তৃতীয় মত

সব ভালো তার, শেষ ভালো যার

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

এবারের কোরবানির ঈদে দুটি হাসিমুখ দেখে মনে অপার আনন্দ লাভ করেছি। একটি হাসিমুখ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। অন্যটি প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার। গত শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য গিয়েছিলেন গণভবনে। তাদের মধ্যে প্রধান বিচারপতিও ছিলেন। আমার এক বন্ধু তার মোবাইল ফোনটি খুলে ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও প্রধান বিচারপতি সিনহার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময়ের একটি নয়, একাধিক ছবি দেখালেন। মন থেকে একটা বড় কালো মেঘ সরে গিয়েছিল।

লন্ডনে আমরা ঈদ করেছি আগের দিন শুক্রবার (১ সেপ্টেম্বর)। পরদিন আমার বাসায় কিছু বন্ধু-বান্ধব এসেছিলেন। দেশের বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে তারা সবাই উদ্বিগ্ন ছিলেন। ঢাকার এই ছবি দেখে সবাই খুশি হলেন। তাদের সবাই ঈদের দিনে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতির এই শুভেচ্ছা বিনিময়ের সাক্ষাৎকার ও হাসিমুখ দেখে ধারণা করছেন, দেশের রাজনৈতিক আকাশে ঘনমেঘের বিস্তার ঘটেছে বটে, তা হয়তো শিগগির কেটে যাবে।

ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে প্রধান বিচারপতিকে টেলিফোন করলাম। তিনি নিজেই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দেখা হওয়ার কথা বললেন। জানালেন, প্রধানমন্ত্রী তার সঙ্গে খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ ব্যবহার করেছেন। বলেছেন, শিগগিরই প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনায় বসবেন। এই সংকট যে কেটে যাবে তখন তারও আভাস পেয়েছিলাম তার কণ্ঠে। জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনি কি কানাডায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন, যাচ্ছি। ঢাকার একটি টেলিভিশনে তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ চালানো হচ্ছে সে সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতেই বললেন, আমার বেশ কিছু বাড়ি আছে। তা বিক্রি করে টাকা পেয়েছি। আশিয়ানার ব্যাপারে আমার বিরুদ্ধে প্রচার চালানো হচ্ছে। আশিয়ানার ওপর ইংজাংশন তো আমিই দিয়েছিলাম।

প্রধান বিচারপতিকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনার বিরুদ্ধে এই প্রচারণার কোনো প্রতিবাদ করবেন না?’ তিনি বললেন, ‘এখন নয়। আমার ইনকাম ট্যাক্স রিটার্নের কাগজপত্র প্রকাশ করি, তাতেই সব কিছু জানা যাবে। আমাকে প্রতিবাদ জানাতে হবে না।’ তার কথার মধ্যে এমন একটা সারল্য ছিল, যাতে তার ওপর বিশ্বাস হারানো আমার কাছে কষ্টকর মনে হয়েছে। ষোড়শ সংশোধনীর যে রায় নিয়ে এত বিতর্ক ও বিবাদ, তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের মধ্যে একটা একাডেমিক আলোচনা, জুডিশিয়াল ডিসকাশন এবং জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো উচিত ছিল। কিন্তু তার বদলে এটাকে একটি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা হয়েছে।

বিএনপি-জামায়াতের হাতে এখন কোনো রাজনৈতিক ইস্যু নেই। তাই এটাকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানোর প্রয়াস চালিয়েছে। তথাকথিত সুশীলসমাজ হাসিনা-সরকারকে হেয় করার জন্য এটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে। চক্রান্ত ছাড়া হাসিনা সরকারকে গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে না এটা জেনে হতাশ ও ব্যর্থ রাজনীতিকের দল আবার জোট বেঁধে ষড়যন্ত্র পাকাচ্ছে। ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত রায় এবং তার সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ (Observation) এই ষড়যন্ত্রে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা হয়েছে সরকার ও বিচার বিভাগের মধ্যে তুমুল বিবাদ বাধিয়ে দিয়ে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের কিছু মন্ত্রী ও নেতা নিজেদের সংযম হারিয়ে এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দিয়েছেন। তারা নিজেদের অসংযত ও অশালীন কথাবার্তা দ্বারা শুধু একজন প্রধান বিচারপতির সম্মান হানি করেননি, গোটা বিচার বিভাগের মর্যাদা ও সম্মানকে ধুলোয় লুটিয়েছেন। এখন ক্ষমতার অন্ধ অহমিকায় এই সত্যটি তারা বুঝবেন না। কিন্তু ভবিষ্যতের ইতিহাস বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক উন্নয়নমূলক কাজের ফিরিস্তি দানের সঙ্গে সঙ্গে এই অপ্রিয় সত্যটিও লিপিবদ্ধ করে রেখে যাবে যে, এই সরকারের আমলে বিচার বিভাগ নামের রাষ্ট্রীয় ইনস্টিটিউশনটি মর্যাদা হারাতে চলেছিল। বিচার বিভাগ এখন আর সব বিতর্কের ঊর্ধ্বের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নয়। এই মর্যাদা উদ্ধারে কত বছর, কত যুগ লাগবে, তা আমি জানি না।

দীর্ঘকাল লন্ডনে বসবাস করি। স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিদেশি সাংবাদিকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা হয়েছে, যারা উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশ সম্পর্কেও খবরাখবর রাখেন। তাদের কেউ কেউ আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, বাংলাদেশের একটি টেলিভিশনে প্রচারিত দেশটির প্রধান বিচারপতির ব্যাংক অ্যাকাউন্ট এবং চেকের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা লেনদেন সম্পর্কে তোমার অভিমত কী? বলেছি, আমার কোনো অভিমত নেই। কারও ব্যাংকে বিপুল অর্থ জমা হওয়ার অর্থ তিনি অসাধু তা নয়। আগে তদন্ত চালাতে হবে এই অর্থের উৎস কী? উৎসটি অসৎ হলে তাকে দুর্নীতিপরায়ণ বলা যাবে। এবং তখন মন্তব্য করা যাবে।

সাংবাদিক বন্ধুকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছি, ব্রিটেনে কয়েক বছর আগে এক রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ উঠেছিল। আদালতে দাঁড়িয়ে তার আইনজীবী বলেছিলেন, কেউ কি ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে ঘুষের টাকা দেয় অথবা নেয়? ব্রিটেনের এক বিখ্যাত সাংবাদিক জন পিলজার ইরাকের সাদ্দাম ও লিবিয়ার গাদ্দাফির বিরুদ্ধে পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের মিথ্যা প্রচার ও আগ্রাসী ষড়যন্ত্রের কথা অনরবত লিখতেন। তার চরিত্র হননের জন্য ডানপন্থী ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকা তার নামে দেয়া একটা মোটা অংকের চেকের ছবি ছেপে বলেছিল, পিলজারকে এই চেক গাদ্দাফি দিয়েছেন। জন পিলজার আদালতে মানহানির মামলা করেছিলেন এবং পত্রিকাটি তাকে ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে বাধ্য হয়েছিল।

ব্রিটিশ সাংবাদিক বন্ধুকে বলেছি, আমাদের প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে টেলিভিশনে বা সংবাদপত্রে যে অভিযোগগুলো প্রচারিত হয়েছে, সে সম্পর্কে এই মুহূর্তে আমার কোনো মন্তব্য নেই। সত্য কখনও ঢেকে রাখা যায় না, তা একদিন জানা যাবেই। সুতরাং প্রধান বিচারপতি সম্পর্কিত অভিযোগগুলোও সত্য হলে একদিন জানা যাবেই। জানা গেলে এ সম্পর্কে কঠোর মন্তব্য করার সঙ্গে সঙ্গে এ প্রশ্নও তোলা যাবে, তাকে নিয়োগদানের সময় তার চরিত্র বিচার করা হয়নি কেন এবং এখন নতুন করে পুরনো অভিযোগ বিরাটভাবে তোলা হচ্ছে কি তার ওপর চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে?

এই নিবন্ধটি লেখা শুরু করেছিলাম এবারের ঈদের ছুটির পরপই। কিন্তু শারীরিক অসুস্থার জন্য শেষ করতে পারিনি। এখন লেখাটা আবার যখন শুরু করেছি, তখন নির্বাহী ও বিচার বিভাগের এই দ্বন্দ্বটা মীমাংসার পথে আরও অনেক দূর এগিয়েছে। মনে হয় সংকট কেটে যাচ্ছে। আর এটা সম্ভব হয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পলিটিক্যাল উইজডমের ফলে। তিনি ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার চরম পরাকাষ্ঠা দেখিয়েছেন। আওয়ামী লীগ এখন যেসব ‘কাউয়ার দল’ (ওবায়দুল কাদেরের ভাষায়) এসে জুটেছে, তাদের কা-কা চিৎকারে প্রভাবিত হননি। প্রধান বিচারপতিও একটানা প্রচার ও অপপ্রচারের মুখে ধৈর্যচ্যুত হননি। কোনো হঠকারী নীতি গ্রহণ করেননি। এই সংকট থেকে যারা সুবিধা লুটতে চেয়েছিলেন, তাদের বরং তিনি হতাশ করেছেন।

পরিবর্তিত পরিস্থিতি আশাব্যঞ্জক। প্রধান বিচারপতি রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ছুটিতে কানাডায় গেছেন তিনি। তার স্থলে একজন অস্থায়ী বিচারপতিও নিযুক্ত হয়েছেন। বিদেশ যাত্রার আগে প্রধান বিচারপতি এক সভায় জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু দেশ স্বাধীন না করলে আমি আজ দেশের প্রধান বিচারপতি হতে পারতাম না।’ এই উপলব্ধি দেশের বহু অকৃতজ্ঞ রাজনৈতিক নেতার মধ্যে নেই।

দেশের এই একটি বিরাট রাজনৈতিক সংকটে যুগান্তরের ভূমিকার আমি প্রশংসা করি। একটি তথাকথিত নিরপেক্ষ বাংলা দৈনিকের মতো এই সংকট থেকে ফায়দা লুটতে দেশের জন্য ক্ষতিকর কৌটিল্য-সংবাদিকতা না করে যেভাবে সমস্যা সমাধানে নিরপেক্ষ সম্পাদকীয় নীতি অনুসরণ করেছে যুগান্তর, তা প্রশংসনীয়। এই পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত কলামিস্ট মাহবুব কামালের সাম্প্রতিক লেখাটি আমি পড়েছি। তার ভাষা, পরিমিতিবোধ ও যুক্তির প্রশংসা করি। এই সপ্তাহে ‘তৃতীয় মত’ কলামে রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে লেখার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু অসমাপ্ত লেখাটি সমাপ্ত করার ইচ্ছাই মনে প্রাধান্য বিস্তার করেছে এ জন্য যে, সম্প্রতি ঢাকা থেকে খবর পেয়েছি কিছু বন্ধু-বান্ধব রটাচ্ছেন, আমি প্রধান বিচারপতিকে সমর্থন জানিয়ে লেখালেখি করছি। আমার লেখা যারা দয়া করে নিয়মিত পড়েন, তাদের কাছেই প্রশ্ন রাখছি, এই প্রচারণাটা কি সঠিক?

আমি ষোড়শ সংশোধনী সম্পর্কিত রায়ের সঙ্গে যুক্ত প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণের কোনো কোনো অংশের বিরোধিতা করেছি। বলেছি এগুলো আপত্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক। এসব মন্তব্য রায় থেকে এক্সপাঞ্জ করার জন্য প্রধান বিচারপতির কাছে আবেদনও জানিয়েছি। কিন্তু এই পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে ভদ্র ও গঠনমূলক মন্তব্য না করে ‘তুমি দু’টাকার উকিল’, ‘তুমি দেশ ছেড়ে চলে যাও’ ইত্যাদি অসংখ্য ও অশোভন মন্তব্য করা যে শুধু এক ব্যক্তিকে নয়, দেশের বিচার বিভাগের মর্যাদাহানিকর, একথাই এই অতি উৎসাহী নেতাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি।

রাষ্ট্রব্যবস্থায় বিচার বিভাগ একটি প্রধান ইন্সটিটিউশন। এই ইন্সটিটিউশনকে কোনো কারণেই বিতর্কিত করা চলে না। তাতে রাষ্ট্র এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষতি হয়। আওয়ামী লীগের মতো একটি গণতান্ত্রিক দল ও সরকারের এই কথাটি জানা নেই, তা আমি বিশ্বাস করতে চাই না। আওয়ামী লীগ কেন সমালোচনার মুখে বিএনপির মতো আচরণ করবে? প্রধান বিচারপতি যদি কোনো ভুল করেন, অন্যায় করেন, তা প্রতিকারের পন্থা সংবিধানেই আছে। রাষ্ট্রপতি ভুল বা অন্যায় করলে তাকে ইমপিচমেন্ট দ্বারা অপসারণের ব্যবস্থা যদি সংবিধানে থাকে, তাহলে প্রধান বিচারপতির ব্যাপারেও অনুরূপ ব্যবস্থা থাকবে না কেন? দেশের রাজনীতিকে আমরা নিন্দা গালিগালাজ দ্বারা মেছো বাজারে পরিণত করতে পারি না।

দেশের সামনে তিনটি বড় সমস্যা দেখা দিয়েছে। ষোড়শ সংশোধনীসংক্রান্ত রায় নিয়ে বিপজ্জনক বিতর্ক, বন্যা এবং বর্তমানে রোহিঙ্গা সমস্যা। প্রধানমন্ত্রী তার বিচক্ষণতা দ্বারা প্রথম সমস্যাটিকে সমাধানের পথে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। তাই বলতে পারি ‘তার সব ভালো, যার শেষ ভালো।’ বন্যা সমস্যা মোকাবেলা সরকার সাধ্যমতো করছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গা। বর্তমান সরকারের সামনে এটা সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সম্পর্কে বারান্তরে বিশদ আলোচনার ইচ্ছে রইল। – যুগান্তর

লন্ডন ১০ সেপ্টেম্বর রোববার, ২০১৭

 

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment