কালের আয়নায়

মার্চ মাস কেমন করে বাঙালির হয়ে গেল?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

মার্চ মাসটা হলো ইংরেজি ক্যালেন্ডারের মাস। এই সময়ের বাংলা ক্যালেন্ডারের মাস হলো ফাল্গুন-চৈত্র। কিন্তু বাংলা মাসকে রেখে মার্চ মাস কী করে বাঙালির এমন আপন মাস হয়ে গেল তা শুধু বিস্ময় নয়, গবেষণারও বিষয়। আমি গবেষক নই। কিন্তু মার্চ মাস কী করে বাঙালির নিজস্ব মাস হয়ে গেল, তা নিয়ে মাঝেমধ্যে ভাবি। আগামী রোববার ২৫ মার্চ। বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের হানাদার সেনাবাহিনীর বর্বর বুদ্ধিজীবী হত্যা ও গণহত্যা শুরু করার দিবস। পরদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। তখন থেকে ২৬ মার্চ আমাদের স্বাধীনতা দিবস। বিষাদে ও আনন্দে মিশ্রিত এই দুটি দিন। কিন্তু এখানেই কি বাঙালি জীবনে মার্চ মাসের তাৎপর্য ও ঐতিহাসিকতা শেষ?

না, শেষ নয়। গত শতক থেকেই বাঙালির আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে মার্চ মাসের গভীর সম্পর্ক। শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা উপমহাদেশেই মার্চ মাস ইতিহাসের বাতিঘর। গত শতকে উপমহাদেশের বহু রাজনৈতিক ঘটনার সাক্ষী মার্চ মাস। সবগুলো ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করার মতো পরিসর নেই, প্রয়োজনও নেই। কিন্তু মার্চ মাস কীভাবে বাঙালির ইতিহাসের বাতিঘর হয়ে গেল, তার ঘটনাগুলোর সবটা নয়, মোটা দাগের ঘটনাগুলো উল্লেখ করতে চাই।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার বীজ রোপিত হয় ভাষা আন্দোলনের দ্বারা। এই ভাষা আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু ১১ মার্চ। ১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখে পুলিশ গুলি চালিয়ে কয়েকজন ভাষাসংগ্রামীকে হত্যা করার পর একুশে ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে ভাষা শহীদ দিবস। তার পূর্ব পর্যন্ত (১৯৪৯-৫১) ১১ মার্চ ছিল রাষ্ট্রভাষা দিবস। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু জন্ম নেন। ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ ঢাকাসহ সারাদেশে পূর্ববঙ্গের মানচিত্র খচিত স্বাধীন বাংলার পতাকা সর্বপ্রথম উত্তোলিত হয়। ২৫ মার্চের কালরাত্রি এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা পুনরুল্লেখ আর করলাম না।

অবিভক্ত বাংলাদেশেও মার্চ অনেক স্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী। ১৯৪৭ সালের মার্চ মাসে (দেশভাগের কয়েক মাস আগে) বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভায় একমাত্র কমিউনিস্ট সদস্য তরুণ ব্যারিস্টার জ্যোতি বসু পরিষদ ভবনে ঢুকতে গিয়ে পুলিশের দ্বারা বাধাপ্রাপ্ত ও গ্রেফতার হন। তখন অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী (ব্রিটিশ আমলে বাংলা ও পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রীকে প্রধানমন্ত্রী বলা হতো) শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনি ছুটে এসে পরিষদ গেটে জোতি বসুকে মুক্ত করেন এবং তিনি পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেন। গত শতকের গোড়ার দিকে বিপ্লবী অনুশীলন ও যুগান্তর পার্টির সদস্যরা এই মার্চ মাসেই রমনায় কালীবাড়িতে সমবেত হয়ে ব্রিটিশরাজের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম পরিচালনার প্রতিজ্ঞাপত্রে আঙুল ফুটিয়ে রক্ত দিয়ে স্বাক্ষর দেন।

মার্চের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনা ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু এই রমনার মাঠেই তার ঐতিহাসিক ভাষণটি দেন- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ জনান্তিকে বলে রাখি, আমার ব্যক্তিগত জীবনে একটি শোকাবহ ঘটনা এই মার্চ মাসে ঘটেছে। আমার পিতা বরিশাল জেলা কংগ্রেসের সভাপতি হাজি ওয়াজেদ রেজা চৌধুরী এই মার্চ মাসের ১৪ তারিখে (১৯৪৬) মৃত্যুবরণ করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় এই মার্চ মাসে সম্ভবত ১৯৪৮ বা ১৯৪৯ সালে। একাত্তরের মার্চের শুরুতেই দেশে অসহযোগ আন্দোলনের শুরু।

মার্চ মাস নিয়ে আমার অপণ্ডিত গবেষণার এখানেই ক্ষান্তি দেই। বর্তমান বছরের মার্চ মাসের দিকে তাকাই। এ বছরের মার্চ মাসেও বাংলাদেশের অর্জন কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এ মাসেই জাতিসংঘ জানিয়েছে, বাংলাদেশ একটি স্বল্পোন্নত দেশের কাতার থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উঠে আসার যোগ্যতা অর্জন করেছে। ইংরেজি মার্চ মাস বাংলা ক্যালেন্ডারের ফাল্গুন ও চৈত্র মাস। বাঙালির বসন্ত উৎসব এই সময়েই। উৎসবের পাশাপাশি কালবৈশাখীর তাণ্ডবেরও সূচনা চৈত্র মাসেই।

আমাদের প্রকৃতিতে মার্চ মাস যেমন উৎসব ও ঝড়-ঝঞ্ঝার মাস, তেমনি জাতীয় জীবনে বিষাদ ও আনন্দের মাসও। আগেই বলেছি, ১৯৭১ সালের এ মাসে পাকিস্তানের বর্বর হানাদারদের গণহত্যা শুরু এবং এ মাসেই আমাদের স্বাধীনতা ঘোষিত হয়। প্রতিবছর ২৫ মার্চ তাই বুদ্ধিজীবীসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের স্মরণে সারাজাতি বিষাদমগ্ন হয়। আর ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের উৎসবে মেতে ওঠে।

বছরের দু’বার আমরা শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মরণ করি। একবার ২৫ মার্চ, আরেকবার ১৪ ডিসেম্বর, পাকিস্তান সৈন্য ও তাদের কোলাবরেটররা দ্বিতীয়বার বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর। আমাদের আনন্দের দিনও দুটি। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের উৎসব, ১৬ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত দেশে বিজয় দিবস পালনের উৎসব। বহু বছর আগে আমি একটা কবিতা লিখেছিলাম। তার প্রথম দু’লাইন হলো :’আমার দুখিনী বাংলা, মা তুই আমার জননী/ তোর এক চোখে জল, আর চোখে হাসে দিনমণি’।

বর্ষ পরিক্রমায় আবার মার্চ মাস ফিরে এসেছে। আগামী রোববার ২৫ মার্চ এবং সোমবার ২৬ মার্চ। কান্না-হাসির দোলায় দুলবে সারাদেশ। কিন্তু সেই সঙ্গে পেছনের দিকে তাকিয়ে আমরা কি আমাদের অর্জনগুলোকে সম্যক উপলব্ধি করতে পারব? স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ ৪৭টি বছর কেটে গেছে। এই ৪৭ বছরে আমাদের অর্জন কতটুকু এবং অবক্ষয় কতটুকু?

দীর্ঘ কয়েক শতক পর স্বাধীনতা অর্জন নিশ্চয়ই বাঙালির সবচেয়ে বড় অর্জন। বাঙালি তার নিজস্ব জাতি-পরিচয় ফিরে পেয়েছে। বাংলা ভাষার জন্ম থেকে সে কখনও সরকারি ভাষা হতে পারেনি। বাংলা এখন একটি স্বাধীন দেশের রাষ্ট্রভাষা। একটি কৃষিনির্ভর এবং এক অর্থনীতি দেশ (one economy country) থেকে বাংলাদেশ বহুমুখী উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশে পরিণত হতে চলেছে। একটি কৃষিনির্ভর সমাজ সামন্তবাদী যুগ পেরিয়ে শিল্পনির্ভর আধুনিক সমাজে পরিণত হতে চলেছে। এখন দেশ নগরনির্ভর। আধুনিক নাগরিক জীবন গড়ে উঠছে।

বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতির দ্রুত বিস্তার লাভ ঘটছে। বাংলা ভাষাভাষী বিভিন্ন দেশের মানুষের সারাবিশ্বে বিস্তার লাভ ঘটেছে বাঙালি পরিচয়ে। নানা রাজনৈতিক বিভাগ সত্ত্বেও বাঙালি পরিচয়ের একটি কালচারাল নেশনহুড গড়ে উঠছে। অবিভক্ত বাংলার রবীন্দ্রনাথ নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল ইন্ডিয়ান পোয়েট। এখন শুধু বাঙালি অথবা বাংলাদেশি পরিচয়ের ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু বিশ্বের শান্তি পুরস্কার পাওয়া নয়, মানবতার জননী (mother of humanity) খেতাব পেয়েছেন।

এখন শিক্ষা, সংস্কৃতি, ব্যবসা-বাণিজ্যে এমনকি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও বাঙালি ও বাংলাদেশের অগ্রগতি লক্ষণীয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তার পাশাপাশি স্বাধীন বাংলাদেশে সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের চিত্রটি বড় ভয়ানক, সমাজের অতীতের মূল্যবোধ বদলে যাওয়া স্বভাবিক এবং কাম্য; কিন্তু তার স্থানে নতুন কোনো সুস্থ মূল্যবোধ গড়ে ওঠেনি। দুর্নীতি ও লোভের মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে সমাজদেহে পচন ধরেছে। নৈতিক স্খলন সারা জাতিকে গ্রাস করে ফেলেছে। এই বিজ্ঞান ও নবপ্রযুক্তির অগ্রসরমান যুগে অন্ধ সংস্কার ও ধর্মান্ধতার ব্যাপক প্রসার বেড়েছে। যে সাম্প্রদায়িকতার অপশক্তি দেশ ছেড়েছিল, তা আবার ফিরে এসেছে।

সংখ্যালঘুদের ওপর প্রকাশ্য ও নীরব নির্যাতন বেড়েছে। নারী শিক্ষা যদি বেড়ে থাকে দশগুণ, তাদের ওপর নির্যাতন বেড়েছে বিশগুণ। দেশের রাজধানীতেও জননিরাপত্তা নেই। লাইফ ক্রাইম বেড়েছে। একজন বিখ্যাত শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী ড. জাফর ইকবালকে প্রকাশ্য দিবালোকে পুলিশ পাহারায় ছুরি মারা হয়েছে। জন্মদিনের পার্টির নামে তরুণীদের ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করা হয়। যুব ও ছাত্র সমাজ বিভ্রান্ত এবং অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত। লোভ ও দুর্নীতি এতটাই বেড়েছে যে, একজন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধেও ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। সরকারি আমলাতন্ত্র তো বটেই, রাজনীতিকদের একটা বড় অংশও এখন জনগণের রক্ষক নয়, ভক্ষক। বুদ্ধিজীবীদের বড় অংশ এখন সুস্থ বুদ্ধির চর্চা করে না। সুযোগ-সুবিধা, অনুগ্রহের লোভে বুদ্ধি ভাড়া দেন অথবা বিক্রি করেন। তালিকা আর কত বড় করব! গোটা দেশটাই যেন এক অন্ধকার যুগের দিকে ফিরে চলেছে।

এই অবক্ষয় ও পচন থেকে দেশকে রক্ষা করতে না পারলে এই স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। একাত্তরের বুদ্ধিজীবী ও মুক্তিসংগ্রামীদের আত্মদান ব্যর্থ হয়ে যাবে। গত ৪৭ বছরে আমাদের এত অর্জন ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাফল্যের মুখ দেখবে না। দেশের এই পরিস্থিতিতে কি আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং বুদ্ধিজীবীরা মতান্তর ও দলাদলি ভুলে স্বাধীনতার মূল্যবোধগুলো পুনরুদ্ধারের জন্য কিছুকালের জন্য হলেও সচেতন ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন না? একটা বড় ধরনের সংস্কার আন্দোলনের পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও কার্যকর করার জন্য এগিয়ে আসতে পারেন না?

আমাদের জাতীয় দিবস, যেমন স্বাধীনতা দিবস, রাষ্ট্রভাষা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি যেন দ্রুত আনুষ্ঠানিকতার জালে বন্দি হয়ে পড়ছে এবং জাতিকে জাগ্রত ও ঐক্যবদ্ধ রাখার শক্তি হারাচ্ছে। এ সম্পর্কে এখনই আমাদের সতর্ক হওয়া দরকার। – সমকাল

লন্ডন, ২৩ মার্চ শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment