কালান্তরের কড়চা

৮ আগস্ট : শোকের মাসে অ-শোক একটি দিন

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

 

শোকের মাসে কারো জন্মদিনের আনন্দগাথা কি উচ্চারণ করা যায়? হয়তো যায় না। কিন্তু বাংলাদেশ এক বিচিত্র ভূমি। যে দেশে স্মরণের আবরণে মরণকে যত্নে ঢেকে রাখা হলেও মরণকে অতিক্রম করে স্মরণও কখনো কখনো মানুষকে উদ্দীপনা জোগায়। আগস্ট মাসের ১৫ তারিখে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিবস। তাঁর সঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছিলেন তাঁর পত্নী বেগম ফজিলাতুননেসা, তাঁর তিন পুত্র, দুই পুত্রবধূ এবং আরো অনেক আত্মীয়। আগস্ট মাস তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন মহররমের মাস।

কিন্তু এই মাসেই জন্মদিনটি পড়েছে বেগম মুজিবের এবং তাঁর বড় ছেলে শেখ কামালের। বঙ্গবন্ধু-পত্নীর জন্মদিন ৮ আগস্ট এবং শেখ কামালের জন্মদিন ৫ আগস্ট। এই দুই দিনেই তাই বাংলার মানুষ চোখের শোকাশ্রু মুছে স্মরণের উদ্দীপনায়ও জেগে ওঠে। মহররম মাস উপলক্ষ করে নজরুল লিখেছিলেন, ‘ফিরে এলো আজ সেই মোহররম মাহিনা/ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। ’ ইংরেজি আগস্ট মাস সম্পর্কেও এই কথাটি বলা চলে।

‘ত্যাগ চাই, মর্সিয়া ক্রন্দন চাহি না। ’ প্রতিবছর ৮ আগস্টে এক মহীয়সী নারীর ত্যাগ ও দুঃখবরণ এবং দেশপ্রেমের কথাই আমাদের মনকে উদ্দীপ্ত করে তোলে।

আগস্ট মাস এলেই সুকান্তর একটি কবিতার লাইন আমার মনে ভেসে ওঠে—‘দেশপ্রেমে দৃপ্তপ্রাণ রক্ত ঢালে সূর্য্যের সাক্ষাতে। ’ বঙ্গবন্ধুর প্রায় গোটা পরিবার দেশপ্রেমে দৃপ্ত হয়ে স্বাধীনতার সূর্যের সাক্ষাতে রক্ত দান করে গেছেন। আর জাতির সাহসী ও মমতাময়ী জননী হয়ে সেই রক্তের সঙ্গে নিজের রক্ত মিশিয়েছেন বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিব। কৃতজ্ঞ জাতির কাছে তিনি তাই  বঙ্গমাতা। ৮ আগস্ট ও ১৫ আগস্ট এই দুই দিবসেই আমরা তাই বঙ্গমাতাকে স্মরণ করি। এই মহীয়সী নারীর জীবন পরম গৌরবের। একদিকে তিনি জাতির পিতার পত্নী, শহীদ সন্তানদের জননী এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একজন শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক নেত্রী শেখ হাসিনারও জন্মদাত্রী।

অবিভক্ত ভারতে গান্ধীর ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ ও খেলাফত আন্দোলনের দুই নেতা (দুই ভাই) মওলানা মোহাম্মদ আলী ও মওলানা শওকত আলীর মা ছেলেদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। দুই ছেলে কারাগারে গেলে তিনি সারা ভারত ঘুরে বেরিয়েছেন ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে জনগণকে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাতে। কৃতজ্ঞ ভারতবাসীর কাছে তিনি পরিচিত হয়েছেন ‘বি আম্মা বেগম’ নামে। মওলানা মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘মায়ের কাছ থেকে সাহস ও প্রেরণা না পেলে এত নির্যাতনের মুখে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে টিকে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। ’

আরেকটি উদাহরণ তুরস্কের বেগম খালেদা হানুম। কামাল আতাতুর্ক যখন নব্য তুরস্ক গঠনের জন্য সশস্ত্র সংগ্রামে রত, তখন এই মহিলা মাথার কালো হিজাব খুলে ফেলে আতাতুর্কের সংগ্রামে তুরস্কের নারীদের যোগদানে উদ্বুদ্ধ করেছেন। নারীশিক্ষা বিস্তার ও নারী জাগরণের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তুরস্কের মানুষ তাঁকে এখনো অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। মহাত্মা গান্ধী তাঁর পত্নী কস্তুরিবাই সম্পর্কে বলেছেন, ‘আমি স্বরাজ সাধনায় এত বাধা ও নির্যাতনের মুখে অবিচল থাকতে পারতাম না, যদি কস্তুরিবাই পাশে না থাকতেন, সাহস ও সমর্থন না জোগাতেন। সেই দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তাঁর এই ত্যাগ সাধনা শুরু। ’

বেগম ফজিলাতুননেসা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘রেনু আমার পাশে না থাকলে এবং আমার সব দুঃখকষ্ট, অভাব-অনটন, বারবার কারাবরণ, ছেলে-মেয়ে নিয়ে অনিশ্চিত জীবনযাপন হাসিমুখে মেনে নিতে না পারলে আমি আজ বঙ্গবন্ধু হতে পারতাম না। বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও যুক্ত থাকতে পারতাম না। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময় সে আদালতে নিত্য হাজিরা দিয়েছে এবং শুধু আমাকে নয়, মামলায় অভিযুক্ত সবাইকে সাহস ও প্রেরণা জুগিয়েছে। আমি জেলে থাকলে নেপথ্যে থেকে আওয়ামী লীগের হালও ধরেছে। ’

এ কথা তো এখন সর্বজনবিদিত, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় যখন অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান ছিল মৃত্যুদণ্ড, তখনো সামরিক শাসকের কোনো আপস প্রস্তাবে স্বামীকে রাজি হতে দেননি বেগম মুজিব। ঊনসত্তরের গণ-আন্দোলনের মুখে যখন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব রাওয়ালপিণ্ডিতে রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠক ডেকে তাতে বঙ্গবন্ধুকে যোগ দিতে প্যারলে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তখন আওয়ামী লীগের অনেক প্রবীণ নেতা রাজি হলেও বেগম মুজিব রাজি হননি। তিনি চাননি গণমুক্তির অধিনায়কের মাথা সামরিক শাসকের কাছে নত হোক। তাঁর অনুরোধে বঙ্গবন্ধু (তখনো বঙ্গবন্ধু হননি) প্যারলে মুক্তি পেতে অসম্মতি জানান। পরে প্রচণ্ড গণ-আন্দোলনের মুখেই সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা তুলে নিতে বাধ্য হয়। বঙ্গবন্ধুসহ সব অভিযুক্ত সসম্মানে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন।

দেশের স্বাধীনতাযুদ্ধেও বেগম মুজিবের অবদান কি কম? পুরো যুদ্ধের সময় তিনি পাকিস্তানি হানাদারদের হাতে বন্দি ছিলেন। এই বন্দি থাকার সময়েও তিনি হানাদারদের হুমকি-ধমকি অগ্রাহ্য করেছেন এবং দুই ছেলে শেখ কামাল ও শেখ জামালকে যুদ্ধে পাঠাতে দ্বিধা করেননি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন দীর্ঘ কয়েক মাস বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের (তখনকার পশ্চিম পাকিস্তান) জেলে বন্দি ছিলেন। তাঁর কোনো খোঁজখবর ছিল না। কিন্তু প্রত্যহ গুজব রটত তাঁকে জেলের ভেতরেই ক্যাঙারু কোর্টের বিচার প্রহসনে ফাঁসি দেওয়ার আয়োজন চলছে। বেগম মুজিব তাতে ভেঙে পড়েননি।

পাকিস্তানি হানাদারদের নেতারা বহু চেষ্টা করেছেন, বেগম মুজিব যেন স্বামীর ওপর চাপ দেন এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য। তাহলে তাঁর জীবন রক্ষা পাবে। বেগম মুজিব এই চাপের কাছে মাথা নত করেননি। তিনি চেয়েছেন, স্বামীর যদি মৃত্যু হয়, তা বীরের মৃত্যু হোক, কাপুরুষের মৃত্যু নয়। তাঁর দৃঢ়তাতেই বঙ্গবন্ধু মুক্ত বাংলার অবিসংবাদিত এবং অপরাজেয় নেতারূপে পাকিস্তানের কারাগার থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছেন।

আমার সৌভাগ্য, বেগম মুজিবকে আমি অত্যন্ত কাছে থেকে দেখতে পেয়েছি এবং তাঁকে ভাবি ডাকতাম। বহু দিন তাঁর হাতের রান্না খেয়েছি। তিনি যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং পরে প্রেসিডেন্টের পত্নী, তখনো গণভবনে বাস করতে চাননি; বরং বত্রিশ নম্বরের বাড়িতে সাধারণ বাঙালি মহিলার মতো একেবারেই সাধারণ জীবন যাপন করতেন। দেশের প্রেসিডেন্টের নিজস্ব বাসভবনে কোনো কার্পেট নেই, এয়ারকন্ডিশনার নেই—এ কথা কি কখনো ভাবা যায়?

ছয় দফা আন্দোলনের সময় তাঁর আরেক মূর্তি আমি দেখেছি। বঙ্গবন্ধুসহ আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতা তখন বন্দি। অধিকাংশ কর্মী হয় জেলে, না হয় পলাতক। আইয়ুব-মোনেম সরকার অমানুষিক নির্যাতন চালাচ্ছে আন্দোলন দমনের জন্য। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশ নিষিদ্ধ। সম্পাদক মানিক মিয়াও জেলে। ছয় দফার প্রচার-প্রচারণা বন্ধ। এই সময় বেগম মুজিব দলের আন্ডারগ্রাউন্ডের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন, উৎসাহ ও সাহায্য জোগাতেন। নিজে কালো বোরকা পরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছয় দফার প্রচারপত্র বিতরণ করতেন।

তাঁর সাহস ও তেজস্বিতা সম্পর্কে আমার একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা বলি। বঙ্গবন্ধু তখন প্রধানমন্ত্রী। শেখ কামাল এক রাতে মতিঝিল এলাকায় গিয়ে পুলিশের গুলিতে গুরুতর আহত হন। সন্ত্রাসী ভেবে পুলিশ ভুল করে গুলি করেছে। প্রায় মরণাপন্ন অবস্থায় শেখ কামালকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এক কেবিনে রেখে তাঁর জীবন রক্ষার চেষ্টা চলছে। বেগম মুজিব চব্বিশ ঘণ্টা ছেলের শয্যাপাশে। এই সময় দেশের স্বাধীনতা বিরোধী চক্র গুজব ছড়াচ্ছিল, শেখ কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলি খেয়েছেন। এটা ছিল ডাহা মিথ্যা প্রচার। টাকা চাইলে যে কোনো ব্যাংক তাঁকে এমনিতেই তা দিত, ডাকাতি করার দরকার হতো না।

যা-ই হোক, এই মিথ্যা প্রচার টেকেনি। আমি শেখ কামালের গুরুতর আহত হওয়ার খবর পেয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তাঁকে দেখতে যাই। তখন তাঁকে বাইরের লোকের দেখতে যাওয়া নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমাকেও তাঁর রুমে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কিন্তু আমার খবর পেয়ে বেগম মুজিব কেবিনের বাইরে চলে আসেন এবং শেখ কামালের শারীরিক অবস্থার কথা জানান।

কথায় কথায় তিনি আমাকে বলেন, ‘দেখো ভাই, আমাদের এখন এত বড় একটা দুঃসময়, এমন সময়ও শত্রুরা আমাদের শত্রুতা করতে ছাড়ছে না। প্রচার চালাচ্ছে, কামাল ব্যাংক ডাকাতি করতে গিয়ে গুলি খেয়েছে। এ কথা যদি সত্য হতো, তাহলে আমি মা হয়েও ওর প্রাণ বাঁচানোর জন্য আল্লাহর কাছে আকুতি-মিনতি করতাম না, হাসপাতালে পড়ে থাকতাম না। ওকে মরতে দিতাম।’ আমি সবিস্ময়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েছি। এমন তেজস্বিতার কথা কোনো সাধারণ মায়ের মুখ থেকে বের হতে পারত না।

চিলিতে প্রেসিডেন্ট আলেন্দেকে ঘাতকরা হত্যা করেছে। তাঁর স্ত্রী ও কন্যাকে করেনি। বাংলাদেশে ঘাতকরা শুধু বঙ্গবন্ধুকেই হত্যা করেনি, তাঁর স্ত্রী, পুত্র, পুত্রবধূ এবং অন্যান্য আত্মীয়কেও করেছে। তার কারণ কী? তার কারণ ঘাতকরা এই পরিবারের কাউকে বাঁচিয়ে রাখা তাদের জন্য নিরাপদ মনে করেনি। বেগম মুজিব যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে তিনিও সিংহীর চেহারা ধারণ করতেন। স্বামীর ভূলুণ্ঠিত আদর্শের পতাকা আবার তুলে ধরতেন। যেমন পরবর্তীকালে তুলে ধরেছেন তাঁর বেঁচে যাওয়া কন্যা শেখ হাসিনা।

আমার বিশ্বাস, স্বাধীন বাংলার স্বাধীনতাযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস যেদিন লেখা হবে, তাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামের পাশে বেগম ফজিলাতুননেসা মুজিবের নামটিও স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। আজ ৮ আগস্ট। তাঁকে নম্রশিরে পরম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি। -কালের কন্ঠ

লন্ডন, সোমবার, ৭ আগস্ট ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment