কালের আয়নায়

এবারের বাংলা নববর্ষের শুরু শনিবারে

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

আজ ১৪২৫ সনের শুরু। শুরু হওয়ার দিনটা আমাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। এবার বাংলা নববর্ষ শুরু হলো শনিবারে। আমারও জন্মদিন শনিবার। সারাজীবন মাঝেমধ্যেই এই শনির দশায় ভুগেছি। সে জন্যই ভাবছি, এই বাংলা বছরটিকেও যেন শনির দশায় না পায়, ভালোয় ভালোয় বছরটা কাটে। তাই এ বছর কাউকে প্রথাগত শুভেচ্ছা জানাতে চাই না। শুধু প্রার্থনা করি, প্রত্যেকের জীবন যেন শনির দশামুক্ত থাকে। সকলের জীবনেই ভালো কিছু হওয়ার আশা রাখি। তা যদি না হয় মন্দ কিছু যেন না ঘটে।

প্রতিবছরই পণ্ডিতরা বাংলা বছরের ভূত-ভবিষ্যৎ নিয়ে পণ্ডিতি আলোচনা করেন। তার উৎস, বৈশিষ্ট্য এবং জাতীয় জীবনে তার গুরুত্বের ওপর আলোচনা করেন। রবীন্দ্রনাথ তো বৈশাখের ওপর একটা গানই লিখে গেছেন : ‘এসো হে বৈশাখ।/এসো এসো’ গানটি নববর্ষের পহেলা দিনে অর্থাৎ পহেলা বৈশাখের উৎসবে প্রবলভাবে গীত হতে থাকে। কোথাও কোথাও তার সঙ্গে নৃত্য যুক্ত হয়। এই একটি দিনে হিন্দু-মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সব বাঙালি মিলে সকলের মঙ্গল কামনা করে। এই দিনটিতে দেশকালপাত্র নির্বিশেষে সব বাঙালির অভিন্ন পরিচয় চিহ্নিত।

আজ আমি ১৪২৫ সন নিয়ে কোনো কেতাবি কথা লিখতে চাই না। কোনো তত্ত্বকথাও কপচাতে চাই না। শুধু আলোচনা করতে চাই। শনিবারে শুরু এই বাংলা বছরটি শনির দশাগ্রস্ত যে বিশ্বে আজ পা রেখেছে, সেই দশা থেকে সে কি বিশ্বকে মুক্ত করবে! শনির প্রসন্ন দৃষ্টি ছড়িয়ে দেবে পৃথিবীময়; না, তার দৃষ্টির কুটিলতায় বিশ্বকে আরও পীড়িত করে তুলবে? একটি পরমাণু যুদ্ধকে সে কি অনিবার্য করে তুলবে, না, তার ছায়া থেকে বিশ্ববাসীকে মুক্ত করবে? এক সাবেক রুশ জেনারেল বলেছেন, ‘এবার যদি রাশিয়া ও আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বাধে, তাহলে সেটা হবে মানব সভ্যতার শেষ যুদ্ধ।’

এই যুদ্ধ বাধানোর জন্য ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো এক কৌতুক চরিত্রের ব্যক্তি কি হোয়াইট হাউসে অধিষ্ঠিত হয়েছেন? তার চরিত্র অনেকটা প্রাচীন নবাব-নাইটদের যুগের ডন কুইক সোটের মতো। ডন কুইক সোট একটি বৃদ্ধ ঘোড়ায় চড়ে ভাঙা অস্ত্র হাতে তার কল্পিত শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রা করেছিলেন। বর্তমানের ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্রমাগত যুদ্ধের হুঙ্কার দিচ্ছেন। যুদ্ধ শুরু করার সাহস এখনও অর্জন করেননি। তবে তার অশ্বটি বুড়ো নয়, হাতের অস্ত্রও ভাঙা নয়। তা আধুনিক মারণাস্ত্র। আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে অনভিজ্ঞ ও বাক্যবাগীশ শাসকটি যদি তার হুঙ্কারের খেলা খেলতে গিয়ে একটি বড় যুদ্ধ বাধিয়ে বসেন, তাহলে সত্যই মানব সভ্যতার শেষ যুদ্ধ সংঘটিত হবে। প্রমাণিত হবে, এটি শনির দশাগ্রস্ত বছর।

বিশ্ব গণতন্ত্র আজ যেমন সংকটে, তেমনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিও গভীর সংকটের জালে বন্দি। পশ্চিমা ধনতন্ত্র মুক্তবাজারের সংকট, বেকার সমস্যা, ইমিগ্রেশন সমস্যা, অর্থনৈতিক শক্তিকেন্দ্র ক্রমশ চীন ও ভারতে স্থানান্তরিত হওয়ার সমস্যায় বিব্রত। গত শতকে ত্রিশের মহামন্দা (great depression) থেকে বাঁচার জন্য পশ্চিমা ধনতন্ত্রকে যেমন একটি বিশ্বযুদ্ধ বাধাতে হয়েছিল, তেমন একটি যুদ্ধ বর্তমান বিশ্ব ধনতন্ত্রের বাঁচার জন্য দরকার।

অন্যদিকে ক্রমাগত যুদ্ধের হুঙ্কার দিয়ে আমেরিকার মানুষের দৃষ্টি অন্যদিকে সরিয়ে দিয়ে ট্রাম্প তার বিপন্ন প্রেসিডেন্সি বাঁচাতে চান। তাই একবার পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষার প্রশ্নে উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে হুঙ্কার দিয়ে বিশ্ব পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তুলেছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ বাধাতে সাহসী হননি। মার্কিন জেনারেলরাই তাকে বাধা দিয়েছেন। তারা জানেন, উত্তর কোরিয়ার কিম পরমাণু অস্ত্রবিহীন ইরাকের সাদ্দাম হোসেন কিংবা লিবিয়ার গাদ্দাফি নন। তার সাহস আছে। হাতে পরমাণু অস্ত্র আছে। তাই হুঙ্কারের মধ্যেই ট্রাম্পের বীরত্ব প্রদর্শন আপাতত শেষ হয়েছে।

সাদ্দাম ও গাদ্দাফিকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে নির্মমভাবে হত্যা করে দেশ দুটিকে ধ্বংস করা গেছে। কিন্তু সিরিয়া ও ইরানকে ধ্বংস করে ইসরায়েলকে মধ্যপ্রাচ্যে একমাত্র শক্তি হিসেবে দাঁড় করানো যাচ্ছে না। কারণ এ দুটি দেশের প্রতি রাশিয়ার সমর্থন। তাই ব্রিটেন ও আমেরিকাকে পুরনো খেলা খেলতে হচ্ছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছিল, তার হাতে গণধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে। এই অভিযোগ তুলে প্রায় ১২ বছর ধরে ইরাকের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অবরোধ চালিয়ে প্রায় ১৭ লাখ শিশুকে অনাহার ও অপুষ্টিজনিত কারণে অকালমৃত্যু বরণে বাধ্য করা হয়েছিল। তারপর দু-দুটি যুদ্ধ চাপানো হয়েছে ইরাকের ওপর। দ্বিতীয় যুদ্ধে সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করা হয়েছে। ইরাকে এখনও যুদ্ধ চলছে।

সাদ্দাম হোসেনকে হত্যা করার পরই ফাঁস হয়ে গেল তার হাতে কোনো মারণাস্ত্র ছিল না। এটা ছিল ব্রিটেন ও আমেরিকার জঘন্য মিথ্যা প্রচার। এ জন্য আমেরিকা ও ইউরোপের মানুষ ব্রিটেনের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ‘বি-লায়ার’ এবং আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশকে তার দেশের ইতিহাসের ‘সর্বাধিক নিকৃষ্ট প্রেসিডেন্ট’ আখ্যা দিয়েছে। এবারও বিশ্বময় যে ভয়াবহ যুদ্ধের উত্তাপ সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে আমেরিকার প্রধান সহযোগী ব্রিটেন।

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মেও কার্যত একটি সংখ্যালঘু সরকারের প্রধান। তিনি গভীরভাবে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সমস্যায় ভুগছেন। ব্রেক্সিট প্রশ্নে ব্রিটেনের মানুষ এখন দ্বিধাবিভক্ত। এমনকি তার দলও দ্বিধাবিভক্ত। তার নিজের জনপ্রিয়তা নেই। তাই তারও একটা যুদ্ধ পরিস্থিতি চাই। যুদ্ধের উত্তাপ সৃষ্টি করে তিনি ব্রিটিশ জনগণের দৃষ্টি ঘরের দিক থেকে বাইরের দিকে ফেরাতে চান। অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পও চান, তার বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকালে রুশ কানেকশনের অভিযোগ, নারীদের নিয়ে অভব্য উক্তি ও আচরণ, হোয়াইট হাউসে তার প্রশাসনের স্থিতিহীনতা ইত্যাদি সংকট থেকে বেরোবার জন্য একটি উত্তপ্ত ইস্যু, যেদিকে আমেরিকার মানুষের দৃষ্টি সরানো যাবে। তাই তেরেসা মে ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আত্মীয়তা এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প তার অতীতের রুশ কানেকশনের অভিযোগ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একটু বেশি বেশি রাশিয়ার বিরুদ্ধে গর্জাচ্ছেন।

প্রথমে অভিযোগ তোলা হয়েছে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আসাদের বিরুদ্ধে। আসাদের মিত্র পুতিনের রাশিয়া। আসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তার বিদ্রোহী বাহিনীর ওপর বিষাক্ত রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছেন। এই বিদ্রোহী বাহিনীকে মদদ জোগাচ্ছে আমেরিকা। বিদ্রোহী বাহিনীর ওপর রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের অভিযোগও আমেরিকার। তারা যদি আসাদকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ ও হত্যা করতে পারে, তখন হয়তো জানা যাবে, সাদ্দামের মতো আসাদের বিরুদ্ধে অভিযোগটি সত্য নয়। কিন্তু তখন আর কিছুই করার থাকবে না। পশ্চিমা জোটের অভিসন্ধিই সফল হবে।

দীর্ঘদিন যুদ্ধ চালিয়ে আসাদের পতন ঘটাতে না পেরে আমেরিকা ও ব্রিটেন তথা পশ্চিমা জোট বুঝতে পেরেছে, আসাদের শক্তির উৎস রাশিয়া। তাকে হটানো না গেলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তাদের অভিসন্ধি সফল ও সমাপ্ত করা যাবে না। কিন্তু রাশিয়াকে শায়েস্তা করা যাচ্ছে না। কারণ, সেও এখন পরমাণু শক্তিধর আগের একটি বড় শক্তিতে পরিণত হতে চলেছে। তার বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে লাভ হয়নি। সুতরাং সামরিক হুমকি প্রদানের সুযোগ খোঁজা।

এই সুযোগ এনে দিয়েছে ব্রিটেনের স্যালিসবারি শহরের সাবেক রাশিয়ান স্পাই (ডাবল এজেন্ট) এবং তার কন্যার ওপর রাসায়নিক বিষ বা নার্ভ এজেন্ট প্রয়োগের ঘটনা। সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এ জন্য রাশিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন, তাকে সমর্থন দেন ট্রাম্প। ইউরোপের অধিকাংশ দেশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ হয়েছে। রুশ কূটনীতিকদের গণহারে বহিস্কার করা হয়েছে। রাশিয়াও পাল্টা তাই করেছে। শুরু হয়েছে সিরিয়া ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হুমকি। ডোনাল্ড ট্রাম্প সময় বেঁধে দিয়েছিলেন সিরিয়ায় হামলা শুরু করার। পরে টুইটে বলেছেন, তিনি এখনই সিরিয়ায় অভিযান চালাবেন না, কখন চালাবেন তা বলেননি। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এটা গোঁফ নামানোর আভাস হয়তো।

রাশিয়া ডাবল এজেন্ট স্পাইয়ের ওপর হামলার অভিযোগ দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেছে। যুক্ত তদন্ত, এ ব্যাপারে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছে। তেরেসা মে কোনোটাতেই রাজি নন। ব্রিটিশ রাসায়নিক অস্ত্রবিশারদ বিজ্ঞানীরাও বলেছেন, এই নার্ভ এজেন্ট যে রাশিয়া থেকে এসেছে, তার কোনো প্রমাণ তারা পাননি। এ ব্যাপারে জাতিসংঘকেও হস্তক্ষেপের এবং নিরপেক্ষ তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হলে রাশিয়াকে বৈধভাবে শাস্তিদানেরও কোনো সুযোগ দেওয়া হচ্ছে না। জাতিসংঘকে এড়িয়ে গালফ যুদ্ধের মতো আমেরিকা ও ব্রিটেন যুদ্ধংদেহী হুঙ্কার ছাড়ছে।

তেরেসা মে ওয়্যার কেবিনেট গঠন করতে চান। ব্রিটিশ মিগ মিডিয়া তাকে পরামর্শ দিচ্ছে, পার্লামেন্টের অনুমোদন ছাড়াই আমেরিকার সঙ্গে জোট বেঁধে যুদ্ধে নামতে। এর একমাত্র বিরোধিতা করছেন লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। তাকে ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী অভব্য ভাষায় গালাগাল করেছেন। এই দৃশ্যপটে সারাবিশ্বেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে যে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে। আর এটা হবে প্রলয়ঙ্কর পরমাণু যুদ্ধ। ইঙ্গ-মার্কিন হুমকির জবাবে রাশিয়ার পুতিন জানিয়েছেন, ইঙ্গ-মার্কিন হামলার মুখে তিনিও মারণাস্ত্র নিয়ে পাল্টা জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন।

এই শরীরের রক্ত হিম করা হুমকি ও পাল্টা হুমকি চলাকালে আমার মতো এক নগণ্য কলামিস্টের ধারণা, প্রলয়ঙ্কর কোনো পরমাণু যুদ্ধ শুরু হবে না। ডোনাল্ড ট্রাম্প না জানলেও মার্কিন জেনারেলরা তাদের আফগান ও ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন, এই যুদ্ধের পরিণতি কী হবে! ট্রাম্পের চক্ষুলজ্জা নেই। আমেরিকা মুখ রক্ষার জন্য সিরিয়ায় আকস্মিক হামলা চালাতে পারে এবং রাশিয়ার সঙ্গে তার সীমাবদ্ধ সামরিক কনফ্রন্টেশনও হতে পারে। তার বেশি কিছু হবে বলে আমার মনে হয় না। আর আমেরিকা যদি গোঁফ নামায়, তাহলে তেরেসা মের ওয়্যার কেবিনেট কী করবে, তা বুঝতে কারও কষ্ট হওয়ার কথা নয়।

যদি রাশিয়া ও পশ্চিমা জোটের মধ্যে বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ না বাধে, আমাদের উপমহাদেশে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে বড় সংঘর্ষ শুরু না হয় এবং বাংলাদেশে কোটা বাতিলের আন্দোলনের মতো বড় ধরনের আন্দোলনের কোনো সুযোগ বিএনপি-জামায়াত গ্রহণ করতে না পারে, তাহলে শনিবারে শুরু বাংলা নববর্ষ বাংলাদেশ বা বিশ্বের জন্য শনির দশা না ঘটিয়ে এই দশা থেকে বিশ্ববাসীকে বাঁচাবে বলেই আমার ধারণা। তাই নববর্ষ শুরু হওয়ার এই দিনটিতে আমার একান্ত কামনা, এবারের বাংলা নববর্ষ যেন আমাদের শনির দশা থেকে মুক্ত করে।

লন্ডন, ১৩ এপ্রিল শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment