দশ দিগন্তে

যুগল ছবি, যুগল-কথা

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

ঢাকার কাগজে এখন যুগল ছবি যুগল কথা ছাপা হয়। এই ছবি ও কথা সম্প্রতি গঠিত যুক্তফ্রন্টের দুই নেতার। আমি এদের নাম দিয়েছি কাগুজে বাঘ। মাঝে মাঝেই কাগজে তারা আবির্ভূত হন। গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন ইত্যাদি সম্পর্কে সুন্দর সুন্দর কেতাবি কথা বলেন, তাদের কথা কেতাবে অথবা কাগজেই আবদ্ধ থাকে। মাঠের রাজনীতিতে তাদের কখনো দেখা যায় না। ভাদ্র মাস এলে যেমন কৈ মাছ উজায়, তেমনি দেশে নির্বাচন এলেই এরা তত্পর হন। কাগজের পাতায় ‘গণতন্ত্রের মানসপুত্র’ হিসেবে আবির্ভূত হন। তার আগে নিজেদের পেশা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। ড্রয়িংরুম পলিটিকস করেন।

আমি সম্প্রতি এই কাগুজে বাঘদের সম্পর্কে আমার বিভিন্ন কলামে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছি। ঢাকায় এক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছেন, আমি এদের সম্পর্কে এত বেশি লেখা লিখছি কেন? এরা কি বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন আর একটা ফ্যাক্টর? আমি তাকে বলেছি, এরা অবশ্যই দেশের রাজনীতিতে এখন আর ফ্যাক্টর নন। ভবিষ্যতেও আর হতে পারবেন, তা মনে করি না। তবু দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত যদি হয় বড় প্রতিবন্ধকতা, তাহলে এরা পথের কাঁটা। আওয়ামী লীগের গণতান্ত্রিক পথচলায় এরা সুযোগ পেলেই পায়ে কাঁটা ফোটায়। বড় ক্ষতি করতে পারে না।

বন্ধুকে বলেছি, ১৯৭৫ সালে কি হয়েছিল বলুন, বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকতেই সিরাজুল আলম খান, আ স ম আব্দুর রব, শাহজাহান সিরাজ প্রমুখ বঙ্গবন্ধুর এককালের অনুসারীদের নিয়ে গড়ে ওঠে অবিভক্ত জাসদ। মনে হয়েছিল, আওয়ামী লীগের সবচাইতে বড় বিরোধী দল হিসেবে গড়ে উঠবে জাসদ।

তখন বিএনপির জন্মই হয়নি। জামায়াত, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম ছিল লাপাত্তা। কিন্তু বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে কিছুদিন ইনফেনটাইল অ্যাডভেঞ্চার চালিয়ে জাসদ বেশিদিন বাজারে থাকতে পারেনি। বিভক্ত ও প্রায় বিলুপ্ত হয়েছে, কিন্তু একাত্তরের পরাজিত শত্রুদের মাথা তোলায়, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যার পথ প্রশস্ত করে দিয়েছে। জিয়াউর রহমানকে সিংহাসনে বসার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। পরে জিয়াউর রহমানই তাদের ফাঁসির রশিতে ঝুলাবার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিলেন। তার ফাঁসির দড়িতে ঝুলেছে শ’য়ে শ’য়ে মুক্তিযোদ্ধাই (কর্ণেল তাহেরসহ)।

বঙ্গবন্ধু হত্যার পর ঘাতকচক্র দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকতে পারত না। যদি তারই অনুসারীদের মধ্য থেকে তারই অত্যন্ত প্রিয় ও কাছের মানুষদের মধ্যের কয়েকজন বিভীষণের ভূমিকা গ্রহণ না করতেন এবং সাইনবোর্ড সর্বস্ব কিছু ছোট ছোট দল গঠন করে সামরিক শাসকদের হাতে শক্তি না জোগাতেন, তাদের আওয়ামী লীগ ভাঙার চক্রান্তে সাহায্য না জোগাতেন এবং নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আওয়ামী লীগের ভোট না কাটতেন, তাতে তারা ক্ষমতায় যেতে পারেননি। বিএনপি-জামায়াতকে ক্ষমতায় আসার সুযোগ করে দিয়েছেন।

এবারেও এই যুগলদের নেতৃত্বে যে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে এবং তাতে জনগণ কর্তৃক বার বার প্রত্যাখ্যাত কিছু মুখচেনা নেতার মুখ দেখা যাচ্ছে, তাতে লাভটা হবে কি? তারা আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে হারিয়ে ক্ষমতায় যেতে পারবেন কি? পারলে কথা ছিল না। জনগণ তাদের গণতন্ত্র এবং সুশাসনের চেহারাটা দেখতে পেত। তারা বড় রূপসী বটে, কিন্তু ভালো রাঁধুনী কিনা সেটাও জানা যেত।

তা তারা পারবেন না। পারবেন, এই আশা দেশের একজন পাগলও চিন্তা করে না। তাহলে কি পারবেন তারা? পারবেন, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন গণতান্ত্রিক মহাজোটের ভোট নষ্ট করতে। গণতন্ত্রের শত্রু, একাত্তরের পরাজিত শক্তি তাদের চাইতেও ভয়াবহ শক্তি আধা তালেবানি ফ্যাসিস্টদের ক্ষমতায় আসার আশঙ্কা সৃষ্টি করতে। অবশ্য তাতে এই যুগল নেতাদের কিছু হবে না। ইতিপূর্বে এই ঘাতক শক্তির সঙ্গে ঘর-সংসার করার অভিজ্ঞতা যুগলের কম-বেশি রয়েছে।

যুগলের মুখে গণতন্ত্র, মানবিক অধিকার ও সুশাসনের কথা। কিন্তু এই তিনটিরই সূতিকাগার যে ধর্মনিরপেক্ষতা বা সেকুলারিজম—তার বর্তমান বিপন্ন অবস্থা এবং কারা এই অবস্থাটি সৃষ্টি করেছে—সে কথা একবারও তারা বলেন না। গণতন্ত্র, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য একটি দেশে দীর্ঘকাল যে রক্তঝরা সংগ্রাম ও আন্দোলন চলে, তার একটিতেও কি এই যুগল নেতারা ছিলেন?

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুগল নেতাদের একজন তার পিতাকে গাড়ি ড্রাইভ করে বর্ডার পার করে দেন। নিজে অধিকৃত ঢাকায় ফিরে আসেন। (পরে যুদ্ধের একেবারে শেষ সময়ে নাকি কলকাতায় গিয়েছিলেন)। এই দীর্ঘ সময়টা অধিকৃত ঢাকায় তিনি কী করছিলেন, তার কোনো সঠিক বিবরণ পাওয়া যায় কি? যুগল নেতাদের এই প্রথম জন বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে না নেমে তাদের প্রধান সহযোগী হয়েছিলেন। রাজনীতির জন্য তার নির্যাতন বরণের একমাত্র উদাহরণ হচ্ছে নিজের দলের হাতে গলাধাক্কা খেয়ে বঙ্গভবন থেকে বের হওয়া এবং মহাখালির রেলপথ ধরে গুন্ডাদের ভয়ে দৌড়ানো। একবার যুগল নেতাদের সভাগৃহে গুন্ডাদের হামলার মুখে মঞ্চের টেবিলের তলায় একসঙ্গে আশ্রয় নিতে দেখা গেছে। (সংবাদপত্রে ছবি বেরিয়েছিল)।

এই হচ্ছে যুগল নেতাদের একজনের গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য লড়াইয়ের চিত্র। আরেকজনের ইতিহাস হচ্ছে, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের হানাদারদের কাছে আত্মসমর্পণ করে লাহোর গমন এবং বেশির ভাগ সময় লাহোরের গুলবার্গে শ্বশুর বাড়িতে অবস্থান। এই সময়টা তার কীভাবে কেটেছে, সেটা তিনিই বলতে পারেন। সে ইতিহাসের কিছুটা আমাদের জানা থাকলেও ‘গণতন্ত্রের এই মানসপুত্র’ সেটা যদি নিজের মুখে প্রকাশ করেন, ভালো হয়।

হ্যাঁ, সামরিক শাসনের আমলেও তিনি গণতন্ত্রের জন্য নির্যাতন বরণ করেছেন বৈকি। আমার জানা মতে, এরশাদের আমলে তাকে একবার চোখ বেঁধে অনেকের সঙ্গে এক অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। তারপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তখন থেকেই তিনি ‘নির্যাতিত নেতা।’ এছাড়া দু’ দুজন সামরিক শাসকের বিরুদ্ধে জনগণের রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের অধিকাংশ সময় এই নেতাকে দেখা গেছে হয় অক্সফোর্ডে, নয় ওয়াশিংটনে সময় কাটাতে। হাসিনা যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারেন, সেজন্য তিনি তৃতীয় আধা-সামরিক শাসন এক-এগারোর সময় ছিলেন এই শাসনের নেপথ্য রূপকার এবং মাইনাস-টু থিয়োরির আসল কারিগর।

এই যুগল নেতার রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, গণতন্ত্র ও সুশাসনের জন্য সংগ্রামের সময় এরা দু’জনেই নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান করেন, চাই কি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধ-শক্তিকে সহায়তা দেন। একজন দিয়েছেন জিয়াউর রহমানকে, আরেকজন দিয়েছেন এক-এগারোর সরকারকে। তারপর আর কেউ যখন (হাসিনা) জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে, মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে মাঠের রাজনীতিতে দৃঢ় অবস্থান নিয়ে গণতন্ত্র উদ্ধার করেন, তখন রাজনীতিতে হঠাৎ তাদের চড়াগলা শোনা যায়। তারা গণতন্ত্র ও সুশাসনের সোল এজেন্ট সাজেন এবং যারা ভয়াবহ নির্যাতন সহ্য করে দেশে পুনঃগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাদের গণতন্ত্র ও সুশাসন সম্পর্কে হিতোপদেশ দিতে থাকেন। ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাবে’। এই সত্যটা তাদের জীবনে সত্য নয়।

এই ভণ্ডামির জন্য যুগলের একজন সম্প্রতি বলতে পেরেছেন, ‘এক স্বেচ্ছাচারীর পরিবর্তে আরেক স্বেচ্ছাচারীকে আমরা ক্ষমতায় আসতে দেব না। যারাই গণতন্ত্রের পক্ষে আমরা তাদের পক্ষে থাকব। শুধু মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে যারা ছিল আমরা তাদের সঙ্গে যাব না এটা পরিষ্কার।’ এই উক্তি শুনে হাসব না, কাঁদব? যিনি রাজনীতি চর্চায় নেমেই প্রথমে এক স্বেচ্ছাচারী সামরিক শাসকের সহযোগী হয়েছেন, ক্যান্টনমেন্টে গঠিত তার দলের হয়েছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, ২০০১ সালেও যাকে বিএনপি-জামায়াত এলায়েন্সের শীর্ষ নেতা হিসেবে দেখা গেছে, তিনি কোন মুখে এসব কথা বলছেন তা আমার বোধগম্য নয়।

যুগলদের আরেক নেতা এখন জামায়াতের বিরুদ্ধে বড় বড় কথা বলছেন, কিন্তু জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি কি তাদের সঙ্গে ইফতার পার্টিতে একাসনে বসে ইফতার সারেননি? দু’জনেই জাতীয় প্রেসক্লাবের সভামঞ্চ থেকে ঘোষণা দিয়েছেন, ‘এটাই আওয়ামী লীগের জন্য ক্ষমতায় থাকার শেষ বছর।’ দেখা যাক তাদের এই ‘চিয়াংকাইশেকি ঘোষণা’ সত্য হয় কিনা? চীনের কুওমিংটাঙ নেতা চিয়াংকাইশেক ফরমোজায় মার্কিন পাহারায় বাস করার সময় যতদিন জীবিত ছিলেন, প্রতি বছর ঘোষণা দিতেন, এটাই চীনে কম্যুনিস্ট শাসনের শেষ বছর। তার জীবনের শেষ বছরেও তিনি এই ঘোষণা দিয়েছেন। ঘোষণা সফল হয়নি। তিনি পরপারে চলে গেছেন। এই যুগল নেতাদেরও ভাগ্যে কি আছে, কে বলবে!

যুগল নেতাদের একজন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভায় শেখ হাসিনার ১০ বছরের শাসনকে আইয়ুবের দশ বছরের শাসনের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বলেছেন, ‘অনেক সহ্য করেছি। দশ বছর হয়ে গেছে, এবার চলে যাও।’ কী মিষ্টি আবদার! এই আবদার নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। কিন্তু আইয়ুবের শাসনকালের সঙ্গে হাসিনার শাসনকালের তুলনা হয় নিম্নস্তরের ঈর্ষাকাতরতা অথবা অজ্ঞতার পরিচায়ক। এ সম্পর্কে আমার অন্য কোনো কলামে আলাদাভাবে আলোচনার ইচ্ছে রইল। – ইত্তেফাক

 লন্ডন, ৮ সেপ্টেম্বর, শনিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment