কালের আয়নায়

সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

দেশে ঝড় থেমে গেছে; কিন্তু তার প্রতিক্রিয়া থামেনি। এই ঝড়ের ভালো-মন্দ দুটি দিকই ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এই ঝড় ছিল একটি আন্দোলন। অরাজনৈতিক আন্দোলন। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে আন্দোলন। এটা সরকার উচ্ছেদের কোনো আন্দোলন ছিল না। তাতে নেতৃত্ব দিয়েছে স্কুলের কচিকাঁচা ছাত্রছাত্রীরা। সমর্থন দিয়েছে গোটা নাগরিক সমাজ। দুর্ঘটনায় নয়, যন্ত্রদানবের বেপরোয়া চলাচলে রোজই অসংখ্য তাজা প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত ঝরে গেল দু’জন কিশোর-কিশোরীর সম্ভাবনাময় জীবন।

যন্ত্রদানবের এই প্রতিকারহীন বর্বরতায় মানুষের মনে ক্ষোভ জমছিল দীর্ঘদিন ধরে। দুই ছাত্রছাত্রীর মর্মান্তিক জীবনাবসানকে কেন্দ্র করে সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনে। এই আন্দোলনে কচিকাঁচারা যে শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার নজির দেখিয়েছে, তা থেকে আমাদের একশ্রেণির রাজনৈতিক দল শিক্ষা নিতে পারে। সরকার এই আন্দোলন মোকাবেলায় দমননীতি গ্রহণ করেনি। বরং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার স্বভাবজাত ধৈর্য ও সহানুভূতির সঙ্গে এই আন্দোলনকে ট্রিট করেছেন, যেমনটা করেছিলেন বিডিআর বিদ্রোহের সময়। সেটা ছিল আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি।

তবে সেটা গণআন্দোলন ছিল না। এটা ছিল ছাত্রদের অরাজনৈতিক নেতৃত্বে গণআন্দোলন। আন্দোলনের শুরুতেই সরকার এই আন্দোলনের দাবি-দাওয়াগুলোকে সঠিক আখ্যা দিয়েছে এবং মেনে নিয়েছে। ছাত্রদের নিরাপদ সড়কের দাবি পূরণের লক্ষ্যে সরকার ইতিমধ্যেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে (যদিও অর্থ সাহায্য দিয়ে এই ক্ষতিপূরণ হওয়ার নয়)। যে মন্ত্রী তার অসতর্ক মন্তব্য দ্বারা জনমনের অসন্তোষকে বাড়িয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ক্ষমা চেয়েছেন। প্রয়োজনে তিনি পদত্যাগেও প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীরা আপাতত আন্দোলনে বিরতি ঘটিয়ে ঘরে ফিরে গেছে।

তবে এ ব্যাপারে একটি সতর্কবাণী তারা সরকারের জন্য রেখে গেছে। অতীতে দেখা গেছে, কোনো ন্যায্য আন্দোলনের মুখে কোনো কোনো সরকার দাবিগুলো মেনে নিয়ে পিছু হটে অর্থাৎ সময় নেয়। তারপর আন্দোলন থেমে গেলে সরকার দাবিগুলো বাস্তবায়নের কথা ভুলে যায়। জনগণের দাবি আমলাতন্ত্রের লালফিতায় বন্দি হয়ে পড়ে থাকে। এবারের আন্দোলনের ছাত্রনেতারা তাই এ ধরনের আশঙ্কায় সরকার দাবি মানা সত্ত্বেও প্রথমে আন্দোলন থেকে সরেনি। তারপর প্রধানমন্ত্রীর আশ্বাসে ও আহ্বানে ঘরে ফিরে গেছে। কিন্তু সরকারের জন্য এই সতর্কবাণী রেখে গেছে যে, যন্ত্রদানবের নিত্য হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা এবং নিরাপদ সড়কের ব্যবস্থা না হলে তারা আবার রাস্তায় নামবে। এটা হলো আন্দোলনের ইতিবাচক দিক।

ভবিষ্যতে ছাত্ররা আবার আন্দোলনে নামুক আর না নামুক, ঘটে যাওয়া আন্দোলনের একটা নেতিবাচক দিক আছে। একটি সাধারণ নির্বাচনের আগে এ ধরনের পরিস্থিতি ঘটতে দেওয়া এবং বিএনপি-জামায়াত-শিবিরকে আবার এই আন্দোলনে অনুপ্রবিষ্ট হয়ে দেশে সন্ত্রাস সৃষ্টির সুযোগ করে দেওয়া উচিত হয়নি। আমি এই আন্দোলনের সময় ঢাকায় ছিলাম। বিএনপি-জামায়াত তাদের অতীতের ভয়াবহ সন্ত্রাসী তৎপরতা দ্বারা সরকারের তেমন ক্ষতি করতে পারেনি। কিন্তু সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন সরকারের ক্রেডিবিলিটি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। ফলে বিডিআর বিদ্রোহ ও হেফাজতের অভ্যুত্থানের সময় বিএনপি-জামায়াতের যে গুজবগুলো কেউ বিশ্বাস করেনি, এবার তাদের দ্বারা ছড়ানো মিথ্যাগুলো অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়েছে। দেশে থাকতে এটা আমি লক্ষ্য করেছি এবং এটাই ভয়ের কথা।

বিডিআর বিদ্রোহের সময় বিএনপি-জামায়াত রটিয়েছিল, ‘ভারতীয় সৈন্যরা কালো ড্রেস পরে এসে অসংখ্য বাংলাদেশি সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে এবং লাশ গুম করে ফেলেছে। বাংলাদেশকে দুর্বল করে ফেলাই তাদের উদ্দেশ্য। হেফাজতি অভ্যুত্থানের সময় তারা রটিয়েছে, ২০ হাজারের মতো হেফাজতের নেতাকর্মী ও সমর্থককে এক রাতে হত্যা করা হয়েছে এবং সব লাশ রাতারাতি ভারতে পাচার করা হয়েছে। এই দুটি অভ্যুত্থানের মোকাবেলায় শেখ হাসিনার ধৈর্য ও সাহস এই গুজব রটনা ব্যর্থ করে দিয়েছে। তখন সরকারের ক্রেডিবিলিটি কমেনি, বরং বেড়েছে।

এবারেও নিরাপদ সড়কের দাবিতে শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনটিকে হাইজ্যাক করার চেষ্টা করেছিল বিএনপি-জামায়াত। স্কুল ছাত্ররা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে নেমেছে আর নেপথ্যে বিএনপি-জামায়াত ছাত্র সেজে রাস্তায় নেমে পাঁচশ’র মতো গাড়ি ভাংচুর করেছে। এর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে স্কুল ছাত্রছাত্রীদের ওপর। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ অফিসে হামলার সময় তাদের মুখোশ খুলে গেছে।

বিএনপি-জামায়াতের অতীতের রেকর্ডের দিকে তাকালে দেখা যাবে, তাদের সব রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত থাকে গুজব রটনা ও মিথ্যা প্রচার। এবারেও তাই ঘটেছে। অনলাইনে দেশে হত্যা, ধর্ষণের এক ভয়াবহ খবর ছড়ানো হচ্ছে। পশ্চিমা দেশ, মানবিক সংস্থা, এমনকি জাতিসংঘের কাছে অনলাইনে দরখাস্ত করা হয়েছে বাংলাদেশে ‘গণহত্যা’ বন্ধ করার জন্য। নারী ধর্ষণের বানোয়াট দাবি তোলা হচ্ছে। খবরে বলা হচ্ছে, গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এই অনলাইন পিটিশনে সই করেছে ১৫ হাজারের বেশি লোক। অর্থাৎ বিডিআর বিদ্রোহ ও হেফাজতের অভ্যুত্থানের সময় যে মিথ্যা প্রচার মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়নি, এবার তা এক বিরাটসংখ্যক মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যাচ্ছে।

এবারের ছাত্র আন্দোলনে সরকারের সাফল্য, বিএনপি-জামায়াতের অরাজকতা সৃষ্টির ষড়যন্ত্র তারা ব্যর্থ করতে পেরেছে। ব্যর্থতা তাদের বিষাক্ত জিহ্বার অপপ্রচারকে এখন পর্যন্ত প্রতিহত করতে পারেনি। অনেক নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীও এই প্রচার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। বিখ্যাত আলোকচিত্রী শহিদুল আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি ফেসবুকে মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছিলেন। পুলিশ তাকে গ্রেফতার করেছে। ড. জাফর ইকবালের মতো জনশ্রদ্ধেয় বুদ্ধিজীবী তাতে ক্ষুণ্ণ হয়ে কলম ধরেছেন। তিনি বিএনপি-জামায়াতের ঘোর বিরোধী। মনে হয়, তিনিও তাদের মিথ্যা প্রচার দ্বারা কমবেশি প্রভাবিত হয়েছেন।

একটা লক্ষ্য করার বিষয়, বর্তমান সরকার একটা না, দুই দফা ক্ষমতায় আছে। কিন্তু তাদের কাউন্টার প্রোপাগান্ডা মেশিন অত্যন্ত দুর্বল। বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠী অনেক ডাহা মিথ্যাকেও সত্য বলে মানুষের সামনে তুলে ধরে আর আওয়ামী লীগ দেশ পরিচালনায় তাদের সাফল্যের সত্যকেও সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারে না। কোনো কোনো মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বহীন উক্তি তো সরকারকে আরও বিপাকে ফেলে।

আওয়ামী লীগের কাছ থেকে যেসব বুদ্ধিজীবী নানা সুযোগ-সুবিধা পান, তাদের অনেককেই দেখা যায়- সরকারের বিপদের সময় এপলোজেটিক। তাদের গায়ে যাতে কাদা না লাগে, সে জন্য সুশীল সেজে একটু দূরে দূরে থাকেন। এবারের ছাত্র আন্দোলনে একটা সত্য ধরা পড়েছে, সরকার দেশের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছে, এমনকি মহাকাশে স্যাটেলাইটও পাঠিয়েছে; কিন্তু দেশের মাটিতে নিরাপদ সড়কের ব্যবস্থা করতে পারেনি।

সরকার রাজনৈতিক সন্ত্রাস অনেকটাই বন্ধ করতে পেরেছে। কিন্তু যন্ত্রদানবের অব্যাহত হত্যালীলা বন্ধ করতে পারেনি। এ জন্য বহু আগে যে ব্যবস্থাগুলো গ্রহণ করা দরকার ছিল; যেমন- রাস্তাঘাট সংস্কার, বিকল বাস, লরি ও ট্রাক রাজপথ থেকে অপসারণ, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন ড্রাইভারদের গাড়ি চালাতে না দেওয়া, ট্রাফিক পুলিশের ঘুষ খাওয়া বন্ধ করা; সর্বোপরি মন্ত্রী, এমপি, উচ্চপদের সরকারি কর্মচারীদের অনেকের ট্রাফিক আইন মেনে না চলা রহিত করা এবং প্রতি বছর বিদেশ থেকে বড়লোকদের খায়েশ পূরণের জন্য দেদার গাড়ি আমদানির নীতি বর্জন করা ইত্যাদি।

সমস্যাগুলো গড়াতে গড়াতে বর্তমানে অসহনীয় অবস্থায় পৌঁছেছে এবং জনগণের মধ্যে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ, বিশেষ করে ছাত্র বিক্ষোভ- দুটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ফেটে পড়েছে। সরকার এই দুটি মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ সড়ক সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে তাদের ব্যর্থতার কথা মনে রেখে আন্দোলনের নেতাদের সঙ্গে যদি বৈঠকে বসত এবং বিএনপি-জামায়াতকে পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণের সময় না দিত, তাহলে সরকারের ক্রেডিবিলিটি অনেকটাই রক্ষা পেত। আমার সন্দেহ নেই, সরকার যদি তাদের ক্রেডিবিলিটি লসের এই ব্যাপারটিকে গুরুত্ব দিয়ে তা পুনরুদ্ধারের দ্রুত বাস্তব কার্যক্রম গ্রহণ না করে, তা হলে তা আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দলের বিরুদ্ধে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবেই।

সরকার দেশের অনেক উন্নয়ন ঘটিয়েছে। এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, এই উন্নয়নের ছোঁয়া অনেক স্থলেই মাটির জনগণের কাছে পৌঁছেনি। যেমন যোগাযোগ ব্যবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু যাতায়াত ব্যবস্থা ও সড়কের সংস্কার হয়নি। দেশে সড়ক দুর্ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে, কমছে না। এ ধরনের উন্নয়ন সম্পর্কে নোবেল লয়িয়েট অমর্ত্য সেন সম্প্রতি বলেছেন, Economic Growth without development in human development is unsustainable and unethical.’ এক কথায় এর অর্থ হলো, ‘মানুষের সুখ-সুবিধার উন্নতি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অনৈতিক এবং তা টেকসই হয় না।’ আমাদের একদল মন্ত্রী, এমপি উন্নয়ন নিয়ে বাগাড়ম্বর করার সময় অমর্ত্য সেনের এই কথাটা মনে রাখলে ভালো করবেন।

লন্ডন, ১০ আগস্ট শুক্রবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment