দশ দিগন্তে

অনিশ্চয়তাকে কি অচলাবস্থায় রূপান্তর করা যাবে?

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশে সম্প্রতি দু’সপ্তাহ অবস্থান করে আমার মনে হয়েছে, দেশটিতে একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টি করার দেশি-বিদেশি চক্রান্ত চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশে যা চলছে তা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তাকে অচলাবস্থায় ঠেলে দিয়ে দেশি-বিদেশি নানা মহল তাদের স্বার্থ ও সুবিধা নিশ্চিত করার তত্পরতায় লিপ্ত রয়েছেন। সাম্প্রতিক কোটা পদ্ধতির আন্দোলন, নিরাপদ সড়কের আন্দোলনকেও এই তত্পরতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখলে ভুল করা হবে।

এই আন্দোলনগুলো রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল না। সরকার পতনের আন্দোলনও ছিল না। সরকার এই আন্দোলনগুলো হ্যান্ডেল করার ব্যাপারে প্রথমদিকে কিছুটা ভুল করেছেন। এই ভুলের সুযোগ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূর্ণ আন্দোলনে পরিণত করা এবং হিংসাত্মক পন্থার দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করে। সেই সঙ্গে আওয়ামী লীগ-বিরোধী একশ্রেণির আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিও সরকারের বিরুদ্ধে গুজব ছড়ানো ও মিথ্যা প্রচারের চেষ্টা চালায়।

ফলে সরকারকে বাধ্য হয়ে দমননীতির আশ্রয় নিতে হয়েছে। তাতে গুজব সৃষ্টিকারীরা দমিত হয়েছে। কিন্তু সরকার-বিরোধী চক্রগুলোর একটি উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। তারা সরকারের দমননীতি অগণতান্ত্রিক, সরকার আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিদেরও সমালোচনা করা থেকে বিরত রাখার জন্য শক্তি প্রয়োগ করছেন ইত্যাদি গুজব বাজারে ছড়াতে ও তাকে অনেকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে অনেকটাই সফল হয়েছে।

এমনকি শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের সময়েও তারা বহির্বিশ্বে প্রচার করেছে বাংলাদেশে গণহত্যা চলছে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকার রাষ্ট্রের জন্য গুরুতর ক্ষতিকর এই ধরনের মিথ্যা প্রচার বন্ধ করার ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতেন। বাংলাদেশ সরকারও তাই করেছেন। কিন্তু সরকারের ব্যর্থতা এখানেই যে, তাদের প্রচারযন্ত্র অত্যন্ত দুর্বল এবং অকার্যকর। তারা সরকারের সমালোচনা ও বিরোধিতাকে নয়, রাষ্ট্রবিরোধী মিথ্যা প্রচারণা বন্ধ করার জন্য তাদের সীমার মধ্যেই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন, একথাটা বহির্বিশ্বে প্রতিষ্ঠা করতে পারছেন না। তাদের বিরোধীরা গোয়েবলসের মতো একই মিথ্যা বার বার উচ্চারণ করে তাকে প্রায় সত্যে পরিণত করে ফেলেছে।

সরকারের এবং সরকারের সমর্থক প্রচার যন্ত্রগুলোর সবচাইতে বড় দুর্বলতা এই যে, তারা কেবল সরকারের উন্নয়নের স্ট্যাটিসটিক্স প্রচারে ব্যস্ত। এই উন্নতির ফিরিস্তি শুনে শুনে মানুষের কান ঝালাপালা। এই উন্নয়নের প্রচারকে ব্যর্থ করে দিয়ে প্রতিপক্ষ দেশে অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়নের যে বিবরণের তিলকে তালগাছ করে প্রচার করে এই সরকারকে একটি অত্যাচারী অবৈধ সরকার হিসেবে প্রতিপন্ন করার জন্য দেশে এবং বিদেশে শতমুখে প্রচার চালাচ্ছে তার যোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য জবাব সরকার দিতে পারছেন না। আওয়ামী লীগের নেতা ও মন্ত্রীরা কেবল ষড়যন্ত্র ষড়যন্ত্র বলে চিত্কার করছেন। কিন্তু সেই ষড়যন্ত্রের বাঘটি দেশে-বিদেশে দৃশ্যমান করে তুলতে অক্ষম।

বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মুখোমুখি হতে সাহস দেখাতে পারছে না। তাই তাদের কৌশল হচ্ছে, বিভিন্ন যৌক্তিক ও অযৌক্তিক দাবি তুলে নির্বাচন বানচাল করা। সেই উদ্দেশ্যে মিথ্যা প্রচার এবং সেই প্রচার দ্বারা বিশ্বের প্রভাবশালী দেশগুলোকে প্রভাবিত করে তাদের সমর্থনে দেশের রাজনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তাকে অচলাবস্থায় পরিণত করা এবং তারা নিজেরা ক্ষমতায় যেতে না পারলে একটি অনির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতায় বসতে সাহায্য করা। দেশের একটি সুশীল সমাজ এবং তাদের বিদেশি পৃষ্ঠপোষকেরা তো এই ধরনের একটি অনির্বাচিত সরকারকে বাংলাদেশে ক্ষমতায় বসানোর জন্য বহুদিন যাবত তত্পর।

আওয়ামী লীগ সুশাসন দিতে ব্যর্থ—এই ধুয়া তুলে বিএনপি-জামায়াতের অগণতান্ত্রিক ও সাম্প্রদায়িক চরিত্র জেনেও বাংলাদেশের এই সুশীলেরা প্রতিটি আন্দোলনে ও নির্বাচনে প্রচ্ছন্নভাবে তাদের সমর্থন দেয় এবং আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতিটি কাজেই খুঁত আবিষ্কারে ব্যস্ত। একটি সাধারণ নির্বাচন সামনে রেখেও এখন তারা একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠনের চেষ্টার চাইতে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গোপন তত্পরতায় বেশি ব্যস্ত এবং ভারত আমেরিকার মতো দেশগুলোকেও মিথ্যা প্রচার দ্বারা প্রভাবিত করে বাংলাদেশে একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা সৃষ্টির চেষ্টায় মদদ দিয়ে চলেছেন।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দূর করার গণতান্ত্রিক সমাধান হচ্ছে একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান। আমাদের নেত্রীকে দুর্নীতির মামলাতে দণ্ডিত হওয়া সত্ত্বেও মুক্তি না দিলে নির্বাচনে যাব না, আমাদের পছন্দমতো সরকার না হলে নির্বাচনে যাব না—এ ধরনের দাবি তুলে যারা নির্বাচনে যেতে চায় না, বুঝতে হবে তারা নির্বাচনকে ভয় পায়। নির্বাচনে তারা জয়ী হবেন এই আশ্বাস না পেলে তারা নির্বাচনে যাবেন না— এটা হলো তাদের মনের আসল কথা। তাদের দেশি-বিদেশি মিত্র ও অভিভাবকেরাও এই দাবিতে নিজেদের স্বার্থ সুবিধার জন্য তাল দিচ্ছেন। এই তাল না দিলে বিএনপি’র পক্ষে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে গত্যন্তর নেই। আমার ধারণা নির্বাচনে তারা শেষ পর্যন্ত আসবেনই।

নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ করা দরকার। তার বিকল্প তৃতীয় পক্ষকে এনে ক্ষমতায় বসানো নয়। এই তৃতীয় পক্ষ সামরিক বা অসামরিক যে ধরনেরই হোক, তাতে দেশের ভাগ্যে কী ঘটে, তা আমরা এক-এগারোর সময় দেখেছি। আসন্ন নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও অবাধ দেখতে চাইলে দরকার আন্তর্জাতিক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করা। কেন আফগানিস্তানে কারজাই গভর্নমেন্টের আমলে জাতিসংঘের পর্যবেক্ষক হিসেবে ড. কামাল হোসেন কাবুলে যাননি? বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনেও তিনি তার আন্তর্জাতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে কেন শক্তিশালী পর্যবেক্ষক টিম আনার ব্যবস্থা করেন না। এবং নিজেও পর্যবেক্ষণে অংশগ্রহণ করেন না? তার বদলে হাসিনা সরকারকে ক্ষমতা থেকে হটাবার লক্ষ্যে দেশের রাজনীতিতে বিদেশি হস্তক্ষেপ ডেকে আনা অথবা অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় ডেকে আনা কি কল্যাণকর হবে? ড. কামাল হোসেন অথবা তার মতো কেউ অনির্বাচিত সরকারের প্রধান হয়ে জালিয়াতিমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা দিতে পারবেন কি?  বিএনপি আমলে কোন নির্বাচনটি জালিয়াতিমুক্ত হয়েছিল?

দেশ এবং বিদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট মহল থেকে বিএনপি যদি উসকানি না পায় তাহলে তারা নিশ্চিতভাবেই নির্বাচনে আসবেন। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে তারা জয়ী হবেন এটি একটি উদ্দেশ্যমূলক প্রচার। তবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে তাদের শক্ত লড়াই হবে এবং সংসদে তারা শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করতে পারবেন। জামায়াতের সংশ্রবমুক্ত হয়ে সংসদীয় রাজনীতিকে বাধামুক্তভাবে চলতে দিলে ভবিষ্যতে নির্বাচনে তারা জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারবেন না একথা কারো পক্ষেই ভাবা সম্ভব নয়।

ঢাকায় অবস্থানকালে অনেকের মুখেই শুনেছি, ভারত ও আমেরিকার যা মনোভাব, তাতে বিএনপি’র অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচন অনুষ্ঠানে তারা সমর্থন দেবেন কিনা সন্দেহ। দেশের মিলিটারি এবং সিভিল ব্যুরোক্রেসিও যদি দেখে সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের দিকে তাহলে তারাও কী ধরনের ভূমিকা নেবেন তাও জল্পনার বিষয়। দেশের কাগজগুলোতেও এই ধরনের জল্পনা-কল্পনা চলছে।

হাসিনা সরকারের জন্য এটা একটা কঠিন সময়। গত ৭০ বছরেও দেশের যে উন্নয়ন ঘটেনি, তারা তা ঘটিয়েছেন। কিন্তু শেখ হাসিনার সকল অর্জন তার একশ্রেণির মন্ত্রী, এমপি, আমলা নষ্ট করে ফেলেন। তার দলও সুসংহত ও সুশৃঙ্খল নয়। দলের ও সরকারের প্রপাগান্ডা মেশিন খুবই অকার্যকর। তবু এই সরকারের প্রতি আন্তর্জাতিক সমর্থন, বিশেষ করে ভারতের সমর্থনে বিএনপি ও তাদের সমর্থক সুশীল সমাজ এখনো তেমন চির ধরাতে পারেনি, কিন্তু সাম্প্রতিক গুজব ও মিথ্যা প্রচারে পশ্চিমা দেশ ও ভারতের বুদ্ধিজীবী মহলের একাংশকে প্রভাবিত করা গেলেও ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলকে এখনো তেমন প্রভাবিত করা যায়নি।

আওয়ামী লীগ সরকারের উচিত, দেশের সৎ ও নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী ও সাংবাদিকদের দ্বারা শক্তিশালী টিম গঠন করে বিদেশে ও ভারতে প্রেরণ করা এবং এই গুজব ও মিথ্যা প্রচারগুলো খণ্ডনের ব্যবস্থা করা বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী মহলে। কারণ, সব দেশেই বুদ্ধিজীবীরাই জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেন। বাংলাদেশে ’৭১ সালের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের সময় এদেশের বুদ্ধিজীবীরাই সংগঠিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে সকল অপপ্রচার ও গুজব খণ্ডন করেছিলেন। বিদেশি বুদ্ধিজীবীরাও এই মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে এগিয়ে এসেছিলেন।

একাত্তরের মনোবল ও দৃঢ়তা নিয়েই আওয়ামী লীগকে পাহাড়প্রমাণ মিথ্যা ও গুজবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হতে হবে। মিথ্যা প্রচারকারীদের, তারা যতই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন হোন, তাদের মুখোশ খুলে দিতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের দল ও সরকারের মধ্যে কঠোর শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে দলটিকে জনগণের কাছে তাদের নিজস্ব দল হিসেবে তুলে ধরতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি সংগঠিত হয়, তার হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পায়, তাহলে দেশের রাজনীতির বর্তমান অনিশ্চয়তাকে কোনো অপশক্তিই অচলাবস্থায় রূপান্তরিত করতে পারবে না। দেশের সামরিক অসামরিক আমলাতন্ত্র এবং পশ্চিমা শক্তি ও ভারতও যদি দেখে যে, আওয়ামী লীগ একটি জনসমর্থিত শক্তিশালী দল, তাহলে তাদের কোনো মহল বিএনপিকে তার অন্যায় আবদার পূরণে উত্সাহ দেবে না। আর এই উত্সাহ না পেলে বিএনপিও কোনো অজুহাতেই নির্বাচন বর্জনের কথা ভাববে না। এটা একটা সহজ সরল সমাধান মনে হতে পারে কিন্তু এই সমাধানের কোনো বিকল্প আছে কি? – ইত্তেফাক

লন্ডন ১৮ আগস্ট, শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment