স্পেন ও ডেনমার্কের বিদায়

অনলাইন ডেস্ক –

বিশ্বকাপের শুরু থেকেই এবার অঘটনের ঘনঘটা। একে একে নিভছে দীপ। জার্মানি গেল, আর্জেন্টিনা, পর্তুগাল বিদায় নিল। এবার বৃষ্টিভেজা ম্যাচে টাইব্রেকারে হেরে স্পেনের অশ্রুভেজা বিদায়। রোববার মস্কোর লুঝনিকি স্টেডিয়ামে সর্বশেষ অঘটনটি দারুণ এক উৎসবের উপলক্ষ এনে দিল স্বাগতিক দেশ রাশিয়াকে। স্পেনের মতো টাইব্রেকার দুর্ভাগ্যের শিকার হয়ে বিদায় নিতে হয় ডেনমার্ককেও। দু’ইউরোপিয়ানের লড়াইয়ে ক্রোটরা টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে ডেনিশদের হারিয়ে উল্লাসে মাতোয়ারা হয়। নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র ছিল।

ফেভারিট তত্ত্বকে আরও একবার ভুল প্রমাণ করে অভাবনীয়ভাবে ২০১০ সালের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেনকে টাইব্রেকারে ৪-৩ গোলে হারিয়ে রাশিয়া চলে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। ১২০ মিনিট রক্ষণাত্মক খেলে স্পেনকে ১-১ গোলে আটকে রাখার পর টাইব্রেকারের ভাগ্যের খেলায় বাজিমাত করে স্বাগতিকরা। গত দুই বছরে টানা ২৩ ম্যাচে অপরাজিত থেকেও বিশ্বকাপ থেকে শূন্যহাতে ফিরতে হল স্পেনকে। অর্থহীন পাসের মালা গেথে ৭৯ শতাংশ সময় বল দখলে রেখেও হতাশার পোস্টার হতে হল রামোস, ইনিয়েস্তাদের।

শেষ ষোলোর প্রথম দুটি ম্যাচের ফয়সালা নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু রোববার স্পেন ও স্বাগতিক রাশিয়ার লড়াই নির্ধারিত সময়ে অমীমাংসিত থাকে ১-১ গোলে। এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম অতিরিক্ত সময়ে গড়ায় কোনো ম্যাচ। অতিরিক্ত সময়েও আর গোল না হওয়ায় ২০১৮ বিশ্বকাপ দেখল প্রথম টাইব্রেকার। সেখানে কপাল পোড়ে স্পেনের। টাইব্রেকারে রাশিয়ার পক্ষে লক্ষ্যভেদ করেন স্মোলভ, ইগানাশেভিচ, গোলোভিন ও চেরিশেভ। অন্যদিকে স্পেনের ইনিয়েস্তা, পিকে ও রামোস লক্ষ্যভেদ করতে পারলেও কোকে ও আসপাসের শট রুখে দেন রুশ গোলকিপার আকিনফিয়েভ। তার বীরত্বেই সোভিয়েত ইউনিয়ন পরবর্তী যুগে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ আটে পা রাখল রাশিয়া। ভরা লুঝনিকি সাক্ষী হল নতুন রুশ বিপ্লবের।

ধারে-ভারে তারা যে রাশিয়ার চেয়ে যোজন যোজন এগিয়ে, সেটি প্রমাণ করতে পারেনি স্পেন। সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের চোখে চোখ রেখেই লড়েছে স্বাগতিকরা। প্রথমার্ধ শেষ হয় ১-১ সমতায়। আত্মঘাতী গোলে ম্যাচের শুরুতেই এগিয়ে গিয়েছিল স্পেন। কিন্তু ধরে রাখতে পারেনি লিড। বিরতির ঠিক আগে পেনাল্টি থেকে ম্যাচে সমতা ফেরায় রাশিয়া। গ্রুপ পর্ব থেকেই এবার স্পেনের খেলার ধরন ও দর্শন বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। বল পজেশনে অনেক এগিয়ে থেকেও গোলের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি করতে না পারায় স্পেনের তিকিতাকা ফুটবল অনেকের কাছেই এখন বিরক্তিকর। কালও সেই একই ছবি। প্রথমার্ধে ৭৫ ভাগ সময় বল ছিল লা রোহাদের দখলে। রাশিয়ার মাত্র ১৪৪ পাসের বিপরীতে ৪৩৮টি পাস স্পেনের। কিন্তু অর্থহীন পাসের মালা গেথে কাজের কাজ কিছুই হয়নি। লক্ষ্যে ছিল মাত্র দুটি শট। দিয়েগো কস্তার একটি আক্রমণ বাদ দিলে প্রথমার্ধে সত্যিকার অর্থে কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি রুশ গোলকিপার ইগর আকিনফিয়েভকে। ম্যাচের ১২ মিনিটে ভাগ্যের ছোঁয়ায় এগিয়ে যায় স্পেন। ডানদিক থেকে মার্কো আসেনসিওর ফ্রিকিক যেন সের্গিও রামোসকে খুঁজে না পায় সেই চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন সের্গেই ইগনাশেভিচ। রামোসকে নিয়ে মাটিতে পড়ার সময় অভিজ্ঞ এই ডিফেন্ডারের পায়ে লেগে জালে জড়ায় বল। কিছুই করার ছিল না আকিনফিভের। এবারের বিশ্বকাপে এটি দশম আত্মঘাতী গোল। শুরুতে এগিয়ে গেলেও ম্যাচের লাগাম শক্তহাতে ধরে রাখতে পারেনি স্পেন। ৪১ মিনিটে সফল স্পটকিকে রাশিয়াকে সমতায় ফেরান আরতিয়ম জিউবা। হেড করতে লাফিয়ে ওঠা জেরার্ড পিকের হাতে বল লাগলে পেনাল্টির নির্দেশ দিয়েছিলেন রেফারি। ঠাণ্ডা মাথায় ডানদিক দিয়ে বল জালে পাঠান জিউবা। গোলকিপার ডেভিড ডি গিয়া ঝাঁপিয়েছিলেন উল্টো দিকে। বিরতির পর কার্যত রাশিয়ার অর্ধেই খেলা হয়েছে। কিন্তু রাশিয়ার ১১ জনই রক্ষণে নেমে আসায় বল নিয়ে বক্সেই ঢুকতে পারছিল না স্প্যানিশরা। ঘুমপাড়ানি ম্যাচের ৮৫ মিনিটে বলার মতো একটি সুযোগ পেয়েছিল স্পেন। বক্সের বাইরে থেকে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার বুদ্ধিদীপ্ত শট দারুণ দক্ষতায় ঝাঁপিয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন আকিনফিয়েভ। আসপাসের ফিরতি শটও পরাস্ত করতে পারেনি রুশ গোলকিপারকে। ৯০ মিনিটে রামোসও লক্ষ্যে রাখতে পারেননি হেড। সমতা না ভাঙায় শেষ পর্যন্ত ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। সেখানেও রাশিয়ার প্রতিরোধ ভাঙতে ব্যর্থ হওয়া স্পেন পরে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নিল শেষ ষোলো থেকেই। শেষটা রাঙাতে পারলেন না স্পেনের ২০১০ বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ম্যাচের পর পরেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে ‘না’ বলে দিলেন স্প্যানিশ এ মিডফিল্ডার। ২০০৬ সালে জাতীয় দলে ক্যারিয়ার শুরু করা এ ফুটবলার স্পেনের জার্সি গায়ে খেলেছেন ১৩১ ম্যাচ। বিশ্বকাপ ছাড়াও দুটি ইউরোতে দেশকে সোনালি ট্রফি এনে দেন ইনিয়েস্তা।

এদিকে নোভগোরদে ক্রোয়েশিয়া ও ডেনমার্কের মধ্যকার ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই ছিল উত্তেজনায় ঠাসা। ইউরোপের দুই পরাশক্তির লড়াই উপভোগ করেছেন দর্শক।

জর্গেনসেনের গোলে ম্যাচের প্রথম মিনিটে এগিয়ে যায় ডেনমার্ক। কিন্তু মিনিট তিনেক পরেই সেই গোল শোধ দিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে সমতায় ফেরান মানজুকিচ। পরাশক্তিইতো বটে। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচেই জিতে দ্বিতীয় রাউন্ডে আসে ক্রোয়েটরা। অন্যদিকে এক জয় ও দুই ড্রয়ে অপরাজিত থেকেই শেষ ষোলোয় নাম লেখায় ডেনমার্ক।

ম্যাচের শুরু থেকেই ছিল আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ। তবে গোলের দেখা পায় আগে ডেনমার্কই। ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৫৪ সেকেন্ড। ইয়োনাস কুনুডসেনের লম্বা থ্রোয়ে বল পান টমাস ডেলেনি। জটলার মধ্যে বল ঠেলে দেন ম্যাথিয়াস জর্গেনসেনকে। এ ডিফেন্ডারের গড়ানো শট ক্রোট গোলকিপার দানিয়েল সুবাসিচের পায়ে লেগে নিজেদের জালেই জড়িয়ে যায় (১-০)। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই সমতায় ফেরে ক্রোয়েশিয়া। ডি বক্সের মধ্যে ডিফেন্ডার আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেন বল বিপদমুক্ত করতে গিয়ে উল্টো গুলিয়ে ফেলেন। ক্রিস্টেনসেনের ক্লিয়ার করা বল নিজের মুখে লেগে বক্সের মধ্যেই থাকে। বল পান মারিও মানজুকিচ। গোল করতে এতটুকুও সময় নেননি যুভেন্তাসের এ ফরোয়ার্ড (১-১)। মাত্র তিন মিনিটেই দুই গোলের উৎসবে মাতোয়ারা হন নোভগোরদ স্টেডিয়ামের দর্শকরা। সমতায় থেকেই বিরতিতে যায় দল দুটি। সর্বশেষ চারটি বিশ্বকাপে প্রথমার্ধে সমতায় থাকা ম্যাচের দুটি করে জয় ও ড্র করেছে ডেনমার্ক। তবে এর মধ্যে ২০১০ সালে প্রথমার্ধে সমতায় থাকার পর নেদারল্যান্ডসের কাছে হেরেছিল ডেনিশরা। নির্ধারিত সময়ের ম্যাচ ১-১ গোলে ড্র থাকায় ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত ৩০ মিনিটে। ম্যাচ শেষ হওয়ার মিনিট চারেক আগে পেনাল্টি পেয়েও গোল করতে ব্যর্থ হয় ক্রোয়েশিয়া। লুকা মডরিচের শট রুখে দেন ডেনিস গোলকিপার ক্যাসপার। ফলে ম্যাচের নিষ্পত্তি হয় টাইব্রেকারেই।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment