কালের আয়নায়

‘হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশে বিএনপির শাসনামলে যা ছিল ক্রসফায়ারিং, এখন তার নাম হয়েছে বন্দুকযুদ্ধ। অর্থাৎ বিএনপি আমলে সন্ত্রাসী দমনের জন্য হত্যাকাণ্ডকে যে ইংরেজি নাম দেওয়া হয়েছিল, আওয়ামী লীগ আমলে আরও ভয়ঙ্কর মাদক ব্যবসায়ীদের দমনের জন্য সেই একই হত্যাকাণ্ডকে নাম দেওয়া হয়েছে ‘বন্দুকযুদ্ধ’। ক্রসফায়ারিংয়ে যারা সন্ত্রাসী হত্যা করত, সেই একই র‌্যাব এখন মাদক ব্যবসায়ী মাফিয়াচক্রের বিরুদ্ধে বন্দুকযুদ্ধ চালাচ্ছে এবং এই বন্দুকযুদ্ধে হত মানুষের সংখা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, এই র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র‌্যাবের জন্ম বিএনপি সরকারের দ্বারা। ক্রসফায়ারিং কথাটার উদ্ভব এবং এই ক্রসফায়ারিংয়ে সন্ত্রাসী হত্যার শুরু তখনই। তখনও দেশের অনেক মানুষ এই সন্ত্রাসী হত্যার দাবি বিশ্বাস করেনি। তারা ভেবেছে, র‌্যাব সন্ত্রাসী সন্দেহে বিচার ছাড়াই মানুষ হত্যা চালাচ্ছে এবং প্রচার চালাচ্ছে, এটা একতরফা হত্যা নয়; র‌্যাব ও সন্ত্রাসীদের মধ্যে যুদ্ধে এই মৃত্যু ঘটেছে। তখনও এই বিচার বহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে জনগণ ও বুদ্ধিজীবীদের একটা অংশ প্রতিবাদমুখর হয়েছিলেন। ফলে বিএনপি আমলে সন্ত্রাস দমনে ভাটা পড়ে যায়।

তাতে এই সন্ত্রাসীদের দাপট বাড়ে। দেশি-বিদেশি নাগরিকসহ মুক্তচিন্তার ব্লগার হত্যা শুরু হয়। গুলশানের এক রেস্টুরেন্টে অবরোধ চালিয়ে একদল তরুণ-তরুণী হত্যার পর আওয়ামী লীগ সরকারের টনক নড়ে। সন্ত্রাসীরা যতটা নৃশংস, ততটা নৃশংসতার সঙ্গে এই সন্ত্রাসী এবং তাদের ঘাঁটিগুলো নির্মূল করার জন্য পুলিশ ও র‌্যাবকে শেখ হাসিনা কঠোর নির্দেশ দেন। শুরু হয় কঠোরভাবে সন্ত্রাস দমন।

আমাদের একশ্রেণির ‘দুর্বল হৃদয়’ বুদ্ধিজীবী ও সম্পাদক এই মানবতার শত্রু নিধনেও মানবতা ও মানবাধিকার বিপন্ন হওয়ার আলামত আবিস্কার করেন। কিন্তু সবল হৃদয় সাধারণ মানুষ এই সন্ত্রাস দমন সমর্থন করেন এবং শেখ হাসিনার সাহসিকতার প্রশংসা করেন। ফলে অত্যাশ্চর্যভাবে তথাকথিত জিহাদিস্ট ঘাতকদের সন্ত্রাস দমিত হয়েছে। যে জঙ্গিবাদী বর্বরতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এখনও লন্ডন ও প্যারিসের মতো বড় বড় শহরে পুলিশ দমন করতে পারেনি; আমাদের পুলিশ তা পেরেছে। ব্রিটিশ আমলে আমার জন্ম। সেই কৈশোর থেকে শুনে এসেছি, পুলিশ ঘুষখোর। তারা অকর্মণ্য। শুধু ঘুষ খেতে জানে। চোর-ডাকাত-খুনিদের ধরতে জানে না। প্রয়াত সাংবাদিক ও লেখক মোহাম্মদ মোদাব্বের তাই এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, আমাদের পুলিশ শুধু ঘুষ খেতে জানে, ঘুষি দিতে জানে না।

সেই কৈশোরকাল থেকে এটি আমারও ধারণা। কিন্তু গত দশ বছরে আমার এ ধারণা পাল্টে গেছে। যে কোনো কারণেই হোক, আমাদের পুলিশ, র‌্যাব এবং অন্যান্য আধা সরকারি বাহিনী অনেক বেশি কর্তব্যসচেতন, কর্মঠ, দক্ষ এবং স্মার্ট হয়ে উঠেছে। তারা সম্পূর্ণভাবে দুর্নীতিমুক্ত হয়েছে- এ কথা বলব না। এখন দুর্নীতি সমাজের উঁচু-নিচু কোন স্তরে নেই? বরং সেই তুলনায় পুলিশ, র‌্যাব অনেক বেশি দুর্নীতিমুক্ত। যে দেশে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ঘুষ খাওয়ার ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, সে দেশে স্বল্প বেতনভোগী এবং নানা সুযোগ-সুবিধাবঞ্চিত পুলিশই কেবল ঘুষ খায় ও দুর্নীতি করে- এই অভিযোগ হাস্যকর।

বাংলাদেশের র‌্যাব ও পুলিশ যদি নিরস্ত্র মাদক ব্যবসায়ীদের বা তাদের ছোট ছোট হকারকে ধরে মারতে শুরু করে থাকে, তাহলে তার অবশ্যই তীব্র প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু যতদূর জানি, ধর্মান্ধ সন্ত্রাসীরা যেমন মারাত্মক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ছিল, বাংলাদেশের মাদক ব্যবসায়ীরাও তাই। এই মাফিয়াতন্ত্রের কোনো কোনো গ্রুপও তাই। তাদের হাতে র‌্যাব ও পুলিশের অস্ত্রের চেয়েও মারাত্মক অস্ত্র আছে। সুতরাং তাদের ঘাঁটিতে হামলা চালাতে গেলে র‌্যাব ও পুলিশকে অবশ্যই অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয়। এটা মৌলবাদী সন্ত্রাস দমনের ক্ষেত্রও ঘটেছিল। এই সন্ত্রাস দমনে ক’জন পুলিশ ও কনেস্টবল মারা গেছেন, তার খবর কি আমাদের মানবতাবাদী বুদ্ধিজীবীরা জানেন না?

অবশ্যই কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাদক ব্যবসায়ীদের মাফিয়া গ্রুপ সশস্ত্র এবং অকস্মাৎ হামলা চালাতে পারে- এই আশঙ্কায় র‌্যাব বা পুলিশ আগেই হামলা চালিয়ে দুর্বৃত্তদের হত্যা করে থাকতে পারে এবং এখনও হয়তো করছে। অস্ত্রধারী মাফিয়াদের বিরুদ্ধে এটা যদি যুদ্ধ হয়, তাহলে সেই যুদ্ধে কিছু নির্দোষ ও নিরীহ মানুষের মৃত্যুর মতো এই মৃত্যুকেও পুলিশের ইচ্ছাকৃত হত্যাকাণ্ড বলে কি চালানো যায়? হয়তো র‌্যাব বা পুলিশের ভুলে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে। তা বন্ধ করার জন্য সরকার পুলিশ ও র‌্যাবকে সতর্ক অবশ্যই করবে।

র‌্যাব ও পুলিশের মাদকবিরোধী অভিযান মনিটরিংয়ের জন্য বিচার বিভাগ ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সরকার কমিটি গঠন করে দিতে পারে। কিন্তু মানবতা ও সমাজ শত্রুদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করার এই লড়াই আমাদের তথাকথিত মানবতাবাদীদের উদ্দেশ্যমূলক আবেদনে বন্ধ করে দিলে এই দুর্বৃত্তদের অবস্থা হবে আরও ভয়ানক অর্ধমৃত সাপের মতো। তারা আরও ভয়ঙ্কর শক্তি নিয়ে মাথা তুলবে। গোটা দেশ ও সমাজের এবং মানবতার ভয়ঙ্কর শত্রুদের পূর্ণ উচ্ছেদ না করা পর্যন্ত হাসিনা সরকার এই যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না। শেখ হাসিনা এ ব্যাপারে কঠোর মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছেন। আমি তাকে অভিনন্দন জানাই।

বাংলাদেশে বিএনপি, তাদের অনুগ্রহভোগী একটি বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়া তাদের আদি অভ্যাস ও চরিত্র এখনও বদল করতে পারেনি। দেশের এবং দেশের মানুষের ভালো করার জন্য আওয়ামী লীগ যখনই প্রয়োজনীয় কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তার প্রত্যেকটির তারা বিরোধিতা করেছে। এখন মাদকবিরোধী অভিযানেও তাই করছে। জাতির পিতা ও জাতীয় নেতাদের আত্মস্বীকৃত ঘাতকদের বিচার ও দণ্ডদান ভণ্ডুল করার জন্য ক্ষমতায় থাকাকালে বিএনপি আপ্রাণ চেষ্টা করেছে। তাদের বিচার শুরু হলে কারাগারে তাদের ফার্স্ট ক্লাস হোটেলে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তাদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলা তারা বন্ধ করতে পারেনি।

‘৭১-এর ঘাতক ও দালালদের বিচার ও দণ্ডদানে বাধা দেওয়ার জন্য তারা বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনে স্বচ্ছতার অভাবের অভিযোগ তুলেছে। বিশ্বময় প্রচার চালিয়েছে, এই বিচার অবৈধ এবং অভিযুক্ত ঘাতকদের আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা গ্রহণের জন্য ফাঁসি দিয়ে হত্যা করছে। খালেদা জিয়া প্রকাশ্য সভায় বক্তৃতা দিয়ে কাদের মোল্লার ফাঁসি রদ করার দাবি জানিয়েছেন। ‘৭১-এর মানবতার শত্রুদের যারা মৃত্যুদণ্ড দাবি করেছে, শাহবাগ চত্বরের সেই বিশাল জনতার নেতাদের তারা কাফের, নাস্তিক আখ্যা দিয়েছে। এই দাবি ও আখ্যাদান কি কোনো দেশপ্রেমিকের হতে পারে?

চীনের কথাই ধরি, কয়েক বছর আগে চীনের কমিউনিস্ট সরকার যখন দুর্নীতি দমন অভিযান শুরু করেছিল, তখন কমিউনিস্ট পার্টির শতাধিক নেতাকর্মীকে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল কত শত, তার হিসাব জানা যায়নি। তাদের মধ্যে কিছু সরকার বিরোধী লোকও ছিল। মার্কিন সরকার যাদের ‘ডিসিডেন্ট’ আখ্যা দিয়ে পলায়নে সাহায্য করেছে এবং আমেরিকায় আশ্রয় দিয়েছে। পশ্চিমা দেশগুলো বলে, তারা মৃত্যুদণ্ড দানের বিরোধী। সেই অজুহাতে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যাকারীদের পর্যন্ত আশ্রয় দিয়ে রাখতে এখনও দ্বিধাবোধ করছে না।

এখন তারাই বিএনপি ও সুশীল সমাজের কারও কারও সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বাংলাদেশে মাদক ব্যবসাবিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার ঘটনাকে নিন্দা জানাচ্ছে। আমি সানডে টাইমসের এক সাংবাদিককে জিজ্ঞেস করেছি, ইরাকে ও আফগানিস্তানে সন্ত্রাস দমনের নামে অভিযান চলাকালে মার্কিন সৈন্যদের ফ্রেন্ডলি ফায়ারে ক’জন ব্রিটিশ সাংবাদিক আহত ও নিহত হয়েছেন, তার সংখ্যাটা বলবেন কি? এই ফ্রেন্ডলি ফায়ারে হত্যাকাণ্ডকে বলা হয়েছে ভুলক্রমে হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের র‌্যাব ও পুলিশও কি ভুল করতে পারে না? কই, ফ্রেন্ডলি ফায়ারে হত্যা নিয়ে তো আপনারা টুঁ শব্দটি করেননি।

তাছাড়া সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে আপনারা আফগানিস্তান ও ইরাকে মারাত্মক যুদ্ধাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে কত হাজার নিরীহ নর-নারী ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করেছেন? অপর দেশে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানোর অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে? বাংলাদেশে মাদক ব্যবসা সমাজ জীবনে যে ভয়াবহ অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তার বিরুদ্ধে সরকার নিজ দেশে মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপত্তার জন্য বাধ্য হয়ে অভিযান চালালে এবং তাতে কিছু লোকের মৃত্যু হলে আপনারা মানবতা বিপন্ন বলে চিৎকার জুড়েছেন অথচ অন্য দেশে গিয়ে একই সন্ত্রাসী দমনের নামে রেজিম চেঞ্জ করছেন, হাজার হাজার মানুষ হত্যা করছেন, তার কৈফিয়তটা কী?

একটা মাত্র উদাহরণ সাংবাদিক বন্ধুকে দিয়েছি। একজন মাত্র সন্ত্রাসী নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আফগানিস্তানে একটা শহরে খুঁজতে গিয়ে আমেরিকা একটা বাড়িতে আকস্মিক বোমা হামলা চালায়। সেটা ছিল একটা বিয়েবাড়ি, কোনো সন্ত্রাসী ঘাঁটি নয়। সেখানে বোমা হামলা চালিয়ে এক রাতে বর-কনেসহ শতাধিক নর-নারীকে হত্যা করা হয়। এই খবর পশ্চিমা পত্রপত্রিকাতেই বেরিয়েছিল। এত বড় হত্যাকাণ্ডের জন্য পশ্চিমা নেতারা বা তাদের মিডিয়ায় কোনো প্রকার দুঃখ প্রকাশ করা হয়নি। তারপর ওসামা বিন লাদেন পাকিস্তানের একটি শহরে পালিয়েছিলেন। তাকে জীবিত ধরার সমস্ত সুযোগ থাকা সত্ত্বেও মার্কিন সৈন্যরা অন্য একটি মিত্র দেশে হামলা চালিয়ে তাকে হত্যা করে লাশ গুম করে ফেলল কেন? বিনা বিচারে তাকে হত্যা করা হলো কেন?

যেখানে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে লাখ লাখ নিরীহ মানুষ হত্যাকারী নাৎসি নেতাদের বিচার করে দণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেখানে বিন লাদেনসহ তার অনেক সহকর্মীকে বন্দুকযুদ্ধের নামে বিনা বিচারে হত্যা করা হলো কেন? বাংলাদেশে ‘৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ব্যবস্থায় পশ্চিমা দেশগুলো ত্রুটি খুঁজেছে; কিন্তু নাৎসি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠিত নুরেমবার্গ ট্র্রাইব্যুনাল ত্রুটিমুক্ত ছিল কি? এই ট্রাইব্যুনালের পরবর্তী টোকিও ট্রাইব্যুনালের অন্যতম বিচারপতি ড. রাধানাথ পাল এ সম্পর্কে কী বলেছিলেন?

অতীতের কাসুন্দি না ঘেঁটে বর্তমান বাংলাদেশে আসি। আমাদের দেশে কিছু অতি বোদ্ধা বুদ্ধিজীবী আছেন, তারা আবার তাত্ত্বিকও, নানা তত্ত্বকথার আড়ালে এরা বড় বড় অপরাধ ও অপরাধীদের বাঁচাতে চান। জঙ্গিবাদবিরোধী অভিযানের সময় তারা বলেছিলেন, সশস্ত্র অভিযান চালিয়ে এই জঙ্গিদের সমাজ জীবন থেকে উচ্ছেদ করা যাবে না। এ জন্য চাই সমাজসংস্কার। অর্থাৎ পুরনো তত্ত্বকথা। কিন্তু বাস্তবে পুলিশ ও র‌্যাবের অভিযানে সমাজ থেকে এই সন্ত্রাস সম্পূর্ণ উচ্ছেদ না হলেও এ সন্ত্রাস থেকে দেশের মানুষকে মুক্ত করা গেছে অনেকটাই।

দেশের মানুষ তাই খুশি এবং সেই সন্ত্রাস দমনের অভিযানের সুফল তারা ভোগ করছে। বর্তমানের মাদক-মাফিয়াতন্ত্র উচ্ছেদেও হাসিনা সরকারের কঠোর অভিযানে সাধারণ মানুষ খুশি। অখুশি কেবল যারা ভাবছেন, তারা জ্ঞানবৃক্ষের সর্বোচ্চ শাখায় বসে আছেন তাদের কিছু সুবিধাভোগী লোক। তারা যদি দেখেন, সরকারের এই মাদকবিরোধী অভিযান সফল হয়েছে এবং সমাজ জীবন কিছুটা হলেও ভয়াবহ কলুষমুক্ত হয়েছে, তখন তাদের মুখে অন্য কথা শোনা যাবে অথবা তারা নীরব বকধার্মিক সাজবেন। কই বিএনপি তো এখন পার্বত্য শান্তিচুক্তি, গঙ্গার পানি চুক্তি নিয়ে একটি কথাও বলছে না। ক্ষমতায় থাকলে এর সুফল তারা ভোগ করে। এখন তিস্তা চুক্তি নিয়ে তাদের প্রোপাগান্ডা। যার সমাধান তারা ক্ষমতায় থাকতে করতে পারেননি। আমার ধারণা, হাসিনা সরকারই এই সমস্যারও সমাধান করবে।

মাদক-মাফিয়াদের যদি বিনা রক্তপাতে উচ্ছেদ করা যায়, সেটা অবশ্যই র‌্যাব ও পুলিশের প্রশংসনীয় কাজ হবে। সন্দেহবশে যাতে নিরীহ ও নির্দোষ লোক নিহত না হয়, যেমন কক্সবাজারের একরাম হত্যা, তার পুনরাবৃত্তি যাতে না ঘটে, সেদিকে অবশ্যই সরকারকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে। আরেকটি দিকে আরও বেশি দৃষ্টি রাখতে হবে তা হলো, মাদক-মাফিয়াতন্ত্রের পুঁটিমাছগুলো শাস্তি পাবে আর রাঘববোয়ালরা জাল ছিঁড়ে বেরিয়ে যাবে- তা যেন না হয়। তাহলে সরকারের গোটা অভিযান ক্রেডিবিলিটি হারাবে। সাধারণ মানুষও সরকারের এই অভিযানের উদ্দেশ্য সম্পর্কে বিরোধীদের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হবে।

যে যাই বলুন, ইয়াবা ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযুক্ত বদি মিয়া এমপিকে বিদেশে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া উচিত হয়েছে কিনা সরকারের তা ভেবে দেখা দরকার। তার বিরুদ্ধে যে গুরুতর অভিযোগ, তাতে তার পাসপোর্ট জব্দ করে বিচারে সোপর্দ করা উচিত ছিল। সরকার পক্ষের কেউ কেউ বলছেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। অভিযোগের সত্যাসতা বিচার করবেন আদালত। সরকারের করণীয়, আগে মাদকবিরোধী অভিযানে রাঘব বোয়ালদের, বিশেষ করে দলের লোকদের সাজা দিয়ে জনগণকে এই অভিযানের ব্যাপারে আরও আস্থাশীল করে তোলা।

মাদকবিরোধী অভিযান চলছে, চলুক। যাদের কাছে সরকারের সব কাজই মন্দ, তাদের প্রচারণায় কান দিয়ে লাভ নেই। সমাজ শত্রুদের বিরুদ্ধে কোনো দুর্বলতা প্রদর্শন ঠিক হবে না। কেবল লক্ষ্য রাখতে হবে, নির্দোষ ও নিরীহ ব্যক্তিদের যেন হয়রানি করা না হয়। তারা যেন হত্যার শিকার না হয়। নজরুল তার এক কবিতায় লিখেছিলেন, ‘ওরে হত্যা নয়, আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন’। সরকার তার মাদক-ব্যবসাবিরোধী অভিযানকে সত্যাগ্রহ ও শক্তির উদ্বোধন হিসেবে গ্রহণ করুক। – সমকাল

লন্ডন, ৮ জুন শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment