কালের আয়নায়

ঈশান কোণের কালো মেঘ উপেক্ষা করা উচিত নয়

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

 

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হয়েছে মনে হয়। শেখ হাসিনার সরকারের একটা বড় কৃতিত্ব এই যে, দেশের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়ন দ্বারা একটা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বাতাবরণ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। কিন্তু এখন বিনা মেঘে এই বাতাবরণটির ওপর ঝড়ের আঘাত লাগছে। এটা শুভ লক্ষণ নয়। এই ঘূর্ণিঝড়ের সূচনা হয় ষোড়শ সংশোধনীর রায় দিতে গিয়ে প্রধান বিচারপতির পর্যালোচনায় কিছু অপ্রয়োজনীয় ও আপত্তিকর কথা যুক্ত হওয়ার ফলে। তা নিয়ে দেশময় প্রচণ্ড বিতর্কের জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিপম্ন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। প্রধান বিচারপতি দীর্ঘদিনের জন্য ছুটি নিয়ে বিদেশে চলে যাওয়ায় মনে হচ্ছিল, সেই মেঘ বুঝি কেটে গেছে। কিন্তু দিল্লিতে নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূত সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর বক্তব্যে এই প্রশমিত ঝড় আবার দেখা দিতে পারে। দিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে হাইকমিশনার বলেন- আমি নিশ্চিত, প্রধান বিচারপতি যদি চিকিৎসার পর সুস্থ হয়ে কাল সকালেই আবার দায়িত্ব নিতে চান, তাতেও কোনো সমস্যা হবে না। সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী আরও বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতি এবং আমি একই জেলা মৌলভীবাজারের মানুষ; আমি তাকে খুব ঘনিষ্ঠভাবে চিনি।’ কিন্তু সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলীর বক্তব্যের সঙ্গে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের বক্তব্যের মিল নেই। তিনি প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহা আবার দায়িত্ব নেবেন, সেই সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।’ আইনমন্ত্রী আনিসুল হকও আভাস ও ইঙ্গিতে বুঝিয়েছিলেন, ‘আপিল বেঞ্চের পাঁচ বিচারপতি তার সঙ্গে একবেঞ্চে বসতে রাজি নন। সুতরাং তার দায়িত্বে ফেরার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।’ বাংলাদেশ সরকারের দু’জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মুখে দুই ধরনের কথা শোনা যাওয়ায় আবার দেশে রাজনীতিতে একটা বিভ্রান্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমান সরকারের আমলের একটি সমস্যা হচ্ছে, একজন নেতা বা মন্ত্রী যা বলেন, অন্য একজন তার বিপরীত কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার মন্ত্রী ও নেতাদের অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তা বলতে নিষেধ করা সত্ত্বেও এক শ্রেণির আওয়ামী নেতা ও মন্ত্রী এমনকি সরকারি কর্মকর্তারাও সেই নিষেধ মেনে চলছেন না। আওয়ামী লীগ সরকার দেশের অনেক ভালো কাজ করেছে ও করছে। তা সত্ত্বেও এ ধরনের পরস্পর বিরোধী কথাবার্তার জন্য সেসব কাজের গুরুত্ব হ্রাস পায় এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিভ্রান্তি দেখা দেয়। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একবার দুঃখ করে বলছিলেন, ‘গু ঞড়হমঁব রং সু ড়িৎংঃ বহবসু’ (আমার জিহ্বা আমার সবচেয়ে বড় শত্রু)। হক সাহেব অত্যন্ত বড়মাপের নেতা ছিলেন। কিন্তু তার পরস্পর বিরোধী কথাবার্তাই রাজনৈতিক শত্রুরা তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতেন। বর্তমানে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের একশ্রেণির সরকারি কর্মকর্তা, নেতা ও মন্ত্রীর মধ্যে এই প্রবণতা দেখা যায়, যা দলটির জন্য বিপজ্জনক।

এ ব্যাপারে সাম্প্রতিক একটি উদাহরণ দেব। বাংলাদেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার নুরুল হুদা বিএনপির নেতাদের সঙ্গে আগামী নির্বাচন সংক্রান্ত এক বৈঠকে অনেক কথার মধ্যে বলেছেন, ‘জেনারেল জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন এবং বিএনপি ক্ষমতায় এসে দেশের শাসন ব্যবস্থায় নতুন ধারা প্রবর্তন করেছেন।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকে, বিশেষ করে বিএনপিকে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে আশ্বস্ত করা এবং তারা যাতে নির্বাচনে যোগ দেয়, সে জন্য তাদের বোঝানো। তিনি তার বদলে প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যের মতো কেন অবান্তর ও অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করতে গেলেন, তা আমার কাছে এক রহস্য। তার বক্তব্যও জাতির পিতার প্রতি কটাক্ষপূর্ণ। কারণ বিএনপির প্রোপাগান্ডা হলো, বঙ্গবন্ধু বহুদলীয় গণতন্ত্র উচ্ছেদ করেছিলেন এবং জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র আবার প্রতিষ্ঠা করেন। এই প্রোপাগান্ডাটি যে মিথ্যা তা আমার লেখাতেও তথ্য ও যুক্তিসহ বহুবার উল্লেখ করেছি। এখানে তার পুনরুক্তি বাহুল্য। হিটলারের প্রোপাগান্ডা মিনিস্টার গোয়েবলসের একটি থিউরি ছিল- একটি মিথ্যা শতবার বলা হলে সত্য হয়ে যায়। বাংলাদেশে বিএনপি গোয়েবলসের এই নীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু নুরুল হুদা সাহেব মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক হওয়ার সুবাদে খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে তাকে চাকরি হারাতেও হয়েছিল। আদালতে মামলা করে সেই চাকরি তিনি ফেরত পান এবং প্রমোশন নিয়ে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি কী করে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বারা প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিযুক্ত হওয়ার পর বিএনপির অসত্য প্রচারগুলো নিজে কেন প্রচার করছেন এবং কী কারণে, তা আমার জানা নেই। তিনি এখন এ সম্পর্কে যত ব্যাখ্যাই দেন, তা ধোপে টিকবে না।

প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এই বক্তব্য নিয়ে দেশে আবারও একটি ছোটখাটো বিতর্ক শুরু হয়েছে। এই বিতর্কটি যাতে বড় হয়ে দেখা না দেয়, সেই লক্ষ্যেই হয়তো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপিকে নির্বাচনে যোগ দিতে রাজি করানোর জন্যই হয়তো সিইসি কথাগুলো রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ব্যবহার করেছেন।’ সিইসির পক্ষে কথা বলার জন্য অনেকে ওবায়দুল কাদেরেরও সমালোচনা করছেন। আমি সেই সমালোচনা করি না। ওবায়দুল কাদের প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিতর্ক এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে নিয়ে বিতর্ক- দুই ব্যাপারেই রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি যদি কোনো ভুলও করে থাকেন, তা দেশের পরিস্থিতিকে ঘোলাটে করার লক্ষ্যে যে বিতর্ক উস্কে দেওয়া হয়েছিল, তা নিবারণের লক্ষ্যেই করেছেন। যে কথাটি তিনি আরও বলতে পারতেন, নির্বাচন কমিশনারের একটি বক্তব্যে জাতির পিতার প্রতি কটাক্ষ এবং বিএনপির শাসনামল সম্পর্কে একটি অসত্য কথা না থাকলে ভালো হতো। বিএনপি ক্ষমতায় এসে দেশ শাসনে নতুন ধারা প্রবর্তন করেছে, এটি একটি চরম অসত্য! বিএনপি ক্ষমতায় এসে রাজনীতির অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ধারাটিকে নষ্ট করেছে এবং স্বাধীনতার শত্রু জামায়াত ও রাজাকারদের নিয়ে সরকার গঠন করে দেশে যে সন্ত্রাস ও হত্যার রাজনীতি শুরু করেছিল, যার বলি হয়েছিলেন দেশের বহু বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতা। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার নিজেও নির্যাতিত হয়েছেন। তা কি দেশে শাসন ব্যবস্থায় নতুন ধারা? তার এই বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা দিলে তিনি ভালো করবেন। ওবায়দুল কাদের এ কথাগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দিলে ভালো হতো। তবে দেশকে আবার বিপজ্জনক ও রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে মুক্ত করার জন্য তিনি যে বক্তব্য রেখেছেন, তাতে তাকে প্রশংসাই বলতে হয়। প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে বিতর্কের সময়ও তিনি আওয়ামী লীগের একশ্রেণির নেতা ও মন্ত্রীর মতো সীমা লঙ্ঘন করেননি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উচিত, আওয়ামী লীগের একশ্রেণির মন্ত্রী, নেতা এবং সরকারি কর্মচারীদের অসঙ্গত ও পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা থেকে বিরত থাকার জন্য কঠোর নির্দেশ দেওয়া। এসব কথা সরকারের ইমেজ ধ্বংস করে এবং শত্রুপক্ষকে অসত্য প্রচারে ও জনগণকে বিভ্রান্ত করার কাজে সাহায্য জোগায়। আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী এই সত্যটি হয়তো উপলব্ধি করেন না, আমি জানি প্রধানমন্ত্রী তা করেন। এ জন্য বহু সমস্যায় তাকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে এবং তার একটি সমাধান বের করতে হয়েছে। এখন উচিত, দলকে দায়িত্বহীন ও পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা থেকে বিরত রাখা। তাহলে হয়তো দেশের রাজনীতিতে বিতর্ক ও কুতর্কগুলো এত দ্রুত ছড়াতে পারবে না। রাজনৈতিক বিতর্ক ভালো; কিন্তু উদ্দেশ্য প্রণোদিত কুতর্কগুলো রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক। তা গুজবকে উস্কে দেয় এবং গণতন্ত্রকে বিপম্ন করে।

আওয়ামী লীগের একটি দুর্ভাগ্য, প্রতিপক্ষের সঙ্গে গণতান্ত্রিক সহাবস্থান এবং উদারতার যথাযোগ্য মূল্য তারা পান না। শেখ হাসিনা প্রথম ক্ষমতায় এসে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় ব্যক্তিকে নিয়োগ না দিয়ে, দেশের সব মহলের নিরপেক্ষ ব্যক্তি বলে পরিচিত বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ দিয়েছিলেন। সেই রাষ্ট্রপতিকে দেখা গেল, পরবর্তী নির্বাচনের সময় একটি সুশীল সমাজ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রচণ্ড আওয়ামী লীগবিরোধী ভূমিকা গ্রহণ করেছেন। সেই বিশাল ব্যক্তিত্ব কর্মফলে বিস্তৃতির অন্ধকারে চলে গেছেন। একজন বিখ্যাত আইনজীবীকে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তিনি এখন আওয়ামী লীগের ঘোর শত্রু এবং এই সরকারকে কীভাবে ক্ষমতা থেকে নামানো যায়, তার একটার পর একটা চক্রান্তের নেপথ্য নায়ক। সম্প্রতি ষোড়শ সংশোধনী সম্পর্কে আপিল আদালত যে রায় দিয়েছেন, সেই রায় প্রদানেও প্রধান বিচারপতিকে প্রভাবিত ও প্ররোচিত করার ব্যাপারে একটি রাশপুটিন গ্রুপের তৎপরতার খবর জানা যায়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সাম্প্রতিক বিতর্কমূলক কথার পেছনেও এই গ্রুপের কোনো তৎপরতা রয়েছে কি-না, তা আমি জানি না। আমি শুধু এটুকু জানি, দেশে দলতন্ত্রের পরিবর্তে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সেসব বিশিষ্ট ব্যক্তিকে শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময় শীর্ষপদে বসান। তারাই দশচক্রে ভগবান ভূত হয়ে যান। এর কারণ এবং প্রতিকার কী, শেখ হাসিনাকে তা খুঁজে বের করতে হবে।

দেশে একটি রাজনৈতিক ঘূর্ণিঝড়, সে কথা আগেই বলেছি। হিন্দু বলে প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহাকে সরানোর ব্যবস্থা হয়েছে, এমন একটি গুজব বাজারে চালু করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের একশ্রেণির মিডিয়া এই প্রচারণাটিকে লুফে নিয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারতের বর্তমান ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নষ্ট করার জন্যই এ প্রচারণাটি ছড়ানো হচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, দিল্লিতে আমাদের হাইকমিশনার সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এই প্রচারটি বন্ধ করার জন্যই প্রধান বিচারপতিকে যে কোনো সময় দেশে ফিরে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেন- ভারতে বসে এই কথাটি বলছেন। কিন্তু কথাটি কি সঠিক? আইনমন্ত্রী ও অ্যাটর্নি জেনারেল তো অন্য কথা বলছেন। এই পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা প্রথমে বন্ধ করা দরকার। বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের কাছে সরকারের পক্ষ থেকে অভিন্ন কণ্ঠে পরিস্থিতির সঠিক ব্যাখ্যা দেওয়াই এই গুজব ও প্রচারণা বন্ধ করার একমাত্র উপায়। সরকার দেশের সৎ, নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়াকর্মীদের উৎসাহিত করতে পারে; যাতে তারা সাম্প্রতিক বিতর্কগুলোতে যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে, তার মুখোশ উন্মোচন করা এবং সঠিক পরিস্থিতি দেশের ও বিদেশের মানুষকেও অবহিত করা। সরকার যেন এই বিতর্কগুলোকে তুচ্ছ মনে না করে। ঈশান কোণের ক্ষুদ্র কালো মেঘখণ্ডই যে দ্রুত সারা আকাশ ঢেকে ফেলে প্রচণ্ড ঝড়ের সৃষ্টি করে, তা সরকারের স্মরণ রাখা উচিত। – সমকাল
লন্ডন, ১৮ অক্টোবর বুধবার, ২০১৭

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment