দশ দিগন্তে

দল থেকে ‘কাউয়া’ তাড়ানোর জন্য শুধু তালির শব্দ করলেই চলবে না

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

আমার এক অনুজপ্রতিম বন্ধু সৈয়দ মোজাম্মেল আলী পেশায় চার্টার্ড একাউন্টেন্ট। কিন্তু নেশা রাজনীতি করা। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এখন ব্রিটেনের আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছেন। তিনি সম্প্রতি একটি কাজ করেছেন, যা অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তিনি হাসিনা সরকারের উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের একটি দীর্ঘ তালিকা তৈরি করেছেন এবং তা লন্ডনের বাংলা কাগজে পৃষ্ঠাজুড়ে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করছেন।

বিজ্ঞাপনটি প্রকাশিত হচ্ছে স্টাডি সার্কেলের নামে এবং শিরোনাম হচ্ছে ‘উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’। কাজটি করা উচিত ছিল আওয়ামী লীগ সংগঠনের। সম্ভবত এটা তাদের মাথায় আসেনি। তাই কাজটা করতে হচ্ছে ব্যক্তিবিশেষকে। এটা একটা দৃষ্টান্তমূলক কাজ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও সম্প্রতি তার মন্ত্রী, এমপি ও দলের নেতা-কর্মীদের উপদেশ দিয়েছেন, বর্তমানে দেশের যে বিরাট অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটেছে, তা যেন তারা জনগণের কাছে সঠিকভাবে তুলে ধরেন। একটি সাধারণ নির্বাচনের আগে দেশের মানুষের জানা উচিত, বাংলাদেশ এখন আর “তলাবিহীন ঝুড়ি” নয়। একটি মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে চলেছে।

বাংলাদেশের যে অভাবিত আর্থ-সামাজিক উন্নতি ঘটেছে, এটা এখন বিশ্ববাসী উপলব্ধি করছে। জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক থেকে শুরু করে পশ্চিমা দেশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা পর্যন্ত তা স্বীকার করছেন এবং হাসিনা নেতৃত্বের প্রশংসা করছেন। হাসিনা-নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানাবার মতো ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব বর্তমান বাংলাদেশে নেই। দেশের রাজনীতির এই স্বীকৃত বাস্তবতা সত্ত্বেও এখন প্রশ্ন উঠেছে, দেশের এত উন্নয়ন, অগ্রগতি সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের পেছনে যে ব্যাপক জনসমর্থন থাকার কথা, তা নেই কেন?

যেকোনো নির্বাচনে, তা পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা জাতীয় সংসদের উপনির্বাচন হোক, আওয়ামী লীগ কখনো জেতে, কখনো কখনো বিপুল ভোটেও (যেমন সাম্প্রতিক গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন) জেতে। কিন্তু এই জয়ের জন্য এত কষ্ট করতে হয় কেন? আওয়ামী লীগের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এখন ভাঙা মঠ। ভাঙা মঠের দেবতারও অনেক পূজারি থাকে। বিএনপিরও তেমনই কোমর ভেঙেছে, কিন্তু ভোটের বাক্সটি তেমন ভাঙেনি।

দেশে যে ডান ও বামপন্থি এত দল, এত নেতা (ড. কামাল হোসেন, ড. বদরুদ্দোজা, ড. ইউনূস প্রমুখ) কিন্তু বিএনপি’র স্থানটি কেউ দখল করতে পারেননি। জাতীয় পার্টির (এ) নেতা জেনারেল এরশাদ তো মাঝে মাঝেই দম্ভ প্রকাশ করেন, তার দল আগামী নির্বাচনে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এককভাবে ক্ষমতায় যাবে। তা শুনে মানুষ কি হাসে না! মানুষ বলে এটা কুঁজোর চিত্ হয়ে চাঁদ দেখার আশা।

আওয়ামী লীগে আমার যারা বন্ধু নেতা আছেন, তারাও স্বীকার করেন, বিএনপি যদি গতবারের মতো ভুল না করে নির্বাচনে যায়, তাহলে আগামী নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। বিএনপি জয়ী হতে না পারলেও সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দল গঠিত হবে। এটাও বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বিকাশের কাজে সহায়ক হবে। বেগম খালেদা জিয়া নির্বাচনের সময় জেলে থাকলে তার দলের পক্ষে সিমপ্যাথি ভোট বাড়বে। এই সত্যটা না বুঝে বিএনপি যদি নির্বাচন বর্জন করে তাহলে নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারবে, বিদেশি ‘দাদারা’ তাদের সাহায্যার্থে ২০১৪ সালের মতোই এগিয়ে আসবে না।

সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে জামায়াত বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটে থেকেও মেয়র পদে নিজেদের প্রার্থী দেওয়ায় এবং বিএনপি ক্ষুব্ধ হওয়ায় আওয়ামী লীগ শিবিরে চাপা উল্লাস দেখা দিয়েছে। জামায়াত ও বিএনপির এই শত্রু শত্রু খেলা দেখে আওয়ামী লীগ নির্বাচন জয় সম্পর্কে কমপ্লাসেন্ট হলে ভুল করবেন। সিটি নির্বাচনে জামায়াত এই আলাদাভাবে লড়াইয়ের ভান দেখালেও জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গেই জোটবদ্ধ থাকবে এবং একসঙ্গে নির্বাচন করবে। বর্তমান খেলা আওয়ামী লীগকে বিভ্রান্ত করার খেলা। ১৯৯৬ সালেও তারা এই ধরনের খেলা দেখিয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে সমর্থন দানের ভান দেখালেও কর্মীদের গোপনে নির্দেশ দিয়েছে বিএনপিকে সমর্থন করো, ভোট দাও। আওয়ামী লীগ এবার যেন জামায়াতি প্রতারণার ফাঁদে পা না দেয়।

বলছিলাম, দেশের উন্নয়নের কথা। আওয়ামী লীগ আমলে দেশের এই অভূতপূর্ব উন্নয়ন সত্ত্বেও সমপরিমাণে দলটির পক্ষে জনসমর্থন তৈরি হয়নি কেন? এই প্রশ্ন এখন অনেকের মনে। আমার মনেও। আমার এক বন্ধু বললেন, এর কারণ তুমি খুঁজে পাবে। তোমাকে একটা গল্প বলি। এক ধনী যুবক গরিব ঘরের সুন্দরী মেয়েকে বিয়ে করেছেন। তাকে অর্থ, গয়নাগাটি দিয়ে একেবারে ভরিয়ে রেখেছেন।

তথাপি কিছুদিন পর দেখা গেল, সেই সুন্দরী স্ত্রী লুকিয়ে গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে প্রেম করছে। ধনী যুবক তা জেনে ফেলে ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হলেন। তিনি তার এক জ্ঞানী বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করলেন, এর কারণ কী? তিনি তো স্ত্রীকে কোনো অভাবে রাখেননি। তাকে অর্থ, শাড়ি, গয়না প্রচুরভাবে দিয়েছেন। তারপরও সে ড্রাইভারের দিকে আকৃষ্ট হলো কেন?

জ্ঞানী বন্ধু বললেন, আমি তোমাকে জানি, তুমি দিন-রাত্রির বেশির ভাগ সময় বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ক্লাবে আড্ডা দিয়ে মদ খেয়ে কাটাও। স্ত্রীকে ততটা সময় দাও না। মেয়েরা অবশ্যই গয়নাগাটি চায়, কিন্তু তার চাইতেও বেশি চায় স্বামীর ভালোবাসা, স্বামীর এটেনশন না পেলে সেটা তারা অন্যত্র খোঁজে। তুমি চরিত্র বদলাও। তোমার স্ত্রীরও স্বভাব পাল্টাবে।

বন্ধুর গল্প শুনে আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি, ঈশপের গল্পের মতো এই গল্পের নীতিকথাটা কী। সরকার দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়ন ঘটিয়েছে। মাঝখানে বঙ্গবন্ধু-কথিত একটি ‘চাটার দল’ তার অনেকটা খেয়ে ফেলেছে। এই চাটার দলে আছে আওয়ামী লীগেরই একশ্রেণির মন্ত্রী, উপমন্ত্রী, এমপি, উপজেলা চেয়ারম্যান, নেতা, পাঁতি নেতা প্রমুখ। সরকার যখন দশ টাকা কেজি দামে গরিব মানুষের জন্য চাল বরাদ্দ করেছিলেন, তার সিংহভাগ কাদের মুনাফা লাভের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে, তা এখন অনেকেই জানেন।

বঙ্কিমচন্দ্র তার ‘কমলাকান্তের দপ্তরে’ লিখেছিলেন, ইংরেজ রাজত্বে দেশের অনেক উন্নতি হয়েছে, রাস্তাঘাট তৈরি হয়েছে, রেল স্টিমার চলছে, শহরের পর শহর তৈরি হচ্ছে। তাতে রাম-রহিমের কী উন্নতি হলো? বঙ্কিমচন্দ্রের এই প্রশ্নটা এখন আবার অনেকে করছেন। এ যুগেও রাম-রহিমের ভাগ্য যে খোলেনি, তার কারণ, ক্ষমতাশালী লুটেরা দলের আবির্ভাব। দেশের বিরাট উন্নয়নের স্রোত যারা জনগণের দুয়ারে পৌঁছতে দেয় না।

ভারতে বিজেপি’র অটলবিহারী বাজপেয়ী যখন প্রধানমন্ত্রী, তখন সাধারণ নির্বাচনের আগে দলটি সারা ভারত জুড়ে ‘ইন্ডিয়া সাইনিং’ নামে এক বিরাট উত্সব-শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল, ভারতে বিজেপি উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দিয়েছে জনগণের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছে দেওয়া। তাতে হিতে বিপরীত হয়েছিল। বিজেপি সেই নির্বাচনেই ক্ষমতা হারিয়েছিল।

বাংলাদেশে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হারবে এমন কথা বলি না। কারণ, ভারতে তখন বিজেপি’র উন্নয়নের প্রচারণা ছিল নিছক প্রচারণা। কিন্তু বাংলাদেশে হাসিনা সরকার বাস্তবেই ঘটিয়েছেন বিরাট উন্নয়ন। কেবল দুর্ভাগ্য এই যে, এই উন্নয়নের ছোঁয়া সর্বত্র সমানভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছেনি। তার কারণ, ক্ষমতাসীন দলেরই একশ্রেণির নেতা, মন্ত্রী, এমপি’র দুর্নীতি ও উদগ্র লালসা। আওয়ামী লীগের এক বিরাট সংখ্যক এমপি’র বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ আছে।

আগামী নির্বাচনের আগে এদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দলে এবং মন্ত্রিসভায় একটা বড় ধরনের পার্জিন দরকার। বিরাট উন্নয়নের শুধু বার্তা প্রচার নয়, তা যাতে জনগণের দুয়ারে যথাসময়ে পৌঁছে, তার নিশ্চিত ব্যবস্থা করতে হবে। শেখ হাসিনার নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের উপর দেশের মানুষের অগাধ আস্থা আছে। কিন্তু তার দল এবং ছাত্রলীগ, যুবলীগের মতো সহযোগী দলগুলোর উপর তা নেই। এই ব্যবধানটা অবশ্যই ঘুচাতে হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এই ব্যাপারে একটা শর্ট টার্ম লং টার্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করুন। দল থেকে “কাউয়া” তাড়ানোর জন্য শুধু তালির শব্দ করলেই চলবে না।

আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় থাকুক এটা আমরা সকলে চাই। দেশে উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং গণতন্ত্রের শত্রু সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান প্রতিহত করার জন্যই এটা চাই আমরা। কিন্তু সেই সঙ্গে জাতীয় সংসদে শক্তিশালী বিরোধী দলও গণতন্ত্রের স্বার্থেই দরকার। বিএনপি যদি তা না চায় এবং নির্বাচন বর্জন করে তাহলে তারা শুধু দেশের ক্ষতি করবে না, নিজেদেরও সর্বনাশ ঘটাবে। আওয়ামী লীগ যদি নিজেকে সংশোধন করতে পারে এবং বিএনপি যদি তারেক রহমানের অশুভ প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে দেশের রাজনীতিতে সঠিক অবস্থান গ্রহণ করতে পারে, তাহলেই দেশের মঙ্গল। – ইত্তেফাক

 লন্ডন ১৪ জুলাই, শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment