বিশ্ব বাঘ দিবস আজ

অনলাইন ডেস্ক –

আজ রবিবার (২৯ জুলাই) ‘বিশ্ব বাঘ দিবস’। যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমান সরকার সুন্দরবনে বাঘ রক্ষায় বেশি উদ্যোগী। সুন্দরবনসংলগ্ন জেলার মানুষকে সম্পৃক্ত করার জন্য দুই বছর ধরে ঢাকার বাইরে জাতীয়ভাবে পালন করা হচ্ছে ‘বাঘ দিবস’। বাগেরহাটের পর এ বছর খুলনায় জাতীয়ভাবে দিবসটি পালন করা হবে। এবারের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘বাঘ বাঁচাই, বাঁচাই বন, রক্ষা করি সুন্দরবন’।

কয়েক বছর আগেও চোরাশিকারি ও জল-বনদস্যুদের তৎপরতার কারণে সুন্দরবনে বাঘ অনেকটা হুমকির মুখে ছিল। সম্প্রতি এসব তৎপরতা কমে গেছে। এ কারণে সুন্দরবনে বাঘ অনেকটা সুরক্ষিত এবং বাঘের বিচরণক্ষেত্র নিরাপদ বলে দাবি করেছে বন বিভাগ। তারা বলছে, আগামী দিনে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে সুন্দরবনে বাঘ টিকে আছে। সারা পৃথিবী থেকে বাঘ হারিয়ে গেলেও সুন্দরবন থেকে বাঘ হারানোর আশঙ্কা কম।

বিভিন্ন সূত্র বলছে, শত বছরে বিশ্বের বনাঞ্চল থেকে বাঘের সংখ্যা এক লাখ থেকে কমে মাত্র চার হাজারের নিচে এসে দাঁড়িয়েছে। বাঘের আটটি উপপ্রজাতির তিনটি এরই মধ্যে বিশ্ব থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এক বছর আগেও বিশ্বের মাত্র ১৩টি দেশে বাঘ ছিল। সেখান থেকে আরো একটি দেশ বাঘ হারিয়েছে। এখন বাংলাদেশসহ মাত্র ১২টি দেশে বাঘের অস্তিত্ব রয়েছে।

সারা বিশ্বের বন উজাড়, শিকারি ও পাচারকারীদের কারণে বাঘ মহাবিপন্ন প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এ অবস্থায় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সংখ্যা বাড়তে পারে—এমন আশার বাণী সুসংবাদ হয়ে এসেছে।

বন বিভাগ জানায়, সুন্দরবনে দ্বিতীয়বারের মতো ‘ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের’ মাধ্যমে বাঘ জরিপ করা হচ্ছে। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে বনের বিভিন্ন অংশে ক্যামেরা স্থাপন করে বাঘের চিত্র ধারণ করা হয়েছে। ক্যামেরায় ধারণকৃত চিত্র বর্তমানে বিশ্লেষণের কাজ চলছে। ২০১৩-১৫ সালে সুন্দরবনে প্রথম পরিচালিত ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ের মাধ্যমে জরিপ অনুসারে সুন্দরবনে বাংলাদেশ অংশে বাঘের সংখ্যা বলা হয়েছে ১০৬টি। সুন্দরবন বিভাগ আরো জানায়, সরকার ২০১২ সালে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা আইন পাস করেছে। নতুন আইন অনুযায়ী বাঘ হত্যা ও পাচার করলে প্রথমবারের জন্য দুই থেকে সাত বছরের কারাদণ্ড এবং দুই থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার বাঘ হত্যা বা পাচার করলে সর্বোচ্চ ১২ বছর কারাদণ্ড ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

সুন্দরবন বিভাগের তথ্য মতে, ২০০১ সাল থেকে চলতি বছরে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে ৩৫টি বাঘের প্রাণহানি ঘটেছে। এর মধ্যে দুষ্কৃতকারীদের হাতে ১০টি, লোকালয়ে ঢুকে পড়লে জনতার হাতে ১৪টি, বার্ধক্যজনিত কারণে ১০টি এবং ২০০৭ সালে সিডরে একটি বাঘ মারা যায়। এই সময়ে বাঘের পাল্টা আক্রমণে প্রায় ৩০০ জন জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল এবং গ্রামবাসী মারা গেছে। তবে ২০১৬ সাল থেকে চলতি ২০১৮ সালের এই পর্যন্ত দুষ্কৃতকারীদের হাতে সুন্দরবনে বাঘ হত্যার ঘটনা ঘটেনি।

খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. আমীর হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘সুন্দরবনের দস্যুরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে একের পর এক আত্মসমর্পণ করছে। যেকোনো সময়ের চেয়ে সুন্দরবনে দস্যুতা কমে গেছে। অভিযানের কারণে সুন্দরবনে চোরাশিকারিদের তৎপরতা নেই বললেই চলে।’

বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক মো. জাহিদুল কবির বলেন, ‘বাঘ শিকার রোধে মনিটর করা হচ্ছে। সুন্দরবনে বাঘ শিকার বন্ধ রয়েছে। এ অবস্থা ধরে রাখতে পারলে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা বাড়বে।’

ওয়াইল্ড টিমের প্রধান নির্বাহী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘সারা পৃথিবী থেকে বাঘ হারিয়ে গেলেও সুন্দরবন থেকে বাঘ হারানোর আশঙ্কা কম। নদ-নদীবেষ্টিত সুন্দরবন। বাঘ না বাঁচলে সুন্দরবন টিকবে না। সুন্দরবন মায়ের মতো। বাঘের সঙ্গে দেশের সুনাম জড়িয়ে রয়েছে।’

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘সাধারণত বনের যেসব এলাকা দিয়ে শিকারিচক্র সুন্দরবনে প্রবেশ করে, সেসব এলাকা বন বিভাগের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে। বাঘ রক্ষায় বনসংলগ্ন মানুষকে নানাভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।’

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. বশিরুল-আল-মামুন বলেন, ‘সাতক্ষীরা থেকে শুরু করে শিপসা পর্যন্ত পেরিফেরিতে বাঘের চলাফেরা অনেক কম। বন বিভাগের স্টাফরা সব সময় সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন। এই অংশ দিয়ে বাঘ শিকারিচক্রের সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ কম।’

সুন্দরবনসংলগ্ন শরণখোলা উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান মিলন বলেন, ‘সুন্দরবনঘেঁষা কয়েকটি গ্রামে একসময় বাঘ শিকারিচক্র সক্রিয় ছিল। এখন ওই সব গ্রামে আর তাদের তৎপরতা নেই।’

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment