“বঙ্গস্তান জমহুরিয়াত এবং তার হুকমাত ও হুকুম (?)”

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

আর্থার কোয়েসলার আমেরিকার চরম কম্যুনিস্ট-বিদ্বেষী লেখক। তিনি তার প্রত্যেকটি বইতে কমিউনিস্টদের দানব হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি তার একটি বিখ্যাত বইতে প্রেডিকসন করেছিলেন, কম্যুনিস্টরা ভারতে নেহরুর মিত্র সেজে তার পতন ঘটাবে। নেহরু তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। সিপিআই বা কম্যুনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া ছিল তার সরকারের সহযোগী। কোয়েসলারের বইটির শেষ দৃশ্য এ রকম। কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। পদচ্যুত নেহরু শেষবারের মতো পার্লামেন্ট ভবনের সিঁড়ি বেয়ে বেরিয়ে আসছেন। কেউ ক্ষমতাহারা নেহরুর দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। কেবল পার্লামেন্ট প্রাঙ্গণের বাগানের মালী সে-ই বাগান থেকে একটি লাল গোলাপ ছিড়ে এনে নেহরুর কোটের বাটনে পরিয়ে দিয়েছিল।

আর্থার কোয়েসলার ভবিষ্যৎ-দ্রষ্টা হিসেবে সফল হতে পারেননি। নেহরু সম্পর্কে তার ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ হয়েছিল। নেহরুর মৃত্যু হয়েছিল স্বাভাবিকভাবে। ভারতে কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। নেহরু ও ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যুর দীর্ঘকাল পর ক্ষমতা দখল করেছে ঘোর সাম্প্রদায়িক বিজেপি। কোয়েসলারের ভবিষ্যদ্বাণী এ ক্ষেত্রেও ব্যর্থ। কোয়েসলারের কথা বারবার তুলছি এজন্যে যে, সম্প্রতি বাংলাদেশ সম্পর্কে আমিও এ রকম একটা স্বপ্ন দেখেছি। স্বপ্নটা বেশ ধারাবাহিক। এক রাতেই খ- খ-ভাবে দেখেছি। বারবার ঘুম ভেঙ্গেছে। আবার ঘুমিয়ে পড়েছি। স্বপ্নের পরবর্তী দৃশ্য দেখেছি।

ঘুম ভেঙ্গে অস্বস্তিবোধ করেছি। আবার স্বস্তি পেয়েছি এটা ভেবে যে, কোয়েসলারের ভবিষ্যদ্বাণীর মতো এই স্বপ্ন সফল হবে না। এটা একটা দুঃস্বপ্ন। মনের অনেক উদ্বেগ ও আশঙ্কা থেকে এই দুঃস্বপ্নের জন্ম। এটা কখনও সফল হওয়ার স্বপ্ন নয় এবং সফল হবে না। তবু পাঠকদের সঙ্গে এই দুঃস্বপ্নটা শেয়ার করতে চাই। আমি জানি, এই দুঃস্বপ্নকে আমি যেমন সিরিয়াসলি নেইনি, আমার পাঠকেরাও তেমনি নেবেন না; বরং মজা পেতে পারেন।

মাঝ রাতের এই স্বপ্নে দেখি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, কচি কলাপাতার রঙের শাড়ি পরণে জাতীয় সংসদের সিঁড়ি বেয়ে একা নেমে আসছেন। তার হাতে একটি লাল গোলাপ। তিনি ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে নেমে অদৃশ্য হয়ে গেলেন। তাকে আর দেখা গেল না। এখানেই ঘুম ভেঙ্গে গেল। স্বপ্নেরও শেষ। আমি বিছানায় ওঠে বসে এই স্বপ্নের তাৎপর্যটা বুঝতে চাইলাম। পারলাম না। আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার স্বপ্নের পরবর্তী অংশটা দেখলাম। রাস্তায় দাঁড়িয়ে একটি বেতার ঘোষণা শুনলাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নাম করা হয়েছে “ইসলামি জমহুরিয়াত বঙ্গস্তান।” স্বপ্নের মধ্যেই চমকে উঠলাম যখন শুনলাম, বঙ্গস্তানের ছদ্রে রিয়াসত (রাষ্ট্রপতি) হয়েছেন এক বৃদ্ধ রাজনৈতিক পীর।

বুঝলাম ক্ষমতা দখল করেছে জামায়াত এবং জিহাদিস্ট উপদলগুলো। বাংলাভাষার ব্যবহার বর্জন করা হয়েছে। মন্ত্রিসভাকে বলা হচ্ছে উজির সভা। প্রধানমন্ত্রীকে বলা হচ্ছে উজিরে আজম। তথ্য মন্ত্রীকে বলা হচ্ছে উজিরে খবর, সাংস্কৃতিক মন্ত্রীকে উজিরে তাহজিব এবং রাজস্ব মন্ত্রীকে উজিরে খাজানা। ঢাকার এয়ারপোর্টের নাম হয়েছে হযরত শাহজালাল হাওয়াই আড্ডা। জাতীয় পতাকা বদল হয়ে গেছে। সবুজের মধ্যে লাল সূর্যের বদলে চাঁদতারা। জাতীয় সংসদের নাম হয়েছে মজলিসে খেলাফত। তার সামনে নতুন কওমিতারানা (জাতীয় সঙ্গীত) গাওয়া হচ্ছে।

ইকবালের তারানায়ে হিনদ্ গানের বাংলা তরজমা করেছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা। সেটারই প্রথম লাইন একটু অদল বদল করে কওমিতারানা গাওয়া হচ্ছে।

বঙ্গস্তান আমার পাকিস্তান আবার

আরব ও চীন নহেকো পর

মুসলিম আমি সারা দুনিয়ায়

ছড়ায়ে রয়েছে আমার ঘর।

এই কওমিতারানা শুনতে শুনতে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চেয়ে দেখি ঘড়িতে রাত তিনটা বাজে। কওমিতারানার সুরের রেশ কান থেকে না মিলাতেই আবার ঘুমিয়ে পড়লাম। আবার সেই একই স্বপ্ন। সিনেমার মতো দৃশ্যের পর দৃশ্য আসছে। তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে।

এবার দেখি নতুন উজিরসভা শপথ নিচ্ছে। বায়তুল মোকাদ্দাসের খতিবের পবিত্র কোরান পাঠের পর উজিরদের শপথ গ্রহণ করা হচ্ছে। উজিরেরা এক এক করে সবাই ওজু করে এলেন। অধিকাংশ উজিরই জামায়াতি। তিন চারজনকে মনে হলো তারা জামায়াতি নন। প্রধানমন্ত্রীকে বলা হচ্ছে উজিরে আজম। তার চেহারাটা পরিচিত মনে হলো। ভাল করে চেয়ে দেখি তাকে দেখাচ্ছে ড. কামাল হোসেনের মতো। তিনি একটা সাদা রঙ্গের শেরোয়ানি চাপিয়েছেন গায়ে। মাথায় পাঞ্জাবের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্যার সেকান্দর হায়াত খানের মতো দোতলা পাগড়ি। বাকি দু’জন উজিরকেও চেনা চেনা মনে হলো। একজন তওবা সম্পাদক মতিউর রহমানের মতো দেখতে। অন্যজন মাহফুজ আনামের মতো। তাদের একজন উজিরে খবর (তথ্যমন্ত্রী), অন্যজন উজিরে তাহজীব (সংস্কৃতি মন্ত্রী)। তওবা সম্পাদকের দৈনিকের নাম এখন জাহানে নও। ইংরেজী দৈনিকের নাম ইসলামিক স্টার। আবার ঘুম ভেঙ্গে গেল। বাংলাদেশে এই বাপক পরিবর্তনের চমক ভুলতে না ভুলতেই ফের ঘুমিয়ে পড়লাম।

বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। বাইরের রাস্তায় লোকজনের হৈচৈ-এ তন্দ্রার মতো ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। ভাবলাম কিছুক্ষণ জেগে থাকি। স্বপ্নে দেখা ঘটনাগুলো একটু ভেবে দেখি। তা হলো না, আবার চোখে ঘুমের আবেশ জড়িয়ে এলো। ঘুমিয়ে পড়লাম। কানে এলো একটি ঘোষণা। বেতারে খবর প্রচারিত হচ্ছে। বাংলাদেশ বেতারের নাম বদল হয়ে গেছে। নতুন নাম হয়েছে ‘গায়েবি আওয়াজ।’ ‘ভাবলাম ভারতের বেতারের নাম যদি ‘আকাশবাণী’ হতে পারে, তাহলে বঙ্গস্তান জমহুরিয়াতের বেতারের নাম গায়েবি আওয়াজ হবে না কেন?

জমহুরিয়াতের ছদরে রিয়াসতের (প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতির) একটা এলান বা ফরমান প্রচার করা হচ্ছে। এই ফরমান শুনে কান খাড়া হয়ে গেল। ফরমান বা ঘোষণাগুলো সাধু ভাষায় প্রচারিত হচ্ছে। ১) এখন হইতে বঙ্গস্তানের তামাম জমিনে মুসলমানদের সার্বভৌম অধিকার, শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত হইবে। যাহারা সর্বপ্রকার কুফরি হইতে মুক্ত এবং হজরত আব্দুল ওয়াহাব ও হজরত মওলানা মওদুদীর দ্বীনি নিয়মকানুন ও নির্দেশ মানিয়া চলিবে একমাত্র তাহাদেরই মুসলমান বলা হইবে। ২) আহমদিয়া, আগাখানি, শিয়া, বাহাই ইত্যাদি সম্প্রদায়গুলো মুসলমান বলিয়া গণ্য হইবে না। কেহ মুসলমান বলিয়া পরিচয় দিলে তাহাকে বা তাহাদের হত্যা করা হইবে। তাহাদের উপাসনালয়কে মসজিদ আখ্যা দিলে তাহা ভাঙ্গিয়া ফেলা হইবে।

আমি ঘুমের মধ্যেও একটু শিউরে উঠলাম, যখন শুনলাম গায়েবি আওয়াজে বলা হচ্ছে, ৩) বঙ্গস্তানে বসবাসকারী অবিশ্বাসী সম্প্রদায়গুলো যেমন হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান, আহমদিয়া, শিয়া, আগাখানি এবং উপজাতি সম্প্রদায়গুলোকে বঙ্গস্তানে বাস করিতে হইলে মোগল আমলের মতো জিজিয়া কর দিতে হইবে। নইলে তাহাদের স্থাবর অস্থাবর সকল সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হইবে। তাহাদের সকল মালামাল, এমনকি কন্যা সন্তানেরাও ‘মালে গণিমত’ বলিয়া গণ্য হইবে।

এবার আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল না। স্বপ্নের মধ্যেই উৎকর্ণ হয়ে শুনতে লাগলাম, ছদরে রিয়াসতের ফরমানটি। ৪) হুকমাতের উপরের ও নিচের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দাড়ি রাখিতে হইবে। মাথায় টুপি পরিতে হইবে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়িতে হইবে। অফিস আওয়ারে নামাজ পড়ার জন্য প্রতি ওয়াক্তে আধ ঘণ্টা করিয়া ছুটি দেওয়া হইবে। অমুসলমানদের কোন ছুটি দেওয়া হইবে না। কেহ নামাজ না পড়িলে, প্রথম শাস্তি প্রকাশ্যে বেত্রাঘাত, তারপর চাকুরী হইতে বরখাস্ত এবং প্রয়োজনে মৃত্যুদ-। ৫) প্রতি ওয়াক্ত নামাজের সময় আধ ঘণ্টার জন্য সকল দোকানপাট ও ব্যবসা-বাণিজ্য (সৌদি আরবের মতো) বন্ধ রাখিতে হইবে। নইলে সে সকল ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করিয়া দেওয়া হইবে এবং মালিক ও কর্মচারীদের কঠোর শাস্তি দেওয়া হইবে।

এবার সত্যি সত্যি জেগে বিছানায় উঠে বসলাম। মনে হলো, এ কি সব অসম্ভব ঘটনা স্বপ্নে দেখছি। হয়তো আজ আর ঘুম হবে না। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই শুয়ে পড়লাম এবং ঘুমও চোখে জড়িয়ে এলো। দেখি তখনো গায়েবি আওয়াজে ছদরে রিয়াসতের ফরমান প্রচার চলছে। এবার শুনলাম, ৬) এখন হইতে প্রধান বিচারপতিকে বলা হইবে কাজীয়ে কুজ্জাত। শরাশরিয়ত বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিদের বিচারপতি নিয়োগ করা হইবে। কোন কুফরি আইন দ্বারা বিচার বিভাগ চালিত হইবে না। দেশের একমাত্র আইন শরিয়া আইন। কুফরি বা পশ্চিমা আইন শিখাইবার জন্য যেই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আছে, তাহা বন্ধ করিয়া দেওয়া হইবে। কুফরি আইনে কোন উকিল মোক্তার প্র্যাকটিস করিতে পারিবে না। করিলে কঠোর শাস্তি। দেশে সমস্ত আইনের কেতাব নিষিদ্ধ করিয়া দেওয়া হইবে।

বিস্ময়! বিস্ময়! সেই ঘুমের মধ্যেও ভাবতে লাগলাম, জমহুরিয়াতের উজির সভার প্রধানতো একজন আইনজীবী এবং দেখতেও ড. কামাল হোসেনের মতো। ড. কামাল হোসেনই কিনা তা বুঝতে পারছিলাম না। অন্য দু’জন উজিরকেও দেখে মনে হয় দেশের দু’জন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত, এককালের বামপন্থী ও প্রগতিশীল দুই সম্পাদকের মতো। এরা কি করে বঙ্গস্তান জমহুরিয়াতের উজির হলেন? তাহলে এরা কি এই হুকমাতের শো বয়?

গায়েবি আওয়াজে এখনও ফরমান জারি চলছে। ৭) শিক্ষাক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন আনা হইল। কোনো স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি থাকিবে না। নিম্ন, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাদ্রাসা থাকিবে। কোন উচ্চ মাদ্রাসায় (বিশ্ববিদ্যালয়ে) কোন কুফ্রি মতবাদ যেমন সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র, সেক্যুলারিজম ইত্যাদি পড়ানো নিষিদ্ধ করা হইবে। ডারউইন, আইনস্টাইনের বৈজ্ঞানিক থিয়োরি নামে শয়তানের ‘অস্ওয়াসা’ শিক্ষার্থীদের পড়ানো হইবে না। ৮) দেশের ধর্মবিরোধী সংবিধান বাতিল করিয়া দেওয়া হইলো। কোন মুসলিম দেশের জন্য মানুষের তৈরি সংবিধান দরকার নাই। আমাদের সংবিধান আমাদের ধর্মগ্রন্থ।

এরপর ফরমান প্রচারে একটু বিরতি। ছদরে রিয়াসতের একটি ফরমান তার নিজের কণ্ঠে প্রচার করা হলো। এই প্রথম তার নাম জানলাম। হযরত শাহ্ সূফী রওশানে দ্বীন, মোজাদ্দেদে জমানা তেঁতুল শরাফি। তিনি বললেন, জমহুরিয়াতে আওরতদের (নারীদের) কোন অধিকার থাকিবে না। তাহারা ভোগের বস্তু। পুুরুষের সেবা ও মনোরঞ্জনের জন্য তাহাদের সৃষ্টি করা হইয়াছে। তাহারা পর্দাপুসিদা মতো ঘরে থাকিবে। দিনে স্বামীর সেবা করিবে এবং রাতে বিছানায় স্বামীর মনোরঞ্জন করিবে। স্বামীকে সন্তান উপহার দিবে। জমহুরিয়াতে নারীদের জন্য চাকুরী বাকুরী করা, পর্দা ছাড়া বাহিরে গমন নিষিদ্ধ করা হইল। নিষেধ অমান্য করিলে কঠোর শাস্তি। নারী-পুরুষের অবৈধ মিলনে বা জেনায় নারীকেই বড় শাস্তি পাইতে হইবে। পুরুষ তাহাকে জোরপূর্বক সম্ভোগ করিলেও নারীকেই শাস্তি পাইতে হইবে। কারণ, তাহারাই তাহাদের রূপ যৌবন দ্বারা পুরুষকে আকর্ষণ করে। তাহাদের রূপ যৌবন তেঁতুলের মতো টক মিষ্টি।

ঘুমের মধ্যেই মনে হলো, নারীদের সম্পর্কে এরূপ একটি ঘোষণা আগে কোথায় যেন শুনেছি। সদরে রিয়াসতের নিজের কণ্ঠের ঘোষণা শেষ হলো। শুরু হলো আগের ফরমানের প্রচার। ৯) চুরি করার দণ্ড- হাত কাটিয়া ফেলা হইবে। টেলিভিশন এখন হইতে শুধু কোরান হাদিস এবং তাহার বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যা প্রচার করিবে। দেশের আলেমে মাশায়েখগণ শুধু তাহাতে অংশগ্রহণ করিবেন। কোন প্রকার নাচগান টেলিভিশনে দেখানো হইবে না। নারীরা কোন ধরনের ক্রীড়ায় অংশগ্রহণ করিতে পারিবে না। বাজার সওদায় বাহিরে গেলে বোরখা পরিধান করিয়া স্বামীর সহিত অথবা একজন আত্মীয় পুরুষের সহিত যাইতে হইবে। মোটরগাড়ি ড্রাইভিং চলিবে না। এইসব আদেশ অমান্য করিলে চল্লিশ বা তাহার বেশি বেত্রাঘাত দেওয়া হইবে।

১০) তিন তালাক ও হিল্লা বিবাহ প্রচলিত থাকিবে, স্বামী নির্যাতন করিলে বা দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা বিবাহ করিতে চাহিলে স্ত্রীর তাহাতে আপত্তি করা চলিবে না। স্বামী চারজন পর্যন্ত স্ত্রী রাখিতে পারিবে। জমহুরিয়াতের এইসব হুকুম-আহকাম অমান্য করিলে সর্বোচ্চ শান্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত দেওয়া হইতে পারে। কোন অমুসলমান বিবাহিত নারীকে মুসলমান পুরুষ জোরপূর্বক সম্ভোগ করিলেও তাহা জ্বেনা বলিয়া গণ্য হইবে না। এখন হইতে আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানের সঙ্গে দোস্তালি এবং ভারতের সঙ্গে দুশমনি। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোন কথা কহিলে তাহা দণ্ডযোগ্য অপরাধ বলিয়া গণ্য হইবে। এবার ঘুম ভাঙ্গলো। সহজে আর ঘুম এলো না। স্বপ্নে হুকমাতের ফরমানের শেষটাও শোনা গেল না।

কিন্তু বিস্ময়ের ব্যাপার পরের রাতে আবার স্বপ্ন। এবার গায়েবি আওয়াজের ফরমান শোনা নয়। দেখি, আমি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে এক চৌকিতে দাঁড়িয়ে আছি। সীমান্ত পার হয়ে ভারতে যাওয়ার জন্য বোরখা পরিহিত তিনজন মহিলাও দাঁড়িয়ে আছেন। শুনলাম তারা ঢাকার এক অভিজাত মুসলিম পরিবারের নারী। আজমীর শরিফে খাজা বাবার মাজারে যাচ্ছেন।

হঠাৎ তিন মহিলা সম্ভবত আমাকে দেখেই বিস্মিত হয়ে নিজেদের অজান্তেই মুখের পর্দা সরিয়ে আমাকে একটু দেখেই যেন ভয় পেয়ে পর্দায় মুখ ঢেকে ফেললেন। আমার মনে হলো, স্বপ্নে ড. কামাল হোসেন, মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনামের মতো দেখতে সেই তিন উজিরই যেন গোপনে সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। তারা কি গোপনে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছেন?

স্বপ্নের মধ্যেই আমার মনে পড়লো, ইরানে মৌলবাদীরা ক্ষমতা দখল করার পর বনি সদর নামে এক পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত গণতান্ত্রিক নেতাকে ইরানের প্রেসিডেন্ট করেছিলেন। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই বনি সদর বুঝতে পারেন, ইরানের নতুন মৌলবাদী শাসকেরা তাকে শো বয় হিসেবে ব্যবহার করছে। যে কোন সময় তাকে হত্যা করে ক্ষমতা থেকে সরানো হবে। তিনি প্রেসিডেন্ট হাউস থেকে বোরখা পরে সীমান্ত পাড়ি দেন এবং প্যারিসে পালিয়ে যান।

স্বপ্ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর ভাবলাম, বাংলাদেশেও কি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখছি? তারপরই মনের সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে ভেবেছি, না, বাংলাদেশে কখনই এ ঘটনা ঘটবে না। এটা অলীক স্বপ্ন। এবং ঘুমের জগতের থিভস। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ৫ জুন, মঙ্গলবার, ২০১৮]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment