তৃতীয় মত

শান্তিনিকেতন, শেখ হাসিনা এবং বন্যার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের গান

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

কয়েক বছর আগে ভেনিসে গিয়েছিলাম। ভেনিস রিভার-সিটি। চারদিকে অথৈ নদীর জল। বাংলাদেশের মেঘনা নদীর মতো। তাতে চাঁটগার সাম্পান নৌকার মতো অসংখ্য গন্ডোলা ভাসছে। শহরে যাতায়াতের প্রধান বাহন গন্ডোলা, যোগাযোগেরও। মনে হয় সারা শহর নদীর ওপর ভাসছে। আমার জন্ম বরিশালে। বরিশালও নদীমাতৃক জেলা। নজরুল তার ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘বরিশাল বাংলার ভেনিস’। ভেনিসের নদীতে গন্ডোলায় ভাসতে ভাসতে বারবার কীর্তনখোলা নদীর কথা মনে পড়ছিল।

ভেনিসে সেবার একটা বড় গন্ডোলায় চেপেছিলাম। তখন প্রশান্ত নদীর ঢেউয়ে সন্ধ্যার লালিমা নাচছে। ভেতরে ছইয়ের নিচে এক ইতালিয়ান যুবক তার গিটারে সুর তুলে একটা গান গাইছে। আর সেই সুরে তাল মিলিয়ে তিন-চারজন তরুণী নাচছে। আমার সঙ্গে প্রয়াত সাংবাদিক ও লেখক আমিনুল হক বাদশাহ ছিলেন। তাকে বললাম- বাদশা, গানের সুরটা পরিচিত মনে হচ্ছে না? বাদশা বললেন, আমারও পরিচিত মনে হচ্ছে। মনে হয় একটি বাংলা গান ইতালিয়ান ভাষায় এবং ‘ওয়েস্টার্ন রিদম’ মিশিয়ে গাওয়া হচ্ছে।

কিছুক্ষণ গানটি কান পেতে শুনতেই ব্যাপারটা স্পষ্ট হল, ইতালিয়ান যুবকটি ইতালিয়ান ভাষায় যে গানটি গাইছে, সেটি রবীন্দ্রনাথের বাংলা গান, ভাষান্তরিত করা হয়েছে, পশ্চিমা সুর মেশানো হয়েছে। গানটি শেষ হলে এবং গান্ডোলাটি তীরে ভিড়লে গায়কের কাছে ভিড় জমল। আমরাও গেলাম। এক ফাঁকে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম- এ গানটি কি ইতালিয়ান? তিনি বিনাদ্বিধায় বললেন, না, এটা আমার এক বন্ধু গায়ক ভিক্টর নিচ্চিয়োয়ের গান। ইন্ডিয়ান গান থেকে কথা ও সুর এডোপটেড করা। অরিজিনাল গান ইন্ডিয়ান একটি ভাষায় লেখা। আমরা ভাষা বদল করেছি, সুর একটু পাল্টেছি। তাকে জানালাম, এটা বাংলাদেশের বাংলা ভাষায় লেখা গান। লিখেছেন নোবেল পুরস্কার পাওয়া কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি টেগোর নামে সারা বিশ্বে পরিচিত। ইতালিয়ান গায়ক মাথা নেড়ে জানালেন, তিনি টেগোর নামটির সঙ্গে পরিচিত।

আমরা গন্ডোলা থেকে নেমে রাস্তায় হাঁটছি, ইচ্ছে রিয়ানটো ব্রিজে যাব। সেটা বিখ্যাত শপিং সেন্টার। ইতালিয়ান গায়কও আমাদের সঙ্গে রিয়ানাটো ব্রিজে চলেছেন। তিনি স্ট্রিট সিঙ্গার। রিয়ানটো ব্রিজে গিয়ে গান গাইবেন। আমার হাঁটুতে বাতের ব্যথা তখনও খুব কাবু করেনি। বাদশার পাশাপাশি হাঁটছিলাম। বাদশার গলা তেমন ভালো ছিল না। তবু তিনি গুনগুন করে গাইছিলেন, ‘তোমার খোলা হাওয়া লাগিয়ে পালে…’। ইতালিয়ান যুবক সঙ্গে সঙ্গে গানটি চিনতে পারলেন, গিটারে ঝংকার তুলে বাদশাকে বললেন- তুমি গাও, আমি বাজাই। তিনি রাজপথের কর্নারে দাঁড়িয়ে গানটির সুর বাজাতে শুরু করেছিলেন।

কতদিন আগের কথা, তবু স্মৃতির পটে জ্বলজ্বল করছে। আরেকদিন অক্সফোর্ডের কাছে শেক্সপিয়রের স্মৃতিপূত ঘন জঙ্গলের অন্ধকার পথে মোটরগাড়িতে বসে এডন নদী দেখতে যাচ্ছি। এই জঙ্গলে এখনও দলে দলে হরিণ ঘুরে বেড়ায়। গাড়ির চাকার নিচে পড়ে যাতে হরিণ মারা না যায় সেজন্য সরকার গাড়ি চালকদের সতর্ক করে রাস্তার পাশে বোর্ড লাগিয়ে দিয়েছে। হরিণগুলো হঠাৎ এসে গাড়ির সামনে পড়ে।

গাড়ির চালক নূরুল ইসলাম হোসেন খুব সতর্কভাবে গাড়ি চালাচ্ছিলেন আর গল্প করছিলেন। বলছিলেন, এই সেই উড (জঙ্গল) যেখানে কোনোকালে শেক্সপিয়র হরিণ চুরি করতেন। এই অঞ্চলের তখনকার জমিদারের ভয়ে তিনি লন্ডনে পালিয়ে যান এবং একটা থিয়েটার হলে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের জুতো পাহারা দেয়ার জন্য ডোরম্যান হন। হোসেনের স্ত্রী সঙ্গে ছিলেন, তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন, গাফ্ফার ভাই এসব গল্প জানেন, তুমি গান বাজাও।

আমার এই দুই বন্ধু এখন নেই। দুরন্ত ক্যান্সারে মারা গেছেন। স্ট্রাটফোর্ডে শেক্সপিয়রের বাড়ির কাছে তার রেস্টুরেন্ট এবং বাড়ি ছিল, আমি দু’দিনের জন্য লন্ডন থেকে এসে তার অতিথি হয়েছিলাম। স্ত্রীর কথায় নুরুল ইসলাম হোসেন গাড়িতে গানের ক্যাসেট বাজিয়ে দিলেন। প্রথমেই একটি মিষ্টি সুর এবং একটি মিষ্টি কণ্ঠ : ‘আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।’ অদ্বিতীয় কণ্ঠ। সহজেই চিনতে পারলাম বাংলাদেশের রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা।

সেদিন শেক্সপিয়রের ওই জঙ্গলে জোছনা ছিল না, ঘন গাছপালায় আকাশই দেখা যাচ্ছিল না, জোছনা দেখব কোথায়? কিন্তু বাংলাদেশ থেকে হাজার হাজার মাইল দূরে সেই ঘন অন্ধকার জঙ্গলে বন্যার কণ্ঠে গান শুনে মনে হল, সমস্ত বনটা জোছনাময় হয়ে উঠেছে। পর পর আরও কয়েকটি গান। গানের সিডি বন্ধ হলে হোসেনের স্ত্রী গাইলেন ‘মধুর তোমার শেষ যে না পাই।’ আমি স্তব্ধ হয়ে গান শুনছি। মনে হয়েছিল, আমার চোখের সামনে রবীন্দ্রনাথ, শেক্সপিয়রের ইংল্যান্ড, বাংলাদেশ সব একাকার হয়ে গেছে।

আমি রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার গানের একজন ফ্যান বা ভক্ত দীর্ঘকাল ধরে। সেই তার প্রথম দিকের অ্যালবামে তার কণ্ঠে ‘অমলধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’ শুনি। তারপর তিনি যতবারই লন্ডনে এসেছেন, ততবারই তার গানের আসরে হাজির হয়েছি। অনুরোধ করে তার কণ্ঠে আমার পছন্দের রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনেছি। শুধু লন্ডনে নয়, সারা ইউরোপেই তার বহু ফ্যান। প্রতি বছর তিনি আমন্ত্রিত হয়ে আমেরিকা ও ইউরোপে আসেন। তিনি গান গাইবেন শুনলে ইউরোপের যে কোনো শহরে শ্রোতায় হল ভর্তি হয়ে যায়। লন্ডনেও তাই হয়।

লন্ডনে তার একটি ফ্যান-ক্লাবও তৈরি হয়েছে। আনুষ্ঠানিক কোনো ক্লাব নয়, ভক্তদের সংঘবদ্ধতা। বন্যা লন্ডনে এলেই তারা তার গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। এবার মে মাসের শুরুতেই শোনা গেল বন্যা আমেরিকায় গেছেন এবং বিভিন্ন শহরে গান গাইবেন। ঢাকায় ফেরার পথে একদিন লন্ডনে থাকবেন। তার লন্ডনে আসার আর মাত্র দু-তিনদিন বাকি। তবু লন্ডনে তার ফ্যান-ক্লাব সক্রিয় হয়ে উঠল। সবাই তার ছোটবোন উর্মি মাজাহারকে ধরলেন অনুষ্ঠানে গান গাইতে বন্যাকে রাজি করানোর জন্য।

অনুষ্ঠানটি করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিলেন শেখ মুজিব রিসার্চ সেন্টারের সাধারণ সম্পাদক মোহম্মদ আবদুল আজিজ এবং শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সোলেমান স্মৃতি সংসদের লোকমান হোসেন। নিজে মুক্তিযোদ্ধা এবং তার ছোট ভাই সোলেমান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। তার স্মৃতি সংরক্ষণে লন্ডনে গঠিত সংসদের ব্যানারেই বন্যার গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। লন্ডনে এমনিতে অনুষ্ঠান করার জন্য হল পাওয়া যায় না। ভাড়া অত্যন্ত বেশি। তার ওপর রমজান মাস। প্রতিদিনই ইফতার পার্টি লেগে থাকে।

হল কিছুতেই পাওয়া যায় না। শেষ পর্যন্ত লন্ডনের সিটি সেন্টার থেকে বহুদূরে এসেক্স মে ফেয়ার ভেন্যুর বাঙালি মালিক জনাব সেলিম শুধু হল দিতেই রাজি হলেন না, বন্যার নাম শুনে হলের ভাড়াও কমিয়ে দিলেন। কিন্তু প্রশ্ন উঠল, শহর থেকে এত দূরে রমজান মাসে দু-একদিনের নোটিশে শ্রোতা পাওয়া যাবে কিনা। তার ওপর বন্যা আমেরিকা থেকে লন্ডনে এসে পৌঁছবেন ৯ তারিখ দুপুর ১১টায়, সেদিনই সন্ধ্যায় লন্ডনের অনুষ্ঠানে দু’ঘণ্টা গান গাইতে পারবেন কিনা। পরদিন খুব সকালে তিনি আবার সুইডেনে রওনা হবেন।

এবারের মে মাসটাই যেন ছিল রবীন্দ্রময়। মে মাস রবীন্দ্রনাথের জন্ম জয়ন্তীর মাস। সারা বিশ্বে এই জয়ন্তী পালিত হয়। বাংলাদেশে হয় আরও ঘটা করে। বাংলাদেশে যেমন রয়েছে কয়েকটি রবীন্দ্রতীর্থ, (যেমন শিলাইদহ, পতিসর ইত্যাদি), তেমনি দেশটির স্বাধীনতাযুদ্ধে রবীন্দ্র সঙ্গীতের অবদান অতুলনীয়। বাঙালির সমগ্র জাতিসত্তায় রবীন্দ্রনাথ যেন মিশে আছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও রবীন্দ্রনাথের অনুরাগী।

তার সরকারের আমলেই তার উদ্যোগে বাংলাদেশে শান্তি নিকেতনের বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুকরণে একটি রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। তাছাড়া শান্তিনিকেতনে একটি বাংলাদেশ ভবন স্থাপন করা হয়েছে। তার উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে সঙ্গে নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও তাতে উপস্থিত ছিলেন। এই অনুষ্ঠানে রেজওয়ানা চৌধুরীও গিয়েছিলেন। শেখ হাসিনার আমন্ত্রণ। সমস্ত রাজনৈতিক বিবাদের ঊর্ধ্বে বাঙালির সাংস্কৃতিক জাতীয়তার বন্ধন যে অচ্ছেদ্য, শেখ হাসিনা এবার তা প্রমাণ করেছেন।

লন্ডনে ৯ মে’র অনুষ্ঠানটিও ছিল সকলকে চমক দেয়ার মতো। বন্যা দীর্ঘ প্লেন জার্নির পরেও লন্ডনের অনুষ্ঠানে একা দু’ঘণ্টার ওপর শ্রোতাদের গান শোনান। তাদের অনুরোধের গান। গানের মাঝে মাঝে রবীন্দ্র সঙ্গীতের নানা টুকিটাকি, অনেক অজানা কথা শ্রোতাদের জানান। মঞ্চে তাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান দু’জন বিশিষ্ট কমিউনিটি নেতা সাইফ খান ও মোহাম্মদ মুজিব। অনুষ্ঠানে ছিলেন বাংলাদেশের হাইকমিশনার নাজমুল কাওনাইনও। মিউজিকে লন্ডনের এই ফাউন্ডেশনের তন্ময়, রবিন ও স্যান্ডিমান অসাধারণ কৃতিত্ব দেখিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার জীবদ্দশাতেই লিখেছিলেন, ‘হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বি …’। সেই হিংসা, বিবাদ ও সংঘাত এখন আরও বেড়েছে। উপমহাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু সেই হিংসা-বিদ্বেষের মাঝেও বাংলাদেশ শান্তি ও সম্প্রীতির নীল বাতি জ্বালিয়েছে। শান্তিনিকেতনে শেখ হাসিনার উদ্যোগে এবার সত্যিই শান্তির ত্রিবেণী সঙ্গমের সূচনা হল। লন্ডনে ৯ মে’র অনুষ্ঠানেও তার প্রতিফলন দেখেছি। মাত্র দু’দিনের ডাকে পাঁচশ’ শ্রোতা ছুটে এসেছিলেন অনুষ্ঠানে। লন্ডনের দূরদূরান্ত থেকেও। অনুষ্ঠান শেষে রবীন্দ্রনাথের সেই গানটির কথাই বারবার মনে পড়ছিল, ‘সম্মুখে শান্তি পারাবার’।

লন্ডন, ১০ জুন, রবিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment