দশ দিগন্তে

সুখবর ঝুটা হলেও ভালো

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

সম্প্রতি ঢাকার কাগজে তিনটি খবর বেরিয়েছে। সেগুলোকে আমি সুখবর মনে করি। কথায় বলে সুখবর ঝুটা হলেও ভালো। আমিও এই তিনটি খবর এখনো সঠিকভাবে প্রমাণিত না হলেও ভালো খবর মনে করি। এই খবর মনকে ভালো করে। আশাবাদী করে। খবর তিনটির একটি হলো- বিএনপি তাদের জোট ও সমমনা দলগুলোর কাছে নির্বাচনে তাদের প্রার্থীদের তালিকা চেয়েছে। দ্বিতীয় খবরটি হলো- সরকারের পাঁচটি প্রস্তাব নিয়ে জেলে বেগম খালেদার কাছে বিএনপি নেতারা গিয়েছিলেন। তিন নম্বর খবর হলো- কিভাবে হবে আগামী ভোট তার একটা রূপরেখা সরকার তৈরি করেছেন এবং নির্বাচন কমিশনও একটি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে প্রস্তুত।

তিনটি খবরই মনে আশা জাগানোর মতো। যদি পরে দেখা যায়, খবরগুলো সর্বাংশে সঠিক নয়, তাহলেও বর্তমান নিরাশার অন্ধকারে তা অনেকটা আশার মৃদু আলোর রেখা। প্রথম খবরটি পাঠ করে মনে হয়েছে, বিএনপি’র নির্বাচনে যোগ দেওয়া সম্পর্কে আমার অনুমানটি হয়তো সঠিক প্রমাণিত হবে। বিএনপি নেতারা এখন মুখে যাই বলুন, শেষতক তারা নির্বাচনে যাবেনই। জোট ও সমমনাদের কাছে প্রার্থী তালিকা চাওয়াতেই তা অনুমান করা যায়।

কোনো কোনো মহল এই প্রার্থী তালিকা চাওয়ার অন্য ব্যাখ্যাও দিয়েছেন। সেই ব্যাখ্যাটি হলো- প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ‘একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ২০ দলীয় জোটের প্রভাবশালী কয়েকটি শরিক দলের মতিগতি নিয়ে বিএনপি চিন্তিত। সরকারের পক্ষ থেকে ওইসব দলের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করা হচ্ছে এবং বিএনপির জোট থেকে বের হলে তারা নাকি কিছু আসন পাওয়ারও আশ্বাস পাচ্ছেন। বিএনপি নির্বাচনে না গেলে এরা জোট ভেঙে বেরিয়ে যেতে পারেন। এমনকি বিএনপি থেকেও একটা অংশ বেরিয়ে যেতে পারে।’

খবরে আরো বলা হয়েছে, ‘বিএনপি’র মহাসচিব এই পরিস্থিতির কথা জেলে বেগম খালেদা জিয়াকে এবং লন্ডনে তারেক রহমানকে জানিয়েছেন। তারা দু’জনেই যেকোনো মূল্যে এই দলগুলোকে জোটে ধরে রাখার ব্যবস্থা করার কথা বলেছেন। এই পরামর্শ অনুযায়ী বিএনপি শরিক দলগুলোকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করা সম্পর্কে আশ্বস্ত রাখার জন্য তাদের কাছে প্রার্থী তালিকা চেয়েছেন।’ এই খবরটি আমার সঠিক মনে হয়। জোটের এবং দলের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই বিএনপিকে এবার নির্বাচনে যেতে হবে। এখনকার হুঙ্কার আসলে দর কষাকষি মাত্র। বিদেশিদের কাছে ধর্ণা দিয়েও তাদের লাভ হয়নি। ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টারি প্রতিনিধি দল ঢাকায় বসেই বিএনপিকে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বেগম জিয়া সম্পর্কে আদালত যে রায় দিয়েছেন সে সম্পর্কে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। বলেছেন, এটা আদালতের নিজস্ব ব্যাপার।

ঢাকার কাগজে প্রকাশিত দ্বিতীয় খবরটি সত্য হলে তা আরো আশাব্যঞ্জক। এতোদিন মনে হয়েছিল, নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র মধ্যে কোনো কথাই হবে না। এখন মনে হচ্ছে বরফ ধীরে ধীরে গলছে। খবরে বলা হয়েছে, ‘কারারুদ্ধ বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সঙ্গে গত ৭ মার্চ জেলখানায় দলের সাত নেতার সাক্ষাত্কার নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। অনেকে ভাবছেন, কি এমন হলো যে, বিএনপি’র স্থায়ী জাতীয় কমিটির সাত সদস্য ও খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবকে একসঙ্গে জেলখানায় প্রবেশের অনুমতি দিলো সরকার?’

খবরে আরও বলা হয়েছে, ‘শুধু সাক্ষাৎ নয়, কারাগারে বিএনপি নেতাদের ভিআইপি-ট্রিটমেন্ট দেওয়া হয়েছে।’ মনে হচ্ছিল, জেলের ভেতরেই বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির বৈঠক হচ্ছে। সরকারের সঙ্গে বিএনপি’র যে আদা ও কাঁচকলার সম্পর্ক তাতে জেলে বেগম জিয়ার দলকে আতিথ্য দেওয়ার কথা নয়। ফলে বাজারে রটেছে যে সরকারের সঙ্গে একটা গোপন সমঝোতা হয়েছে বা হতে যাচ্ছে বিএনপির। এই সমঝোতার (অলিখিত) খালেদা জিয়ার সম্মতি আছে কিনা সেটা জানার জন্যই জেলের ভেতরে বিএনপি’র এই উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। সরকারের সম্মতিতেই যে এই বৈঠকের ব্যবস্থা হয়েছিল তাতে কারো সন্দেহ নেই।

এই বৈঠকে মির্জা ফখরুল ইসলাম নাকি তার নেত্রীকে জানান, তার মুক্তির ব্যাপারে ৫ দফা সমঝোতার প্রস্তাব রয়েছে। যদি খালেদা জিয়া জামিন নিয়ে লন্ডনে চলে যেতে রাজি হন তাহলে তার জামিনের ব্যাপারে সরকারের তরফ থেকে কোনো আপত্তি দেওয়া হবে না। আগামী নির্বাচনে বর্তমান সরকারের অধীনে বিএনপি অংশ নেবে, কিন্তু বেগম জিয়া বা তার পরিবারের কেউ অংশ নেবেন না। নির্বাচনের আগে বিএনপি’র সব পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা স্থগিত থাকবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

প্রস্তাবগুলো শুনে বেগম জিয়া নাকি বলেছেন, ‘সবই ঠিক আছে, কিন্তু আমি যেখানেই থাকি সেখান থেকেই আমাকে নির্বাচনে যোগ দেওয়ার অধিকার দিতে হবে।’ অর্থাৎ তাকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ দিলে তিনি যে এই সরকারের অধীনে নির্বাচনে যোগ দিতে রাজি আছেন তা বুঝা যায়। তিনি এই প্রস্তাবগুলো তার ছোট ভাই শামিম ইসকান্দারকে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়ায় মনে হয় তিনি প্রস্তাবগুলো নাকচ করেননি। আরো বিবেচনার জন্য রেখেছেন। আমার ধারণা, সরকারের সঙ্গে বিএনপির আরো কিছুদিন দর কষাকষি চলবে। তার পর শেখ হাসিনার এল, এফ ও (LFO) মেনেই বেগম জিয়া নির্বাচনে আসবেন।

তৃতীয় খবরটিতেও আশার ফুলকি দেখা যায়, অনুমিত হয়, নির্বাচন কমিশন সরকার ও সব দলের সহযোগিতায় একটি যথাসম্ভব সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে পারবেন। সরকারও বিএনপি’র নির্বাচন সহায়ক সরকার গঠনের দাবি না মানলেও ব্রিটেন বা অনুরূপ কোনো গণতান্ত্রিক দেশের মতো বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বেই এমন একটি কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান করবেন, যাতে বিএনপি জোটের যোগদানে আপত্তি থাকা উচিত হবে না।

খবরে বলা হয়েছে, ‘এই সরকার কেবল দৈনন্দিন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে। উন্নয়নমূলক কোনো কাজে তাদের সম্পৃক্ততা থাকবে না। প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে যেভাবে সহযোগিতা করা দরকার সেভাবেই করবে। নির্বাচনকালীন সরকারের আকার ছোট হবে। কোনো নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করবে না। শুধু রুটিন মাফিক দিনের কাজগুলো করবে, যারা মন্ত্রিসভার সদস্য থাকবেন, তারাও নির্বাচনী এলাকায় জনসভা ও প্রচারণায় অংশ নিতে পারবেন না। দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদেরও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে কোনো বাধা থাকবে না।

আমার কথা হলো, পাকিস্তান আমলে আওয়ামী লীগ যদি ইয়াহিয়া-জান্তায় এল এফ ও’র কঠিন বিধিনিষেধের মধ্যে (অনেকেই নিষেধ করেছিলেন) নির্বাচনে অংশ নিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হতে পারেন, তাহলে বর্তমানে বিএনপি যে জনপ্রিয়তার দাবি করে, সেই জনপ্রিয়তার বলে তারা নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন না কেন? তারা তাদের বিদেশি বন্ধুদের ডেকে এনেও তো নির্বাচন অনুষ্ঠানকালে আরও কঠোর পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারেন।

যে যাই বলুন, আমার ইনটিউশন, বিএনপি গাইগুই করে শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে আসবে। ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে বিএনপি-নেতাদের সঙ্গে বেগম জিয়ার যে কথাবার্তার খবর কাগজে বেরিয়েছে, তা সত্য হলে বিএনপি নেত্রীর মনোভাব অনেকটা ইতিবাচক মনে হয়। তিনি জামিন পেলে বিদেশে যেতে রাজি আছেন। কেবল নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার অধিকার বহাল রাখতে চান। এই ব্যাপারে সরকারের বেশি কিছু করণীয় নেই। আদালতের বিচারে দণ্ডিত কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না তা সংবিধানের বিধি-বিধান না ভেঙে বিবেচনা করবেন আদালত ও নির্বাচন কমিশন।

বেগম জিয়া যদি নিজে নির্বাচনে প্রার্থী হতে না পারেন (যা তার পুত্র তারেক রহমানের বেলাতেও প্রযোজ্য) তাহলেও তিনি দেশেই থাকুন, আর বিদেশেই থাকুন কিম্বা জেলে থাকলেও নির্বাচন পরিচালনায় দলকে নেতৃত্ব দিতে পারবেন। ভারতে কংগ্রেসের সোনিয়া গান্ধী তো একবার নির্বাচনে নিজে এবং তার দল জেতা সত্ত্বেও তিনি ইতালিয়ান বংশোদ্ভূত হওয়ায় বিরোধী কোনো কোনো দল তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে আপত্তি তোলেন এবং তিনি স্বেচ্ছায় কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির নেতৃপদ ছেড়ে দিয়ে ড. মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসিয়েছিলেন। কিন্তু দল ও সরকারের আসল চাবিকাঠি ছিল সোনিয়া গান্ধীর হাতেই।

দলের স্বার্থ, গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থে বেগম খালেদা জিয়া যদি কিছুকালের জন্য তার আস্থাভাজন কাউকে দলের সংসদীয় নেতার আসনে বসার সুযোগ দেন, তাহলেও দলের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তার হাতেই থাকবে এবং কিছুকাল পর তার আবার প্রধানমন্ত্রীর পদে ফিরে আসার সম্ভাবনার দরোজা খোলা থাকবে। ধরে নেয়া যাক, আগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসবে, তাতে কি আসে যায়। দেশে যদি গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে, তাহলে এই নির্বাচনের পরবর্তী নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসা অনিবার্য হয়ে দাঁড়াবে। আওয়ামী লীগ কেন, কোনো দলের পক্ষেই চিরকাল ক্ষমতায় থাকা সম্ভব নয়, উচিত নয়।

কথায় বলে, ‘মেঘ দেখে তুই করিস নে ভয়, আড়ালে তার সূর্য হাসে’। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও বর্তমানে যত অনিশ্চয়তার অন্ধকার ঘনাক, তার আড়ালে আশার আলো একেবারে অদৃশ্য নয়। আমার ধারণা, নির্বাচনের দিন-তারিখ ঘোষিত হলে এই আশার আলো আরো দৃশ্যমান হবে। প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে যারা পোড়া আলু খাওয়ার আশায় সুশীল সমাজের ভেক ধরে দিন গুনছেন, তাদের দিন গোনা ব্যর্থ হবে। প্রকাশিত খবর তিনটি যদি সঠিক নাও হয়, তাহলেও বলবো ‘সুখবর ঝুটা হলেও ভালো।’ – ইত্তেফাক

লন্ডন, ১৭ মার্চ শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment