তৃতীয় মত

তাদের মুখে এসব কথা উচ্চারিত হওয়া সাজে কি?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সম্প্রতি ঢাকার জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক গোলটেবিল আলোচনায় নবগঠিত যুক্তফ্রন্টের দুই শীর্ষ নেতা যেসব কথা বলেছেন, তা নিয়ে আমার একটি কলামে (যুগান্তরে নয়) আলোচনা করেছি। কিন্তু এই সেমিনারে উচ্চারিত একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করিনি। বিষয়টি সিরিয়াস। এটি দেশের নবপ্রজন্মের তরুণদের বিভ্রান্ত করার জন্য একটি জঘন্য মিথ্যাচার ও তথ্যবিকৃতি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের এই সভায় ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী বলেছেন, ‘পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান ছিলেন বড় স্বৈরাচার। দশ বছরের বেশি তার স্বৈরাচার টেকেনি। এখন যে স্বৈচ্ছাচারী সরকার ক্ষমতায় আছে, তাদের মেয়াদও ১০ বছর। অনেক সহ্য করেছি। ১০ বছর হয়ে গেছে। এবার চলে যাও। আমার মনে হয় এটাই আওয়ামী লীগের শেষ বছর। এক স্বৈরাচারীর পরিবর্তে অন্য স্বৈরাচারীকে আমরা ক্ষমতায় আসতে দেব না। যারাই গণতন্ত্রের পক্ষে আমরা তাদের সঙ্গে থাকব।’

এই কথাগুলো যদি আন্তরিকতাপ্রসূত হতো, ইতিহাস-বিকৃতি না হতো তাহলে আপত্তি করার কিছু ছিল না। ডা. বরুদ্দোজা চৌধুরীর রাজনৈতিক অতীত নিয়েও ঘাঁটাঘাঁটি করার কিছু থাকত না। কিন্তু এই কথাগুলো আন্তরিকতা প্রসূত নয়, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ প্রসূত এবং শুধু ইতিহাস বিকৃতি নয়, ইতিহাস-বিশ্লেষণে মূর্খতারও প্রকাশ। প্রথম কথা, আইয়ুব খান বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখল করেছিলেন, বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় ছিলেন। শেখ হাসিনা বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় আসেননি। এসেছেন গণতান্ত্রিক আন্দোলন করে এবং নিয়মতান্ত্রিক পন্থায়। হাসিনাকে আইয়ুবের মতো স্বৈরাচারী বলা চরম মিথ্যা।

এদিক থেকে বরং ডা. চৌধুরীর মতে নেতা জেনারেল জিয়াউর রহমানকে আইয়ুবের পন্থায় ক্ষমতা দখলকারী স্বৈরাচারী বলা যায় এবং ডা. চৌধুরী তাকে সহায়তা দিয়ে ক্যান্টনমেন্টে বসে বিএনপি নামে যে দল গঠন করেছিলেন, তা ছিল স্বৈরাচারী শাসনের ক্রীড়নক দল। ডা. চৌধুরী তার রাজনৈতিক জীবনের সূচনাতেই কোনো গণতান্ত্রিক নেতা ও গণতান্ত্রিক দলের পক্ষে অবস্থান নেননি। তিনি সেবা করেছেন এক সামরিক শাসকের এবং তার সামরিক শাসনের বাহক দলটির। সেই দল থেকে বহিষ্কৃত হয়ে তিনি গণতন্ত্রের সেবক সেজেছেন।

আইয়ুব ১০ বছর দেশ শাসন করেছেন জনগণকে প্রতারণা করার জন্য ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ নামে এক গণতন্ত্র বিরোধী পদ্ধতি প্রবর্তন করে। জেনারেল জিয়া ছয় বছর দেশ শাসন করেছেন জনগণকে প্রতারণার জন্য মৌলিক গণতন্ত্রের অনুকরণে গ্রাম সরকার নামে এক পদ্ধতি দ্বারা। ডা. বদরুদ্দোজা তার সহযোগী ছিলেন। আইয়ুবের মতো জেনারেল জিয়া ‘হ্যাঁ, না’ গণভোটের প্রহসনে স্বনিযুক্ত রাষ্ট্রপতি হন। ডা. চৌধুরী তখনও কি তার পার্শ্বচর ছিলেন না?

আইয়ুব ক্ষমতা দখল করে দেশের নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত এবং জাতীয় সংসদে গৃহীত ১৯৫৬ সালের সংবিধান (পাকিস্তানের) ধ্বংস করেন এবং নিজের একক ইচ্ছায় একটি আইয়ুবি সংবিধান তৈরি করে তা দেশের মাথায় চাপিয়ে দেন। দল গঠন করেন কনভেনশন মুসলিম লীগ। বাংলাদেশে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখলের পর স্বাধীনতা যুদ্ধের পবিত্র মূলমন্ত্রের ভিত্তিতে নির্বাচিত জন প্রতিনিধিদের দ্বারা রচিত (যার আবার অন্যতম প্রণেতা ছিলেন ড. কামাল হোসেন) এবং জাতীয় পার্লামেন্টে সর্বসম্মতভাবে গৃহীত ১৯৭২ সালের সংবিধান একক ইচ্ছায় আইয়ুবের কায়দায় নষ্ট করেননি? সংবিধানের মৌলিক বিধানগুলো ধ্বংস করে তার মর্যাদাহানি করেননি? ডা. বদরুদ্দোজা এই সময়েও কি তার বন্ধু ও নেতার পাশে ছিলেন না? আজ সেই সংবিধানের মর্যাদা ও পবিত্রতা রক্ষার নাম কি মায়াকান্না! ইতিহাস, তুমি অন্ধ হয়ে যাও!

ক্ষমতা দখল থেকে রাজনৈতিক দল গঠনে যে স্বৈরাচারী আইয়ুবের হুবহু অনুকরণ করেছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান, সেই জেনারেলের আমৃত্যু সহকারী এবং পরবর্তীকালে তার স্ত্রীর প্রথমদিকের প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও সহযোগী আজ গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে আইয়ুব খানের সঙ্গে তুলনা করছেন শেখ হাসিনার! তাকে আইয়ুব খানের মতো স্বৈরাচারী আখ্যা দিচ্ছেন এবং হাস্যকর উক্তি করছেন ‘আইয়ুব খানের রাজত্ব ১০ বছর স্থায়ী হয়েছিল, হাসিনার রাজত্বও তাই হবে। এটাই তার ক্ষমতায় থাকার শেষ বছর।’ হাসিনা বিদ্বেষে অন্ধ না হলে কারও পক্ষে একথা বলা সম্ভব হয় না।

আইয়ুব তার ১০ বছরের শাসনকালকে ‘উন্নয়নের দশক’ নাম দিয়েছিলেন। তারপরও ক্ষমতায় আঁকড়ে থাকতে চেয়েছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় বা নির্বাচন দিয়ে তাতে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ত্যাগ করেননি। তার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল। তাছাড়া তিনি জানতে পেরেছিলেন, জেনারেল ইয়াহিয়ার নেতৃত্বে একদল সেনাপতি এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো তাকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের ষড়যন্ত্র চালাচ্ছে। তার পেশোয়ারের জনসভায় বোমা নিক্ষিপ্ত হয়েছে। পাকিস্তানের দুই অংশে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। এ ব্যাপারে আইয়ুবের মতো কিংবা তার চেয়েও ভয়াবহভাবে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ ঘটে জেনারেল জিয়ার। আইয়ুবের মতোই নিজের সামরিক বাহিনীর একাংশের হাতে মৃত্যুবরণ করতে হয় তাকে। গুলিতে তার শরীর ঝাঁজরা হয়ে গিয়েছিল। শব শনাক্ত করা কঠিন হয়েছিল।

বাংলাদেশেও শেখ হাসিনার শাসনকাল এ বছর ১০ বছর পূর্ণ হবে। কিন্তু এ বছরই তার শাসনের শেষ বছর এটা ডা. চৌধুরীর কানে কানে কে বলেছিল?

তাকে ক্ষমতা থেকে তাড়ানোর জন্য কোনো আন্দোলন দেশে নেই। আন্দোলন করে, সন্ত্রাস করে হাসিনা সরকারের পতন ঘটানোর বহু চেষ্টা করেছে বিএনপি-জামায়াত। জন সমর্থন পায়নি। বিদেশিদের সাহায্যে কামাল-বদরুদ্দোজা-ইউনূস গং বহু ষড়যন্ত্র করেছেন একই উদ্দেশ্য সফল করার জন্য। ব্যর্থ হয়েছেন।

শেখ হাসিনা তার শাসনকালের মেয়াদ শেষে গণতান্ত্রিক নিয়ম অনুসরণে একটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। এই নির্বাচনে যদি জনগণ তার জোটকে ভোট না দেয়, তাহলে তিনি সম্মানের সঙ্গে জনগণের ম্যান্ডেট মেনে ক্ষমতা থেকে চলে যাবেন। সেই ইচ্ছাই তিনি ব্যক্ত করেছেন। অতীতেও তিনি এভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন, তাতে অসম্মানের কিছু নেই। আর যদি এবারের নির্বাচনেও তিনি জনগণের ম্যান্ডেট পান, তাকে ক্ষমতা থেকে হটায় কে? ডা. চৌধুরীরা তো আগেও জোট বেঁধে অনেক চেষ্টা করেছেন। সফল হয়েছেন কি? ১৯৯৬ সালে তো ডা. চৌধুরীরা স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়েননি। জনগণকে গলাধাক্কা দিয়ে তাদের ক্ষমতা থেকে সরাতে হয়েছিল। হাসিনকে তো কেই কোনোবারই এভাবে গলাধাক্কা দিয়ে ক্ষমতা থেকে সরায়নি। সরাতে হয়নি। কারণ তিনি গণতান্ত্রিক পন্থাতেই ক্ষমতায় এসেছেন, গণতান্ত্রিক পন্থাতেই ক্ষমতা ছেড়েছেন। আবার ক্ষমতায় এসেছেন। ডা. বদরুদ্দোজা বলেছেন, শেখ হাসিনার ১০ বছরের শাসনে তারা অথবা তিনি অতিষ্ঠ; বলেছেন, ‘অনেক সহ্য করেছি। ১০ বছর হয়ে গেছে। এবার চলে যাও।’ হাসিনা সরকারের শাসনে কারও কারও মনে জ্বালা সৃষ্টি হতে পারে, কিন্তু ডা. চৌধুরী অতিষ্ঠ হলেন কেন? তার রাজনৈতিক জীবনে কখনও তার শরীরে একটি ফুলের টোকাও লাগেনি। নিজের পেশায় তিনি প্রতিষ্ঠিত। তাই নিজের বাসায় বসে প্র্যাকটিস করে দেদার টাকা কামাচ্ছেন। বিকল্প ধারা নামে পারিবারিক রাজনৈতিক দল গঠন করেছেন। তিন দিনের রাষ্ট্রপতি ছিলেন, সেটাই নামের সঙ্গে যুক্ত করে রাজনীতিতেও বর্ষীয়ান নেতা সেজেছেন। আওয়ামী লীগের একজন ক্ষুদে নেতাও গণতন্ত্র ও সংবিধানের মর্যাদা রক্ষার জন্য যে নির্যাতন বরণ করেছেন, তিনি সেই নির্যাতনও কখনও বরণ করেননি। সুতরাং আওয়ামী লীগের শাসনামলে তিনি কী অত্যাচার সহ্য করেছেন, তা একটু খুলে বললে ভালো করতেন।

আইয়ুবের ১০ বছরের শাসনের উন্নয়ন আর হাসিনা সরকারের ১০ বছরের উন্নয়নের চিত্র কি এক? আইয়ুব তার দুর্নীতিবাজ সিও (ডেভ) ও মৌলিক গণতন্ত্রীদের দু’হাতে টাকা ঢেলে উন্নয়নের বালির বাঁধ তৈরি করেছিলেন, তা কি তার পতনের সঙ্গে সঙ্গে ধুলায় মিশে যায়নি? বিএনপি যখন ক্ষমতায় এবং ডা. চৌধুরী যখন মন্ত্রী, তখন খালেদা জিয়া দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইছে বলে দাবি করেছিলেন। সেই জোয়ারের চিহ্ন এখন কোথায়? হ্যাঁ, উন্নয়ন হয়েছিল তার পরিবারের সদস্যদের।

হাসিনা সরকারের এক দশকের শাসনের অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতি আছে, কিন্তু দেশের আর্থিক অবস্থার অভূতপূর্ব উন্নয়ন দৃশ্যমান। উড়াল সেতুতে ঢাকা ভরে গেছে। দেশের চলাচল ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। যমুনার পর পদ্মা সেতু তৈরি হতে যাচ্ছে। মহাকাশে বাংলাদেশ উপগ্রহ উড়িয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন করা হয়েছে। অবৈতনিক শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বিনামূল্যে শিশুদের পাঠ্যবই দেয়া হচ্ছে। দিনমজুর থেকে গ্রামের কৃষকের আয় বেড়েছে। উত্তরবঙ্গের বাৎসরিক মঙ্গা এখন অতীতের কাহিনী। সবচেয়ে বড় কথা, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে যে সন্ত্রাস দেশময় ছড়িয়েছিল, তা দমন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর ঘাতক, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও দণ্ডদান করা হয়ছে। সারা বিশ্বে এজন্য হাসিনা সরকার প্রশংসিত হয়েছে।

এগুলো কি ডা. চৌধুরীদের চোখে পড়ে না? তারা কেবল খারাপ দিকগুলোই বড় করে তুলে ধরতে চান। তাও রঞ্জিত-অতিরঞ্জিত করে। ডা. চৌধুরীদের আমলে এই খারাপ দিকগুলোই তো বড় ছিল। কোনো ভালো দিক ছিল কি? দেশের মানুষ এখন জানে, হাসিনা সরকারের যে দোষ-ত্রুটিগুলো এখনও সংশোধন করা যায়নি, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে সেগুলোরও পালাক্রমে সংশোধন হবে। কিন্তু তার বদলে ডা. চৌধুরীরা যদি ক্ষমতায় আসেন, কিংবা তাদের সহায়তায় বিএনপি-জামায়াত, তাহলে বাংলাদেশে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের কিলিং ফিল্ড তৈরি হবে। – যুগান্তর

লন্ডন, ৯ সেপ্টেম্বর, রবিবার, ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment