কালান্তরের কড়চা

গুজবে বিশ্বাস করতে বলি না ষড়যন্ত্র ঠেকানো জরুরি

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

‘দীর্ঘ আয়ু দীর্ঘ অভিশাপ’—কথাটা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। আমার মনে হয়, দীর্ঘ আয়ুর একটা ভালো দিকও আছে।

মানুষের মনে তা দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পুঁজি জমায়। দীর্ঘ আয়ু পেয়েছি বলেই আজ স্মরণ করতে পারছি সত্তরের দশকে লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর গলব্লাডার অপারেশনের সময় কী উত্কণ্ঠা ও শঙ্কার মধ্যে আমাদের একটা দিন কেটেছে! এ বছরেও সেপ্টেম্বর মাসের শেষের দিকে গভীর উত্কণ্ঠার মধ্যে আমাদের অনেকেরই একটা দিন কেটেছে, যখন লন্ডনে বসে শুনেছি, আমেরিকার এক হাসপাতালে শেখ হাসিনার গলব্লাডার অপারেশন হচ্ছে।

কোথায় এ বছর ২৮ সেপ্টেম্বর আমরা শেখ হাসিনার ৭১তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে শুভেচ্ছা জানাব, তার বদলে তাঁর আশু রোগমুক্তি ও দীর্ঘজীবনের জন্য প্রার্থনা করে কাটাতে হয়েছে। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি নিউ ইয়র্কে যান। সেখানেই রোগাক্রান্ত হন। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দেহে সফল অস্ত্রোপাচার করা হয়। দেশবাসী শঙ্কামুক্ত হয়। ফলে তাঁর দেশে ফেরাও বিলম্বিত হচ্ছে।

গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে শেখ হাসিনার ৭০ বছরে পা দেওয়া উপলক্ষে দেশের দলমত-নির্বিশেষে বিশিষ্ট গুণীজনরা বিশাল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনের ঠিক আগের দিন দেশের সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের প্রয়াণ ঘটে। শোকাভিভূত দেশের মানুষের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে শেখ হাসিনা নিজের জন্মদিনের আয়োজিত উৎসব বাতিল করার নির্দেশ দেন। দেশের সংস্কৃতি ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের প্রতি শেখ হাসিনা কতটা শ্রদ্ধা পোষণ করেন, শুধু সেদিন নয়, বহুবার তার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এ বছর আগস্ট মাসের ২৪ তারিখে শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে বিদেশি গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। তাকে ভিত্তি করে দেশের কয়েকটি টিভি চ্যানেলেও খবর প্রচারসহ আলোচনা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা হয়। খবরটি হলো, প্রধানমন্ত্রীর ওপর একটি ব্যর্থ হামলা হয়েছিল। তাতে জড়িত ছিল একটি বিশেষ বাহিনীর কিছু সদস্য। অর্থাৎ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে যেমন তাঁর বিশ্বস্ত দেহরক্ষীদের দুই ব্যক্তি হত্যা করেছিল, তেমনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ওপর হামলা চালানোর ষড়যন্ত্র হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সঙ্গে সঙ্গে এই খবর অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের উদ্দেশ্যমূলক ও বিভ্রান্তিকর খবর প্রচার না করার জন্যও সবাইকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাণনাশের জন্য অতীতেও বারবার চেষ্টা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ হামলা হয়েছে ২০০৪ সালের আগস্ট মাসে, যা গ্রেনেড হামলা নামে পরিচিত। এ ছাড়া ছোটখাটো ষড়যন্ত্র তো লেগে আছেই। তাঁর বিমানে যান্ত্রিক ত্রুটি ঘটা, তাঁর খাদ্য বিনা পরীক্ষায় ছেড়ে দেওয়া ইত্যাদি ঘটনাও সন্দেহের আওতার বাইরে নয়। সুতরাং কোনো মহল যদি উদ্দেশ্যমূলকভাবেও শেখ হাসিনার জীবননাশের চেষ্টার অসত্য খবর কিংবা গুজব ছড়ায়, মানুষ তাকে সহজেই বিশ্বাস করে নেবে। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সঙ্গে সঙ্গে খবরটি যে ভিত্তিহীন, তা প্রচার করে সময়োচিত কাজ করা হয়েছে। হয়তো গুজব রটনাকারীদের আসল উদ্দেশ্য তাতে ব্যর্থ হয়ে গেছে।

এই গুজব রটনার একটা বড় উদ্দেশ্য হতে পারে নানা ধরনের প্রচার-প্রচারণা, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাস চালিয়েও হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করতে না পেরে এখন তাঁর হত্যাচেষ্টার গুজব ছড়িয়ে দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা এবং বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বাস নষ্ট করা। চাই কি ওই বাহিনীর কোনো কোনো সদস্যকে এ ধরনের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হওয়ার জন্য উসকানি দেওয়া। সুতরাং ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর জীবননাশের চেষ্টা হয়েছিল বলে যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা ভিত্তিহীন বলে দেশবাসীকে জানিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা আরো কঠোর করা এবং তাঁর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালনে রত বিশেষ বাহিনীগুলোর প্রত্যেক সদস্যের বিশ্বস্ততা সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া। কর্তৃপক্ষ কোনো কারণেই যেন কমপ্লায়েনসিতে না ভোগে।

২৪ আগস্টের ব্যর্থ হত্যাচেষ্টা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিজ্ঞপ্তিটি আমি সঠিক বলে বিশ্বাস করি। তবে তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র অতীতে হয়েছে, বর্তমানেও হচ্ছে, ভবিষ্যতেও যে হবে না, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এই ষড়যন্ত্রগুলো অতীতে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে ও ভবিষ্যতেও যাতে ব্যর্থ হয়, সে জন্য কঠোর সতর্কতা এবং সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ভিজিলেন্স দরকার। মানুষ মাত্রেরই মৃত্যু অবধারিত। শেখ হাসিনারও একদিন মৃত্যু হবে। কিন্তু অসময়ে তাঁর মৃত্যু আমরা চাই না। তাঁকে দেশের ও জাতির আরো বেশ কিছুদিন দরকার।

এ মুহূর্তে দেশে এমন কোনো নেতৃত্ব নেই, যে নেতৃত্ব দেশবিরোধী সব ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক কাঠামো রক্ষা করতে পারে। এটা তাঁর স্তুতি নয়, এটা দেশের বর্তমান বাস্তবতা। আমি তাঁর সরকারের অনেক ভুলত্রুটির সমালোচনা করি। কিন্তু এ কথা স্বীকার করি, বিএনপি-জামায়াতের সন্ত্রাস ও ষড়যন্ত্র থেকে যদি দেশকে রক্ষা করতে হয়, জিহাদিস্ট ও তালেবানের অভ্যুত্থান থেকে দেশটাকে বাঁচাতে হয়, তাহলে এই মুহূর্তে হাসিনা-নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও  সার্বভৌমত্বের জন্য এই নেতৃত্ব আরো বেশ কিছুকাল দরকার।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার শত্রুরা এ কথাটা জানে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে তারা ভেবেছিল, বাংলাদেশের অস্তিত্ব তারা ধ্বংস করতে পারবে। কিন্তু তাঁর পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যকে হত্যা করেও বন্ধবন্ধুকন্যা হাসিনার রাজনীতিতে আবির্ভাবে তাদের চক্রান্ত সফল হয়নি। তাই দেশ-বিদেশে বসে ষড়যন্ত্রের জাল ছড়ানো হচ্ছে হয় হাসিনা-সরকারকে অবৈধভাবে উত্খাত অথবা হাসিনার প্রাণনাশের জন্য। ষড়যন্ত্রকারীরা এই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য শেখ হাসিনার নিরাপত্তাবলয়ের মধ্যেও অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাতে পারে। যেমন ভারতের ইন্দিরা গান্ধীর নিরাপত্তাবলয়ে ঢুকে চক্রান্তকারীরা তাদের উদ্দেশ্য সফল করেছে। আমি এ জন্যই প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার দায়িত্বে যাঁরা শীর্ষস্থানে আছেন, তাঁদের গুজবে বিশ্বাস করতে বলি না; কিন্তু সতর্ক হতে বলি।

ভারতের একটি অনলাইন সংবাদ সংস্থা ‘লুক ইস্ট’ বর্তমানের এই ডামাডোলের মধ্যে খবর দিয়েছে, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া চিকিসার নামে গত জুলাই মাস থেকে লন্ডনে পুত্র তারেক রহমানের সঙ্গে বসবাস করে বাংলাদেশে সরকার উচ্ছেদের নানা ষড়যন্ত্রে রত। তিনি লন্ডনে পাকিস্তান হাইকমিশনে  গিয়েছিলেন, এ খবরটা সমর্থিত হয়নি; কিন্তু তিনি যে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের চিফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল নাভিদ মুকতার, কর্নেল নাদিম ইকবাল খান, দেশরক্ষা সম্পর্কিত উপদেষ্টা রাজা রব-ই-নওয়াজ ও কোনো কোনো জিহাদিস্ট নেতার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছেন, লুক ইস্টের এ খবরটি তারা প্রকাশ করার আগে থেকেই লন্ডনের বাজারে ছড়িয়ে পড়েছে। লন্ডনে খালেদা জিয়া তাঁর দলের কোনো নেতাকর্মীর সঙ্গে দেখা করছেন না; দলের সমাবেশে যাচ্ছেন না। দলের ক্ষুব্ধ কোনো কোনো নেতাকর্মী এ খবর ফাঁস করে দিচ্ছেন যে নেত্রী অন্য ধরনের গোপন তত্পরতায় জড়িত হয়ে পড়েছেন।

লুক ইস্টের খবরে খালেদা জিয়া বাংলাদেশে যে জুডিশিয়াল ক্যু ঘটানোর ব্যর্থ চক্রান্ত করেছিলেন তার উল্লেখও রয়েছে। তিনি আশা করছিলেন, এতে সাধারণ নির্বাচনে ১৫৪ জন এমপির নির্বাচন অবৈধ—এই রায় দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর কাজে সাহায্য জোগাবেন। কিন্তু প্রধান বিচারপতিকে এই ষড়যন্ত্রে জড়ানো সম্ভব হয়নি। প্রধান বিচারপতি যাতে এই ষড়যন্ত্রের ফাঁদে পা দেন এবং সুনাম হারান সে জন্য তাঁকে অশোভনভাবে নিন্দা ও সমালোচনা করে উত্তেজিত ও প্ররোচিত করার উদ্দেশ্যে আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেও একটি মহল চেষ্টা করেছে। তাদের চক্রান্তও সফল হয়নি।

আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে বেষ্টন করে নানা ধরনের চক্রান্তের জাল বোনা হচ্ছে। এগুলোকে অস্বীকার বা উপেক্ষা করা ঠিক হবে না। লন্ডনে বসে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান কী ধরনের ষড়যন্ত্রের জাল বুনছেন সে সম্পর্কে তদন্ত হওয়া দরকার। এই তদন্তে সম্ভব হলে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড ও এমআই ফাইভ ও এমআই সিক্স ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা দুটির সাহায্য গ্রহণ করা উচিত। লন্ডনে ফিনসলে এলাকায় জেনারেল জিয়াউর রহমানের সম্পর্কিত বোন বিলকিস প্রধান যূথীর বাসভবনে পাকিস্তানের আইএসআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা জুনায়েদ আলম, ব্রিগেডিয়ার আশরাফ, মেজর জেনারেল তারেক গুলজার ও মেজর জেনারেল নোমান জাকারিয়া পর্যায়ক্রমে খালেদা জিয়ার সঙ্গে গোপন বৈঠকে বসেছিলেন কি না—এ খবরটিরও সত্যতা যাচাই হওয়া প্রয়োজন।

যদি এই খবর সঠিক বলে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, তাহলে বুঝতে হবে, শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিদেশের মাটিতেও হাসিনা-সরকারকে উত্খাত অথবা তাঁকে হত্যার নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলার খবর অসত্য নয়। এ সম্পর্কে যেমন আওয়ামী লীগ সরকার তেমনি আওয়ামী লীগ দলেরও সতর্ক হওয়া উচিত। দেশে ১৯৭৫ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কিছুতেই ঘটতে দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন নিশ্চয়ই চলবে এবং তা চলতে দেওয়া উচিত। কিন্তু ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সরকার উচ্ছেদ বা হাসিনাকে হত্যার ষড়যন্ত্র কিছুতেই সফল হতে দেওয়া চলবে না। জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা নিয়ে এই ষড়যন্ত্রের রাজনীতির বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি প্রয়োজন। – কালের কন্ঠ

লন্ডন, রবিবার, ১ অক্টোবর ২০১৭

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment