থাইল্যান্ডে গুহায় আটকা ১৮ দিন

আরো ৪ কিশোর উদ্ধার : কোচসহ পাঁচ কিশোর উদ্ধারের অপেক্ষায়

অনলআইন ডেস্ক –

গতকাল উদ্ধারের পর চার শিশুকে হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। ছবি : এএফপি

থাইল্যান্ডবাসীর জন্য আরো একটি স্বস্তির দিন গেল। দেশটির উত্তরাঞ্চলে বন্যাপ্লাবিত থাম লুয়াং গুহা থেকে গতকাল সোমবার উদ্ধার অভিযানের দ্বিতীয় দিনে আটকে পড়া আরো চার কিশোরকে বের করে আনা হয়েছে। এ নিয়ে অন্ধকার গুহাটি থেকে গত দুই দিনে মোট আট কিশোরকে বের করে আনলেন ডুবুরিরা। এখন ভেতরে রয়েছে আর পাঁচজন। গতকাল স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়। উদ্ধারকৃত সব কিশোর শারীরিকভাবে ভালো আছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। আজ মঙ্গলবার সকালে তৃতীয় দিনের মতো অভিযান চালানো হবে। তবে গতকালের অভিযানের ব্যাপারে সরকারিভাবে কিছুই জানানো হয়নি।

থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই প্রদেশের মায়ে সাই জেলার থাম লুয়াং গুহায় গত ২৩ জুন আটকে পড়ে ‘ওয়াইল্ড বোর্স’ নামের একটি ফুটবল টিমের ১২ কিশোর সদস্য ও তাদের কোচ। আটকে পড়ার ১৬ দিনের মাথায় গত রবিবার শুরু হওয়া উদ্ধার অভিযানের প্রথম দিন চারজনকে উদ্ধার করা হয়। ওই দিনের অভিযানে প্রথমে ছয়জনকে উদ্ধার করা হয়েছিল বলে ডুবুরিদলের সূত্রে খবর প্রকাশিত হলেও পরে সরকারিভাবে জানানো হয়, প্রথম দিন চারজনকে উদ্ধার করা হয়। সেদিন ট্যাংকারে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে আসায় ডুবুরিরা উদ্ধার অভিযান স্থগিত করেন।

গতকাল সকাল ১১টার দিকে ডুবুরিদলের সংখ্যা আরো বাড়িয়ে দ্বিতীয় দিনের অভিযান শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে লড়াই করতে থাকা ডুবুরিদের পূর্বনির্ধারিত সময় আরো এগিয়ে আনা হয়। উদ্ধার অভিযানের কমান্ডার ও চিয়াং রাই প্রদেশের গভর্নর নারোংসাক ওসোত্তানাকোর্ন গতকাল স্থানীয় সময় বিকেলে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, নিয়ম অনুযায়ী রবিবার অভিযানে অংশ নেওয়া ডুবুরিদের ২০ ঘণ্টা বিশ্রাম নিতে হতো। এ হিসাবে অভিযান শুরু করতে হতো সোমবার রাত ৮টা থেকে ১০টার দিকে। কিন্তু ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস, পানির পরিমাণ বৃদ্ধির আশঙ্কা ও শারীরিক স্বাস্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় অভিযানের সময় চার-পাঁচ ঘণ্টা এগিয়ে আনা হয়েছে। গতকালও পাম্প দিয়ে অব্যাহতভাবে গুহার পানি সেচতে থাকায় পরিমাণ নিয়ন্ত্রণযোগ্য বলে তিনি জানান। নারোংসাক বলেন, ‘আমরা আশা করছি পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সুখবর পাওয়া যাবে।’ বিকেল ৩টায় তাঁর এ ঘোষণার দেড় ঘণ্টা পর পঞ্চম কিশোরটিকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের আগে গুহার কাছে পাঁচটি অ্যাম্বুল্যান্স ও একটি হেলিকপ্টার রাখা হয়। উদ্ধারের পর তাদের প্রথমে গুহার কাছে অস্থায়ী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্সা দেওয়া হয়। পরে তাদের চিয়াং রাই প্রাচানাকরোহ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

থাম লুয়াং গুহার কাছে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা গতকাল বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানায়, মেডিক্যাল কর্মীদের চার কিশোরকে স্ট্রেচারে করে অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুল্যান্সের কাছে নিয়ে যেতে দেখা গেছে। হাসপাতালের কর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের স্বাস্থ্যের অবস্থা ভালো। তবে রয়টার্স উদ্ধারকৃতদের পরিচয় নিশ্চিত করতে পারেনি। এ ব্যাপারে অভিযানের প্রধান নারোংসাক ওসোত্তানাকোর্ন কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকার করেন।

গতকালও আটকে পড়া কিশোরদের সব মা-বাবাকে গুহার কাছে অপেক্ষা করতে দেখা যায়। গতকাল পর্যন্ত যেসব কিশোরকে উদ্ধার করা হয়েছে, তাদের কারো পরিচয়ই নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে সব অভিভাবকেরই সেখানে জড়ো হতে দেখা যায়। উদ্ধারকৃত কিশোরদের হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এবং পরবর্তী সংক্রমণ থেকে রক্ষার জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে। অভিভাবকরাও সেটি মনে নিয়ে সব কিশোরের অপেক্ষায় আছেন। গতকাল প্রথম এক কিশোরকে উদ্ধারের পর এক কিশোরের মা সাংবাদিকদের বলেন, ‘জেনেছি আরেকজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সে কে, তা জানি না। আমরা চাই সবাই বের হয়ে আসুক।’

উদ্ধার অভিযানকারী দলের সূত্রে জানা যায়, অভিযানের প্রথম এক কিলোমিটার স্থান খুবই বিপজ্জনক যাত্রা। সেখানে গুহার সংকীর্ণ পথটি পানিতে প্লাবিত হয়ে যায়। এ কারণে প্রতিটি কিশোরকেই অক্সিজেন মাস্ক পরানো হয়।

গত ২৩ জুন অনুশীলন শেষে তুমুল বৃষ্টি শুরু হলে ওই ১২ ফুটবলার ও তাদের কোচ গুহাটির ভেতর আশ্রয় নিয়েছিল। সে দিন একজনের জন্মদিন উদ্যাপনের জন্য তারা গুহাটির ভেতর ঢুকেছিল বলে জানা গেছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তুমুল বৃষ্টি শুরু হলে বন্যার পানিতে গুহামুখ ডুবে যায়। পানি বাড়তে থাকায় এ ফুটবল দলটিও গুহার আরো ভেতরে যেতে থাকে। তাদের নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর তাদের বাইসাইকেল ও জুতা দেখে ধারণা করা হয় তারা গুহার ভেতর আটকে পড়েছে। পরে অনুসন্ধান অভিযানের এক সপ্তাহ পর ২ জুলাই সোমবার দুজন ব্রিটিশ ডুবুরি অলৌকিকভাবে কিশোরদলটিকে গুহার চার কিলোমিটার ভেতরে জীবিত দেখতে পান। এর পর থেকে তাদের অক্সিজেন ও খাবার দিয়ে বাঁচিয়ে রাখেন ডুবুরিরা। গত রবিবার অভিযান শুরুর পর কর্তৃপক্ষ জানায়, এই অভিযান সমাপ্ত করতে তিন থেকে চার দিন লেগে যেতে পারে।

নারোংসাক জানান, রবিবার উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে যারা চার কিশোরকে উদ্ধার করেছিলেন, সেই বহুজাতিক দলটিই সোমবার মোতায়েন করা হয়। তিনি জানান, ডুবুরিরা প্রত্যেক কিশোরের মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরান, যাতে তারা স্বাভাবিক শ্বাস নিতে পারে। পরে রোপ গাইডের (আসা-যাওয়ার পথ চিহ্নিত ও সহজ করার জন্য পানির নিচে টানানো দড়ি) সাহায্যে দুজন ডুবুরি গাইড করে একজন করে কিশোরকে সঙ্গে নিয়ে আসেন। তিনি আরো জানান, দ্বিতীয় পর্বের অভিযানের অংশ হিসেবে ডুবুরিরা গাইড রোপকে আরো শক্ত করে বাঁধেন। সোমবার রাতে ডুবরিরা দেখতে পান পানির নিচে যেখানে গুহার পথ সংকীর্ণ, সেটি পানিতে ভরে গেছে। এরপরই তারা সেখানে আরো শক্ত ব্যবস্থা নেন।

উদ্ধারকৃতদের স্বাস্থ্য : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অনুপং জাওজিন্দ ও স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধারকৃত আট কিশোরের শারীরিক অবস্থা ভালো আছে। তারা কেউ কেউ হেঁটে অ্যাম্বুল্যান্সে উঠেছে বলেও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে। এই আটজনকে চিয়াং রাই প্রাচনাকরোহ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের গতকাল পর্যন্ত মা-বাবার সঙ্গে দেখা করানো হয়নি। থাই জনস্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তাদের হাসপাতালের আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে। তারা গুহার ভেতর একটি ভিন্ন পরিবেশে থাকার কারণে বিভিন্ন প্রাণীর সংস্পর্শে আসায় তারা যেকোনো ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তাই তাদের ও পরিবারের সদস্যদের স্বাস্থ্যে নিরাপত্তার জন্য তাদের আলাদা রাখা হচ্ছে। তাদের রক্ত, প্রস্রাব পরীক্ষা করে তাদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হবে। এ জন্য দু-তিন দিন সময় লাগতে পারে। সূত্র : বিবিসি, এএফপি, রয়টার্স, ব্যাংকক পোস্ট।

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment