দশ দিগন্তে

রাজনীতির অচল চাকা সচল হবে কিভাবে?

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী

বাংলাদেশে রাজনীতির চাকা ঠিকমতো ঘুরছে না। যেটুকু ঘুরছে তা কোনদিকে ঘুরছে কেউ তা বলতে পারেছেন না। মনে হয় রাজনীতির চাকা কাদামাটিতে আটকে গেছে। আমার ছোটবেলা কেটেছে ব্রিটিশ আমলের গ্রামবাংলায়। তখন গ্রামের এত উন্নতি হয়নি। বিদ্যুৎ যায়নি, রাস্তাঘাট-এমনকি জেলা বোর্ডের প্রশস্ত রাস্তাও ছিল মাটির। এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে যেতে যানবাহন বলতে ছিল নৌকা অথবা গোরুর গাড়ি। এই গোরুর গাড়ি যাত্রী বহনও করত।

বর্ষাকালে মাটির রাস্তা কাদায় ভরে যেত। খানা-খন্দ সৃষ্টি হতো। গোরুর গাড়ির চাকা ওই খানাখন্দে একবার পড়লে শক্তিশালী ষাঁড় বা গোরুও তা টেনে তুলতে পারত না। যাত্রীবাহী গাড়ি হলেতো কথাই ছিল না। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ওই গাড়িতে যাত্রীরা বিশেষ করে নারী ও শিশুরা আটকে থাকতেন। গ্রামে খবর দেওয়া হতো। তার পর একদল জওয়ান পুরুষ এসে কাদার গর্ত থেকে গাড়ির চাকা তুলতেন। গাড়ি আবার চলতে শুরু করত।

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনীতির অবস্থা দেখে ছোটবেলায় দেখা কাদায় পড়া গোরুর গাড়ির কথা মনে পড়ে। পার্থক্য এই যে, এই গাড়ির অচল চাকা সচল করার কোনো জওয়ান পুরুষের দেখা মিলছে না। এখানে জওয়ান পুরুষ বলতে আমি আমাদের রাজনৈতিক নেতাদের কথাই বলছি। আমাদের জাতীয় ও আন্তর্জাতীয় খ্যাতি সম্পন্ন রাজনৈতিক নেতারতো অভাব নেই। ড. কামাল হোসেন, নোবেল-পুরস্কার খ্যাত ড. ইউনূস, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, অবসর ভোগী প্রাক্তন বিচারপতিরা (সাবেক প্রধান বিচারপতি এবং দু’বার রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন আহমদতো এখনো বেঁচে আছেন) সবাই নির্বাক ও নিষ্ক্রিয়। জাতীয় সংকটে তাদের একমাত্র বাণী প্রদান ছাড়া আর কোনো কিছু করণীয় আছে বলে মনে হয় না। কখনো সুবিধা বুঝে তারা যদি সক্রিয় হন, তাহলে ব্যক্তিগত রাগ ও বিদ্বেষ থেকে বিশেষ দলের প্রতি বৈরাগ্য দেখান। নিরপেক্ষ হতে পারেন না।

ভারতে ব্রিটিশ আমলে যখন প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দল কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মধ্যে, দু’দলের নেতা গান্ধী ও জিন্নার মধ্যে বিরোধের ফলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হতো, তখন তাতে সালিশি করার জন্য অনেক বরেণ্য জাতীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। যেমন ড. আম্বেদকর, বয়োবৃদ্ধ আগা খান, রাজা গোপাল আচারিয়া, সরোজিনী নাইডু, ইউসুফ মেহের আলি প্রমুখ। ইউসুফ মেহের আলি ছিলেন সমাজতন্ত্রী দলের নেতা। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নার ব্যক্তিগত বন্ধু। রাজা গোপাল আচারিয়া ছিলেন গান্ধীজির বেয়াই। সরোজিনী নাইডু ছিলেন জিন্নার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি এক সময় জিন্নাকে “ambassador of Hindu Muslim unity” বা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের দূত আখ্যা দিয়েছিলেন। তারা কংগ্রেস ও লীগের বিরোধ মেটানোর বহু চেষ্টা করেছেন। সফল হননি তা অন্য কথা।

বর্তমান বাংলাদেশে ব্রিটিশ আমলের ভারতের মতো জাতীয় সংকটে মধ্যস্থতা করার মতো নিরপেক্ষ ও দক্ষ নেতার অভাব আছে। যে দু’একজন আছেন, তারা কেউ হাসিনা বিদ্বেষে ভোগেন, কেউ আওয়ামী লীগকে দু’চোখে দেখতে পারেন না। কেউ কেউ নিজেরা ক্ষমতায় যেতে পারেননি বলে প্রচণ্ডভাবে আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী। কেউ কেউ মনে মনে বিএনপি’র প্রতি অনুরাগ পোষণ করেন। কিন্তু বিএনপি’র সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক চরিত্রের জন্য প্রকাশ্যে দলটিকে সমর্থন দিতে পারছেন না। প্রচ্ছন্নভাবে দেন। এদের রাজনৈতিক সংকটে মধ্যস্থতা করার বা জাতিকে নির্দেশনা দেওয়ার মতো ক্রেডিবিলিটি নেই।

বর্তমানে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক সমস্যা, তা অতীতে গ্রামবাংলায় বর্ষার কাদামাটির রাস্তায় গোরুর গাড়ির চাকা আটকে যাওয়ার মতো। কিন্তু গর্ত থেকে এই চাকা তোলার জওয়ান নেই। ব্রিটিশ আমলে এই ধরনের সংকটে কবি নজরুল ইসলাম আহ্বান জানাতেন, “কে আছো জওয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যত”। বর্তমান বাংলাদেশে এই জওয়ানদের দেখা নেই। ভবিষ্যতও অনিশ্চিত।

বাংলাদেশ বর্তমানে একটি গতিশীল দেশ। তার অর্থনৈতিক উন্নতির চাকা ঘুরছে। কিন্তু রাজনৈতিক স্থবিরতা ঘুচছে না। রাজনৈতিক নেতাদের মুখে একই রেটোরিক উচ্চারিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ বলছে, দেশে অর্থনৈতিক উন্নতির জোয়ার বইছে। আর বিএনপি বলছে, গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকায় দেশ আজ ধ্বংসের পথে। কেউ তাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন না যে, তাদের আমলে দেশে গণতন্ত্র অনুপস্থিত ছিল। গুম, খুন, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ও দুর্নীতি আরো বেশি চলেছে।

অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগের মধ্যে আমাদের রাজনীতি আবর্তিত হচ্ছে। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র অনড় অবস্থান। এই অবস্থায় দেশের যে সুশীল সমাজ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা গ্রহণ করতে পারতেন তারাও আজ নিজেদের সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানী ভূমিকার জন্য বিতর্কিত। দেশে শক্তিশালী একটি বাম আন্দোলন নেই, যারা অতীতের মতো আওয়ামী লীগের ভেতরে প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থি অংশের উত্থান রোধ করতে পারতেন এবং পারতেন বিএনপি’কে জামায়াত ও স্বাধীনতা বিরোধী চক্রের কবল থেকে মুক্ত রাখার চেষ্টা চালাতে। দেশে ডান এবং বাম উভয় রাজনীতিরই নৈতিকতার ভিত্তি এত শিথিল যে, রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্রমশ নিম্নগামী।

তাই দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের নেত্রী দুর্নীতির দায়ে জেলে যাওয়া সত্ত্বেও দেশের মানুষের মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া খুবই কম। জামায়াতিরা আশা করেছিল তাদের যুদ্ধাপরাধী নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হলে দেশে আগুন জ্বলবে। তা জ্বলেনি। বিএনপি নেতারা হুমকি দিয়েছিলেন তাদের নেত্রীকে কারাদণ্ড দেওয়া হলে তারা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশ অচল করে দেবেন। দেশ অচল হয়নি। লন্ডনে বাংলাদেশের হাই কমিশন ভবনে গুন্ডামি করা ছাড়া ব্রিটেনেও তারেক রহমান প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেননি বরং ব্রিটিশ সরকার শক্ত মনোভাব নেওয়ায় এখন তারা এই গুন্ডামির জন্য প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করতে বাধ্য হয়েছে।

বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলা সম্পর্কে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার দায়িত্বহীন কথা বলার কোনো দরকার ছিল না। এই মামলাটি আওয়ামী লীগ করেনি। করেছে তাদের পূর্ববর্তী সরকার। বিচারও হয়েছে দেশের সাধারণ আদালতে সাধারণ বিচার প্রক্রিয়ায়। সুতরাং এই মামলার রায়ে আওয়ামী লীগ বেনিফিটেড হওয়া সত্ত্বেও এই মামলার দায়-দায়িত্ব আওয়ামী লীগের নয়। তথাপি আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার কথাবার্তায় দেশের মানুষের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে যে, এই মামলা দ্বারা আওয়ামী লীগ বুঝি প্রতিশোধ গ্রহণ করতে চাইছে। এই ভুল ধারণাটি জনমনে সৃষ্টি হতে দেওয়া উচিত নয়।

উক্ত আওয়ামী নেতা বলেছেন, “মাত্র একটা মামলায়তো বেগম জিয়া পাঁচ বছরের জন্য জেলে গেছেন। তার বিরুদ্ধে আরও পাঁচটি দুর্নীতির মামলা আছে।” অর্থাৎ আরও পাঁচটি মামলায় শাস্তি তার জন্য অপেক্ষা করছে। আরও পাঁচটি কি তার বেশি মামলাতেও বেগম জিয়ার দণ্ড হবেই আওয়ামী লীগের এই নেতাকে কে বলেছে? তার কথা শুনে সাধারণ মানুষ ভাবতে পারে আওয়ামী লীগ সরকার নেপথ্যে বসে কলকাঠি নেড়ে এই সাজা দানের ব্যবস্থা করে রেখেছে। মানুষের মনে এই ভুল বার্তা পাঠাবেন কেন আওয়ামী লীগের কোনো নেতা? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাতো এই ব্যাপারে তাদের কথা বলতে নিষেধ করেছেন। তারপরেও তাদের অযথা কথা বলার এত উত্সাহ কেন?

বিএনপিও তাদের নেত্রীর বিচার ও দণ্ডিত হওয়া নিয়ে যে দায়িত্বশীল মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছেন তা নয়। তাদের নেত্রীর জেল হলে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামবে বলে তারা যে আশা করেছিলেন তা হয়নি। সর্বশেষ, ঢাকায় তারা যে কালো পতাকা মিছিল বের করতে চেয়েছিলেন, তাও সফল হয়নি। এতদিন তারা মামলাটাকে মিথ্যা মামলা বলে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছেন। এখন বিচারককেই তাদের প্রচারণার শিকার করতে চাইছেন। বলছেন, দণ্ডদানকারী বিচারক তাদের নেত্রীর আদালতে দেওয়া বক্তব্যের ভুল উদ্ধৃতি তার রায়ে দিয়েছেন।

তা যদি হয় তাহলে এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিলের দ্বারতো খোলা। বিএনপির আইনজীবীরা সেই আপিল করার উদ্যোগও নিয়েছেন। তাহলে সংশ্লিষ্ট বিচারককেও কেন রাজনৈতিক বিতর্কে তারা জড়াতে চাইছেন? এরপর যদি মহামান্য হাইকোর্টও নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখে, তাহলে বিএনপির নেতারা কি বলবেন, হাইকোর্টের বিচারপতিরাও আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে এই কাজটি করেছেন? আর বেগম জিয়াকে খালাস দিলে বলবেন, বাংলাদেশের বিচারপতিরা ন্যায়বিচার করার সাহস দেখিয়েছেন?

বিএনপির এই প্রচারণার কৌশল ব্যর্থ করার জন্যই আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীদের উচিত, এই মামলার ব্যাপারে কোনো দায়িত্বহীন কথা না বলা এবং এই মামলাগুলোর রায় প্রভাবিত করার ব্যাপারে সরকারের যে কোনো ভূমিকা নেই, তা দেশবাসীকে বিশ্বাস করানোর মতো পাল্টা প্রচার অভিযান চালানো। তারা যেন মনে রাখেন, সামনে একটি সাধারণ নির্বাচন আছে। বিএনপিকে তারা যদি দুর্বল প্রতিপক্ষ ভাবেন, তাহলে ভুল করবেন। তা ছাড়া আওয়ামী লীগ চায়, বিএনপি নির্বাচনে আসুক। সকলের অংশগ্রহণে নির্বাচনটি হোক। এই কারণেও আওয়ামী লীগের কোনো নেতারই এখন কথা বলা উচিত নয়। যার সুযোগ গ্রহণ করে বিএনপি তাদের নির্বাচন বর্জনের প্রচারণায় সফল হতে পারে।

বিএনপি নেতারা এখনো বলছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। আমার ধারণা তারা নির্বাচনে যাবেন। বেগম জিয়াও হয়ত উচ্চ আদালতে জামিন পেয়ে তার দলের নির্বাচন অভিযানে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। তিনি নির্বাচনে নিজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন কিনা, সেটা অবশ্য আদালতের বিবেচ্য বিষয়। বেগম জিয়া যদি নিজে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তাহলেও বিএনপি নির্বাচনে যাবে বলে আমার ধারণা। নির্বাচনে অংশ নিয়ে যদি তারা জয়ী হন, তাহলেই ক্ষমতায় গিয়ে তারা দল হিসেবে বিএনপিকে রক্ষা, বেগম জিয়ার নেতৃত্ব রক্ষা এবং তারেক রহমানের দেশে ফেরা নিশ্চিত করতে পারবেন, অন্যথায় নয়।

এখানেই দেশের দল নিরপেক্ষ সুধীজন ও সুশীল সমাজের দায়িত্বের কথাটি এসে পড়ে। তারা দুই বড় দলের মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার একটা মধ্যস্থতা করায় সক্ষম ও সফল হতে না পারেন, কিন্তু বিএনপিসহ সকল দলের অংশগ্রহণে একটি সফল নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হয় এবং রাজনীতির প্রায় অচল চাকা আবার সচল হয় সেজন্যে জনমতের চাপ সৃষ্টির লক্ষ্যে একটু সক্রিয় হতে পারেন। জ্ঞানবৃক্ষের উচ্চ ডালে বসে কেবল সরকারি দলকে জ্ঞানদান করা এবং নির্বাচনে বিএনপিকে আনা কেবল ক্ষমতাসীন দলেরই দায়িত্ব এই আপ্তবাক্য ক্রমাগত না আউড়ে তারাও দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালনের জন্য একটু সঙ্ঘবদ্ধ ও সক্রিয় হতে পারেন। নইলে প্রাচীন গ্রিসের ওয়াকলের মতো কেবল দৈববাণী আউড়ে নিজেদের পাণ্ডিত্য জাহির করতে পারবেন। কিন্তু সেই পাণ্ডিত্য দেশকে রাজনৈতিক সমস্যামুক্ত করার কাজে লাগাতে পারবেন না। – ইত্তেফাক

লন্ডন, ২৪ ফেব্রুয়ারি, শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment