বাংলাদেশেও আজ উগ্র এবং হিংস্র-মৌলবাদ মাথা তুলেছে। দুই প্রতিবেশী দেশের ধর্মান্ধতার বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশেও। এই ধর্মান্ধতার প্রসার সামলাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করছেন। তিনি একা কতদিক সামলাবেন?

কবি শামসুর রাহমান বাংলাদেশ সম্বন্ধে দুঃখ করে লিখেছিলেন—‘উদ্ভট উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ’।  কথাটি যেন সত্যি হতে চলেছে। বাংলাদেশের পাঠ্য পুস্তকে সাম্প্রতিক পরিবর্তন, ভাস্কর্য নিয়ে বিতর্ক, স্বাধীন মতামত প্রকাশে বাধাদান— আজ এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যুক্তিবাদী মনন ও বিজ্ঞান মনস্ক পরিবেশ গড়ে ওঠার বদলে মধ্যযুগীয় অন্ধ সংস্কার প্রসার লাভের সুযোগ পাচ্ছে। একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে তোলার পথে এটা একটা বিরাট অন্তরায়। আমাদের আশা ছিল ভারতীয় গণতন্ত্র গোটা উপমহাদেশে গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ হবে। বাংলাদেশ ভারতের সাহায্যেই একটি মধ্যযুগীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পেরেছে। সেই ভারতেও আজ হিন্দুত্ববাদের উত্থান গোটা উপমহাদেশেই গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎকে সংশয়গ্রস্ত করে তুলেছে।

সম্প্রতি কলকাতার ‘দৈনিক স্টেট্সম্যান’ পত্রিকায় ড. প্রদীপ কুমার দত্ত ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার মুখে অসাম্প্রদায়িকতার কথা বললেও কীভাবে অত্যন্ত কৌশলে উগ্র হিন্দুত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন তার বিবরণ দিয়েছেন। পাকিস্তান ও বাংলাদেশে যেমন শিক্ষা ব্যবস্থায় ধর্মীয়করণ দ্বারা একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ গঠনের চেষ্টা চলছে, ভারতেও সেই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে আরো অভিনব কায়দায়। ড. দত্ত লিখেছেন— ‘ভারতের বর্তমান সরকার শিক্ষায় গৈরিকিকরণের মাধ্যমে ছাত্র-ছাত্রীদের মনে অন্ধ সংস্কার দূর করার পরিবর্তে এমন সব বিষয় তাদের পাঠ্যসূচির মধ্যে ঢুকাচ্ছে যা তাদের যুক্তিবাদী মানসিকতা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে। যেমন কয়েকটি রাজ্যে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়ানো হচ্ছে— এরোপ্লেন, টেলিভিশন ও পরমাণু বোমার উদ্ভব হয়েছিল রামায়ণ ও মহাভারতের যুগে। বৈদিক যুগে নাকি মোটরগাড়ি ছিল। কারণ ঋগবেদে অনশ্ব রথের উল্লেখ আছে। পুষ্পক রথ ছিল যা নাকি প্রমাণ করে তখন এরোপ্লেন ছিল। বৈদিক যুগে লাইভ টেলিকাস্টও ছিল। তার প্রমাণ হস্তিনাপুরে বসে ধৃতরাষ্ট্র  কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ধারা বিবরণী শুনেছিলেন। গান্ধারির গর্ভজাত মাংসপিণ্ড থেকে একশত কৌরবের জন্ম হয়েছিল। তাতে প্রমাণ হয়, সে সময় স্টেমসেল গবেষণার অগ্রগতি হয়েছিল’। (২রা জুন, দৈনিক স্টেট্সম্যান)

দত্তবাবুর মতে— রামমোহন, বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ যে বৈজ্ঞানিক শিক্ষা দ্বারা আধুনিক ভারতীয় সমাজ গঠন করতে চেয়েছিলেন,  তার পথ বর্তমান ভারতে রুদ্ধ করা হচ্ছে। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যের কথা, আধুনিক বিজ্ঞান শিক্ষার স্থলে ভারতের স্কুল-কলেজের সিলেবাসে রামায়ণ, মহাভারত, গীতা প্রভৃতি পাঠ্য হিসেবে পড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীও বলেছেন— ‘গণেশের হাতির মাথা প্রমাণ করে প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারি ছিল’। এই শিক্ষাই যদি ভারতের নতুন প্রজন্মকে শেখানো হয় তাহলে ভবিষ্যতের ভারত কী চেহারায় গড়ে উঠবে তা ভাবতেও ভয় লাগে! গো-হত্যা নিবারণ নিয়ে ভারতে যা চলছে তা আধুনিক সভ্য জগতে এক বিস্ময়কর ঘটনা।

পাকিস্তানে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামিকরণ এই ধরনের অন্ধ-মানসিকতা সৃষ্টির পথ সহজ করছে। ধর্মান্ধতা সেখানে মাথা চাড়া দিয়েছে। এক জামাতি পণ্ডিতের লেখা একটি বই পড়েছিলাম। তা বাংলাদেশে কোনো মাদ্রাসা বা কওমি মাদ্রাসায় পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে কিনা আমি জানি না। এই বইটিতে আছে— প্রাচীন ইসলামি যুগে যে আকাশে ওড়ার ব্যবস্থা ছিল তার প্রমাণ দুলদুল ঘোড়া। তারও আগে হযরত সোলাইমানের উড়ন্ত চাদরে বসে আকাশ ভ্রমণ প্রমাণ করে, বর্তমান এরোপ্লেন তখনো ছিল। গ্রহ-গ্রহান্তরে যাতায়াতের বর্তমান রকেট ব্যবস্থাও ইসলামের প্রাচীন যুগে ছিল বলেও জামায়াতের পণ্ডিতের বইয়ে লেখা আছে। বাংলাদেশে হেফাজতিরা যদি এধরনের শিক্ষার প্রসারে সক্ষম হয় তাহলে বাঙালির গত দুইশ বছরের নব-জাগরণের করুণ পরিসমাপ্তি ঘটবে। মনীষী সৈয়দ আহমেদ, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখ আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা দ্বারা ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে যে নবজাগরণের সূচনা করে গিয়েছিলেন, যার ফলে একটি উন্নত বাঙালি মুসলিম সমাজও গড়ে উঠেছিল; সে যুগেরও অবসান ঘটবে।

একটিমাত্র ভরসার কথা এই যে— বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ এখনো আঁকড়ে ধরে আছেন। তিনি ধর্মবিশ্বাসী কিন্তু ধর্মান্ধ নন। তিনি বাংলাদেশে ধর্মান্ধতার অভিযান রুখতে একটি ভারসাম্যনীতি অনুসরণ করে চলেছেন। তার এই নীতি সফল না হলে বাংলাদেশের ভাগ্যে কী ঘটবে তা আমি বলতে পারি না। – ইত্তেফাক

 [ লন্ডন, ২৩ জুন, শুক্রবার, ২০১৭ ]

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment