তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার প্রেতাত্মাকে কি আবার জাগানো দরকার?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

লন্ডনে আমার যেসব বিদেশী সাংবাদিক বন্ধু আছেন ইদানীং দেখা হলেই তারা জিজ্ঞাসা করেন, একসময় তোমাদের আওয়ামী লীগই তো বিরাট গণআন্দোলন করে দল নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি বিএনপি সরকারের কাছ থেকে আদায় করেছিল। তাহলে এখন সেই আওয়ামী লীগের সরকারই কেন একটি নিরপেক্ষ অদলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে যেতে ভয় পাচ্ছে?

সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত পিনাকরঞ্জন চক্রবর্তী তার এক লেখায় এই একই প্রশ্ন একটু অন্যভাবে তোলায় লন্ডনেও বিষয়টি অনেকের মনে জেগেছে। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, আওয়ামী লীগের প্রোপাগান্ডা এবং কাউন্টার প্রোপাগান্ডা যন্ত্র এতই দুর্বল এবং অযোগ্য যে, বিএনপি-জামায়াত এবং দেশের সুশীল সমাজের অসত্য প্রচারণাগুলোও তারা খণ্ডন করতে চান না অথবা পারেন না।

আমার মনে আছে, ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভাগ্য বিপর্যয়ের সময়ও এই অবস্থা দেখেছি। বঙ্গভবনে বসে আওয়ামী লীগের মনোনীত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীন সাহেবই যে ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, মান্নান ভূঁইয়া প্রমুখ সুশীল ও রাজনীতিকদের কান পরামর্শে পর্দার অন্তরালে বসে নানা অনৈতিক কাজ করেছেন এবং মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ একশ্রেণীর পশ্চিমা কূটনীতিকের (সুশীল সমাজের পৃষ্ঠপোষক) তৎপরতায় মদদ জুগিয়েছেন এবং তাদের দোসর ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান বিচারপতি লতিফুর রহমান ওরফে শান্তি মিয়া এসব খবর সুদূর লন্ডনে বসেও জানতে পেরেছি।

এ সময় ঢাকা থেকে মোনায়েম সরকারসহ যেসব বন্ধু আমাকে নানা তথ্য উপাত্ত পাঠিয়েছেন, তাদের মধ্যে জনকণ্ঠের বর্তমান নির্বাহী সম্পাদক স্বদেশ রায়ের সাহায্য বিশেষভাবে আমার উল্লেখ করা উচিত। তিনি দুঃসাহস দেখিয়ে আমাকে পাঠাতেন নিউজ বিহাইন্ড দ্য নিউজ। ফলে সাহাবুদ্দীন সাহেব সম্পর্কে অনেক গোপন তথ্য জানতে পারি। এই তথ্য ভিত্তি করেই তখন লিখেছিলাম, ‘বঙ্গভবনে একজন ঈশ্বরের মৃত্যু’। এই লেখাটি পাঠ করে সাহাবুুদ্দীন সাহেব এতটাই চটেছিলেন যে, তিনি অতো বড় উচ্চাসন থেকে অত্যন্ত নিচে নেমে এসে আমাকে মিথ্যাবাদী, অসাধু সাংবাদিক বলে গালি দিতে দ্বিধা করেননি।

বর্তমানে এই উচ্চাসনে বসে নিজের সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র পাকাবার সম্ভাবনা নেই। কারণ, এখন যিনি রাষ্ট্রপতি, তিনিও আওয়ামী লীগ কর্তৃক মনোনীত রাষ্ট্রপ্রধান হলেও তিনি বর্তমান সুশীল সমাজের চরিত্র ভালোভাবে জানেন। তারা কোনভাবেই তাকে সাহাবুদ্দীন সাহেবের মতো ‘হিপনোটাইজ’ করতে পারবে না। সুতরাং রাষ্ট্রের উচ্চাসন থেকে আওয়ামী লীগের ভয় করার কিছু নেই। কিন্তু ভয় করার আছে প্রোপাগান্ডা যুদ্ধে। এই যুদ্ধে আওয়ামী লীগ শিবিরে দক্ষ সৈনিকের অভাব। আওয়ামী লীগে সরকারের অনুগ্রহভোগী অনেক বুদ্ধিজীবী আছেন। কিন্তু তাদের অবস্থা লজ্জাবতী লতার মতো। কেউ তাদের আওয়ামী লীগপন্থী বলে ভাবে, এই ভয়ে দু-একজন ছাড়া আর সকলেই গা বাঁচিয়ে লেখালেখি করেন।

সুশীল সমাজ তাই পুরনো খেলা নতুনভাবে খেলার সুযোগ পাচ্ছে। তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি সম্পর্কে আওয়ামী লীগ সরকারের বর্তমান ভূমিকা নিয়ে ভুল ধারণা বিশ্বময় ছড়াচ্ছে এবং তাদের প্রোপাগান্ডা ও ম্যানুপুলেশন শক্তির জোরে শহিদুল আলমের গ্রেফতার নিয়ে বিশ্বের অনেক নোবেল জয়ীকেও বিভ্রান্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি প্রবর্তিত হয়েছিল আওয়ামী লীগসহ দেশের গণতান্ত্রিক দলগুলোর দাবি ও আন্দোলনের ফলেই। বিএনপি-জামায়াত সরকারের নির্বাচন কারচুপি এমন তুঙ্গে উঠেছিল যে, নির্বাচন পরিচালনায় অদলীয় সরকার গঠন তখন সময়ের দাবি ছিল। সকলেরই ধারণা ছিল, যতদিন দেশে নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হয়ে না ওঠে। ততদিন নির্দলীয় সরকারের অধীনেই তা অনুষ্ঠিত হোক। এটাই ছিল সকল দলমতের মানুষের মনের ইচ্ছা।

কিন্তু বিএনপি গোড়া থেকেই এই ব্যবস্থাটি দূষিত ও ব্যর্থ করার চক্রান্তে ওঠে পড়ে লেগে যায়। আন্দোলনের মুখে যখন তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি মানতে বাধ্য হয় এবং সংসদের মধ্যরাতের অধিবেশনে সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানভুক্ত করে, তখন তারা আওয়ামী লীগের ভুলের সুযোগ নিয়ে একটি শয়তানির আশ্রয় নেয়। এত পুরনো রাজনৈতিক দল হয়েও আওয়ামী লীগ এই ভুলটি করে। বিএনপি সরকার তাদের দাবি মেনে নিয়েছে এই পরমানন্দে মধ্যরাতে শয্যাসুখ ছেড়ে সংসদের ওই অধিবেশনে যোগ দেয়া প্রয়োজন মনে করেনি। এই ভুলের খেসারত পরে তাদের দিতে হয়েছে।

মধ্যরাতের সেই বিরোধী দলবিহীন সংসদের অধিবেশনে বিএনপি সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করতে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে সব মন্ত্রী দফতর রাখার ব্যবস্থা করলেও দেশরক্ষা দফতরের ভার প্রেসিডেন্টের হাতে রাখার গোপন কৌশল গ্রহণ করে। পরদিন আওয়ামী লীগ জানতে পারলেও এটাকে কোন গুরুত্ব দেয়নি। দেশের প্রেসিডেন্ট তখন বিএনপি মনোনীত ‘রাজাকার রাষ্ট্রপতি’ নামে খ্যাত আবদুর রহমান বিশ্বাস।

বিচারপতি হাবিবুর রহমান শেলি প্রথম তত্ত্বাবধায়কের প্রধান হতে না হতেই শুরু হয়, এই সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। জাতির উদ্দেশ্য বিচারপতি হাবিবুর রহমানের টেলিভাষণ অর্ধপথে বন্ধ করে দেয়া হয়। জানা যায়, এটা বিএনপিপন্থী টেলি অফিসারের কাণ্ড। অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি বিশ্বাস ও বিএনপিপন্থী এক সেনা অফিসার মাহবুবুর রহমানের (বর্তমানে বিএনপি নেতা) যোগসাজশে একটি সেনা অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। তুরস্কের মতোই জনগণের তীব্র বিরোধিতা এবং শেখ হাসিনার দৃঢ় ভূমিকার ফলে সেই সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ হয়।

২০০১ সালে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের আমলে বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত দ্বিতীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাণ্ডকীর্তির কথা আগেই উল্লেখ করেছি। সুশীল সমাজ ও বিদেশী কূটনীতিকদের সহযোগিতায় এই সরকারকে হাতের পুতুল বানিয়ে যে মিডিয়া ক্যু’র নির্বাচন হয়েছিল এবং নির্বাচন পরবর্তী দেশে অত্যাচার ও নিপীড়নের যে তাণ্ডব সৃষ্টি করা হয়েছিল তা আজ ইতিহাস।

সবশেষে বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজদ্দীনের আমলে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়, সেই সরকারই এই ব্যবস্থাটিকে হত্যা করে তার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেয়। প্রথমত. বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন নিজেই নিজেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা বলে ঘোষণা করেন এবং নির্দলীয়ভাবে মনোনীত উপদেষ্টারা তার স্বেচ্ছাচারী কার্যকলাপে বিরক্ত হয়ে পদত্যাগ করলে তিনি নিজেই বশংবদ কয়েকজন উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। সবাই জেনে গিয়েছিল তিনি চালিত হচ্ছেন লাল টেলিফোনে হাওয়া ভবন থেকে পাওয়া তারেক রহমানের নির্দেশে।

দেশে জনবিক্ষোভ পুঞ্জীভূত হয় এবং শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনী দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে। সেনাসমর্থিত নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ২০০৭ সালে তাদের তত্ত্বাবধানে নির্বাচন হয়। নির্বাচনে বিএনপি শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু ক্ষমতা থেকে যাওয়ার আগে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাটিকে পচিয়ে দূষিত করে আর লাশ রাস্তায় ফেলে রেখে যায়।

শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর এই লাশেরই সম্মানজনক দাফন কাফনের ব্যবস্থা করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সর্বদেশে প্রচলিত ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। এখানেই বিএনপির আপত্তি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে হাতের পুতুল বানিয়ে তারা পুরনো খেলা খেলতে পারবে না জেনেই এই ব্যবস্থাটির জন্য মায়াকান্না জুড়ে দিয়েছে। এই কান্নায় গলা মিশিয়েছে সুশীল সমাজ। কেবল সাধারণ মানুষকে বুঝতে দেয়া হচ্ছে না। অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের নাম পাল্টে অদলীয় সরকারের নামে যে সরকারই গঠিত হোক তা হবে অতীতের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরই প্রেতাত্মা। এই প্রেতাত্মা দ্বারা বাংলাদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তা নেই।

এই সত্যটি দেশের মানুষ এবং বিশ্ববাসীর কাছে পৌঁছাতে আওয়ামী লীগের প্রচারযন্ত্র সম্পূর্ণ ব্যর্থ। এখানেই আমার ভয়। প্রচারণায় জয় যুদ্ধ জয়ের অর্ধেক। এই সত্যটি যেন আওয়ামী লীগের নেতারা মনে রাখেন। এখনও সময় আছে। তারা সতর্ক ও সক্রিয় হোন। – জনকন্ঠ

[লন্ডন, ১১ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার, ২০১৮] প্রকাশিত : ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment