কালের আয়নায়

গাজীপুরে আ’লীগ গাজি হয়েছে, কিন্তু তারপর?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

গাজীপুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ গাজি হয়েছে। কিছুকাল আগেও ভয় ছিল, গাজীপুরে আওয়ামী লীগ গাজি হতে নাও পারে। সেই ভয় আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংগঠিত করেছে, সক্রিয় করেছে। তার ফলে গাজীপুর সিটি করপোরেশনে বিপুল জয় আওয়ামী লীগ ছিনিয়ে আনতে পেরেছে। এই নির্বাচনের আগে আমি লিখেছিলাম, এর ফলাফলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রতিভাত হবে। বাংলাদেশে একটি সাধারণ নির্বাচনের আর মাত্র পাঁচ মাস বাকি। তারপর সামনেই রয়েছে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচন। গাজীপুরের নির্বাচনই আভাস দেবে, দেশ কোন পথে এগোবে? গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ধারাবাহিকতার দিকে, না সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী অন্ধকারের দিকে? গাজীপুরের মানুষ প্রমাণ দিয়েছে, তারা বিএনপি-জামায়াতের অর্ধতালেবানি শাসনে ফিরে যেতে চায় না।

বাংলাদেশের জন্য এখন এটা একটি ভয়ানক ক্রান্তিকাল। এই ক্রান্তিকালের নির্বাচনগুলোই আভাস দেবে, দেশ স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের লক্ষ্যপথে অটল থেকে এই সংকট পার হতে পারবে কিনা। গাজীপুরে নির্বাচনের ফল প্রমাণ দিয়েছে, তারা তা পারবে। গাজীপুরের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয়ী হওয়া অত্যন্ত জরুরি ছিল। আওয়ামী লীগ সেই জয় পেয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের উচিত, এই জয়কে সংহত করা এবং আরও তিনটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নিজেদের জয়কে নিশ্চিত করা। তাহলে আগামী ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনেও এই জয় নিশ্চিত হবে।

পাকিস্তান আমলে ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনের সময় বঙ্গবন্ধু তার দলের নেতাকর্মীদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘স্বৈরাচারীদের সঙ্গে আন্দোলন ও সংগ্রামে আমাদের সাধারণ নেতাকর্মীরা বারবার শহীদ হন। এবার আমাদের গাজি হতে হবেই। নইলে বাংলার মানুষকে রক্ষা করা যাবে না।’ বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে আওয়ামী লীগ ‘৭০-এর নির্বাচন এবং ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে গাজি হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল ও প্রতিবিপ্লবী শক্তি পরাজিত হয়েছিল।

বর্তমান সময়েও স্বাধীন বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে, তারা চরিত্রে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো গণতান্ত্রিক ধারা নয়। তারা একাত্তরের স্বাধীনতা বিরোধী শিবিরের পরবর্তী প্রজন্মের ধারা। এই অশুভ ধারার বিরুদ্ধে বর্তমানের সব নির্বাচনী যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে অবশ্যই জয়ী হতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি নির্বাচনে জেতে, সেটা মূলত হয় দলের জয়। কিন্তু যদি হারে তাহলে সেটা হয় গোটা গণতান্ত্রিক বাংলার পরাজয়। এ জন্য শুধু গাজীপুরের নির্বাচনে নয়, সামনের তিনটি সিটি করপোরেশন ও সর্বোপরি ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জয় অর্জন করতে হবে। ‘৭০-এর নির্বাচনের মতো আওয়ামী লীগকে গাজি হতে হবে।

বিএনপি যথারীতি তার চিরাচরিত স্বভাব অনুযায়ী গাজীপুর নির্বাচনেও কারচুপি হয়েছে অভিযোগ তুলে এই নির্বাচন বাতিলের দাবি তুলেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থী জাহাঙ্গীর আলম যেখানে ভোট পেয়েছেন চার লাখের মতো, বিএনপি প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকারের সঙ্গে যার ভোটের ব্যবধান দুই লাখের ওপর, সেখানে ব্যাপকহারে জাল ভোট দেওয়ার প্রয়োজন অথবা সুযোগ আছে কি? জয়ী ও পরাজিত প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ৪০-৫০ হাজার হলেও মনে করা যেত, ৫০ হাজার জাল ভোট তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু দুই লাখ বা আড়াই লাখ জাল ভোট তৈরি করা বা তা ব্যবহার করার কোনো সুযোগ আছে কি?

ভোটকেন্দ্রে কি বিএনপির পোলিং এজেন্টরা ছিলেন না অথবা বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা? এ যুগে এত সতর্কতা ব্যর্থ করে ভোটবাক্সে লাখ লাখ জাল ভোটপত্র ঢোকানো সম্ভব কি? তথাপি গাজীপুর নির্বাচনে কয়েকটি কেন্দ্রে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং ৯টি কেন্দ্রে ভোট আবার নেওয়া হবে। কিন্তু তা জাহাঙ্গীর আলমের বিরাট জয়ে কোনো রদবদল ঘটাবে না। তাকে গাজীপুরের নির্বাচিত মেয়র হিসেবে ধরে নেওয়া হয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী এই যুবকের জয়লাভে গাজীপুরের মানুষ আনন্দিত। তিনি গাজীপুরের মানুষকে একটি আধুনিক শহর উপহার দেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

গাজীপুরের নির্বাচনে ছোটখাটো অনিয়ম যে হয়নি, তা নয়। কোনো কোনো কেন্দ্রে এই জাল ভোট পড়েছে। দু’পক্ষই তা করেছে। এ ধরনের ছোটখাটো অনিয়ম উপমহাদেশের যে কোনো নির্বাচন ও উপনির্বাচনেও দেখা যায়। তবে তা বিএনপির আমলে মাগুরা উপনির্বাচনের মতো ব্যাপক হয়নি। মাগুরা উপনির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে বিএনপি সমর্থকদের রক্তাক্ত তাণ্ডবে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে পর্যন্ত মাগুরা থেকে পালাতে হয়েছিল।

গাজীপুর থেকে আমার এক বন্ধু জানিয়েছেন, গাজীপুরের এই নির্বাচনে কিছু জাল ভোট অবশ্যই ভোটবাক্সে পড়েছে। তার সংখ্যা খুবই কম এবং তা নির্বাচনের ফলকে প্রভাবিত করেনি। এই জাল ভোট প্রদানের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। বন্ধুর কথা শুনে একটি পুরনো ঘটনা মনে পড়ছে। সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর উপরাষ্ট্রপতি জাস্টিস সাত্তারকে রাষ্ট্রপতি পদে বসানো হয়। ‘৭২-এর সংবিধানে উপরাষ্ট্রপতি পদটি ছিল না। জাস্টিস সাত্তার প্রথমে হন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি। অতঃপর এই পদে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা হয়। প্রত্যক্ষ ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন।

এই নির্বাচনে বিএনপির পক্ষ থেকে দাঁড়ান জাস্টিস আবদুস সাত্তার এবং আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ান ড. কামাল হোসেন। জাস্টিস সাত্তারের কাছে ড. কামাল হোসেন বিপুল ভোটে পরাজিত হন। লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকা এ সম্পর্কে যে রিপোর্ট প্রকাশ করেছিল, সেই রিপোর্টের কথা এখন মনে পড়েছে। গার্ডিয়ানে বলা হয়েছিল, ‘জাস্টিস সাত্তার ও ড. কামাল হোসেনের মধ্যে রাষ্ট্রপতি পদে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার সময় ভোট গণনার প্রথম দিকে না হলেও শেষ দিকে এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল যে, জাস্টিস সাত্তার বহু ভোটে জয়ী হবেন। এ ক্ষেত্রে জাস্টিস সাত্তারের দলের (বিএনপি) তার পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার কোনো দরকার ছিল না। জাস্টিস সাত্তার এমনিতেই জয়ী হতেন। দলের কিছু লোক তার পক্ষে জাল ভোট দিয়ে বরং দলের দুর্নাম কুড়িয়েছে।

বর্তমানে গাজীপুর থেকে যেসব খবর পেয়েছি তাতে মনে হয়, আওয়ামী লীগ, যুবলীগের কিছু অতি উৎসাহী সমর্থক তাদের প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট দেওয়ার সুযোগ গ্রহণ করেছেন। তা ব্যাপক কিছু নয় এবং তা দেওয়ার কোনো দরকারও ছিল না। দিয়ে তারা দলের দুর্নাম কুড়িয়েছেন। জাহাঙ্গীর আলমের বিজয় স্বাভাবিক ও তিনি তারুণ্যের প্রভাব এবং জনপ্রিয়তার জোরেই জিতেছেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির হাসান উদ্দিন সরকার ৭০ বছর বয়সের বৃদ্ধ এবং অতীতে একাধিকবার দলবদল করেছেন; মেয়র, এমপি ইত্যাদি পদে বহুদিন ছিলেন এবং তার রাজনৈতিক অতীত বিতর্কিত। এদিক থেকে জাহাঙ্গীর আলম ৩৯ বছরের তরুণ। এই প্রথম মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেন এবং তার রাজনৈতিক অতীত স্বচ্ছ। স্বাভাবিকভাবেই গাজীপুরের মানুষ তরুণ ও বৃদ্ধের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তরুণকেই বেছে নিয়েছে।

বিএনপির নেতারা এখন মুখে যা-ই বলুন, নির্বাচনের আগেই তারা টের পেয়েছিলেন, তাদের পরাজয় অনিবার্য। নইলে নির্বাচনের আগেই তারা এমন হিংসাত্মক ভাষায় কথা বলতেন না। প্রার্থী হাসান উদ্দিন সরকার নির্বাচনের দু’দিন আগে হুমকি দিয়েছিলেন, ‘নির্বাচনে তার সমর্থকদের হয়রানি করা বন্ধ না হলে তিনি এমন কাণ্ড ঘটাবেন, যাতে বিশ্ববাসী স্তম্বিত হয়ে যাবে।’ হয়তো প্রকারান্তরে তিনি বলতে চেয়েছেন, নির্বাচনে পরাজয় তিনি মেনে নেবেন না। পরাজিত হলে তিনি প্রলয় কাণ্ড ঘটাবেন। তার দলের নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ দিয়েছিলেন আরও বড় হুমকি। বলেছিলেন, ‘খুলনার কায়দায় গাজীপুরে নির্বাচন করা হলে তার ভয়াবহ পরিণতি ঘটবে।’

নির্বাচন হয়ে গেছে। বিএনপি প্রার্থী পরাজিত হয়েছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশে বিশ্ব-ত্রাস সৃষ্টির কোনো ঘটনা বা মওদুদ কথিত ভয়াবহ কোনো পরিণতি ঘটেনি। এ জন্যই সেই প্রবাদটি সত্য মনে হয়, ‘শূন্য কলস বেশি বাজে’। কলসটি জলে ভর্তি থাকলে অর্থাৎ বিএনপির এই হুমকির পেছনে জনসমর্থন থাকলে, নির্বাচনের পর গাজীপুরের রাজপথে আজ অন্য দৃশ্য দেখা যেত। সদ্য গৃহহারা মওদুদ সাহেবকে রাজনৈতিক এতিমের বেশে দেখা যেত না।

মওদুদের আরেকটি হুমকি, গাজীপুরের নির্বাচন-ফল দেখে তারা ঠিক করবেন, পরবর্তী বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তারা যাবেন কিনা। যার অর্থ দাঁড়ায়, তারা যাবেন না। এই হুমকিও অসার প্রমাণিত হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত যে খবর পাওয়া গেছে, তাতে বিএনপির এই তিনটি নির্বাচনে অংশ গ্রহণেরই আভাস পাওয়া যায়। তারা না গিয়ে কী করবে? রাজপথে তারা আন্দোলন করবে। সেই শক্তি তাদের নেই। এরপর নির্বাচনেও না গেলে বিএনপির সাধারণ নেতাকর্মীদের কোনো কাজকর্মই থাকবে না। তাহলে বিএনপিতে সংকট ও ভাঙন দেখা দেবে। এই সংকট ও ভাঙন রোধের জন্যই তাদের সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে যেতে হবে। এমনকি জাতীয় সংসদের নির্বাচনেও। দলের নেত্রী নির্বাচনের সময় জেলের ভেতরে, না বাইরে থাকবেন, সেই ইস্যুটিও মওদুদ, ফখরুল, রিজভী সাহেবরা অদূর ভবিষ্যতে আর তুলবেন না। এই ভবিষ্যদ্বাণী আমি করে রাখছি।

গাজীপুরের জয়ে আওয়ামী লীগ গা ভাসিয়ে দিলে ভুল করবে। সামনে বরিশাল, সিলেট ও রাজশাহীর নির্বাচন। সিলেট ও রাজশাহীতে বিএনপি-জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি রয়েছে। গাজীপুরের জয়কে তাই সংহত করে দলকে আর তিন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে এবং সর্বোপরি ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের জন্য শক্ত প্রস্তুতি নিতে হবে। আওয়ামী লীগ যত বড় দল হোক তাতে প্রচুর আগাছা জন্মেছে। দলের আদর্শের প্রতি অনুগত নয়, বরং বিরোধী এমন বহিরাগতদের সংখ্যা আওয়ামী লীগে শঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। অনেক মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, উপজেলা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষকে উৎপীড়নের এমন অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, যা বিএনপি আমলকেও ছাড়িয়ে গেছে। হাসিনা-নেতৃত্বের সব ভালো কাজ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নকে এরা ম্লান করে দিচ্ছে।

আওয়ামী লীগের কোনো কোনো মন্ত্রী, এমপি, নেতা ও উপনেতার সন্তানদের দাপট সব সীমা ছাড়িয়েছে। এখন আওয়ামী লীগের অবস্থা যা দাঁড়িয়েছে, তাতে বিএনপি বা জামায়াত দলটির বড় শত্রু নয়; বড় শত্রু আওয়ামী লীগই। নির্বাচনে বহু স্থানে বহুবার আওয়ামী লীগকে পরাস্ত করেছে আওয়ামী লীগই। একাধিক বিদ্রোহী প্রার্থী দলের মূল প্রার্থীর ভোট কেটেছে। জয়ী হয়েছে বিএনপি বা জামায়াত প্রার্থী। আগামী সাধারণ নির্বাচনে এই অবস্থার প্রতিকারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা কি দলের হাইকমান্ড উদ্ভাবন করতে পারবে?

দেশের রাজনীতির বাস্তবতার কারণে আওয়ামী লীগ মৌলবাদী গ্রুপের একটিকে তাদের সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করেছে। গাজীপুরসহ দেশের পৌরসভা, সিটি করপোরেশনগুলোর নির্বাচনে এদের ভূমিকা কী? এরা পেটের ভেতর ঢুকে ছুরি না মারে! ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে গঠিত জোটে জামায়াতকে গ্রহণ না করা সত্ত্বেও তারা নিজেরাই এই জোটের সহায়ক শক্তির ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। কিন্তু নির্বাচনের সময় এই দলের তৎকালীন আমির গোলাম আযমের কিছু গোপন চিঠি ধরা পড়ে। তাতে তিনি দলের নেতাকর্মীদের বিএনপিকে ভোট দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। তখন দেশে আওয়ামী লীগের পক্ষে জনজোয়ার দেখা দেওয়ায় জামায়াতের এই শঠতা ও ষড়যন্ত্র সফল হয়নি। আসন্ন সাধারণ নির্বাচনেও যাতে আওয়ামী লীগের বর্তমান মৌলবাদী সহায়ক শক্তি অনুরূপ ভূমিকা গ্রহণ না করে অথবা গ্রহণ করতে না পারে, সেদিকে দলের হাইকমান্ডকে কঠোর দৃষ্টি রাখতে হবে।

আওয়ামী লীগকে আগামী সাধারণ নির্বাচনে আরও একটি শক্তির মোকাবেলা করতে হবে। দেশের একশ্রেণির বিগ এনজিও, নব্য ধনী ও তাদের অনুগৃহীত সুশীল সমাজটির দ্বারা এই শক্তি গঠিত হচ্ছে। ২০০১ সালের সাধারণ নির্বাচনের সময় এরা সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি। কিন্তু তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি লতিফুর রহমানের কাঁধে কৌশলে ভর করে পশ্চিমা কূটনীতিকদের টুয়েসডে ক্লাবের সহায়তায় বাংলাদেশে অঘটন ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল। আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতাচ্যুত হয়নি। দেশময় হত্যা, নির্যাতনের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল।

এবার এই একই চক্র নির্বাচন সামনে নিয়ে রাজনৈতিকভাবে সংঘবদ্ধ হওয়া এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মোর্চা গঠনের চেষ্টা করছে। ২০০১ সালে তারা বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতা দখলে সাহায্য করেছে। এবার নিজেরা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে। না পারলে বিএনপির নেতৃত্বে গঠিত খুবই দুর্বল ২০ দলীয় মোর্চার বি-টিম হিসেবে ভূমিকা নিয়ে ওই মোর্চার দুর্বল শরীরে ভিটামিন জোগানোর ব্যবস্থা করবে। এই মোর্চার মুখপত্র একটি ইংরেজি ও বাংলা দৈনিকের বর্তমান সূক্ষ্ম প্রচারণা দেখেও এই চক্রান্ত সম্পর্কে আঁচ করা যায়। এটা হবে নতুন বোতলে পুরনো মদ ঢোকানোর মতো ব্যবস্থা। মোর্চা নতুন। কিন্তু নেতৃত্ব সেই ড. ইউনূস, ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীদের হাতেই। একই সঙ্গে ভাঙা মৌলবাদী শিবির থেকে ইসলামী ঐক্য ফ্রন্ট নামে বিএনপির আরেকটি সি-টিম যদি গঠিত হয়, তাহলেও বিস্মিত হওয়ার কিছু থাকবে না।

আওয়ামী লীগের মহাজোটকে এবার তাই এক বা দু’ফ্রন্টে নয়, চার ফ্রন্টে যুদ্ধ করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি দলকে ‘কাউয়ার গোষ্ঠীর’ কবল থেকে উদ্ধার করতে পারে, নীতি ও আদর্শের প্রশ্নে অনড় থাকতে পারে, দলীয় ঐক্য অটুট রাখতে পারে, তাহলে এই দৈত্যকুলকে তার ভয় করার কিছু নেই। এই মুহূর্তে দেশে হাসিনা-নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেস বা তার নেত্রী মমতা ব্যানার্জির অনেক কাজ ও নীতির সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি না। কিন্তু একটা ব্যাপারে তার সাহসের প্রশংসা করি। একদিকে তিনি মাথার ওপরে মোদি সরকারের মতো শক্তিশালী কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে লড়ছেন; অন্যদিকে এক হাতেই দশ-বারোটি শক্তিশালী বাম দলের সমন্বয়ে গঠিত বাম ফ্রন্টের সঙ্গে লড়াই চালাচ্ছেন এবং এখনও ক্ষমতায় টিকে আছেন। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনেও তার দল জিতেছে।

মমতা ব্যানার্জি তো নিজের দক্ষতায় সর্বভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে উঠে এসেছেন। সে ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা উঠে এসেছেন সর্বএশীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বে। আওয়ামী লীগ তৃণমূল কংগ্রেসের চেয়েও বড় এবং প্রাচীন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। মৃত্তিকায় তার শক্ত অবস্থান। এই অবস্থায় সংগঠনটি যদি সব দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে রাজনীতিতে আবার ঘুরে দাঁড়ায় এবং তার গণঐক্যের পুরনো ভিত্তিটি আবার তৈরি করতে পারে, তাহলে আগামী নির্বাচনে তার একশ’টা শত্রুকেও ভয় করার কিছু নেই। ২০১৮ সালের নির্বাচনে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে। কারণ, দুই নির্বাচনের মূল লক্ষ্যটা তো একই। স্বাধীনতার শত্রু, হিংস্র মৌলবাদ ও গণশত্রুদের দেশের মাটিতেই পরাজিত করা। এই যুদ্ধে আওয়ামী লীগকে জয়ী হতে হবেই।

লন্ডন, ২৯ জুন শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment