দশ দিগন্তে

ড. ইউনূস এত দীর্ঘকাল পর মুখ খুললেন কেন?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সিগমন্ড ফ্রয়েডের মতে মানুষ দীর্ঘকাল আগেও যদি কোনো অপরাধ করে তার গ্লানিবোধ থেকে তারা মুক্ত হতে পারে না। এই গ্লানি থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য তারা দুটি কাজ করে। সৎ ও সাহসী লোক হলে অপরাধ স্বীকার করে গ্লানিমুক্ত হন। যেমন করেছিলেন জার্মানির বিখ্যাত মনীষী গুন্টার গ্রাস। প্রাক যৌবনে না জেনে তিনি যে হিটলারের যুব সংঘের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন, সেকথা অকপটে স্বীকার করেছেন। আবার এমন লোক আছেন যারা নিজেদের অতীতের অপরাধ অস্বীকার করে নিজেকে সাধু সাজাবার চেষ্টা করেন। মনে করেন সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি দুর্বল। সময়ের ব্যবধানে তারা তার অপরাধের কথা ভুলে গেছে। এই শ্রেণির ব্যক্তিরা সৎ নয় এবং সাহসীও নয়।

সম্প্রতি লন্ডনের একটি বাংলা সাপ্তাহিকে বাংলাদেশের পাঁচজন পরিচিত মানুষের হাস্যোজ্জ্বল মুখের ছবি দেখে আমি একটু কৌতূহলী হয়েছি। এই পাঁচজনের মধ্যে চারজন হলেন যথাক্রমে ড. ইউনূস, ড. কামাল হোসেন, মতিয়ুর রহমান (প্রথম আলো), মাহফুজ আনাম (ডেইলি স্টার), পঞ্চম ছবিটি অস্পষ্টতার জন্য চিনতে পারিনি। (ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের কি?) এরা সকলেই এক-এগারোর কুশীলব।

কৌতূহলী হলাম হঠাৎ কাগজে তাদের ছবি কেন? কাগজের ভাঁজ খুলতেই বুঝলাম, ওয়ান ইলেভেন বা এক-এগারো নিয়ে লেখার সঙ্গে ছবিগুলো ছাপা হয়েছে। ঠিক লেখা নয় ঢাকার বিভিন্ন কাগজে ই-মেইলে পাঠানো ড. ইউনূসের বক্তব্য। এক-এগারোর পেছনে তার ভূমিকা সম্পর্কে তিনি গুন্টার গ্রাসের মতো সততা ও সাহস দেখাননি, বরং এই ভূমিকা অস্বীকার করেছেন এবং এ সম্পর্কে জেনারেল মইন এবং ব্রিগেডিয়ার বারীর অভিন্ন বক্তব্যকেও অসত্য ও কল্পনাপ্রসূত বলে দাবি করেছেন। অর্থাৎ দু’ব্যক্তির দু’জনেই মিথ্যা কথা বলেছেন এবং তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি সত্য কথা বলছেন।

ভালো কথা। এক এগারো ঘটেছে দীর্ঘকাল আগে। এই দীর্ঘকাল ধরেই মানুষ জানে, ড. ইউনূস এই এক এগারোর একজন কুশীলব। তারই এক এগারোর সরকারের প্রধান ব্যক্তি হওয়ার কথা ছিল। তিনি ভিন্ন বিবেচনায় হননি। বিবেচনাটি কী ছিল, তাও অনেকের জানা। বাজারে প্রচলিত ও আলোচিত এই জানা কথা নিয়ে এতকাল পর ড. ইউনূস বিচলিত হলেন কেন? এটা কি বিবেকের দংশন, না, ‘পিপলস মেমোরি ইজ ভেরি শর্ট’ এই প্রবাদটিকে সত্য মনে করে নিজেকে অপরাধমুক্ত করার চতুর চেষ্টা?

লন্ডনের সাপ্তাহিকে ঢাকার কাগজ থেকেই ড. ইউনূসের বক্তব্য পুনর্মুদ্রণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে এক এগারোর আরও চার কুশীলবের ছবিও ছাপা হয়েছে। এক এগারো এখন বাসী ঘটনা। তারপর দীর্ঘ এগারো বারো বছর কেটে গেছে। এই দীর্ঘকাল পঞ্চ রত্নের একজনও মুখ খোলেননি। হঠাৎ তাদের একজন শিরোমণি মুখ খুললেন কেন? দেশে একটি সাধারণ নির্বাচন সামনে নিয়ে ড. ইউনূসের হঠাৎ সাধু সাজার চেষ্টা কেন? এর ভেতরেও কোনো রহস্য আছে কি? সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত কোনো ব্যক্তির মনে এই সন্দেহটি জাগলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে কি?

আমি ড. ইউনূসের গোটা বক্তব্যটি উদ্ধৃত করতে চাই না। কারণ, তার বক্তব্য নিজের অপরাধ ঢাকার জন্য নিজের পক্ষে দীর্ঘ সাফাই গাওয়া এবং দু’জন সেনাপ্রধানকে মিথ্যাবাদী বানানোর চেষ্টা। ক্ষমতা ছাড়ার পর এই দু’জন সেনাপতির ড. ইউনূস সম্পর্কে মিথ্যা বলার প্রয়োজন এবং লাভটা কী? দুই সেনা কর্মকর্তাই তাদের ভিন্ন ভিন্ন সাক্ষাত্কারে একই কথা বলেছেন। ড. ইউনূস দীর্ঘকাল পর একা বলছেন ভিন্ন কথা। মানুষ কার কথা বিশ্বাসযোগ্য মনে করবে? অধিকাংশ মানুষ হয়ত বিশ্বাস করবে, দু’জন প্রাক্তন সেনাকর্তা মিথ্যা উক্তি করেননি। ড. ইউনূসই এতকাল পর বিশেষ উদ্দেশ্যে সত্যের বিকৃতি ঘটাচ্ছেন।

জেনারেল মঈন ও ব্রিগেডিয়ার বারী দু’জনেই তাদের সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘ড. ইউনূসকে কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলে এই সরকার দুই বছরের মেয়াদে সীমাবদ্ধ থাকবে জেনে তিনি এত সীমিত সময়ের জন্য দায়িত্ব নিতে রাজি হননি।’ ড. ইউনূস এটার সত্যতা অস্বীকার করেছেন। কিন্তু কেন অস্বীকার করছেন তার কোনো কারণ দর্শাননি। এটা কি ক্ষমতার প্রতি অনীহা? ক্ষমতার প্রতি অনীহা থাকলে তিনি এক এগারোর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও সমর্থন নিয়ে দেশে রাজনীতি যখন নিষিদ্ধ তখন নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেছিলেন কেন?

আমি কি এই প্রশ্নটির জবাব দিতে পারি? যদি ভুল হয়, ড. ইউনূস নিজগুণে আমাকে মার্জনা করবেন এবং ভুলটি সংশোধন করে দেবেন। ড. ইউনূস অসম্ভব ক্ষমতালোভী মানুষ। তিনি একক কর্তৃত্ব ছাড়া কিছু বোঝেন না, গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রেও তার এই একক কর্তৃত্ব পরায়ণতা দেখা গেছে। তিনি মাত্র দু’বছরের জন্য একটি কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের ক্ষমতাহীন প্রধান হতে চাননি। সেকথাই তিনি দুই সেনা কর্মকর্তার কাছে বলেছেন। কিন্তু মনের আসল উদ্দেশ্যটি বলেননি; যা নিজের কোনো কোনো বিশ্বস্ত সহকর্মীর কাছে বলেছেন।

এই আসল উদ্দেশ্যটি হলো, দীর্ঘকালের জন্য প্রকৃত ক্ষমতা দখল। কেয়ার টেকার গভার্নমেন্টের প্রধান হিসেবে তাকে যে সেনাপ্রধানদের নির্দেশে চলতে হবে এটা তিনি জানতেন। তাই অন্যের অধীনে চাকরি করার পরিবর্তে সেনা প্রধানদের সহায়তায় একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা ড. কামাল হোসেনের থিয়োরি অনুযায়ী অনির্বাচিত গুড গভার্নমেন্ট গঠন করে দীর্ঘকালের জন্য ক্ষমতায় বসতে চেয়েছেন। এক এগারোর সময় দেশে রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ ছিল। সুতরাং তিনি ফাঁকা মাঠে সহজেই গোল দিতে পারবেন ভেবেছিলেন।

বাংলাদেশের সেনাপ্রধানেরাও তার অভিলাষ পূরণে সহায়তা দিয়েছেন। একদিকে ড. ইউনূসের পেছনে ছিল আমেরিকার প্রচণ্ড শক্তিশালী ক্লিনটন পরিবারের সমর্থন, অন্যদিকে সেনাকর্তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন কেয়ারটেকার গভার্নমেন্টের মেয়াদ শেষ হলে মার্কিন সমর্থনে ড. ইউনূস যে গভার্নমেন্ট গঠন করতে চান, তাতে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো থাকবে না। সেটা হবে মূলত অরাজনৈতিক সরকার।

এই ধরনের সরকারে সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ কর্তৃত্ব না থাকলেও অপ্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণ থাকে। সুতরাং এক এগারোর সরকারের মেয়াদ শেষে দেশে যাতে অরাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় বসে, সেই উদ্দেশ্যে মইন-বারী জুটি ড. ইউনূসকে দেশে রাজনৈতিক তত্পরতা নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও এককভাবে রাজনৈতিক তত্পরতা চালানোর সুযোগ দেন। অন্যদিকে ফেরদৌস কোরেশীর নেতৃত্বে হোন্ডা বাহিনী গঠন দ্বারা আরেকটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করানোর উদ্যোগ নেন। ফেরদৌস কোরেশীকে কারা হোন্ডাগুলো সাপ্লাই দিয়েছিল সেকথা কি মানুষের এখন অজানা?

ড. ইউনূস তার সাম্প্রতিক বক্তব্য দ্বারা বোঝাতে চেয়েছেন এক এগারোর সরকারের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। তাদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি যাননি এবং তাকে আমন্ত্রণ জানানোও হয়নি। কিন্তু এক এগারোর সরকার গঠনে তখনকার সেনা কর্মকর্তারা যে তার সমর্থন ও সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন এবং তিনি তাদের তা দিয়েছেন, সেকথা তার নিজের বক্তব্যেও পরিষ্কার।

ড. ইউনূস বলেছেন, “আমি তাদের কেয়ারটেকার গভার্নমেন্টের প্রধান হতে না চাইলে কাকে প্রধান করা যায় সে সম্পর্কে আমার পরামর্শ চান। আমি আমার কিছু বন্ধু এবং পরিচিত কয়েকজনের নাম বলি। এদের মধ্যে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. ফখরুদ্দীনের নামও ছিল।” ড. ইউনূস এটুকু বলেছেন, আমি তার মনের ইচ্ছার পরবর্তী অংশটুকু বলি? ভুল হলে তিনি আমাকে সংশোধন করে দেবেন।

সেনা কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ এবং ড. ইউনূসের পরামর্শে ড. ফখরুদ্দীন কেয়ারটেকার গভর্নমেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি বুঝতে পারেননি, ড. ইউনূসের মনের ইচ্ছা, তিনি হবেন, ড. ইউনূসের ক্ষমতা গ্রহণের আগে স্টপ গ্যাপ এরেঞ্জমেন্ট। এই সুযোগে নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সমর্থনে ও সহায়তায় নির্বাচনের মাধ্যমে অথবা সুশীল সমাজের সমর্থনে ড. ইউনূস ক্ষমতায় বসবেন। বন্ধু ফখরুদ্দীনকে তিনি মধ্যবর্তী সময়টুকুর জন্য নির্দয়ভাবে ব্যবহার করবেন।

ড. ফখরুদ্দীন আহমদ অত্যন্ত ভালো মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র থাকাকালে ছিলেন আমার ছোট ভাইয়ের মতো। পরবর্তীকালে আমি ওয়াশিংটনে গেলে সাহিত্যিক আবদুন নূরের বাসায় আমার আড্ডায় সারা রাত কাটাতেন। এই ভালো মানুষটি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ড. ইউনূসের চালাকি বুঝতে পারেননি। ছাগলের শিংয়ে পা রেখে জলে নিমজ্জিত সিংহ যেমন কুয়া থেকে উঠে আসতে চেয়েছে; ড. ইউনূসও তাই চেয়েছেন ড. ফখরুদ্দীনের বেলায়। এক এগারোর কর্তাদের সব পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। এখন ড. ইউনূসের বন্ধুত্বের বলি হয়ে ড. ফখরুদ্দীন এক এগারোর জন্য নিন্দিত এবং দেশ ছাড়া।

সবচাইতে বড় কথা, মইন-ফখরুদ্দীনেরা না হয় দেশের এক সংকটময় মুহূর্তে এক এগারোর বিতর্কিত সরকার গঠন করেছিলেন, কিন্তু তারা তো আর মাইনাস টু থিয়োরি তৈরি করেনি। এটাতো ব্রেনচাইল্ড আমাদের সুশীল সমাজের—বিশেষ করে পঞ্চরত্নের, যাদের ছবি লন্ডনের বাংলা সাপ্তাহিকে ছাপা হয়েছে। এই থিয়োরি তখনকার সেনা কর্মকর্তাদের গিলিয়ে তাদের দ্বারা এই থিয়োরি কার্যকর করতে গিয়ে দেশকে যে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সে সম্পর্কে ড. ইউনূসের আত্মসাফাই কী? ড. ইউনূস প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো তার এই আত্মসাফাইও টুইটারে দিলে ভালো করবেন। হিলারি ক্লিনটন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাংলাদেশে ছবির পঞ্চরত্নের সৌভাগ্য সূর্য আবার কিভাবে উদিত হতো সে সম্পর্কেও কিছু জানাবেন। – ইত্তেফাক

লন্ডন, ৩০ জুন, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment