খাগড়াছড়ি জেলার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭
বিবৃতি –

বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার ৬ষ্ঠ সম্পাদক মন্ডলী বৈঠক থেকে খাগড়াছড়ি জেলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। গতকাল মঙ্গলবার ( ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭) জেলা সদরে জেলা শাখার দিনব্যাপী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক অমল ত্রিপুরা সঞ্চালনায় ও ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তপন চাকমার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় পিসিপি খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্যগণ উপস্থিত ছিলেন।

সম্পাদক মন্ডলীর বৈঠকে নেতৃবৃন্দ খাগড়াছড়ি জেলার বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, খাগড়াছড়ি জেলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এক মাসের মধ্যে জেলার পানছড়ি ও দীঘিনালায় দুই নারী এবং গুইমারায় এক সেটলার বাঙালি খুনসহ তিনটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। খুনের মূল কারণ খুঁজে বের না করে এই খুনের ঘটনাকে পাহাড়ি জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। গুইমারায় বিএনপি ও আওয়ামী লীগ এই দুই দলের মধ্যে সংঘাতের কারণে এক ব্যক্তি খুনের ঘটনা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হবার পরেও এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক প্রলেপ দিয়ে পাহাড়ি জনগণের উপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। পানছড়িতে বালাতি ত্রিপুরা খুনে জড়িত সন্দেহে এক ব্যক্তিকে আটক করার পরে এই ঘটনাকে নিয়েও উগ্র সেটলার বাঙালিরা জাতিবিদ্বেষী প্রচারণা চালাচ্ছে। খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রী ইতি চাকমাকে গত ফেব্রুয়ারি মাসে খুন করার পরে প্রকৃত অপরাধীকে আটক করার চেষ্টা না করে কল্পিত ‘প্রেমের কারণে খুন’ এই নাটক সাজানো হয়েছে। এই সকল ষড়যন্ত্রমূলক কার্যকলাপের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়, জুম্ম জনগণের অস্তিত্ব রক্ষার আন্দোলনকে ধ্বংস করতে সরকার ও প্রশাসন মরিয়া হয়ে উঠেছে। নেতৃবৃন্দ সরকার ও প্রশাসনের এই ধরনের জনবিরোধী কার্যকলাপ জনসম্মুখে উন্মোচন করে দেয়ার মাধ্যমে অধিকার আদায়ের লড়াইকে এগিয়ে নিতে ছাত্র সমাজের প্রতি আহবান জানান।

এছাড়া নেতৃবৃন্দ বলেন, পাশের দেশ মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে যে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে তাতে রং ছড়িয়ে ধর্মীয় উস্কানি দেওয়া হচ্ছে। মাটিরাঙ্গায় উগ্র-সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীরা সে ইস্যুকে কেন্দ্র করে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষের উপর হামলা চালিয়েছে।

তারা আরো উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারা দেশে নারী নির্যাতন চলছে কিন্তু তা রোধ করার জন্য সরকার ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না, অপরাধীদের গ্রেফতার করে উপযুক্ত শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। এ মাসে খাগড়াছড়ি জেলা সদরে এক সেটলার বাঙালি কর্তৃক আনন্দ নগর এলাকায় মারমা সম্প্রদায়ের এক প্রতিবন্ধী কিশোরীকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সে ঘটনায় থানায় ধর্ষণের মামলা করা হয়েছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত ধর্ষককে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

তারা আরো বলেন, গত মার্চ মাসে খাগড়াছড়ি জেলা সদর আরাম বাগ এলাকায় খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে ছাত্রী ইতি চাকমাকে নিজ বাসায় খুন করেছিল দুর্বৃত্তরা। ঘটনার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত টিম গঠন করা হয়েছে, কিন্তু তদন্তের কি হল সেটি প্রকাশ করতে পারেনি। ঘটনার পরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পর্যন্ত তিন জনকে আটক দেখানো হয়েছে। কয়েকদিন আগেও সে ঘটনার সাথে জড়িত দায়ের করে একই কলেজে এইচএসসি ২য় বর্ষের একজন ছাত্রকে আটক করেছে। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে বিভিন্ন পত্রিকায় খবর ছাপিয়েছিল প্রেমের ঘটনায় ব্যর্থ হওয়ায় ইতি চাকমাকে খুন করা হয়েছে। খুনীরা পিসিপিসহ বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ গ্রহণ ও বক্তব্য রেখেছিল। প্রশাসন ও মিডিয়া কর্মীদের এসব মিথ্যা অপপ্রচার উদ্দেশ্য প্রণোদিত ও সংগঠনের ভাবমূর্তিকে বিনষ্ট করার জন্য ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে বলে মন্তব্য করেন।

নেতৃদ্বয় আরো বলেন, গণবিরোধী পার্বত্য জেলা পরিষদের অনির্বাচিত চেয়ারম্যান ও সদস্যদের মাধ্যমে প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ বিষয়ে হাই কোর্ট থেকে স্থিতাবস্থা জারি রাখার জন্য নোটিশ দেয়া হয়েছে। এর মাধ্যমেই স্পষ্ট হয়েছে সেখানে দুর্নীতি চলছিল। ছাত্র সমাজ ন্যায়ের পক্ষে থেকে সে দুর্নীতির ও ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আন্দোলন গড়ে তুলেছে। ফলে পরিষদে এমন অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে নির্দেশ এসেছে। তারা আগামীতে শত প্রতিকূল ও বাধা মোকাবেলা করে স্বার্থান্বেষী মহলে সকল ধরনের অন্যায়, অনৈতিক, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ছাত্র সমাজের প্রতি আহ্বান জানান।

বৈঠক থেকে নেতৃবৃন্দ, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তিন খুনের ঘটনায় প্রকৃত খুনীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধারণ মানুষের উপর হামলাকারীদের গ্রেফতার করে সুষ্ঠু বিচার, জেলা শহরে প্রতিবন্ধী কিশোরীর ধর্ষণের ঘটনার সাথে জড়িত ধর্ষক শাহাদাৎকে দ্রুত গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রদানে দাবি জানানো হয়। এছাড়াও খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ছাত্রী ইতি চাকমার খুনের ঘটনায় কোন সংগঠনের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে ষড়যন্ত্র না করে সুষ্ঠু তদন্তের পর পুলিশি তদন্ত রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রদানের জন্য জোর দাবি জানান।

নেতবৃন্দ, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়ানোর পর বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সারাদেশে উগ্র সাম্প্রদায়িক ও ধর্মীয় মৌলবাদী গোষ্ঠীদের অপতৎপরাতা চলছে, তা বন্ধ করতে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা উৎসবে নিরাপত্তা জোরদার করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান।

বার্তা প্রেরক

সমর চাকমা
দপ্তর সম্পাদক
পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি)
খাগড়াছড়ি জেলা শাখা।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment