তৃতীয় মত

একুশ কি এখন আমাদের অন্ধ পদ্মলোচন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। বাংলাদেশে একটি জাতীয় অনুষ্ঠান। জাতীয় উৎসবও বলা যেতে পারে। শোক থেকে এই উৎসবের উৎপত্তি, এই দিন ভাষা আন্দোলন ও ভাষা শহীদদের স্মরণ করে সরকারি-বেসরকারি নানা অনুষ্ঠান হয়। বাংলা একাডেমির উদ্যোগে বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধনী ভাষণ দেন। শহীদ মিনারে লক্ষ মানুষ সমবেত হয়। ভাষার গানে মুখরিত হয় সারা ফেব্রুয়ারি। ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবীরা নানা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে ভাষা আন্দোলনের বৈশিষ্ট্য, বাংলাভাষার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা করেন। পত্রিকাগুলো বিশেষ সংখ্যা বের করে। তাতে থাকে নানা তাত্ত্বিক আলোচনা। একদিনের জন্য না, দু’দিন পোশাক-আশাকে বাঙালি হয়ে ওঠে সবাই। বাংলা নববর্ষের দিনটির কথা বাদ দেই কেমনে?

তারপর আবার বছরের এগারো মাসের জন্য আমরা যেমন ছিলাম, তেমন হয়ে যাই। আহারে-বিহারে পোশাক-আশাক ব্যবহারে আবার কসমোপলিটান হয়ে যাই। ধুতি, চাদর, পাজামা-পাঞ্জাবি, এমনকি শাড়ির প্রচলন দেশে এখন প্রায় উঠে যাচ্ছে। মেয়েরা শাড়ি পরলেও গুজরাটি ঢংয়ে পরেন। পুরুষদের পাজামা-পাঞ্জাবিও তাই। ঢাকায় দু-তিন বছর আগে এক ধনী বন্ধুর ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বহু বছর বিদেশে থাকি। তাই এ অনুষ্ঠানে গিয়ে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলাম।

অনুষ্ঠানের সাজসজ্জা দেখে, গান-বাজনা শুনে মনে হয়েছিল মুম্বাইয়ের কোনো অনুষ্ঠানে বসে আছি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর এক শ্রেণীর বাংলাদেশি শহুরে মহিলা ঢাকায় ভারতীয় শাড়ি আমদানির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শনের জন্য মিছিল করেছিলেন। তাদের অধিকাংশের পরনে ছিল দামি ভারতীয় শাড়ি। কয়েক বছর আগে ঢাকায় এই বিয়ের অনুষ্ঠানে সস্তা হিন্দি গানের কান ফাটানো দাপট, বাংলা গানও হিন্দি ঢংয়ে গাওয়া, নাচের নামে বেলেল্লাপনা দেখে মনে হল বিএনপি-জামায়াতের কল্যাণে বাংলাদেশে ভারতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়ছে, কিন্তু সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে হিন্দি অপসংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে, তার প্রতিরোধ কোথায়। তাহলে প্রতি একুশে ফেব্রুয়ারিতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির নামে কোরাসে এই মায়াকান্না কেন।

আমি ওইদিন বিয়ের আসরে বসা এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ঢাকার সব সামাজিক উৎসবটি কি পাল্টে গেছে? বন্ধু বললেন, ঢাকা কেন, জেলা শহরগুলোর কমিউনিটি সেন্টার ঘুরে আসুন। এই একই ছবি দেখতে পাবেন। বুঝতে পারলাম, আমার দেখা বাংলাদেশ আর নেই। তেতাল্লিশ বছর পর স্বদেশে এসে দেখছি আমি একজন রিপভ্যান উইঙ্কল। যুগ এবং দেশের চেহারা সব পাল্টে গেছে।

আমি এ পরিবর্তনের বিরোধী নই। রক্ষণশীল মানুষ তো মোটেই নই। ১৯৭৪ সালে যখন প্রথম ব্রিটেনে আসি। তখন যে ব্রিটেন দেখেছি তা কি এখন অপরিবর্তিত আছে? মোটেই নয়। পরিবর্তনের স্রোতে ব্রিটিশ সমাজ, সামাজিক আচরণ সব পাল্টে গেছে। যে ব্রিটেনের বর্তমান রানীর চাচা সম্রাট অষ্টম এডোয়ার্ডকে এক ডিভোর্সী আমেরিকান মহিলাকে বিয়ে করার জন্য সিংহাসন ত্যাগ করতে হয়েছিল, সেই ব্রিটেনে এখন প্রিন্স চার্লস ও ডায়ানার পুত্র হ্যারি এক তালাকপ্রাপ্ত আমেরিকান তরুণীকে (যার মায়ের বংশ কালো) বিয়ে করতে যাচ্ছেন। রানী এই বিয়েতে অনুমোদন দিয়েছেন এবং সিংহাসনের ওপর হ্যারির দাবি কিছুমাত্র ক্ষুণ্ণ হয়নি।

কিন্তু ইংরেজ জাতি তার ভাষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক আচার-আচরণের ব্যাপারে শিকড়চ্যুত (Rootless) হয়নি। তার অতীতের সাম্রাজ্যগর্ব আছে, স্বাতন্ত্র্যবোধ আছে। এজন্যই ইংল্যান্ডে ব্রিটেনের পক্ষে-বিপক্ষে বিতর্ক থাকলেও গণভোটের রায় ব্রেক্সিটের পক্ষে গিয়েছে। ব্রিটেনে বহিরাগতদের মধ্যে ভারতীয়দের সম্মান বেশি। তারা দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটেনে বসবাস করলেও নিজেদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। আফ্রিকার বহু জাতি তা পারেনি। তারা ব্রিটেনে এসে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ত্যাগ করে নিম্ন আয়ের মজুর শক্তি হয়েছে। কিন্তু ব্রিটেনের সমাজ জীবনে অঙ্গীভূত হতে পারেনি।

বাংলাদেশে এখন যা চলছে, তা তাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে শিকড়চ্যুতির পালা। বাংলা ভাষার গ্রহণশক্তি প্রবল। আরবি, ফার্সি, ইংরেজি, ফরাসি, তুর্কি, পর্তুগিজ নানা ভাষা থেকে সে এন্তার শব্দ আহরণ করেছে। বিদেশি সংস্কৃতির ভালো দিকগুলো গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে বাঙালি জাতির কোনো দীনতা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ পাশ্চাত্য সঙ্গীতের সঙ্গে বাঙালির নিজস্ব বাউল গানের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। নজরুল তুর্কি হারেমের গানের সুরে বাংলায় গজল লিখেছেন। তাতে বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতি সমৃদ্ধ হয়েছে, নিঃস্ব হয়নি।

কিন্তু এখন? বাঙালি স্বাধীন এবং তার আর্থ-সামাজিক জীবনে বিস্ময়কর আধুনিকতা ও উন্নতি সত্ত্বেও সাংস্কৃতিক জীবন নীরব নিঃস্বতা গ্রাস করছে। তার দৈন্য বাড়ছে। অপসংস্কৃতির জোয়ারে বাঙালির এককালের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক জীবন ভেসে যেতে বসেছে, এ কথা বললে কি অত্যুক্তি হবে? সত্যজিৎ রায় যখন অশনিসংকেত ছবিটি তৈরি করেন, তখন তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি কলকাতায় এত সুন্দরী নায়িকা থাকতে কেন বাংলাদেশের ববিতাকে তার ছবির নায়িকা করেছেন? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘সত্য কথা বলব? পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ নায়িকা এখন হিন্দির অনুকরণে বাংলা বলেন, বাংলাদেশের নায়িকারা এটা এখনও শেখেনি। তারা এখনও বাংলার মতো করে বাংলা বলেন।’

বহুদিন হয় সত্যজিৎ রায় প্রয়াত হয়েছেন। এখন বেঁচে থাকলে এবং বাংলাদেশে এলে দেখতে পেতেন, ববিতা, সুলতানা, সুচন্দার মতো বাংলা বলেন এমন নায়িকা খুঁজতে হবে। নেই যে তা বলছি না। কিন্তু বাংলা সংস্কৃতিতেও এখন বাংলাদেশে ভাটার টান, মুম্বাইয়া অপসংস্কৃতি বাংলাদেশের সমাজ জীবনকে অবিচ্ছিন্ন করেছে। হিন্দি ভাষা এখন উপমহাদেশে এটি ঔপনিবেশিক আধিপত্যবাদী ভাষার চেহারা ধারণ করেছে। বাংলাদেশের বাঙালি এককালে উর্দুর ঔপনিবেশিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যে বাঙালিত্ব অর্জন ও উদ্ধার করেছিল, তা এখন হিন্দির দাপট ও মুম্বাইয়া অপসংস্কৃতির আগ্রাসনে বিপর্যস্ত হতে চলেছে।

অনেকে বলেন, বিশ্বায়নের ফলে এটা ঘটেছে, এটা ঠেকানোর উপায় নেই। আমি এই তত্ত্বে বিশ্বাস করি না। যেসব দেশ ও জাতির ভাষা সংস্কৃতির শক্ত ভিত্তি আছে, তারা বিশ্বায়ন থেকে বিকাশের ফসল কুড়িয়েছে। বিনাশের পথে যায়নি। তাহলে আমরা কেন গেলাম? জার্মানিতে গিয়ে দেখেছি, এখনও সেখানে হাজার বছরের পুরনো পল্লী সংস্কৃতির চর্চা হয়, উৎসব হয়। জার্মানি দু-দুটো মহাযুদ্ধে পরাজিত হয়েছে। কিন্তু নিজের স্বাতন্ত্র্য ও স্বকীয়তা হারায়নি। ফরাসিরা তো বিশ্বায়নের নামে ‘অ্যামেরিকানাইজেশনের’ ঘোর বিরোধী। তারা আমেরিকার সামরিক নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে। কিন্তু সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব মেনে নেয়নি।

বাংলাদেশে ঘটেছে এর উল্টোটা। রাজনৈতিকভাবে আমরা সাধারণত ভারত বিরোধী। কিন্তু সামাজিক ক্ষেত্রে ভারতের সুস্থ সংস্কৃতি নয়, অপসংস্কৃতির কাছে নতজানু। আমাদের যে হাজার বছরের সমৃদ্ধ পল্লী সংস্কৃতি- যাত্রা, জারি, সারি আজ বিলুপ্তির পথে। চর্যাপদ থেকে রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত সমৃদ্ধ সাহিত্য সংস্কৃতিচর্চা ক্রমশ সীমাবদ্ধ। শহুরে এলিট ক্লাসের একটা বড় অংশের এখন তা স্ট্যাটাস সিম্বল। নইলে প্রসার ও প্রভাব বাড়ছে তথাকথিত ব্যান্ডগানের।

ভাষা সংস্কৃতির ভিত্তি, আবার সংস্কৃতি ভাষার প্রসারতা বাড়ায়। বাংলা ভাষার একটা বৈশিষ্ট্য এই যে, সে একটি সেকুলার জাতীয়তাবাদের জননী এবং এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করেছে। এটা সম্ভব হয়েছে একুশের ভাষা আন্দোলন এবং ভাষাভিত্তিক একটি জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ফলে। এই জাতিরাষ্ট্র এখন সহিংস ধর্মীয় মৌলবাদ দ্বারা আক্রান্ত। তার ভাষা-সংস্কৃতি গ্রাস করতে চাইছে বিদেশি অপসংস্কৃতি।

এ সময় বাংলাদেশে একুশ আনুষ্ঠানিকাতার জালে বন্দি হয়ে গেলে, বুদ্ধিজীবীদের তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকলে বর্তমান অচলাবস্থা কাটানো যাবে না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব একটি দ্বিতীয় বিপ্লব অনুষ্ঠানের প্রয়োজন অনুভব করেছিলেন। আমাদেরও একটি দ্বিতীয় ভাষা আন্দোলন দরকার। জোরালো সাংস্কৃতিক আন্দোলন দরকার। জনসংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন দরকার। কথা হল, এই সাংস্কৃতিক আন্দোলন করার মতো সচেতন সংস্কৃতিবান ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব কোথায়?

ব্রিটিশ আমলে ত্রিশের দশকের ঢাকায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। এই আন্দোলনের নেতারা নির্মম নির্যাতন সহ্য করেছেন। কেউ কেউ ঢাকা ছেড়ে কলকাতায় পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলনে অনেক বুদ্ধিজীবী নেতৃত্ব দিয়েছেন। কারাবরণ করেছেন। ছায়ানটের প্রতিষ্ঠাতা সনজীদা-ওয়াহেদ জুটিকে তৎকালীন আইয়ুব-মোনায়েম সরকারের নিদারুণ রোষে পড়তে হয়েছিল। স্বাধীনতার যুদ্ধে তো বেছে বেছে ধরে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে বুদ্ধিজীবীদের।

সেই লড়াকু বুদ্ধিজীবী এখন কোথায়? সেই সচেতন ছাত্র-জনতা এখন কোথায়? এখন অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী ক্ষুদ্র ব্যক্তিগত স্বার্থে বিভক্ত। এক দল এক রাজনৈতিক দলের সমর্থক, অন্য দল আরেক রাজনৈতিক দলের অনুগ্রহপ্রার্থী। বাংলাদেশে কমিউনিস্ট আন্দোলনের পতনের পর সাংস্কৃতিক জীবনের নেতৃত্বের আসন প্রায় শূন্য, এই অবস্থায় আশা কোথায়? আমার ধারণা, আশা এখনও একুশে। আনুষ্ঠানিকতার গ্রাসে একুশে এখন আমাদের সমাজ জীবনে অন্ধ পদ্মলোচন। একুশের এই অন্ধত্ব ও বন্ধ্যাত্ব আমাদের ঘোচাতে হবে। যে নেতৃত্ব তা ঘোচাবেন, তার জন্য হয়তো কিছুকাল অপেক্ষা করতে হবে। মাৎস্যন্যায়ের কাল বাংলাদেশ অতিক্রম করবেই। আমি আশাবাদী। তাই এই আশা এখনও পোষণ করছি। – যুগান্তর

লন্ডন, ৪ ফেব্রুয়ারি, রোববার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment